চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের একটি অংশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন। সেই সময় আপনাকেও বেশ সক্রিয় দেখা গেছে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানকে এখন আপনি কীভাবে দেখেন, এটি কি কাঠামোগত রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা, নাকি সাময়িক ক্ষোভের বিস্ফোরণ ছিল?
তানজীমউদ্দিন খান: আমার কাছে এটি সরাসরি কোনো কাঠামোগত রাজনৈতিক পরিবর্তনের সূচনা বলে মনে হয় না। কারণ, আন্দোলনের সূচনাটা হয়েছিল খুব নির্দিষ্ট একটি দাবি—সরকারি চাকরি, বিশেষ করে বিসিএসে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোটা সংস্কারের দাবি নিয়ে। সেই প্রেক্ষাপটে কোটা সংস্কার আন্দোলন ধীরে ধীরে বড় হয় এবং শেষ পর্যন্ত গণ-অভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ঘটনাপ্রবাহ বিশেষ করে আবু সাঈদ, ফারহান, শিশু রিয়া গোপের হত্যাকাণ্ড এমন কিছু মুহূর্ত তৈরি করে, যেখানে নিরাপত্তাহীনতা আর জীবননাশের হুমকি একবারে প্রত্যেকের ঘরের দুয়ারে এসে পৌঁছে যায়। এতে মানুষের মধ্যে উপলব্ধি তৈরি হয় যে সমস্যাটি কেবল কোটা নয়; রাষ্ট্রের স্বৈরাচারী কাঠামোও।
ব্যক্তিগতভাবে আমি মনে করি, এই গণ-অভ্যুত্থান কোনো রাজনৈতিক দল বা জোট দ্বারা বা তাদের নেতৃত্বে প্রস্তুত করা সুদূরপ্রসারী কোনো রাজনৈতিক পরিকল্পনার ফল ছিল না; বরং তৎকালীন সরকারের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস, রাজনৈতিক ক্ষমতার দম্ভ, দমনমূলক মনোভাব এবং বিশেষ করে আন্দোলন দমনে লাগামহীন সহিংসতার পথ বেছে নেওয়াই পরিস্থিতিকে ক্রমশ বিস্ফোরণমুখী করে তোলে। যখন রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন এবং হত্যাকাণ্ড শুরু হয়, তখন একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে করপোরেট কর্মকর্তাও অনুভব করতে থাকেন যে তাঁদের জীবন ঝুঁকির মধ্যে পড়ে গেছে। রাজনৈতিক হোক বা না হোক, প্রায় সবাই একধরনের অস্তিত্ব আর জীবননাশের আশঙ্কায় পড়ে যায়। সেই পরিস্থিতিই মানুষের মধ্যে একধরনের ঐক্যের অনুভূতি তৈরি করে।
আমরা এমন এক পর্যায়ে পৌঁছে যাই, যেখানে অনেকেই মনে করতে শুরু করেন—এই সরকার ক্ষমতায় থাকলে নিজের নিরাপত্তা নিশ্চিত বা ভালো কিছু সম্ভব নয়। ফলে সরকার পতনের দাবি একধরনের অনিবার্যতায় পরিণত হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক মুহূর্তটিই গণ-অভ্যুত্থানের প্রধান চালিকা শক্তি ছিল।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য; অনেকেই মনে করতে পারেন যে শিক্ষক নেটওয়ার্ক হঠাৎ করেই এই গণ-অভ্যুত্থানে সক্রিয় হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের রাজনৈতিক সক্রিয়তার ইতিহাস অনেক পুরোনো। ২০১৪-১৫ সাল থেকেই শিক্ষক নেটওয়ার্ক শিক্ষার্থীদের অধিকার, তাদের নিরাপত্তা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার মান উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করে আসছে। এই বিষয়গুলো নিছক একাডেমিক নয়; এগুলো রাজনৈতিকও বটে। ফলে এস্টাবলিশমেন্টের সঙ্গে আমাদের সংঘাত হওয়াটা স্বাভাবিক। ঘটনার পরম্পরায় জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান আমাদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মুহূর্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু সেটি আমাদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সক্রিয়তার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতার মধ্যেই ঘটেছে। আমরা এই আন্দোলনের প্রত্যক্ষ সাক্ষী ছিলাম, একই সঙ্গে সামনের সারিতেও ছিলাম।
এই গণ-অভ্যুত্থানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক বা বৈশিষ্ট্য কী ছিল? এর সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক অর্জন এবং সীমাবদ্ধতা কী বলে মনে করেন?
