বিশেষ সাক্ষাৎকার: মাহদী আমিন

ভিন্নমত ও ভিন্নপথের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রত্যাশা করি

প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির নির্বাচন পরিচালনা কমিটির মুখপাত্র হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বিএনপি ইশতেহার প্রণয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। এই সাক্ষাৎকারে তিনি নতুন সরকারের ১৮০ দিনের পরিকল্পনা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, তরুণদের কর্মসংস্থান, বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক ও রাষ্ট্র সংস্কার প্রসঙ্গে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ফিরোজ চৌধুরী।  

প্রথম আলো:

 বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় দুই মাস হয়ে গেল। আপনার দৃষ্টিতে সরকারের শুরুটা কেমন হলো?

মাহদী আমিন: প্রথমেই আমি ধন্যবাদ জানাতে চাই বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণকে, যাঁরা বিএনপির ওপর আস্থা রেখেছেন। জনগণের অবিস্মরণীয় ম্যান্ডেট নিয়ে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনপ্রাপ্ত হয়ে আজকে বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেয়েছে। দীর্ঘ সময় পর সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ ভোট দিতে পেরেছেন এবং নিজেদের প্রতিনিধিত্বমূলক একটি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনায় এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই সরকারের কাছ থেকে জনগণের প্রত্যাশা অনেক। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য অবিরত, অনিঃশেষ কাজ করে যাচ্ছেন।

প্রথম আলো:

গত দুই মাসে দেশের দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি কি হয়েছে?

মাহদী আমিন: নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। আইন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয়েছে। মানবাধিকার ও বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়েছে। এই অর্জনকে পাথেয় ধরেই আমরা নিশ্চিত করতে চাই বাংলাদেশের প্রত্যেক মানুষের সুরক্ষা ও ভাগ্যের পরিবর্তন।

জনগণ এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষমতায়িত। কারণ, এমন একটি নির্বাচন হয়েছে যেটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য; যার মাধ্যমে জন-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে। জনগণ দ্বারা ক্ষমতায়িত এই সরকারের অন্যতম দায়িত্ব জনগণের সুরক্ষা, জনগণের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা।

প্রথম আলো:

কোনো চ্যালেঞ্জ লক্ষ করছেন কি?

মাহদী আমিন: চ্যালেঞ্জ তো থাকবেই। তবে চ্যালেঞ্জকে আমরা দেখতে চাই সম্ভাবনা হিসেবে, জনগণের প্রতি আমাদের কমিটমেন্ট বাস্তবায়নের দায়িত্ব হিসেবে। সরকারের যদি আন্তরিকতা ও দায়বদ্ধতা থাকে, স্বয়ং সরকারপ্রধান যখন তৃণমূল পর্যায়ের কাজে ডিপলি ইনভলভ থাকেন, তখন সেই আত্মবিশ্বাস থাকে যে আমরা সবাই মিলে অবশ্যই লক্ষ্য অর্জন করতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

প্রথম আলো:

আপনারা ছয় মাস বা ১৮০ দিনের পরিকল্পনার কথা বলছেন। সেগুলোর অগ্রাধিকার কী কী?

 মাহদী আমিন: দেশের প্রত্যেক নাগরিকের ধর্ম, বর্ণ, অবস্থান বা রাজনীতি যা–ই হোক না কেন, প্রত্যেককে আমরা সমৃদ্ধি ও স্বনির্ভরতা দিতে চাই। নিরাপত্তা দিতে চাই যেন প্রতিটি মানুষ তাঁর পরিবার নিয়ে ভালো থাকেন, শান্তিতে থাকেন। সেটিই আমাদের অগ্রাধিকার।

 নির্বাচনী ইশতেহারে বিএনপির যে পরিকল্পনাগুলো ছিল, প্রধান যে প্রতিশ্রুতিগুলো ছিল, তার বাস্তবায়নের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে প্রথমবারের মতো ১৮০ দিনের কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে। ফ্যামিলি কার্ডের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ইমাম–মুয়াজ্জিন–খতিবদের সম্মানী এবং অন্য ধর্মীয় গুরুদের সম্মানী প্রদান শুরু হয়েছে। কৃষক কার্ড বিতরণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে পয়লা বৈশাখ (১৪ এপ্রিল) । শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও স্বাস্থ্য খাতের জন্য যে কর্মসূচিগুলো আমাদের রয়েছে, তার ব্যাপক কাজ চলমান রয়েছে। খাল খনন, বৃক্ষরোপণ থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে সেক্টর ধরে ধরে নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়নের জন্য নির্মোহভাবে কাজ করা হচ্ছে।

