বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ভারত—তিন দেশই বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে পিছিয়ে। আপনার দৃষ্টিতে সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় বাধা এখন কোনটি—রাষ্ট্রীয় চাপ, বাজারের চাপ, নাকি ভয়?
জাফর আব্বাস: সম্ভবত এ তিনটি সমন্বিতভাবে কাজ করে। তবে ভয় সবচেয়ে কম কাজ করে এ ক্ষেত্রে। অনেক সংবাদমাধ্যমের জন্য বাজারের চাপ বড়, আবার অনেকের জন্য সরকারই প্রধান চাপ। ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ—প্রতিটি দেশের সরকারই নিজেদের উন্নয়ন নিয়ে তথাকথিত ইতিবাচক সংবাদ চায়। তারা চায় সংবাদমাধ্যম তাদের দুর্বলতা বা ব্যর্থতা এড়িয়ে যাক। কোনো সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশিত হলেই সরকার সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যম, সম্পাদক বা প্রতিবেদকের ওপর চাপ সৃষ্টি করে। এতে অনেকেই ভীত হয়ে পড়েন। অনেক ক্ষেত্রে আত্মনিয়ন্ত্রণ বা ‘সেলফ সেন্সরশিপ’ শুরু হয়। এ কারণে মূলধারার ঐতিহ্যবাহী সংবাদমাধ্যম বিশ্বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সূচকে অবনতির এটিও একটি কারণ।
ভারত, পাকিস্তান বা বাংলাদেশ—প্রতিটি দেশের সরকারই নিজেদের উন্নয়ন নিয়ে তথাকথিত ইতিবাচক সংবাদ চায়। তারা চায় সংবাদমাধ্যম তাদের দুর্বলতা বা ব্যর্থতা এড়িয়ে যাক।
পাকিস্তানে সাংবাদিকতা নানা ধরনের চাপের মুখে থাকে। সাম্প্রতিক কোনো অভিজ্ঞতার উদাহরণ দেবেন?
জাফর আব্বাস: আমি সহজে চাপের কাছে নতি স্বীকার করি না। তবে অনেক সংবাদমাধ্যম আছে, যারা চাপের কাছে হার মেনেছে এবং সরকারি চাওয়া অনুযায়ী সাংবাদিকতা করছে। একসময় সরকারি মহল থেকে ফোন আসত। কোনো সংবাদ প্রকাশ না করার অনুরোধ বা নির্দেশ দেওয়া হতো। এখন তারা আমার ক্ষেত্রে সেটা ছেড়ে দিয়েছে। কারণ, আমি এসব ফোন ধরি না। কিন্তু আমি জানি, অন্য সংবাদমাধ্যমগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবস্থাপনার মধ্যে রাখা হয়।
কেউ কেউ সরকারি অবস্থান অনুসরণ করায় পুরস্কৃতও হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় এটাই বাস্তবতা। সম্পাদক ও সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো ঐক্যবদ্ধ না হলে সরকারগুলো চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করানোর চেষ্টা চালিয়েই যাবে এবং সমালোচনা ঠেকাতে চাইবে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এভাবেই কাজ করে।
এমন কোনো অদৃশ্য ‘রেডলাইন’ কি আছে, যা আপনি অতিক্রম করতে পারেন না বা করতে সাহস পান না?