তানজীমউদ্দিন খান: এই আন্দোলনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল সামাজিক ও রাজনৈতিক বিভাজন অতিক্রম করে মানুষের মধ্যে ঐক্য সৃষ্টি হওয়া। বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বড় দুটি রাজনৈতিক শিবিরকে কেন্দ্র করে তীব্র মেরুকরণ তৈরি হয়েছিল। রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে সমাজও বিভক্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু এই আন্দোলনের সময় সেই বিভাজন অনেকাংশেই অস্পষ্ট হয়ে যায়। মানুষ তাদের দলীয় পরিচয় ভুলে গিয়ে একধরনের যৌথ অবস্থানে দাঁড়ায়। এটিই ছিল আন্দোলনের সবচেয়ে অনন্য বৈশিষ্ট্য। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের বৈধতার সংকটও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এই সরকারের ক্ষমতায় থাকার ভিত্তি ছিল খুব দুর্বল। ফলে বৈধতার ঘাটতি পূরণ করতে সরকারকে বিদেশি শক্তির ওপর, বিশেষ করে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের সমর্থনের ওপর অপেক্ষাকৃতভাবে অনেক বেশি নির্ভর করতে হয়েছিল। শক্তিশালী রাষ্ট্রের একচ্ছত্র সমর্থন পাওয়া মহাপরাক্রমশালী হয়ে ওঠা একটি সরকারকে জনগণের ঐক্যবদ্ধ আন্দোলনের মাধ্যমে সরিয়ে দেওয়া একটি অভূতপূর্ব ঘটনা।
বাংলাদেশের পূর্ববর্তী গণ-আন্দোলনগুলোর দিকে তাকালে দেখা যায়, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই রাজনৈতিক দলগুলোই নেতৃত্ব দিয়েছে এবং তাদের শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো ছিল মূল চালিকা শক্তি। কিন্তু ২০২৪ সালের আন্দোলনে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। মানুষের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা বা কথা আর কাজের তুমুল অমিল দেখতে দেখতে দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি মানুষের আস্থাহীনতা তৈরি হয়েছিল। ফলে মানুষ সরাসরি রাজনৈতিক দলের ব্যানারে আন্দোলনে নামতে খুব একটা আগ্রহী ছিল না। আবার এটাও সত্য, সরকারবিরোধীদের গুম, খুন, লাগামহীন মামলা-হামলার শিকার হতে দেখে রাজনৈতিক দলের ব্যানারে আন্দোলনে নামার মতো সাহস খুব কমসংখ্যক মানুষেরই ছিল। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত দেয়; এটি আপাতদৃষ্টিতে ছিল সনাতনি দলীয় ব্যানার ছাড়া এক প্ল্যাটফর্ম, যা রাজনৈতিক হোক বা না হোক, সব মানুষের কাছে বিশ্বাসযোগ্যতা তৈরি করেছিল।
তবে এই আন্দোলনের সীমাবদ্ধতাও ছিল। সরকার পতনের পর কী ধরনের রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি হবে—সে বিষয়ে তাদের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছিল না। যদি আন্দোলনটি সত্যিই ‘মেটিকুলাসলি ডিজাইনড’ হতো, তাহলে সরকার পতনের পর রাষ্ট্র পরিচালনার একটি সুস্পষ্ট রূপরেখা থাকত। বিপ্লব হবে নাকি গণ–অভ্যুত্থান, সেই ব্যাপারে সুস্পষ্ট বোঝাপড়া থাকত। সরকার পতনের পরই কেউ কেউ বিপ্লবী সরকার গঠনের কথা বলেছিলেন, আবার কেউ সংবিধানের কাঠামোর মধ্যেই নতুন সরকার গঠনের পক্ষে ছিলেন। শেষ পর্যন্ত সংবিধানের আওতাতেই অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়।
যে উপায়ে সরকার গঠন হলো, তাতে সামাজিক আর রাজনৈতিক ঐক্যের যে অনুভূতি, যে শক্তি আন্দোলনের সময় তৈরি হয়েছিল; সেটিকে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দেওয়া যায়নি। যদি সেই ঐক্যের ভিত্তিতে একটি জাতীয় সরকার বা নতুন ধরনের রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করা যেত, তাহলে হয়তো ভিন্ন বাংলাদেশ দেখা যেত।
অন্তর্বর্তী সরকার গঠন নিয়ে আলোচনার একটি পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আপনিও যুক্ত ছিলেন। সেই অভিজ্ঞতাটি কেমন ছিল?
