বিএনপি সরকার ১০০ দিন পার করেছে। যেকোনো সরকারের প্রথম ১০০ দিন গুরুত্বপূর্ণ। কেননা, সরকারের নীতি বা সরকার কোন পথে যেতে চায়, তার একটি বার্তা পায় জনগণ। আপনারা প্রথম ১০০ দিনে কতটুকু কী করতে পারলেন?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: প্রথম ১০০ দিনকে আমরা শুধু একটি সময়সীমা হিসেবে দেখি না; এটি ছিল ধ্বংসস্তূপ থেকে রাষ্ট্রকে তুলে আনার প্রথম রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পরীক্ষা। আমরা যখন দায়িত্ব নিয়েছি, তখন অর্থনীতির শরীরে ছিল বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের দীর্ঘ ক্ষত। উচ্চ মূল্যস্ফীতির ভারে মানুষ ছিল জর্জরিত; ব্যাংক খাত লুটপাট, অনিয়ম ও রাজনৈতিক ঋণখেলাপির ভারে ক্ষতবিক্ষত; পুঁজিবাজারে সাধারণ বিনিয়োগকারীর পুঁজি কারসাজি ও আস্থাহীনতার আগুনে পুড়ে প্রায় নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল আর বাজারব্যবস্থা ছিল সিন্ডিকেটের হাতে জিম্মি। এই বাস্তবতা আড়াল করে উন্নয়নের গল্প বলা সহজ, কিন্তু আমরা সেই পথ বেছে নেয়নি। আমরা জনগণকে সত্য বলেছি এবং সেই সত্যের ওপর দাঁড়িয়ে পুনর্গঠনের কাজ শুরু করেছি।
এই ১০০ দিনে আমাদের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো, সরকার কোন পথে যাবে, তা জাতির সামনে পরিষ্কার করা। আমরা বলেছি, রাষ্ট্র আর কোনো গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত সম্পদ নয়—ব্যাংক, বাজেট, বাজার, পুঁজিবাজার, প্রশাসন এবং উন্নয়ন প্রকল্প জনগণের স্বার্থেই পরিচালিত হবে। দায়িত্ব গ্রহণের পর সরকার বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ–সংকট, বিনিয়োগে স্থবিরতা, কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার মতো একাধিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েও দ্রুত নীতি-সিদ্ধান্ত, অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় স্থিতিশীলতা এবং প্রশাসনিক শৃঙ্খলার ইঙ্গিত দিয়েছে।
মানুষের জীবনে সরাসরি প্রভাব ফেলে, এমন কর্মসূচিগুলো আমরা অগ্রাধিকার দিয়েছি। ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, খাল খনন, হাম-রুবেলা টিকাদান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ, ভূমিসেবা অটোমেশন, কৃষিঋণ সহায়তা, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা সহায়তা, শ্রমিকদের বেতন-বোনাস নিশ্চিতকরণ, জ্বালানি সরবরাহ স্থিতিশীল রাখা এবং দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়া—এসব উদ্যোগ প্রথম ১০০ দিনের কাজের দিকনির্দেশনা স্পষ্ট করেছে।
এই সময়েই ৫৩ হাজারের বেশি পরিবার ফ্যামিলি কার্ড পেয়েছে, ২০ হাজারের বেশি পরিবার কৃষক কার্ড পেয়েছে, ২ কোটির বেশি শিশুকে হাম-রুবেলা টিকা দেওয়া হয়েছে, ৬৬৬টি খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে, ৬৫ হাজার ৫৬৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে, ৫৫ লাখ পরিবারকে ১৫ টাকা কেজি দরে চাল দেওয়ার কার্যক্রম চলেছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উন্নতির পথে এসেছে। এগুলো হয়তো সব সমস্যার শেষ সমাধান নয়; কিন্তু এগুলো প্রমাণ করে, সরকার মানুষের ঘরে, মাঠে, বাজারে এবং কর্মক্ষেত্রে পৌঁছাতে চায়।
আমরা দাবি করছি না যে ১০০ দিনে সবকিছু বদলে গেছে। বিগত সুদীর্ঘ ফ্যাসিবাদী শাসনের ক্ষত ১০০ দিনে সারানো যায় না। কিন্তু এই ১০০ দিনে আমরা একটি বিষয় প্রমাণ করেছি—রাষ্ট্রের দিক পাল্টেছে। লুটপাটের অর্থনীতি থেকে উৎপাদনের অর্থনীতিতে, সিন্ডিকেটের বাজার থেকে প্রতিযোগিতামূলক বাজারে, ভঙ্গুর ব্যাংক থেকে সুশাসিত আর্থিক খাতে এবং ভয়ভীতির রাজনীতি থেকে জনগণকেন্দ্রিক প্রশাসনের পথে আমরা যাত্রা শুরু করেছি।
মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা—এই তিন অগ্রাধিকার ঠিক করেছিল সরকার। তিন অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি কি আদৌ দেখা যাচ্ছে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: সরকারের প্রথম বৈঠকেই এই তিন অগ্রাধিকার নির্ধারণ করা কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছিল না; এটি ছিল বাস্তব সংকটের সরাসরি স্বীকৃতি। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে বাজার সিন্ডিকেট এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল যে সাধারণ মানুষ জানত না, পণ্যের দাম বাজারে নির্ধারিত হচ্ছে, নাকি অদৃশ্য কোনো রাজনৈতিক-ব্যবসায়িক চক্রের বৈঠকে নির্ধারিত হচ্ছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দায়, অদক্ষতা এবং অস্বচ্ছ চুক্তির বোঝা অর্থনীতিকে দুর্বল করেছে।
আইনশৃঙ্খলা খাতে মানুষের আস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এই তিন ক্ষেত্রেই আমরা আগুন নেভানোর কাজের পাশাপাশি ভেতরের কাঠামোগত সমস্যাও চিহ্নিত করেছি।
দ্রব্যমূল্যের ক্ষেত্রে সরকার বাজার মনিটরিং জোরদার করেছে, টিসিবি কার্যক্রম ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে, প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে আমদানি ও মজুত ব্যবস্থাপনা সক্রিয় করেছে এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকিমূলক সহায়তা সম্প্রসারণ করেছে। আমাদের লক্ষ্য, বাজারে আতঙ্ক নয়, স্বস্তি ফেরানো। মূল্যস্ফীতি এক দিনে তৈরি হয়নি, তাই এক দিনে যাবে না। কিন্তু বাজারে সিন্ডিকেট, অতিরিক্ত মুনাফা, সরবরাহ বাধা এবং আমদানি ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে আমরা ধারাবাহিক ব্যবস্থা নিচ্ছি।
আইনশৃঙ্খলার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ আছে, এটি আমরা অস্বীকার করি না। তবে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার—পুলিশ কোনো দলের নয়, রাষ্ট্রের; বিচার কোনো মবের হাতে নয়, আদালতের এবং নাগরিক নিরাপত্তা কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়, সাংবিধানিক অধিকার। কিশোর গ্যাং, মাদক, সাইবার অপরাধ, অনলাইন জুয়া, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং মব সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিত পদক্ষেপের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নতুন জনবল নিয়োগ, প্রযুক্তিভিত্তিক নজরদারি এবং দ্রুত বিচারিক প্রক্রিয়ার উদ্যোগ এগুলোর অংশ।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রেও সরকার অস্বাভাবিক বৈশ্বিক চাপের মধ্যে কাজ করছে। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি ও জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার মধ্যেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, বিকল্প উৎস অনুসন্ধান, সরকারি দপ্তরে জ্বালানি সাশ্রয়, কৃষি সেচে জ্বালানি অগ্রাধিকার এবং দীর্ঘমেয়াদি নবায়নযোগ্য জ্বালানি পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যুদ্ধাবস্থায় ভর্তুকির মাধ্যমে তেলের বাজার নিয়ন্ত্রণ করার কথাও ১০০ দিনের অগ্রগতিতে উল্লেখ আছে।
দৃশ্যমান অগ্রগতি আছে, তবে কাজ শেষ হয়নি। আমরা বুঝি, মানুষের কাছে অগ্রগতির মাপকাঠি হলো বাজারে দাম, রাস্তায় নিরাপত্তা, ঘরে বিদ্যুৎ এবং চাকরি ও ব্যবসার সুযোগ। সেই মাপকাঠিতেই আমরা নিজেদের বিচার করতে প্রস্তুত।