 ১৮০ দিনের মধ্যে সব মন্ত্রণালয়কে কিছু টার্গেট অর্জন করতে হবে। প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে নিয়মিত সভা হচ্ছে, যেখানে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী উপস্থিত থাকছেন। প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য এই যে আন্তরিকতা ও দৃঢ়তা, এই যে স্বপ্রণোদিত ও নজিরবিহীন উদ্যোগ; বিস্তৃত সেই কর্মযজ্ঞ বাংলাদেশের রাজনীতির বড় সাংস্কৃতিক পরিবর্তন।

প্রথম আলো:

দ্রব্যমূল্য ঊর্ধ্বমুখী। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আপনাদের ভাবনা কী?

 মাহদী আমিন: সামষ্টিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য আমাদের একটি বড় অগ্রাধিকার দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা। স্বাভাবিকভাবেই দেশের প্রতিটি মানুষ যেন তাঁদের পরিবার নিয়ে, আত্মীয়স্বজন নিয়ে যে আর্থসামাজিক ব্যবস্থায় রয়েছেন, সেখানে আগের চেয়ে তাঁরা যেন ভালো থাকেন, সচ্ছল থাকেন। তাঁরা যেন দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা পান—প্রতিটি মৌলিক চাহিদা যেন আরও সুলভ মূল্যে তাঁদের কাছে পৌঁছে যায়, সেটি নিশ্চিত করতে হবে।

 মাত্র কিছুদিন আগেই পবিত্র রমজান মাস শেষ হলো। প্রতিকূল বৈশ্বিক ও দেশীয় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেও অন্যান্য বছরের তুলনায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়েছে। একই সঙ্গে তারল্যসংকট থাকা সত্ত্বেও খাদ্যপণ্য ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের আমদানি অব্যাহত রাখা হয়েছে। ফলে অভ্যন্তরীণ বাজারে সংকট তৈরি হয়নি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা গেছে। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে বিশ্বজুড়ে তেলের দাম বাড়লেও বাংলাদেশে তেলের দাম যথেষ্ট স্থিতিশীল রয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় তেল সংস্থানের জন্য নতুন উৎস অনুসন্ধান করা হচ্ছে এবং আন্তর্জাতিক দর–কষাকষিতে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

 গত প্রায় ১৮ বছরের মধ্যে এই প্রথমবারের মতো ঈদুল ফিতর উপলক্ষে কোনো শ্রমিক অসন্তোষ দেখা যায়নি। শ্রমিক, মালিক, সরকার ও অংশীজনের সঙ্গে সমন্বিত আলোচনার ভিত্তিতে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাংকিং সহায়তা প্রদান করে নিশ্চিত করা হয়েছে, প্রত্যেক শ্রমিক ঈদের আগেই তাঁদের বেতন, বোনাস ও অন্যান্য সুবিধাদি পেয়েছেন।

মাহদী আমিন
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

বাংলাদেশের জনসংখ্যার দুই–তৃতীয়াংশের বেশি তরুণ। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড হিসাব করলে আমরা অনেক এগিয়ে। প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করছেন। জুলাই আন্দোলনের অন্যতম দাবি ছিল কর্মসংস্থান। তরুণদের কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে আপনার সরকারের পরিকল্পনা কী?