তানজীমউদ্দিন খান: ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর সেনাপ্রধান একটি সংবাদ সম্মেলন করেন এবং সেনানিবাসে কয়েকটি রাজনৈতিক দলসহ কিছু ব্যক্তিবর্গকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় ছিল—এই গণ-অভ্যুত্থানে মোটাদাগে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীরা কেউ সেখানে উপস্থিত ছিল না। পরবর্তী সময়ে আমাদের জানানো হয়, বঙ্গভবনে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন নিয়ে আলোচনা হবে এবং সেখানে শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ও শিক্ষক প্রতিনিধিরা অংশ নেবেন। প্রথমে বলা হয়েছিল চারজন শিক্ষক প্রতিনিধি থাকবে, পরে সেটি কমিয়ে দুজন করা হয়। এর মধ্যে একজন ছিলেন অধ্যাপক আসিফ নজরুল এবং অপর জন আমি। আমরা শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটি বাসে করে বঙ্গভবনে যাই। সেখানে মূল আলোচনা হয়ে ওঠে—অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কে হবেন।
তখন সবকিছু বিবেচনায় প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নাম জনপরিসরে খুব স্বাভাবিকভাবেই আলোচনায় ছিল, কিন্তু সেটি আনুষ্ঠানিকভাবে অনুমোদিত হয়নি বা স্বীকৃতি পায়নি। কয়েক ঘণ্টার দীর্ঘ আলোচনার পর তাঁর নাম চূড়ান্ত করা হয়। অন্য উপদেষ্টাদের নামের ব্যাপারে আর আলাপের সুযোগ হয়নি। তবে কৌশলগত কারণে আমি এই আলোচনায় অংশ নেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রেখেছিলাম এবং এতে অধ্যাপক আসিফ নজরুলও সেদিন আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে পারেননি। পরবর্তী সময়ে উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য কারা হবেন, তা নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে ছাত্রনেতাদের সঙ্গে আলোচনা হয়। কিছু ছাত্রনেতা আমার বাসায় এসেছিল সম্ভাব্য নামের একটি তালিকা তৈরি করার জন্য। আলোচনা শেষে শিক্ষক নেটওয়ার্কের পক্ষ থেকেও একটি তালিকা দিয়েছিলাম। কিন্তু সেই তালিকাটি খুব বেশি গুরুত্ব পায়নি।
পরে দেখা গেল, অনেকেই উপদেষ্টা পরিষদে জায়গা পেয়েছেন, যাঁদের সঙ্গে গণ-অভ্যুত্থান বা গণ-অভ্যুত্থানের চেতনা বা আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে কোনো সম্পর্কই ছিল না। আমার উপলব্ধি হলো, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য নির্বাচনের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সম্পর্ক, বন্ধুত্ব, পরিচিতি এবং বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থ, ব্যক্তিগত স্বার্থ, আঞ্চলিকতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকতে পারে। এমনকি ২০০৭ সালের সেনাসমর্থিত সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে কর্মরত ছিলেন—এমন ব্যক্তিদেরও সেখানে দেখা গেছে। ফলে গণ-অভ্যুত্থানের সরকার হিসেবে যে ধরনের রাজনৈতিক চরিত্র প্রত্যাশিত ছিল, তার সত্যিকারের কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
গণ-অভ্যুত্থানের পর তরুণদের মধ্যে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ অনেক বেড়েছে বলে মনে হচ্ছে। গণ-অভ্যুত্থানে নেতৃত্ব দেওয়া শিক্ষার্থীদের একটি অংশ জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) নামে নতুন একটি রাজনৈতিক দল গঠন করে এবং তারা এবার একটি জোটের অংশ হিসেবে নির্বাচনেও অংশ নেয়। এ বিষয়গুলোকে আপনি কীভাবে দেখেন?