অন্তর্বর্তী সরকারের মতোই বর্তমান সরকারের আমলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাগরিকদের উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ। পল্লবীর শিশুধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা নাগরিকদের আরেক দফা ক্ষুব্ধ ও শঙ্কিত করেছে। কুষ্টিয়া ও ঢাকায় মাজারে হামলার মতো মব সহিংসতাও সম্প্রতি দেখা গেল। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি ও স্থিতিশীলতার সঙ্গে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থানের সম্পর্কও নিবিড়। এ ক্ষেত্রে তো সরকারের মনোযোগের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। আপনার মন্তব্য কী?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আপনাদের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং সরকারের পক্ষ থেকে আমি এ বিষয়ে কোনো রকম আত্মতুষ্টির ভাষা ব্যবহার করব না। পল্লবীর শিশুর ওপর নির্মম অপরাধ, মাজারে হামলা, মব সহিংসতা বা যেকোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক ও সামাজিক অস্থিরতা—এগুলো কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এগুলো শুধু আইনশৃঙ্খলার বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এগুলো রাষ্ট্রের নৈতিক কর্তৃত্ব, নাগরিক আস্থা এবং গণতান্ত্রিক শৃঙ্খলার ওপর আঘাত।
তবে এটাও মনে রাখতে হবে, বিগত ফ্যাসিবাদী শাসন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোকে জনগণের সেবা থেকে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষার যন্ত্রে পরিণত করেছিল। পুলিশ, প্রশাসন, স্থানীয় প্রভাববলয় এবং বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর সেই ক্ষতের প্রভাব রাতারাতি মুছে যায় না। আমরা সেই ক্ষত ঢাকছি না; বরং প্রতিষ্ঠানকে আবার আইনের অধীনে ফিরিয়ে আনার কাজ করছি।
সরকারের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট—আইন নিজের হাতে নেওয়ার অধিকার কারও নেই। ধর্মীয় স্থাপনায় হামলা, নারী ও শিশুর ওপর সহিংসতা, মব জাস্টিস, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, চাঁদাবাজি, দখলদারি বা যেকোনো অপরাধের ক্ষেত্রে অপরাধীর পরিচয় নয়, অপরাধই বিবেচ্য হবে। কেউ যদি মনে করে সরকার বদলেছে বলে অপরাধের লাইসেন্স পেয়েছে, তাহলে সে ভুল করছে।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে মব সহিংসতা প্রতিরোধ, কিশোর গ্যাং দমন, অনলাইন জুয়া, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক, সন্ত্রাস ও সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশকে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং নতুন ১০ হাজার কনস্টেবল নিয়োগসহ সক্ষমতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। দ্রুত বিচার, তদন্তের গতি, প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ে জবাবদিহিকে আমরা একসঙ্গে এগিয়ে নিচ্ছি।
আইনশৃঙ্খলা ও অর্থনীতির সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ। বিনিয়োগকারী প্রথমে দেখেন তাঁর পুঁজি নিরাপদ কি না, শ্রমিক দেখেন কর্মস্থল নিরাপদ কি না, কৃষক দেখেন তাঁর উৎপাদন বাজারে নিতে পারবেন কি না আর নাগরিক দেখেন পরিবার নিরাপদ কি না। তাই আইনশৃঙ্খলা শুধু স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ইস্যু নয়; এটি বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, রাজস্ব, সামাজিক সম্প্রীতি এবং রাষ্ট্রের মর্যাদার ইস্যু। সরকার রাষ্ট্রের সর্বস্তরে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার বিষয়ে বদ্ধপরিকর।
