যত দিন যাচ্ছে, ঢাকার জলাবদ্ধতার সমস্যা কেন আরও প্রকট হচ্ছে? সামনের দিনগুলোয় কেমন পরিস্থিতি আশঙ্কা করছেন?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: এভাবে চলতে থাকলে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় যে সামনের দিনগুলোয় পরিস্থিতি আরও খারাপের দিকেই যাবে। তবে একজন সচেতন নাগরিক ও পরিকল্পনাবিদ হিসেবে আমি আশাবাদী হতে চাই।
বর্তমান সমস্যাগুলো সঠিকভাবে চিহ্নিত করে কার্যকর সমাধানে যথাযথ পদক্ষেপ নিলে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব। কিন্তু আমরা যদি নিষ্ক্রিয় থাকি এবং চিহ্নিত সমস্যাগুলো এড়িয়ে যাই, তবে ভবিষ্যতে এটি ভয়াবহ দুর্যোগে রূপ নেবে—এ বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
চিহ্নিত সমস্যাগুলো কী?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: জলাবদ্ধতার প্রকৃত কারণ বুঝতে হলে প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মগুলো বুঝতে হবে। বৃষ্টি মহান আল্লাহর রহমত এবং প্রকৃতির আশীর্বাদ। এই বৃষ্টির ওপরেই মানুষসহ সমগ্র জীবজগৎ, উদ্ভিদ ও সামগ্রিক বাস্তুসংস্থান এবং আমাদের কৃষিব্যবস্থা টিকে আছে। কিন্তু এই আশীর্বাদই এখন অভিশাপে পরিণত হয়েছে। এর মূল কারণ হচ্ছে আমরা প্রাকৃতিক পানিচক্রের স্বাভাবিক গতিপ্রবাহ নষ্ট করে ফেলেছি।
বৃষ্টি মাটিতে পড়ার পর প্রধানত দুটি ঘটনা ঘটে। প্রথমত, বৃষ্টির পানির একটি বড় অংশ মাটিতে প্রবেশ করে বা শোষিত হয়, যাকে আমরা বিজ্ঞানের ভাষায় ইনফিলট্রাশন বলি। দ্বিতীয়ত, গাছপালা ও মাটির তৃষ্ণা মেটানোর পর যে বাড়তি পানিটুকু থাকে, তা ঢালু জায়গা দিয়ে গড়িয়ে নিচু জলাভূমি, খাল বা নদীতে গিয়ে পড়ে। কিন্তু নগরায়ণের নামে আমরা ঢাকার মাটির উপরিভাগের বেশির ভাগ অংশ কংক্রিট দিয়ে ঢেকে ফেলেছি। ফলে বৃষ্টির পানি মাটিতে ঢোকার আর কোনো পথ পাচ্ছে না। যে পানিটুকু আগে মাটির নিচে চলে যেত, তা এখন উপরিভাগে জমা হয়ে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি করছে।
শহরের ভেতরের ও চারপাশের প্রাকৃতিক জলাশয় এবং বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলগুলোও আমরা ধ্বংস করে ফেলেছি। বসুন্ধরা বা মধুমতি মডেল টাউনের মতো বড় বড় বেসরকারি আবাসন প্রকল্পগুলো মূলত গড়ে উঠেছে নিচু জলাভূমির ওপর, যেখানে একসময় বৃষ্টির পানি জমে থাকত। এরপর হলো খাল ও ড্রেনেজ–ব্যবস্থার সংকোচন।
ঢাকা শহরে একসময় ৫৬টি খাল ছিল। ২০২০ সালের শেষের দিকে ওয়াসা যখন সিটি করপোরেশনের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে, তখন কাগজে-কলমে ২৬টি খাল অবশিষ্ট ছিল। এখন সেই ২৬টি খালও খুঁজে পাওয়া কঠিন। যেগুলো টিকে আছে, সেগুলোও মৌজা ম্যাপ অনুযায়ী দখল হয়ে গেছে।