তানজীমউদ্দিন খান: আমার মনে হয় তাদের রাজনৈতিক দল গঠন করা ছাড়া তেমন কোনো বিকল্প ছিল না। কারণ, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতি কোনো পক্ষের জন্যই খুব নিরাপদ ছিল না; আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া তরুণদের জন্য তো আরও বেশি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় অনেক ছাত্রনেতাই একমত হয়েছিল যে রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম না থাকলে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
তরুণদের দল গঠনকে আমি অস্বাভাবিক কিছু মনে করি না। তবে প্রশ্ন হচ্ছে, তারা কি সত্যিই নতুন ধরনের রাজনীতি করছে, নাকি শেষ পর্যন্ত রাজনীতির পুরোনো ধারার মধ্যেই ঢুকে পড়েছে। এখন পর্যন্ত যেসব ঘটনা ঘটেছে, তাতে মনে হয় তারা অনেক ক্ষেত্রেই পুরোনো রাজনীতির পথই অনুসরণ করছে।
ফলে শুরুতে যে ভিন্ন ধরনের রাজনীতির প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, সেটা একটা বড় ধাক্কা খেয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, এদের অনেকের বিরুদ্ধে দুর্নীতিসহ অন্যান্য যেসব অভিযোগ উঠেছে, তা তাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকারকে ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এতে পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর মতো তাদের ক্ষেত্রেও কথা আর কাজের অমিলটাও সময় পার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রকট হয়ে উঠেছে। তাদের ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক ব্যবস্থা’, ‘নয়া বন্দোবস্ত’, সাম্য—এগুলো কথার কথা হিসেবেই থেকে গেছে!
অনেকেই বলছেন, গণ-অভ্যুত্থানের পর ডানপন্থী বা দক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান ঘটছে। এটা কি সত্যি?
তানজীমউদ্দিন খান: বাংলাদেশে উগ্র দক্ষিণপন্থা বা ধর্মীয় উগ্রপন্থী প্রবণতা একেবারে নতুন কিছু নয় বা হঠাৎ করেই চলে আসেনি। অতীতেও আমরা এর নানা উদাহরণ দেখেছি। ধর্মীয় অনুভূতিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা তৈরি করা বা সহিংসতার প্রবণতা আমাদের সমাজে আগেও ছিল। তবে পার্থক্যটা হলো, তখন এসব উগ্রপন্থী আচরণ রাজনৈতিকভাবে খুব বেশি গ্রহণযোগ্যতা পেত না। সমাজের সাংস্কৃতিক ও সামাজিক চেতনায় একধরনের বিভাজনের বদলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ভাবনা তখন তুলনামূলকভাবে সবল ছিল। ফলে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন বা প্রকাশ্য পৃষ্ঠপোষকতা খুব একটা পেত না।
কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে আমরা যে ঘটনাগুলো দেখেছি—যেমন মাজার ভাঙচুর, কবর থেকে লাশ তুলে পুড়িয়ে ফেলা, ভিন্ন চিন্তার মানুষ, ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা, নারীদের ওপর আক্রমণ—এসব ঘটনায় অন্তর্বর্তী সরকার কোনো স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারেনি। অন্তর্বর্তী সরকারের পক্ষ থেকে জনপরিসরে স্পষ্ট বার্তা দেওয়া প্রয়োজন ছিল যে এই ধরনের আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। কিন্তু বাস্তবে সরকারের সেই দৃঢ় অবস্থান আমরা দেখতে পাইনি।
উল্টো কিছু ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে সহিংস আচরণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে তাদের সামাজিকভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর ফলে একটি বার্তা গেছে যে এসব কর্মকাণ্ড হয়তো সহ্য করা হবে। সরকারের নীরবতা বা দ্ব্যর্থহীন অবস্থানের অভাবের কারণে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো একধরনের সাহস পেয়েছে এবং ধীরে ধীরে রাজনৈতিকভাবেও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। আমার মনে হয় গত দেড় বছরে এই গোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন অনেক বেশি দৃশ্যমান হয়েছে। এটি সমাজের জন্য একটি ঝুঁকিপূর্ণ প্রবণতা।
এখানে আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় নির্বাচনের প্রশ্নে মূলধারার রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যেই বিভক্তি ছিল। কিছু গোষ্ঠীর মধ্যে নির্বাচন পেছানোর আগ্রহও দেখা গেছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতি বা সামাজিক বিশৃঙ্খলা বাড়ার মানে হলো—এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচন করা সম্ভব নয়। ফলে সহজে নির্বাচন পিছিয়ে দেওয়ার যুক্তিও তৈরি হতো। এই প্রেক্ষাপটে কখনো কখনো মনে হয়েছে—ইচ্ছাকৃতভাবে বা অনিচ্ছাকৃতভাবে—একধরনের বিশৃঙ্খল বা অরাজক পরিস্থিতিকে টিকে থাকতে দেওয়া হয়েছে। আর সেই সুযোগে উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিকভাবে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে একটি বহুল আলোচিত বিষয় হলো মব সহিংসতা। এ ঘটনাগুলোকে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
তানজীমউদ্দিন খান: এই ঘটনাগুলো অত্যন্ত উদ্বেগজনক ছিল। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কেউ কেউ এসব ঘটনাকে ‘প্রেশার গ্রুপ’ এর কর্মকাণ্ড বলে উল্লেখ করেছিলেন। কিন্তু সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখা, অরাজকতা বা কোনো ধরনের আইনহীনতাকে উৎসাহিত করা নয়। যদি কারও বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়াই সরকারের কাজ। কিন্তু জনতাকে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার সুযোগ দিলে, সেটি সমাজে একধরনের আইনহীনতার সংস্কৃতি তৈরি করে। কিন্তু যখন দায়িত্বশীল অবস্থান থেকে এমন বক্তব্য দেওয়া হয়, যা মব সংস্কৃতি বা দঙ্গলবাজিকে পরোক্ষভাবে বৈধতা দেয়, তখন পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। ফলে সমাজে ভয় ও অনিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি হয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের মধ্যে মানবাধিকারকর্মী ছিলেন, আইনের শিক্ষক ছিলেন। তাঁরা কেন আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেন না?