দায়িত্ব নেওয়ার মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ইরান যুদ্ধের মতো অভাবনীয় পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। এই যুদ্ধের প্রভাব বহুমুখী ও দীর্ঘমেয়াদি। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিতিশীলতার কারণে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনা কতটা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে? যুদ্ধের যে অর্থনৈতিক অভিঘাত, তা থেকে আমাদের অর্থনীতি ও নাগরিকদের রক্ষায় সরকারের পরিকল্পনা কী?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমরা এমন একটি অর্থনীতি পেয়েছি, যা আগে থেকেই ধ্বংসপ্রাপ্ত ছিল; তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি নতুন চাপ তৈরি করেছে। বিগত ফ্যাসিবাদী সরকারের রেখে যাওয়া অর্থনৈতিক ভঙ্গুরতা, বিশেষ করে রিজার্ভে চাপ, আমদানিনির্ভর জ্বালানি কাঠামো, ধ্বংসপ্রাপ্ত ব্যাংক খাত, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং রাজস্ব ঘাটতির ওপর যুদ্ধের অভিঘাত এসে পড়েছে। ফলে এটি শুধু পররাষ্ট্র বা নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের বাজেট, বাজার, কৃষি, জ্বালানি, রেমিট্যান্স এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার প্রশ্ন।
মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা হলে প্রথম ধাক্কা আসে জ্বালানির বাজারে। তেলের দাম, এলএনজি, সার, পরিবহন ব্যয়, শিপিং খরচ, আমদানি বিল—সবকিছু চাপের মুখে পড়ে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পূর্বাভাসেও বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য সংকট দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধি কমতে পারে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ বেশি হতে পারে। এই অভিঘাত আমাদের অর্থনীতিতেও পড়েছে। ফলে প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি, ঋণ ও কারেন্ট অ্যাকাউন্ট ব্যালেন্সও চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।
আমাদের পরিকল্পনা তিন স্তরের। প্রথম স্তর হলো তাৎক্ষণিক সুরক্ষা। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা, সংকটকালীন লক্ষ্যভিত্তিক ভর্তুকি, নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য স্বল্পমূল্যে খাদ্য সরবরাহ, টিসিবি ও খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি, ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ড সম্প্রসারণ, বাজার মনিটরিং এবং কৃষিসেচে জ্বালানি অগ্রাধিকার।
দ্বিতীয় স্তর হলো সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। আমরা মুদ্রানীতি ও রাজস্বনীতির সমন্বয় করছি, অপ্রয়োজনীয় আমদানি নিয়ন্ত্রণ করছি, রপ্তানি ও রেমিট্যান্সের প্রবাহকে উৎসাহ দিচ্ছি, উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে বাজেটসহায়তা নিয়ে কাজ করছি এবং রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় সতর্কতা বজায় রাখছি।
তৃতীয় স্তর হলো দীর্ঘমেয়াদি সক্ষমতা। আমাদের জ্বালানি উৎস বৈচিত্র্যকরণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সোলার সেচ, কৃষি উৎপাদনশীলতা, স্থানীয় শিল্পের পুনরুজ্জীবন, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং নতুন শ্রমবাজার সৃষ্টির দিকে যেতে হবে। একক উৎস, একক বাজার, একক পণ্য বা একক শক্তির ওপর নির্ভরতা বিপজ্জনক। তাই এই সংকটকে আমরা অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবেও দেখছি।
ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে সরকারের বিপুল অঙ্কের অর্থ প্রয়োজন। আগামী অর্থবছর থেকে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতাও বাড়ছে। এর বিপরীতে রাজস্ব জিডিপি আদায় সর্বনিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে। তাহলে বিপুল এই অর্থের সংস্থান কীভাবে হবে? নতুন করে ট্যাক্স-ভ্যাটের বোঝা চাপবে কি না, তা নিয়ে নাগরিকদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: প্রথমেই বলি, আমরা জনগণের ঘাড়ে অযৌক্তিক করের বোঝা চাপাতে চাই না। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসন একদিকে জনগণের নামে উন্নয়নের স্লোগান দিয়েছে, অন্যদিকে রাজস্ব ব্যবস্থাকে সীমিত গোষ্ঠীর সুবিধা, কর অব্যাহতির অপব্যবহার, ফাঁকি, হয়রানি এবং অদক্ষতার জালে আটকে রেখেছে। ফলে সৎ করদাতা চাপে পড়েছে আর প্রভাবশালী গোষ্ঠী সুবিধা নিয়েছে। এই অন্যায় কাঠামো না বদলালে রাজস্ব বাড়বে না।