ড্রেনগুলোর অবস্থাও শোচনীয়; অনেক জায়গায় ড্রেনের সঙ্গে খালের কোনো সংযোগই নেই। এর ওপর যোগ হয়েছে আমাদের দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা। সব আবর্জনা ও প্লাস্টিক গিয়ে পড়ছে ড্রেনে, এ কারণে ড্রেনগুলো কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ড্রেনেজ–ব্যবস্থা ভালো থাকলেও শেষ পর্যন্ত পানিনিষ্কাশনের পথ হচ্ছে বুড়িগঙ্গা, বালু বা তুরাগ নদ। জোয়ার-ভাটার কারণে অনেক সময় এই নদ–নদীগুলোর পানির উচ্চতা খালের চেয়ে বেশি থাকে। ফলে বৃষ্টি হলে খালের পানি নদীতে না গিয়ে উল্টো শহরকে প্লাবিত করে।
খালগুলোর দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তরের পরও কেন ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: সিটি করপোরেশনকে দায়িত্ব দেওয়া হলেও সেই কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনে প্রয়োজনীয় কারিগরি সক্ষমতা, বিশেষজ্ঞ জনবল এবং পর্যাপ্ত বাজেট সংস্থান করা হয়নি। সিটি করপোরেশন এমনিতেই তাদের নিয়মিত কাজগুলো সামলাতে হিমশিম খায়। তার ওপরে এই বিশাল কর্মযজ্ঞের ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে কোনো রকম প্রস্তুতি ছাড়াই।
দ্বিতীয়ত, পানিনিষ্কাশন কেবল ড্রেন বা নর্দমা তৈরির বিষয় নয়। এটি একটি সামগ্রিক ব্যবস্থা। ড্রেনের পানি যাবে খালে, খাল থেকে পাম্পিংয়ের মাধ্যমে সেই পানি যাবে নদীতে।
এখন ড্রেন যদি সিটি করপোরেশনের হয়, আর খালের মুখ বা নদীর নাব্যতা যদি পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দায়িত্বে থাকে, তবে এক পক্ষ কাজ করলেও অন্য পক্ষের নিষ্ক্রিয়তায় পুরো প্রক্রিয়াটি মুখ থুবড়ে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে। তা ছাড়া শহরের ভূমি ব্যবহার এবং ভবন নির্মাণের অনুমোদন দেয় রাজউক। রাজউক যদি মাস্টারপ্ল্যান লঙ্ঘন করে জলাশয় বা পানিধারণ এলাকা ভরাট করে আবাসন প্রকল্পের অনুমতি দেয়, তবে সিটি করপোরেশন হাজারো ড্রেন তৈরি করেও জলাবদ্ধতা কমাতে পারবে না।
মূলত রাজউক, সিটি করপোরেশন ও পাউবোর মধ্যে যে পেশাদারি সমন্বয় থাকা উচিত ছিল, তা অনেকটাই অনুপস্থিত। এর সঙ্গে যুক্ত আছে বেসরকারি আবাসন কোম্পানিগুলো। এই বহু প্রতিষ্ঠানের সমন্বয়হীনতা এবং প্রত্যেকে নিজের দায়িত্ব এড়ানোর ফলে পুরো ব্যবস্থাটি আজ একটি চরম জগাখিচুড়িতে পরিণত হয়েছে।
কংক্রিটের কথা বললেন। কংক্রিট ব্যবহার নিয়ে তো একটি নির্দিষ্ট অনুপাত আছে বিধিমালায়। সেটি কেন মানা হচ্ছে না?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: এটি আমাদের একটি গভীর চেতনাগত ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা। আমাদের দেশে ‘পাকা করা’ মানেই উন্নয়ন। গত কয়েক দশকে শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত সব জায়গা ইটের গাঁথুনি বা টাইলস দিয়ে ঢেকে দেওয়ার এক আত্মঘাতী প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে। এমনকি পার্কের সৌন্দর্যবর্ধনের নামেও ঘাসের বদলে কংক্রিট বিছানো হচ্ছে। চেতনাগত ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি নিয়ে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