তানজীমউদ্দিন খান: এর পেছনে কয়েকটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী যে ধরনের অন্তর্বর্তী সরকারের প্রত্যাশা ছিল, বাস্তবে সেটা হয়নি। দ্বিতীয়ত, বর্তমান সময়ে রাজনীতির একটি নতুন মাত্রা তৈরি হয়েছে, যাকে আমি ভার্চ্যুয়াল পলিটিক্যাল ফ্রন্টিয়ার বলি। আগে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা মূলত রাষ্ট্রীয় স্থলজ রাজনৈতিক সীমান্ত বা ইংরেজিতে যাকে টেরেস্ট্রিয়াল পলিটিক্যাল ফ্রন্টিয়ার বলে, তা ছিল, কিন্তু এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম—বিশেষ করে ইউটিউব ও অন্যান্য অনলাইন প্ল্যাটফর্ম রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের একটি বড় স্পর্শকাতর ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব এতটাই শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল যে রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়ছিল। এই পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে কিছু ইউটিউব ইনফ্লুয়েন্সার সমাজে উত্তেজনা ছড়ানোর কাজ করেছে। তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক মহলের কিছু অংশের সম্পর্ক তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। এর ফল আমরা দেখেছি; দেশের দুটি প্রধান সংবাদমাধ্যম প্রথম আলো ও ডেইলি স্টার এবং সাংস্কৃতিক সংগঠন ছায়ানট বা উদীচীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে ঘোষণা দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে, ভাঙচুর করা হয়েছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে সহিংসতার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বক্তব্য বা পরিচয় স্পষ্টভাবে সামনে আসার পরও দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে তারা আরও উৎসাহ পেয়েছে এবং রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতাবান হয়ে উঠেছে।
সামগ্রিকভাবে অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরের শাসনামলকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
তানজীমউদ্দিন খান: এটা স্বীকার করতে হবে যে অন্তর্বর্তী সরকার খুব কঠিন একটি সময়ে দায়িত্ব পালন করেছে। কিছু ক্ষেত্রে তাদের সাফল্যও রয়েছে; যেমন অর্থনীতির ভঙ্গুর পরিস্থিতি সামাল দেওয়া, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট মোকাবিলা করা এবং প্রবাসী আয় বাড়ানো, উচ্চশিক্ষা খাতে ক্রমবর্ধমান অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। বিদেশি পরাশক্তিগুলোকে সামলানোও তাদের জন্য সহজ ছিল না। সবশেষে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাফল্যের কথা অবশ্যই বলতে হবে, সেটি হলো শান্তিপূর্ণভাবে একটি নির্বাচন আয়োজন করা। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে ছিল, তাতে নির্বাচন আয়োজন করা সহজ ছিল না। এ ক্ষেত্রে সশস্ত্র বাহিনীর সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
সত্যি কথা বলতে কি, ৫ আগস্টের পর মানুষের প্রত্যাশা অনেক বেশি ছিল; যখন মানুষ একটি সরকারের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে জীবন ঝুঁকিতে ফেলে আন্দোলন করে, তখন নতুন সরকারের প্রতি তাদের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই আকাশচুম্বী হয়ে ওঠে। কিন্তু সেই প্রত্যাশা পূরণের জন্য যে কমিটমেন্ট ও সমন্বয় প্রয়োজন ছিল, তা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যায়নি। কিছু ক্ষেত্রে এমন আলোচনা উঠেছে যে উপদেষ্টা পরিষদের ভেতরে ‘কিচেন ক্যাবিনেট’ বা কোনো কোনো উপদেষ্টাকে ঘিরে অনানুষ্ঠানিক কেন্দ্র তৈরি হয়েছে। এমন ধারণা তৈরি হয়েছিল যে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সবাই সমানভাবে অংশগ্রহণ করতে পারছেন না।
নতুন নির্বাচিত সরকারের শুরুর সময়টাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করছেন?