আমাদের লক্ষ্য হলো করহার বাড়ানো নয়; বরং ট্যাক্স-বেইজ (করভিত্তি) বাড়িয়ে রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করা, কর ন্যায্যতা বাড়ানো; সৎ করদাতাকে হয়রানি করা নয়, কর ফাঁকি বন্ধ করা; রাজস্ব প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবের হাতিয়ার বানানো নয়, পেশাদার ও ডিজিটাল করা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের নীতি ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার আনা হবে, যাতে করনীতি হয় পূর্বানুমানযোগ্য, বিনিয়োগবান্ধব এবং ন্যায্য আর কর আদায়ের প্রক্রিয়া হয় স্বচ্ছ, প্রযুক্তিনির্ভর ও হয়রানিমুক্ত।
সরকার রাজস্ব বাড়ানোর জন্য অনলাইন আয়কর রিটার্ন বাধ্যতামূলককরণ, শুল্ক ও আয়কর তথ্যের মধ্যে অ্যাসাইকুডা (এনবিআরের আমদানি-রপ্তানি ও কাস্টমস শুল্ক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহৃত স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার) ব্যবহারের মাধ্যমে যাচাই, এনবিআর ডিজিটালাইজেশনের জন্য স্ট্রেন্থেনিং ডোমেস্টিক রেভিনিউ মোবিলাইজেশন প্রজেক্ট, ভ্যাট কাঠামো যৌক্তিকীকরণ, কর অব্যাহতি পর্যালোচনা, রাজস্ব ফাঁকি শনাক্তকরণ এবং কর-বহির্ভূত রাজস্ব ব্যবস্থাপনা নীতিমালা প্রণয়ন চলমান রয়েছে।
ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষক কার্ডকে আমরা নিছক ভর্তুকি হিসেবে দেখি না। এটি নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষা, কৃষকের উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি, গ্রামীণ বাজারে চাহিদা সৃষ্টি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষার বিনিয়োগ। প্রান্তিক মানুষের হাতে টাকা গেলে তা বিদেশে পাচার হয় না; তা স্থানীয় বাজার, কৃষি, ক্ষুদ্র ব্যবসা ও উৎপাদনে ঘুরে দাঁড়ায়।
অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রে আমরা চারটি পথে এগোব: রাজস্ব ফাঁকি ও লিকেজ বন্ধ, অগ্রাধিকারহীন ও অপচয়মূলক ব্যয় কমানো, কর-বহির্ভূত রাজস্ব ও রাষ্ট্রীয় সম্পদের সুশাসন বাড়ানো এবং উৎপাদন-বিনিয়োগ-কর্মসংস্থান বাড়িয়ে রাজস্ব ভিত্তি সম্প্রসারণ। নাগরিকদের আশ্বস্ত করতে চাই, যাঁরা নিয়ম মেনে কর দেন, তাঁদের শাস্তি দেওয়া হবে না; যাঁরা বছরের পর বছর রাষ্ট্রের টাকা লুট করেছেন, কর ফাঁকি দিয়েছেন, ব্যাংক খালি করেছেন, অর্থ পাচার করেছেন, তাঁদের জবাবদিহির আওতায় আনা হবে।
বেসরকারি খাত চাঙা করতে ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৬০ হাজার কোটি টাকা প্রণোদনা তহবিল ঘোষণা করেছে। এটি নিঃসন্দেহে প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রণোদনা তহবিলের এই ঋণের অর্থ যে নয়ছয় হবে না, তার জন্য কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আপনার উদ্বেগ যৌক্তিক। কারণ, অতীতে আমরা দেখেছি, জনগণের নামে ঘোষিত প্রণোদনা অনেক সময় প্রকৃত উদ্যোক্তা বা শ্রমিকের কাছে যায়নি; গেছে প্রভাবশালী ঋণখেলাপি, রাজনৈতিকভাবে সংযুক্ত ব্যবসায়ী বা কাগুজে প্রতিষ্ঠানের কাছে। বিগত ফ্যাসিবাদী অর্থনীতির বড় বৈশিষ্ট্যই ছিল এই: মুনাফা ব্যক্তির, ঝুঁকি জনগণের; ঋণসুবিধা গোষ্ঠীর, বোঝা ব্যাংকের; আর ব্যাংকের ক্ষতি শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপর। এই চক্র ভাঙতেই নতুন প্রণোদনা তহবিলে কঠোর জবাবদিহি রাখা হবে।