মাহদী আমিন: ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড আমরা তখনই কাজে লাগাতে পারব, যখন নারী–পুরুষ ও ডেমোগ্রাফি–নির্বিশেষে তরুণদের সবাইকে আমরা ক্ষমতায়িত করতে পারব, যখন তাঁদেরকে আমরা সৎ, দক্ষ ও যোগ্য হিসেবে গড়ে তুলতে পারব। সরকারের একটি লক্ষ্য ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে একাডেমিয়ার সমন্বয় তৈরি ও প্রাইভেট সেক্টরকে ফ্যাসিলিটেট করা। কারিগরি শিক্ষাকে কীভাবে মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থায় সন্নিবেশ করা যায়, তা নিয়ে কাজ চলছে। চেষ্টা রয়েছে আগামী প্রজন্মের তরুণদের তাঁদের কাজের ক্ষেত্রে দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলা। সরকারি অনেক স্থাপনা রয়েছে, যা পুরোদমে চলছে না, আবার কিছু অব্যবহৃত স্থাপনা রয়েছে, যেমন বিভিন্ন বিসিক, ইকোনমিক জোন, ইপিজেড, হাইটেক পার্ক—এই নন-ফাংশনাল প্রতিটি প্রকল্পে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে লোকাল লিংকেজ তৈরি করা। কলকারখানা, শিল্প ও বাণিজ্য স্থাপন বা সম্প্রসারণে কর্মসংস্থান সৃষ্টিকেই নীতিগত প্রাধান্য দেওয়া হবে।

প্রথম আলো:

বৈদেশিক কর্মসংস্থান সম্প্রসারণে আপনার সরকারের ভাবনা কী?

মাহদী আমিন: বিদেশে জনশক্তি রপ্তানি শুরু হয়েছিল শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সময়। আর বৈদেশিক কর্মসংস্থান ও প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রতিষ্ঠা হয়েছিল দেশনেত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী থাকার সময়। ফলে একমাত্র বিএনপির সেই ঐতিহ্য রয়েছে প্রবাসীদের জন্য আলাদাভাবে বিভিন্ন স্কিম ও ওয়েলফেয়ার উদ্যোগ নেওয়ার। আমাদের উদ্দেশ্য, যে ব্যক্তি যে দেশে যেতে চান, পর্যায়ক্রমে সেখানে তাঁদের ভাষা শিক্ষা নিশ্চিত করা। এর পাশাপাশি যে যোগ্যতা বা দক্ষতা নিয়ে যাচ্ছেন, তার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ কাজকে আমরা বহির্বিশ্বে কানেক্ট করতে চাই।

 এভাবে জাতীয় পর্যায়ে জনশক্তি রপ্তানি অনেক বাড়ানো প্রয়োজন। বাংলাদেশের মতো বিপুল জনগোষ্ঠীর দেশ থেকে বছরে মাত্র ১০ লাখ মানুষ বিদেশে কাজ করতে যাচ্ছেন। আমরা এই সংখ্যাটিকে বছরে ২০ লাখে উন্নীত করতে চাই। এর জন্য যে কারিগরি ও ভাষাগত প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রয়েছে, সেটি আমরা শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করতে চাই।

 এ জন্য বাংলা ও ইংরেজির বাইরে তৃতীয় ভাষা শিক্ষাকে গুরুত্ব দিচ্ছি। মধ্যপ্রাচ্যের শ্রমবাজারের জন্য আরবি খুবই দরকারি। তেমনি ইউরোপের জন্য ফ্রেঞ্চ, ইতালিয়ান কিংবা জার্মান। এশিয়ার জন্য জাপানিজ, চায়নিজ কিংবা কোরিয়ান। ইস্ট ইউরোপ, এশিয়াসহ পৃথিবীর যে দেশেই আমাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে, সেই দেশের ভাষাটা বাংলাদেশের ভেতর থেকে শেখার সুযোগ তৈরি করতে চাই।

 আমাদের জনসংখ্যার ৫০ শতাংশের বেশি নারী, কিন্তু বিদেশগামীদের মধ্যে নারীর সংখ্যাটা ১০ শতাংশের কম। আমরা যদি সে ধরনের পলিসি তৈরি করে দক্ষ কর্মী হিসেবে গড়ে তুলতে পারি, তাহলে বিদেশগামী জনশক্তির একটি বড় অংশ হতে পারেন নারী। আমরা যদি আমাদের নার্সদের ভালোভাবে প্রশিক্ষণ দিতে পারি, কেয়ার-গিভার হিসেবে অনেককে প্রমোট করতে পারি অর্থাৎ বহির্বিশ্বে যে চাকরিগুলোর চাহিদা রয়েছে, তার সঙ্গে আমরা যদি দেশের শিক্ষাব্যবস্থাকে অ্যালাইন করতে পারি এবং বিদেশের দূতাবাসগুলো ঠিকভাবে কাজের চাহিদা ও জোগান নিয়ে সহযোগিতা করতে পারে, তাহলে বিদেশে নারীদের কাজের অনেক সুযোগ তৈরি হবে।

প্রথম আলো:

তরুণদের যাঁরা উদ্যোক্তা হতে চান, তাঁদের নিয়ে কি সরকারের কোনো পরিকল্পনা আছে?