তানজীমউদ্দিন খান: নতুন সরকারের শুরুতে কিছু ইতিবাচক দিক অবশ্যই রয়েছে। বিশেষভাবে নির্বাচনের পর বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবে সাক্ষাৎ করে প্রধানমন্ত্রী যে উদারতা দেখিয়েছেন—এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি নতুন দৃষ্টান্ত। তবে একই সঙ্গে কিছু বিষয়ে উদ্বেগও তৈরি হয়েছে। মনে হচ্ছে, নতুন সরকারের অনেকেই ১২ ফেব্রুয়ারিকে মূল ঘটনা হিসেবে দেখছেন। কিন্তু ১৬ বছরের স্বৈরাচারী শাসনামলে হাজার হাজার মানুষের আত্মাহুতির পথ ধরেই ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থান।
এই অভ্যুত্থান না হলে ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ও রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্ভব হতো না। এ বিষয়টি অনুধাবন করার পরিবর্তে খুব হালকা করে দেখা বা বিস্মৃত হলে মানুষের কাছে অবশ্যম্ভাবীভাবে ভুল বার্তা যেতে পারে। কারণ, ৫ আগস্টের পরও অনেক জায়গায় দেখা গেছে শুধু রাজনৈতিক ব্যানার বদলেছে, কিন্তু আচরণগত পরিবর্তন সব ক্ষেত্রে ঘটেনি, দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বে খুনের ঘটনা তো আছেই। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে আগের মতোই মতলববাজ, সুবিধাবাদী, চাটুকারিতার আর সোশ্যাল মিডিয়ায় নেতার সঙ্গে তোলা ছবির প্রদর্শন ও প্রটোকলের রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেন আবার ফিরে আসছে। এ ধরনের সামাজিক আর রাজনৈতিক বাস্তবতা সাধারণ মানুষের প্রতিদিনের জীবনে অস্বস্তি, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে ভয় এবং আশঙ্কা তৈরি করছে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, এই গণ-অভ্যুত্থানের একটি জরুরি ভিত্তি ছিল—মেধা ও নৈতিকতার মূল্যায়ন। কিন্তু সাম্প্রতিক কিছু নিয়োগের ক্ষেত্রে সেই নৈতিক প্রশ্ন সামনে এসেছে। উদাহরণ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত মানুষের মনে আবার সেই পুরোনো আশঙ্কা তৈরি করতে পারে—আমরা কি আবার আগের সংকীর্ণ ব্যক্তিস্বার্থনির্ভর দলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে ফিরে যাচ্ছি? ৫ আগস্টের আন্দোলনের মাধ্যমে যে পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়েছিল, সেটি পূরণ করার ব্যাপারে ক্ষমতাসীনরা কতটা আন্তরিক—এই প্রশ্নও তখন সামনে এসেছে।
বর্তমান সময়ের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো, মানুষের সাহস ও রাজনৈতিক সচেতনতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি। একটি স্বৈরাচারী সরকারকে হটিয়ে দেওয়ার অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস তৈরি করেছে। ফলে জনরোষ তৈরি হওয়ার জন্য এখন সব সময় বড় রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মের প্রয়োজন নাও হতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ক্ষমতাসীনদের আরও বেশি রাজনৈতিক সংবেদনশীলতা ও আন্তরিকতা দেখাতে হবে। শুধু কথায় নয়, বাস্তব সিদ্ধান্তেও সেই আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, তথাকথিত ‘প্রটোকল’ আর চাটুকারিতার রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তে ও কাজে মিল আছে এমন রাজনৈতিক সংস্কৃতির চর্চা করতে হবে এবং একে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
আপনি আন্তর্জাতিক সম্পর্কের শিক্ষক। সেই বিষয়ে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি করেছে। এই চুক্তি কার্যকর করা নিয়ে কূটনৈতিক চাপের কথা বলছেন কেউ কেউ। এ বিষয়টাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
তানজীমউদ্দিন খান: বর্তমান বিশ্বব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিনির্ভর ও অরাজক প্রকৃতির। আন্তর্জাতিক আইন, চুক্তি বা আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকারিতা আগের তুলনায় অনেক কমে গেছে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমরা দেখছি, বড় শক্তিগুলো কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে সরাসরি শক্তি প্রয়োগ করছে—কখনো সামরিকভাবে, কখনো অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে। শুল্ক বা ট্যারিফকেও এখন চাপ তৈরির একটি হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচনের মাত্র কয়েক দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের অসম বাণিজ্যচুক্তি হওয়া এবং সেটির বিস্তারিত জনসমক্ষে না আসা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন এবং আশঙ্কা তৈরি করে।
একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যিনি নিরাপত্তা উপদেষ্টা ছিলেন, তিনিই এখন নতুন সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এতে অনেকের কাছে মনে হতে পারে, অন্তর্বর্তী সরকারের শক্তিশালী রাষ্ট্রকে তুষ্ট রাখা নীতির ধারাবাহিকতাই বজায় রাখা হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এই ধারাবাহিকতা কি স্বেচ্ছায় গ্রহণ করা হয়েছে, নাকি চাপের কারণে তা বজায় রাখতে হচ্ছে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—সরকারের সঙ্গে জনগণের সম্পর্ক কতটা শক্তিশালী। যদি সরকার প্রকৃত অর্থে জনসমর্থনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে আন্তর্জাতিক চাপ মোকাবিলা করার সক্ষমতা বাড়ে।
একটি উদাহরণ দিলে স্পষ্ট হবে। ২০০৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ড বাংলাদেশ সফরে এলে তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণের বিষয়টি সামনে আসে। কিন্তু তখনকার সরকার জাতিসংঘের নেতৃত্বের বাইরে এ ধরনের যুদ্ধে অংশ না নেওয়ার ব্যাপারে নিজেদের অবস্থান স্পষ্ট করে। তৎকালীন সরকারের সম্ভবত তাৎক্ষণিকভাবে রাজনৈতিকভাবে দর-কষাকষি করার মতো শক্তি ছিল এবং তাই তারা অন্তত সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে অংশগ্রহণ প্রশ্নে জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে পেরেছিল।
বেশ কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের জনগণের মধ্যে ভারতবিরোধী মনোভাব বেশ জোরালো হয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে দুই দেশের সরকারের মধ্যেও সম্পর্কের বেশ অবনতি হয়েছিল। তবে নতুন নির্বাচিত সরকারের আমলে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুটা স্বাভাবিক হয়েছে। এই বিষয়গুলোকে একটু ব্যাখ্যা করবেন?
তানজীমউদ্দিন খান: বাংলাদেশে ভারতবিরোধী মনোভাব শক্তিশালী হওয়ার পেছনে কিছু নির্দিষ্ট রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। তবে শেখ হাসিনার স্বৈরাচারী সরকারকে ভারতের একতরফা ও লাগামহীনভাবে সমর্থন দেওয়া, প্রতিটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ বিকিয়ে দিয়ে স্বৈরাচারী রেজিমের স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার ফলে জনমানুষের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ভারতবিরোধী মনোভাব চাঙা হয়েছে। এ জন্য প্রতিবেশী ভারতের বোঝা প্রয়োজন যে নিজেদের স্বার্থে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে একতরফা সমর্থন এবং বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থকে উপেক্ষা করা ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়িয়ে দেয়।
ভারত বাংলাদেশের জন্য একটি অপরিবর্তনীয় প্রতিবেশী। তাই সম্পর্ক রক্ষায় প্রতিবেশীসুলভ দৃষ্টিভঙ্গি খুব গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক এমন হওয়া উচিত, যেখানে উভয় পক্ষের পারস্পরিক স্বার্থ রক্ষা পায়। বাংলাদেশকে তার জনগণের স্বার্থকে সামনে রেখেই ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রক্ষা করতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ভারতবিরোধী বক্তব্য বা রেটোরিক সরকারি পর্যায়ে এবং জনপরিসরে অনেক বেশি দৃশ্যমান ছিল। ফলে ভারতের পক্ষ থেকে সরকারের প্রতি একধরনের অনাস্থা এবং অবিশ্বাস তৈরি হয়েছিল। বর্তমান সরকার একটি পরিচিত রাজনৈতিক শক্তি এবং অতীতেও তারা ক্ষমতায় ছিল। তাই ভারতের সঙ্গে তাদের একটি পূর্বপরিচিত কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। এ ছাড়া এখন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সক্রিয় থাকায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক পরিসর তৈরি হয়েছে। ফলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করা তুলনামূলকভাবে সহজ হয়েছে।
আপনি বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাই শেষ প্রশ্নটা শিক্ষা নিয়ে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় কাঠামোগত সমস্যা কী বলে মনে করেন?