৬০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের মূল উদ্দেশ্য হলো বন্ধ ও সংকটে থাকা শিল্প, সিএমএসএমই, কৃষি, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং গ্রামীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পুনরুজ্জীবিত করা। বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষণায়ও এই তহবিলের লক্ষ্য হিসেবে বন্ধ শিল্প ও সেবা খাত, ক্ষুদ্র-মাঝারি উদ্যোগ, কৃষি, রপ্তানি বৈচিত্র্য এবং গ্রামীণ অর্থনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এটি উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের তহবিল, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার তহবিল নয়।
তহবিল ব্যবহারে কয়েকটি সুরক্ষা ব্যবস্থা থাকবে। প্রথমত, ঋণ বিতরণ হবে ব্যাংকিং চ্যানেলের যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে। দ্বিতীয়ত, প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা, শ্রমিকের সংখ্যা, কর ও ব্যাংকিং আচরণ, বিদ্যমান দায় এবং পুনরুজ্জীবনের বাস্তব পরিকল্পনা যাচাই করা হবে। তৃতীয়ত, ঋণের অর্থ কোথায় ব্যবহার হচ্ছে, কাঁচামাল, মজুরি, উৎপাদন, রপ্তানি বা কর্মসংস্থান, তা এন্ড–ইউজ মনিটোরিং–এর মাধ্যমে দেখা হবে। চতুর্থত, ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপি, অর্থ পাচারকারী, কাগুজে প্রতিষ্ঠান বা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী কোনো চক্রকে সুবিধা দেওয়ার সুযোগ থাকবে না। পঞ্চমত, বাংলাদেশ ব্যাংক, তফসিলি ব্যাংক, নিরীক্ষা ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে তদারকি করা হবে। ঋণ বিতরণে ব্যাংকের দায় থাকবে; অনিয়ম হলে শুধু গ্রাহক নয়, সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্মকর্তারও জবাবদিহি থাকবে।
আমরা চাই, বন্ধ কারখানা খুলুক, শ্রমিক কাজে ফিরুক, উৎপাদন বাড়ুক, রপ্তানি বাড়ুক, কিন্তু ব্যাংকের টাকা আবার লুটের মাল হোক, তা হতে দেওয়া হবে না। প্রণোদনা হবে উৎপাদনের জন্য, কর্মসংস্থানের জন্য, বাস্তব উদ্যোক্তার জন্য। এটি ব্যাংক ডাকাতির দ্বিতীয় অধ্যায় হতে দেওয়া হবে না।
নির্বাচনের আগে বিএনপি বলেছিল, সরকারে গেলে কোনো মেগা প্রকল্প করবে না। সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবাধিকার উন্নয়নে ব্যয় করা হবে। কিন্তু সম্প্রতি আমরা দেখছি, পদ্মা ব্যারাজের মতো বড় প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হলো। রাজনৈতিক বিবেচনা থেকেই কি এমন একটি প্রকল্প নিতে হলো?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমরা যে কথা বলেছিলাম, সেটি এখনো বলছি: জনগণের টাকা দিয়ে প্রদর্শনীমূলক, ঋণনির্ভর, অগ্রাধিকারহীন এবং রাজনৈতিক প্রচারণার মেগা প্রকল্প করা হবে না। বিগত ফ্যাসিবাদী শাসন উন্নয়নকে অনেক সময় ক্ষমতার বিজ্ঞাপনে পরিণত করেছিল। প্রকল্পের ব্যয় ফুলে-ফেঁপে বিকট আকার ধারণ করেছে, সময় বেড়েছে, জবাবদিহি কমেছে আর জনগণের ঘাড়ে ঋণের বোঝা চাপানো হয়েছে। আমরা সেই মডেল প্রত্যাখ্যান করেছি।
কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে দেশের কৃষি, পানি, জলবায়ু নিরাপত্তা, খাদ্যনিরাপত্তা ও আঞ্চলিক অর্থনীতির জন্য অপরিহার্য কৌশলগত প্রকল্পও নেওয়া যাবে না। পদ্মা ব্যারাজকে আমরা রাজনৈতিক প্রকল্প হিসেবে দেখি না; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলা, কৃষি রক্ষা, নদী ও পানি ব্যবস্থাপনা পুনরুদ্ধার, লবণাক্ততা কমানো, সেচসুবিধা সম্প্রসারণ, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করার প্রকল্প।
জনগণের সরকারের ১০০ দিনের অগ্রগতিতে উল্লেখ আছে, পদ্মা ব্যারাজ বাস্তবায়িত হলে দেশের প্রায় ৩৭ শতাংশ মানুষ সরাসরি উপকৃত হবে এবং চারটি বিভাগের ১৯ জেলার ১২০টি উপজেলা সুবিধা পাবে। এটি শুধু কংক্রিটের অবকাঠামো নয়; এটি কৃষকের মাঠে পানি, নদীতে প্রবাহ, সুন্দরবনের পরিবেশ, উপকূলের জীবন, খাদ্য উৎপাদন এবং গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্কিত।