 মাহদী আমিন: কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যাঁরা উদ্যোক্তা হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে চান, তাঁদেরকে আমরা ‘সিড ফান্ডিংয়ের’ জোগান দিতে চাই, গ্র্যান্ট দিতে চাই। আমাদের মূল লক্ষ্য সরকারি-বেসরকারি দুই ক্ষেত্রেই যেন তরুণদের কাজের সুযোগ আমরা তৈরি করে দিতে পারি। উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য তাঁদের প্রশিক্ষণ দিতে চাই, যাতে তাঁরা নিজেদের সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে পারেন।

 আমাদের অনেকে ব্যবসা করতে চান, কিন্তু ব্যবসা করার জন্য পর্যাপ্ত ফান্ডিং অ্যাকসেস তাঁরা পান না। ঋণসহায়তাটাকে কতটা সহজতর করা যায়, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের বেস্ট আইডিয়াগুলোকে কীভাবে কমার্শিয়ালাইজ করা যায়—বিশেষভাবে তরুণ এবং নারীদের জন্য, এটা নিয়েও কাজ চলছে।

 আমাদের উদ্দেশ্য এমনভাবে ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলা, যাঁরা একই সঙ্গে সৎ, দক্ষ এবং যোগ্য হবেন। তার জন্য রাষ্ট্রের যে নীতিমালা, সেটি দিয়ে আমরা তাঁদেরকে সহায়তা করব। দেশে অনেক তরুণ ফ্রিল্যান্সিং করছেন, অনেকে তথ্যপ্রযুক্তি খাতে কাজ করছেন, কিন্তু আমাদের দেশে পেপাল নেই। পেপাল এবং এর মতো আরও বৈদেশিক লেনদেনের মাধ্যম রয়েছে, সেগুলো চালু করতে আমরা ইতিমধ্যে যোগাযোগ শুরু করছি।

প্রথম আলো:

আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারত। বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সীমানা ভারতের সঙ্গে। আমাদের রাজনীতি এবং সংস্কৃতিতে পক্ষ–বিপক্ষ মিলিয়ে ভারত সব সময় আলোচিত। বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্ক নিয়ে আপনার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কী?

 মাহদী আমিন: আমরা চাই এমন একটি সম্পর্ক গড়ে উঠুক, যেখানে সমতা ও ন্যায্যতা থাকবে। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশ নয়, সব দেশের জন্যই গণতান্ত্রিক সরকারের একই নীতি প্রযোজ্য। বিএনপির  নির্বাচনী প্রচারণায় স্লোগান ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’। তার মানে বাংলাদেশের স্বার্থ, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব ও জনগণের ক্ষমতায়ন—সেটিই আমাদের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। এই আদর্শকে ধারণ করে আমরা একদিকে যেমন চাই ভারতসহ প্রতিটি দেশের সঙ্গে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, মোবিলিটি, সংস্কৃতি—সর্বক্ষেত্রে জনগণের মধ্যে যোগসূত্র ও ‘পিপল-টু-পিপল টাইস’ তৈরি করতে, তেমনি চাই দুই দেশের বাণিজ্য, বিনিয়োগসহ পারস্পরিক সহযোগিতা আরও বাড়ুক, দ্বিপক্ষীয়ভাবে এবং বহুপক্ষীয়ভাবে।

 সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে আমরা আরও বেশি শক্তিশালী সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারি, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় যেটি শুরু হয়েছিল। একই সঙ্গে আমরা চাই একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আমাদের যেন নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়। যেহেতু আমরা সমতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি তৈরি করতে চাই, আমরা অবশ্যই পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত করতে চাই। আমরা অবশ্যই চাই সীমান্তে যেন আর কোনো মানুষের জীবন দিতে না হয়। সুতরাং জাতীয়তাবাদী সরকার কোনো নতজানু পররাষ্ট্রনীতিতে বিশ্বাসী নয়। স্বাধীন, সার্বভৌম ও আত্মমর্যাদার দেশ হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্বের প্রতিটি দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে চায়, যেখানে সর্বোচ্চ আন্তরিকতা, সহমর্মিতা ও সহযোগিতা থাকবে। তবে অবশ্যই বাংলাদেশের স্বার্থ ও জনগণের আকাঙ্ক্ষা সবার আগে সুরক্ষিত হতে হবে।

প্রথম আলো:

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিক সমাজের জন্য আপনাদের সরকারের অবস্থানটা কী?