তানজীমউদ্দিন খান: বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো—রাষ্ট্রের কোনো সুস্পষ্ট উচ্চশিক্ষা দর্শন নেই। অর্থাৎ আমরা উচ্চশিক্ষাকে কী উদ্দেশ্যে বিস্তার করতে চাই, কোন মানদণ্ডে তা পরিচালনা করতে চাই—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট উত্তর নেই। এর ফলে অনেক সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্তগুলো শিক্ষাগত প্রয়োজনের ভিত্তিতে নয়, বরং স্থানীয় দলীয় সমর্থকগোষ্ঠীর আর্থিক এবং পেশাগত লাভালাভের বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
২০০৮ সাল পর্যন্ত দেশে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিল সর্বোচ্চ ২৫-২৬টি। কিন্তু ২০০৯ সালের পর থেকে দ্রুতগতিতে পরিকল্পনাবিহীনভাবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় অনুমোদন দেওয়া হয়েছে এবং এখন সেই সংখ্যা পঞ্চাশের বেশি। সমস্যা হলো, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে কোনো রকম অবকাঠামো তৈরি হওয়ার আগেই জেলায় জেলায় এগুলোতে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করা হয়েছে; কমপক্ষে ২২টি বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া বাড়িতে চলছে। এমনও দেখা গিয়েছিল, একটি কক্ষের মধ্যে একাধিক বিভাগের কার্যালয়, শিক্ষকেরা ভাড়া বাড়ির গ্যারেজে বসেন। আবার এমন বিভাগ চালু আছে, যেখানে প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি এবং অন্যান্য সুবিধাদি নেই।
এ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ঘিরে নিয়োগ-বাণিজ্য এবং স্থানীয় রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়ও সামনে এসেছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় প্রাধান্য পেয়েছে। কোথাও লাগামহীনভাবে দলীয়করণ হয়েছে। আবার, কোথাও কোথাও দেখা গেছে শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হলেও কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় সমান। এগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আরেকটি দিক হলো উন্নয়ন প্রকল্প। অবকাঠামো নির্মাণের জন্য হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়। কিন্তু নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার জন্য যে রাজস্ব বাজেট দরকার, সেখানে অর্থ বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেট প্রণয়নের পদ্ধতিও এখানে একটি সমস্যা। অনেক ক্ষেত্রে তারা আগের বছরের বাজেটকে ভিত্তি ধরে সামান্য কিছু বৃদ্ধি করে নতুন বাজেট নির্ধারণ করে। এতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রকৃত প্রয়োজন প্রতিফলিত হয় না। এই পুরো পরিস্থিতিকে ‘এডুসাইড’ অর্থাৎ শিক্ষার বিনাশ বলা যেতে পারে। কারণ, একদিকে শিক্ষার মানের সঙ্গে আপস করা হয়েছে, লাগামহীনভাবে দলীয়করণ হয়েছে, আবার অন্যদিকে পর্যাপ্ত অবকাঠামো নির্মাণ ছাড়াই বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে উচ্চশিক্ষা খাত রাজনৈতিকভাবেও খুব স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর শিক্ষার্থীদের ভূমিকা ও প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। তাই শিক্ষার্থীদের সংকট ও দাবি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা জরুরি। তা না হলে শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে।
সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় উচ্চশিক্ষাকে রাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার অংশ হিসেবে দেখতে হবে। জাতীয় নিরাপত্তা শুধু সীমান্ত রক্ষার বিষয় নয়; একই সঙ্গে মানব নিরাপত্তাকে বিশেষ বিবেচনায় নিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষিকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। যদি রাষ্ট্র এই দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করে, তাহলে উচ্চশিক্ষায় প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ ও সংস্কার বাস্তবায়ন করা সহজ হবে।
সময় দেওয়ার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ।
তানজীমউদ্দিন খান: আপনাকেও ধন্যবাদ।