রাজউক যখন কোনো ভবনের নকশা অনুমোদন দেয়, তখন সেখানে নির্দিষ্ট পরিমাণ খোলা জায়গা বা উন্মুক্ত মাটি রাখার শর্ত থাকে। কিন্তু সেই শর্ত ঠিকমতো পালিত হচ্ছে কি না, তা দেখার লোক নেই। তদারকির পাশাপাশি আইন অমান্যকারীদের শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে এমন পরিস্থিতি হতো না। আধুনিক নগর-পরিকল্পনায় বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে পাঠানোর জন্য অনেক প্রযুক্তিগত সমাধান আছে, কিন্তু আমাদের নকশা প্রণয়নকারীরা এবং ভবনমালিকেরা সে বিষয়ে মোটেও সচেতন নন।
বৃষ্টির পানি ভূগর্ভে পাঠানোর কথা বললেন, ঢাকার ক্ষেত্রে এটি বাস্তবায়ন করা সম্ভব?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: অবশ্যই সম্ভব। ঢাকার প্রতিটি ভবনের ছাদ বা প্লট এখন একেকটি কংক্রিটের প্রতিবন্ধক। বৃষ্টির পানি সবচেয়ে বেশি জমা হয় ভবনের ছাদে। যদি নতুন ভবন অনুমোদনের সময় বৃষ্টির পানি সংগ্রহের জন্য নির্ধারিত আয়তনের ডিটেনশন ট্যাংক বা রিজার্ভার নির্মাণ বাধ্যতামূলক করা হয়, তবে পানিনিষ্কাশনের ব্যবস্থার ওপর অন্তত ৩০ শতাংশ চাপ কমানো সম্ভব।
জার্মানির বার্লিন শহরের উদাহরণ দেওয়া যায়। সেখানে কোনো ভবনমালিক যদি তাঁদের নিজস্ব প্লটের ভেতর ডিটেনশন ট্যাংকে বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে পারেন বা মাটির নিচে নির্মিত রিজার্ভারে পাঠিয়ে দিতে পারেন, তাঁদের ট্যাক্স বা কর কমিয়ে দেওয়া হয়। আর যাঁরা সব পানি সরাসরি ড্রেনে ছেড়ে দিয়ে ব্যবস্থার ওপর চাপ বাড়ান, তাঁদের অতিরিক্ত কর দিতে হয়।
আমরা যদি ভবনে সংরক্ষিত বৃষ্টির পানি শৌচাগার পরিষ্কার, ছাদবাগান, গাড়ি ধোয়া বা অন্যান্য গৃহস্থালিকাজে ব্যবহার করি, তবে ওয়াসার সরবরাহকৃত পানির ওপরও চাপ কমবে। ব্যবহার না করলেও রিজার্ভার থেকে সেই পানি ধীরে ধীরে ছাড়া হলে ড্রেনেজের ওপরেও চাপ কম পড়ে। এটি একটি দ্বিমুখী সমাধান। ঢাকা শহরের পটভূমিতে নতুন ভবনগুলোর ক্ষেত্রে এই নিয়ম এখনই কার্যকর করা প্রয়োজন।
ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা বা ড্যাপ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা আলোচনা-সমালোচনা আছে। এটা নিয়ে আপনার মতামত কী?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: ড্যাপ একটি দীর্ঘমেয়াদি এবং বৈজ্ঞানিক পরিকল্পনা। এতে ভূমি ব্যবহারের ধরন, জনঘনত্ব এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নের একটি পূর্ণাঙ্গ রূপরেখা দেওয়া আছে। বিশেষ করে এতে জলাশয় রক্ষা বা ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ এবং রিটেনশন এরিয়া তথা পানি ধরে রাখার জায়গাগুলোর গুরুত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এর মূল দুর্বলতা হলো বাস্তবায়নের অসামঞ্জস্য।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে রাজউকের আওতায় থাকা অনেক উন্নয়নকাজ ড্যাপের প্রস্তাব মেনে করা হয় না। আবার বড় বড় সরকারি প্রকল্প, যেমন এক্সপ্রেসওয়ে বা মেট্রোরেল নির্মাণের সময়ও অনেক ক্ষেত্রে ড্যাপের মাস্টারপ্ল্যান দেখা হয় না।
মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা বিভিন্ন দপ্তর নিজেদের মতো প্রকল্প নেয় এবং বাস্তবায়ন করে। পরিকল্পনার সঙ্গে বাস্তবায়নের এই যে বিপরীতমুখী যাত্রা, এটা ড্যাপের বড় ব্যর্থতা। তা ছাড়া ড্যাপ অনুমোদনের পর গত পাঁচ বছরে কতটুকু বাস্তবায়িত হলো, তার কোনো নিরপেক্ষ নিরীক্ষা বা অডিট হয় না। ড্যাপের পরিকল্পনা অনেকটা ফাইলেই সীমাবদ্ধ হয়ে আছে।
নতুন ভবনের উচ্চতা ও ফার (ফ্লোর এরিয়া রেশিও) নিয়ে স্থপতি, প্রকৌশলী ও আবাসন ব্যবসায়ীদের মধ্যে বড় ধরনের বিতর্ক দেখা যাচ্ছে। এ বিষয়ে কী বলবেন?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: এই বিতর্ক তৈরি হয়েছে মূলত কতিপয় আবাসন ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা থেকে। নগরের প্রতিটি এলাকার সক্ষমতা বা ধারণক্ষমতা সমান নয়। গুলশান বা মতিঝিলের রাস্তার প্রশস্ততা এবং নাগরিক সুযোগ-সুবিধার সঙ্গে বাড্ডা বা কামরাঙ্গীরচরের সুবিধা কোনোভাবেই তুলনীয় নয়। তাই পুরো শহরে সব প্লটে একই উচ্চতার ভবন নির্মাণের অনুমতি দেওয়া অবৈজ্ঞানিক ও আত্মঘাতী।
যে এলাকায় পর্যাপ্ত রাস্তা নেই, ড্রেনেজ–ব্যবস্থা দুর্বল এবং স্কুল-কলেজ বা খেলার মাঠ নেই, সেখানে যদি আমরা ২০তলা ভবনের অনুমতি দিই, তবে সেই এলাকার জনজীবন ধ্বংস হয়ে যাবে। আবাসন ব্যবসায়ীরা চান সর্বত্র উঁচু ভবন নির্মাণ করে মুনাফা লুটতে। ড্যাপে এলাকাভিত্তিক উচ্চতা নির্ধারণ করা হয়েছে বৈজ্ঞানিক তথ্য বিশ্লেষণ করে এবং প্রতিটি এলাকার ধারণক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে। এটি অত্যন্ত যৌক্তিক এবং এটি লঙ্ঘন করা মানে ঢাকাকে বসবাসের অনুপযোগিতার চরম শিখরে নিয়ে যাওয়া।
তবে ড্যাপের পরিকল্পনা যেহেতু পাঁচ বছর পরপর আপডেট করতে হয় এবং এই সময়ের মধ্যে কোনো এলাকায় বাস্তবায়িত অবকাঠামো মূল্যায়ন করে যদি ফার পরিবর্তনের যৌক্তিকতা তৈরি হয়, সেটা করা যেতে পারে।
ঢাকার অবশ্যই পরিবর্তন সম্ভব। এর জন্য বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব দরকার। কারণ, এটা বাস্তবায়ন করতে গেলে কিছু অজনপ্রিয় কাজ করতে হবে। প্রয়োজন হবে সংস্কারের। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থানের মাধ্যমে। এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে কিন্তু ঢাকা শহরের অবস্থাও পরিবর্তন করা সম্ভব। সময় লাগবে, রাতারাতি এটা হবে না। অসম্ভব বলে আমি মনে করি না।
শহরের বাইরে যেখানে পানি প্রবাহিত হয়ে নদীতে যাওয়ার কথা, সেখানেও তো অনেক অপরিকল্পিত স্থাপনা গড়ে উঠছে। সেখানকার ব্যবস্থাপনা কীভাবে হবে?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: এর জন্য আমাদের একটি সামগ্রিক স্পেশাল প্ল্যানিং ফ্রেমওয়ার্ক প্রয়োজন। নগরের পরিকল্পনা কেবল প্রশাসনিক সীমানায় আটকে থাকলে চলে না। বৃষ্টির পানি কোনো সীমানা চেনে না, সে তার নিজস্ব ঢাল বেয়ে নদীতে যেতে চায়। অনেক সময় সিটি করপোরেশনের বাইরে ইউনিয়ন পরিষদ থেকেও বড় ভবনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, যা ড্রেনেজ–ব্যবস্থা বা জলাশয় দখল করে নির্মিত।