মাহদী আমিন: গত ফ্যাসিবাদী সরকারের ১৬ বছর গুম, খুন, হামলা, মামলা ও নজিরবিহীন মানবাধিকার লঙ্ঘন হয়েছে। সবচেয়ে বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার দল হিসেবে এবং সবচেয়ে বেশি শহীদ ও গুম হওয়া মানুষের দল হিসেবে বিএনপি অবশ্যই প্রাধান্য দিচ্ছে যে প্রতিটি হত্যাকাণ্ডের বিচার হোক। বিএনপির পূর্ববর্তী যে সরকারগুলো ছিল, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় আমরা দেখেছি, তিনি যে রাষ্ট্রকাঠামো পেয়েছিলেন, সেখানে চারটা ছাড়া সব সংবাদপত্র বন্ধ ছিল। তিনি সব বাধা দূর করেছিলেন, সব পত্রিকা আবার প্রকাশের সুযোগ দিয়েছিলেন। দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি সংবাদপত্র ও টিভি চ্যানেল নিবন্ধন পেয়েছিল, কিন্তু কোনো দলীয়করণ হয়নি। দেশের অধিকাংশ বিদেশি গণমাধ্যম বাংলাদেশের পূর্ববর্তী বিএনপি সরকারের সময় এসেছিল, জবাবদিহি তৈরি করেছিল।

 বিএনপির ২০০১–০৬ সরকারের সময় খবরের কাগজ খুললেই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী দেশনেত্রী খালেদা জিয়া কিংবা বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর নামে ব্যঙ্গাত্মক কার্টুন প্রকাশিত হতো। এর জন্য কখনো কোনো সাংবাদিককে আটক করা হয়নি, কখনো কোনো গণমাধ্যম বন্ধ করা হয়নি। সুতরাং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা বিএনপির একটি গৌরবের বিষয়। সেটিকে ধারণ করে বর্তমান বিএনপি সরকারও প্রাধান্য দিচ্ছে বাক্স্বাধীনতা নিশ্চিত করার বিষয়টিকে।

 আপনারা দেখেছেন, জনগণের ভোটে দুই–তৃতীয়াংশ ম্যান্ডেট নিয়ে নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিরুদ্ধে অপপ্রচার ও বিষোদ্গার চলছে সামাজিক মাধ্যমে। সেই চিহ্নিত গোষ্ঠী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ অনেকের বিরুদ্ধেই মিথ্যাচার করছে, অশালীন আচরণ করছে। তারপরও আজ পর্যন্ত কারও বাক্স্বাধীনতা হরণ করা হয়নি। ক্ষমতাসীন সরকারের নজিরবিহীন এই উদারতা ও সহনশীলতা গণতান্ত্রিক সৌন্দর্য ও সহাবস্থান।

 অন্তর্বর্তী সরকারের সময় আটক যেসব সাংবাদিক কারাগারে রয়েছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে বলব, যাঁরা অপরাধী অবশ্যই তাঁদের বিচার হবে। আইন তার নিজের গতিতেই চলবে এবং আইনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠা হবে। তবে নির্দোষ যদি কেউ থেকে থাকেন, তাহলে তাঁরা মুক্ত হবেন, প্রাপ্য মর্যাদা পাবেন প্রত্যেক মানুষ—সেটি আমাদের প্রত্যাশা।

প্রথম আলো:

  সংস্কার প্রশ্নে বিতর্ক এখন রাজনীতির অঙ্গনে প্রধান আলোচ্য বিষয়। আপনি বিএনপির ইশতেহার প্রণয়ন কমিটিতে যুক্ত ছিলেন। তাই আপনার কাছে জানতে চাই, সংস্কার প্রসঙ্গে বিএনপি সরকারের অবস্থানটা কী?