আমাদের পার্থক্য এখানেই। ফ্যাসিবাদী উন্নয়ন মডেলে প্রকল্পের কেন্দ্র ছিল ক্ষমতা ও কমিশন; আমাদের উন্নয়ন মডেলে প্রকল্পের কেন্দ্র হবে মানুষ, উৎপাদন, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মানবসম্পদ ও সামাজিক সুরক্ষা আমাদের অগ্রাধিকার থাকবে। একই সঙ্গে কৃষি ও পানি নিরাপত্তা ধ্বংস হতে দিলে শিক্ষা-স্বাস্থ্যও টেকসই হবে না। কারণ, খাদ্যনিরাপত্তা ও জলবায়ু নিরাপত্তা ছাড়া কোনো উন্নয়নই স্থায়ী হয় না।
তবে বড় প্রকল্প মানেই ব্ল্যাংক চেক নয়। পদ্মা ব্যারাজসহ সব বড় প্রকল্পে ব্যয়, সময়, পরিবেশগত প্রভাব, পুনর্বাসন, ক্রয়প্রক্রিয়া, বাস্তবায়ন দক্ষতা এবং অর্থনৈতিক রিটার্ন কঠোরভাবে পর্যালোচনা করা হবে। জনগণের টাকা জনগণের হিসাবেই খরচ হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে করা বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠছে। এই বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে সরকারের অবস্থান কী?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির বিষয়ে আমাদের অবস্থান দায়িত্বশীল, বাস্তববাদী এবং জাতীয় স্বার্থনির্ভর। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের চুক্তি কোনো দলীয় আবেগে বাতিল বা গ্রহণ করার বিষয় নয়। আবার কোনো চুক্তিকে অন্ধভাবে মেনে নেওয়ারও সুযোগ নেই।
আমরা চুক্তিটি জাতীয় স্বার্থ, রপ্তানি সক্ষমতা, পোশাক খাতের প্রতিযোগিতা, শ্রমমান, পরিবেশমান, কৃষি ও শিল্পপণ্যের বাজারপ্রবেশ, জাতীয় নিরাপত্তা, নীতি-স্বাধীনতা এবং দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্য ভারসাম্যের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করছি। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি বাজার এবং বিনিয়োগ অংশীদার। তাই এই সম্পর্ককে আমরা গুরুত্ব দিই। কিন্তু সম্পর্ক মানে একতরফা নির্ভরতা নয়; সম্পর্ক মানে সম্মান, পারস্পরিক সুবিধা এবং জাতীয় স্বার্থের সুরক্ষা।
যদি কোনো ধারা বাংলাদেশের শিল্প, কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা বা নীতি-স্বাধীনতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়, আমরা তা নিয়ে আলোচনা করব। যদি কোনো ধারা আমাদের রপ্তানি, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত, নতুন বিনিয়োগ, শ্রমিকের অধিকার এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক হয়, আমরা সেই সুযোগ কাজে লাগাব।
আমাদের নীতি হলো, কোনো বাজার হারানো যাবে না, কোনো বাজারের ওপর অন্ধ নির্ভরতাও তৈরি করা যাবে না। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন, জাপান, ভারত, মধ্যপ্রাচ্য, আসিয়ান, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকা—সব দিকেই আমাদের বাণিজ্য বিস্তার করতে হবে। বাণিজ্যনীতি হবে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, রপ্তানি, শিল্পায়ন এবং জাতীয় নিরাপত্তার সেবক।
সুতরাং এই চুক্তি নিয়ে সরকার আতঙ্ক ছড়াতে চায় না, আবার চোখ বন্ধ করতেও চায় না। আমরা জনগণকে আশ্বস্ত করতে চাই, বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না এবং দেশের রপ্তানি ও বিনিয়োগের স্বার্থে যে সুযোগ আছে, সেটি দক্ষতার সঙ্গে কাজে লাগানো হবে।
বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন তীব্র। ভূরাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই একক কোনো দেশের ওপর নির্ভরতা আমাদের জন্য অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ। এখানে যেমন জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন আছে আবার অর্থনৈতিক স্বার্থের প্রশ্নও আছে। বিএনপির পররাষ্ট্রনীতিতে ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার কতটা প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে?