জাফর আব্বাস: অদৃশ্য রেডলাইন সব সময়ই থাকে। যেহেতু সেগুলো অদৃশ্য, তাই আমরা সেগুলো নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলি না।
সাংবাদিকতা সম্পর্কে বাস্তববাদী হতে হবে। সমাজে কে কী বলছে, কী বলা উচিত আর কী বলা উচিত নয়—এসব বিষয়ে সচেতন থাকতে হয়।
একটি উদাহরণ দিই। দুটি দেশের মধ্যে যুদ্ধ হলে আপনি সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে কী আশা করবেন? সাধারণত প্রবল জাতীয়তাবাদী আবেগের কারণে সংবাদমাধ্যম স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরকারি অবস্থানের কাছাকাছি চলে যায়। আরেকটি কারণ হলো, সরকারি সূত্র ছাড়া তথ্য পাওয়ার বিকল্প খুব কম থাকে। রেডলাইন আছে এবং সেটি ভবিষ্যতেও থাকবে। সম্পাদকদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে—কোন রেডলাইন উপেক্ষা করা প্রয়োজন আর কোনটি তথাকথিত জাতীয় স্বার্থে মেনে চলা উচিত।
সম্পাদক ও সাংবাদিক ইউনিয়নগুলো ঐক্যবদ্ধ না হলে সরকারগুলো চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের পক্ষে সংবাদ প্রকাশ করানোর চেষ্টা চালিয়েই যাবে এবং সমালোচনা ঠেকাতে চাইবে। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতি এভাবেই কাজ করে।
প্রিন্ট থেকে ডিজিটালে রূপান্তর এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, এটি বর্তমান বাস্তবতা। পাকিস্তানে পরিস্থিতি কেমন?
জাফর আব্বাস: পাকিস্তানও একই চ্যালেঞ্জের মুখে। ধীরে ধীরে সংবাদপত্রের গুরুত্ব কমবে, আর ইন্টারনেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যমের গুরুত্ব বাড়বে। এটি বাস্তবতা এবং তা ইতিমধ্যে ঘটছে। তবে আমি এখনো বিশ্বাস করি, যেসব সংবাদপত্রে অভিজ্ঞ সাংবাদিকদের শক্তিশালী দল আছে—যেমন ডন–এ আছে—তারা বহু বছর প্রাসঙ্গিক থাকবে। কারণ, তথ্য সংগ্রহ, যাচাই এবং নির্ভরযোগ্য সংবাদ তৈরির দক্ষতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন আয়ের বড় অংশ এখন প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মগুলোর দিকে চলে যাচ্ছে। এই আর্থিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আপনারা কী করছেন?
জাফর আব্বাস: নতুন বাস্তবতায় সংবাদপত্রগুলো রাজস্ব হারাচ্ছে। বিজ্ঞাপনদাতারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ঝুঁকছে। এই প্রবণতা চলতেই থাকবে। সংবাদপত্রের ভূমিকা বদলাবে। তারা আরও বেশি কনটেন্ট সরবরাহকারীতে পরিণত হবে। তবে সংবাদপত্র খুব দ্রুত হারিয়ে যাবে—এটা আমি মনে করি না। রাজস্ব কমে যাওয়ায় আর্থিক সীমাবদ্ধতা তৈরি হবে এবং অতীতের মতো প্রভাব হয়তো তারা আর রাখতে পারবে না।
পাকিস্তানে নিউজপ্রিন্ট আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে নিউজপ্রিন্টের দাম বাড়লে ডন–এর দামও বাড়ে। পাকিস্তানে অন্য পত্রিকাগুলোর ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটে।
এ পরিস্থিতিতে কি পত্রিকার দাম বাড়াতে হয়েছে, নাকি সাবস্ক্রিপশন মডেলে যেতে হয়েছে?
জাফর আব্বাস: আমি সংবাদপত্রের ব্যবসায়িক দিক দেখি না, শুধু সম্পাদকীয় বিষয় নিয়ে কাজ করি। তবে সংবাদপত্রের আয় কমার বিষয়টি অবগত আছি। অনেক সময় পত্রিকার ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা পত্রিকার দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, পাকিস্তানে নিউজপ্রিন্ট আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে নিউজপ্রিন্টের দাম বাড়লে ডন–এর দামও বাড়ে। পাকিস্তানে অন্য পত্রিকাগুলোর ক্ষেত্রেও একই বিষয় ঘটে।
সংবাদপত্রের পাঠকসংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে কমছে। পাঠকদের ধরে রাখতে ডন কী করছে?