 মাহদী আমিন: ঐতিহ্যগতভাবে বিএনপি সংস্কারের ধারক ও বাহক। বাংলাদেশের ইতিহাসে যতগুলো মৌলিক সংস্কার হয়েছে, সবগুলো কিন্তু শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সময় হয়েছে কিংবা প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সময় হয়েছে। ঐতিহ্যগত সেই সংস্কারকে ধারণ করেই ২০১৬ সালে ‘ভিশন ২০৩০’ প্রণয়ন করেছিলেন দেশনেত্রী খালেদা জিয়া। ২০২২ সালে ‘২৭ দফা’ প্রণয়ন করেছিলেন তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। ২০২৩ সালে ‘৩১ দফা’ প্রণয়ন করা হয়েছিল চূড়ান্তভাবে এবং সেই ৩১ দফাতেই কিন্তু সংস্কারের মৌলিক ভিত্তি রয়েছে। আজকের বাংলাদেশে আমরা যা কিছু নিয়ে আলোচনা করি না কেন, তার প্রায় প্রতিটিই বিএনপির সেই ৩১ দফায় রয়েছে। তারপর আমরা ‘জুলাই সনদে’ উপনীত হয়েছিলাম, যেটি গণতান্ত্রিক সব রাজনৈতিক দলের সমঝোতার ভিত্তিতে হয়েছিল।

 যতটুকু সমঝোতার ভিত্তিতে হয়েছিল এবং সেই জুলাই সনদে ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ বিএনপি সম্মত হয়ে যেভাবে স্বাক্ষর করেছিল, সেই স্বাক্ষরিত জুলাই সনদকে আমরা বাস্তবায়নের জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। দেশের মানুষের কাছে বিএনপি যে অঙ্গীকার করেছে এবং যে প্রতিশ্রুতির আলোকে জনগণ ধানের শীষে ভোট দিয়েছে, সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে শুরু করে সবাই তা অক্ষরে অক্ষরে পালনের জন্য দায়বদ্ধ। একই সঙ্গে যেসব বিষয়ে কোনো আলোচনা ও ঐকমত্য হয়নি, যার আইনি ভিত্তি নেই, কিংবা যেসব প্রস্তাব টেকসই ও বাস্তবসম্মত নয়, সেগুলো চাপিয়ে দেওয়াও ঠিক নয়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ মতভেদের বিষয়গুলো নিয়ে যুক্তিতর্ক ও আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার জন্য তো জাতীয় সংসদ রয়েছেই।

প্রথম আলো:

আগামী দিনের বাংলাদেশ বিনির্মাণে আপনার প্রত্যাশা কী?

 মাহদী আমিন: আমাদের দেশে ভিন্নমত ও ভিন্নপথের যেসব গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল রয়েছে, আমরা তাদের সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রত্যাশা করি। আমরা চাই, সবাই মিলে দেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে। এমন একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করতে চাই, যেখানে দলীয় ও আদর্শিক পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু দেশের স্বার্থে, দেশের মানুষের স্বার্থে এবং বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে সবাই এক। আমরা সবাই মিলেই তো বাংলাদেশ।

 দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী সরকারের সময়ে যে মানুষগুলো জীবন দিয়েছেন, গুম হয়েছেন, খুন হয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন—একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই কিছুটা হলেও তাঁদের ঋণ শোধ করতে পারব। সত্যিকার গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতা থাকবে, গণমানুষের অধিকার ও স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হবে। সেই পথযাত্রায় ইনশা আল্লাহ জনগণের বিপুল ম্যান্ডেটপ্রাপ্ত প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ন্যায়বিচার, বাক্স্বাধীনতা ও আইনের অনুশাসন প্রতিষ্ঠা করবে, নিশ্চিত করবে প্রত্যেক মানুষের মানবাধিকার। আমরা নিশ্চিত করতে পারব সেই উন্নয়ন, যার মাধ্যমে মানুষের সমস্যার সমাধান হয়, ভাগ্যের পরিবর্তন হয়। আমরা সবাই মিলে গড়ে তুলব এক দুর্বার বাংলাদেশ—বহুল আকাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ, জনগণের প্রত্যাশার বাংলাদেশ।

প্রথম আলো:

 আপনাকে ধন্যবাদ।

 মাহদী আমিন: আপনাকে ও প্রথম আলোর পাঠকদেরও ধন্যবাদ।