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর: আমাদের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা খুব পরিষ্কার—সবার আগে বাংলাদেশ। এই নীতি কোনো স্লোগান নয়; এটি জাতীয় নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক স্বার্থ, জ্বালানি নিরাপত্তা, শ্রমবাজার, রপ্তানি বাজার এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্ত গ্রহণের নীতি। আমরা কারও শত্রু হতে চাই না, কিন্তু বাংলাদেশের স্বার্থ কারও হাতে বন্ধক রাখতেও রাজি নই।
বিগত ফ্যাসিবাদী শাসনের বড় সমস্যা ছিল ভারসাম্যের বদলে নির্ভরতাকে নীতি বানানো। কখনো উন্নয়নের নামে, কখনো নিরাপত্তার নামে, কখনো কূটনৈতিক সুবিধার নামে দেশের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত অবস্থান সংকুচিত করা হয়েছে। আমরা সেই পথ থেকে বেরিয়ে আসতে চাই। আজকের বিশ্বে একক দেশ, একক বাজার, একক ঋণদাতা বা একক জ্বালানি উৎসের ওপর নির্ভরতা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
আমাদের নীতি হবে বন্ধুত্ব সবার সঙ্গে, নির্ভরতা কারও ওপর নয়। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, চীনের সঙ্গে অবকাঠামো ও শিল্প সহযোগিতা, ভারতের সঙ্গে প্রতিবেশী বাস্তবতা ও পারস্পরিক স্বার্থ, জাপান-কোরিয়া-ইইউর সঙ্গে প্রযুক্তি ও মানসম্পন্ন বিনিয়োগ, মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে জ্বালানি ও শ্রমবাজার, আসিয়ান ও আফ্রিকার সঙ্গে নতুন বাজার—সব ক্ষেত্রেই আমরা বাংলাদেশের স্বার্থকে কেন্দ্র করে সম্পর্ক গড়ব।
এই পররাষ্ট্রনীতি অর্থনৈতিক কূটনীতির ওপর দাঁড়াবে। আমাদের প্রবাসী শ্রমিক কোথায় নিরাপদে কাজ পাবেন, রপ্তানি পণ্য কোথায় বাজার পাবে, জ্বালানি কোথা থেকে সাশ্রয়ীভাবে আসবে, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগ কোথা থেকে আসবে, উন্নয়ন সহযোগিতায় কী শর্ত থাকবে—এসবই পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে থাকবে।
ভূরাজনীতিতে আবেগ, প্রচার বা একপক্ষীয় অবস্থান দিয়ে রাষ্ট্র চলে না। রাষ্ট্র চলে বাস্তবতা, মর্যাদা, কৌশল এবং জাতীয় স্বার্থ দিয়ে। বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রনীতি তাই হবে আত্মসম্মানসম্পন্ন, ভারসাম্যপূর্ণ, অর্থনৈতিকভাবে বিচক্ষণ এবং জাতীয় নিরাপত্তা-সচেতন। আমাদের পথ একটাই—বাংলাদেশের মানুষ, বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং বাংলাদেশের সার্বভৌম স্বার্থ আগে।