জাফর আব্বাস: পাঠক কমছে—এভাবে বলাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আসলে পাঠক কাগজের সংস্করণ থেকে ডিজিটাল সংস্করণে চলে যাচ্ছেন। অনেক দিক থেকে পাঠকসংখ্যা বরং বেড়েছে। ডনের মুদ্রিত সংস্করণের প্রচারসংখ্যা সীমিত হলেও এর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিশাল। প্রতি সপ্তাহে কোটি কোটি পেজ ভিউ হয়। এটিকে আমি সফলতা হিসেবে দেখি।
এখন চ্যালেঞ্জ হলো, কীভাবে এমন আর্থিক মডেল তৈরি করা যায়, যা ওয়েবসাইটকে লাভজনক করবে। সেটি ব্যবস্থাপনার বিষয়। তবে যদি কার্যকর আয় মডেল দাঁড় করানো যায়, তাহলে সেটি বড় সফলতা হবে।
পাঠক কমছে—এভাবে বলাটা পুরোপুরি ঠিক নয়। আসলে পাঠক কাগজের সংস্করণ থেকে ডিজিটাল সংস্করণে চলে যাচ্ছেন। অনেক দিক থেকে পাঠকসংখ্যা বরং বেড়েছে। ডনের মুদ্রিত সংস্করণের প্রচারসংখ্যা সীমিত হলেও এর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম বিশাল। প্রতি সপ্তাহে কোটি কোটি পেজ ভিউ হয়। এটিকে আমি সফলতা হিসেবে দেখি।
আপনারা কি নিউজরুমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ব্যবহার করছেন? এটি কি সাংবাদিকতার জন্য হুমকি, নাকি সহায়ক প্রযুক্তি?
জাফর আব্বাস: বিষয়টি এখনো বিকাশমান পর্যায়ে আছে। বর্তমানে আমরা কপি সম্পাদনার কাজে এআই ব্যবহার নিরুৎসাহিত করি। মূলত তথ্য যাচাই ও তথ্য সংগ্রহে এআই ব্যবহৃত হচ্ছে। তবে সংবাদ লেখা, বিশ্লেষণ করা বা প্রেক্ষাপট যুক্ত করার কাজে নয়। এমনকি এআই দিয়ে তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রেও তা আবার যাচাই করতে হয়।
কোনো প্রতিবেদক এআই ব্যবহার করলে তাঁকে ডেস্ককে জানাতে হয়। সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যম এআই থেকে ইতিবাচকভাবে উপকৃত হবে বলে আমি মনে করি। গ্রাফ, চার্ট, মানচিত্র—এ ধরনের কাজে এআই সহায়ক হতে পারে। ডনের একটি দল নিয়মিত এআই ও এর ব্যবহার নিয়ে কাজ করছে।
তবে সাংবাদিক ও সম্পাদকেরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকেন, তাহলে কোনো সরকারের পক্ষেই দীর্ঘদিন এসব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আমি আশা করি, পাকিস্তানেও সেটি দ্রুত ঘটবে।
পাকিস্তানে সাংবাদিকতার ভবিষ্যৎ নিয়ে আপনার সবচেয়ে বড় উদ্বেগ কী?
জাফর আব্বাস: সত্যি বলতে, আমি খুব উদ্বিগ্ন নই। বরং আমি আশাবাদী যে পাকিস্তানে সাংবাদিকতার ভূমিকা আরও বাড়বে। একসময় দেশে হাতে গোনা কয়েকটি সংবাদপত্র ছিল। এখন ২৪ ঘণ্টার ৪০টির বেশি টেলিভিশন চ্যানেল আছে, অসংখ্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম আছে। সংবাদমাধ্যমের পরিধি অনেক বেড়েছে।
হ্যাঁ, বিভিন্ন সময়ে সামরিক শাসন, স্বৈরাচারী বেসামরিক সরকার—সবই ছিল। কখনো সংবাদমাধ্যম তুলনামূলক স্বাধীন ছিল, কখনো ছিল কঠোর সেন্সরশিপ। কখনো সাংবাদিকেরা আত্মনিয়ন্ত্রণে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু আমরা প্রতিবারই সেই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসেছি। নতুন শাসক আসে, নতুন আইন আনে, নতুন বিধিনিষেধ দেয়—এটাই চক্র।
তবে সাংবাদিক ও সম্পাদকেরা যদি ঐক্যবদ্ধ থাকেন, তাহলে কোনো সরকারের পক্ষেই দীর্ঘদিন এসব নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। আমি আশা করি, পাকিস্তানেও সেটি দ্রুত ঘটবে।