জলাবদ্ধতা ও অপরিকল্পিত নগরায়ণ মোকাবিলায় দেশের প্রতিটি ইঞ্চি জমি যেন পরিকল্পনার আওতায় থাকে, তার জন্য তিন স্তরে জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত স্থানিক মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের কোনো বিকল্প নেই।
ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে ড্রেনেজ, সড়ক, খাল, জলাধার ও অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়ন—সবকিছুই এই পরিকল্পনার আলোকে পরিচালিত হতে হবে। আমাদের প্রস্তাব হলো ইউনিয়ন, উপজেলা এবং জেলা পর্যায়ে মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করার জন্য কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে হবে। গ্রামীণ বা আধা শহুরে এলাকাগুলোয় যেন জলাভূমি ভরাট করে অপরিকল্পিত সড়ক বা ভবন তৈরি না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন।
মেয়র, মন্ত্রী বা উপদেষ্টাদের ঘটা করে খাল উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়। এত উদ্ধার অভিযানের পরও কেন খালগুলো পুনরুদ্ধার হয় না?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: খাল উদ্ধারের ক্ষেত্রে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে ভুল আছে। অনেক সময় এসব অভিযান কেবল আইওয়াশ বা সস্তা জনপ্রিয়তা পাওয়ার জন্য করা হয়। খাল উদ্ধারের পর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো সেখানে পয়োবর্জ্য বা গৃহস্থালির আবর্জনা ফেলা বন্ধ করা। আমাদের শহরের পয়োবর্জ্য ব্যবস্থাপনার লাইনগুলো সরাসরি খালের সঙ্গে যুক্ত। ফলে খালের পানি এখন কুচকুচে কালো ও দুর্গন্ধে ভরা। একে আমরা ‘ব্লু নেটওয়ার্ক’ না বলে ‘ব্ল্যাক নেটওয়ার্ক’ বলতে পারি।
খালকে টেকসই করতে হলে একে জনসম্পৃক্ত করতে হবে। দক্ষিণ কোরিয়া বা অন্যান্য দেশে খাল উদ্ধারের পর তার দুই পাশে হাঁটার পথ, সবুজায়ন ও বিনোদনকেন্দ্র তৈরি করা হয়েছে। যখন একটি খাল জনসাধারণের ব্যবহারের জায়গায় পরিণত হয়, তখন সাধারণ মানুষই তার পাহারাদার হয়ে ওঠে। বেসরকারি খাতকে সম্পৃক্ত করে সেখানে পরিবেশবান্ধব ক্যাফে বা পর্যটনসুবিধা তৈরি করলে সেখান থেকে নিয়মিত আয়ও সম্ভব হবে, যা দিয়ে খালের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ মেটানো যাবে। সরকারি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে অংশীদারত্বমূলক মডেলে এটা করা যায়।
বারবার সমন্বয়হীনতার কথা আসছে। কিন্তু এই সমন্বয়টা কে করবে?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: প্রথম শর্ত হলো দূরদর্শী ও বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতৃত্ব। রাজনৈতিক স্বার্থে ঢাকাকে দুই সিটি করপোরেশনে ভাগ করা হলেও একটা শহরের পানিনিষ্কাশন, ক্যানেল সিস্টেম বা জলাবদ্ধতা সমস্যাকে কি দুই ভাগে ভাগ করা সম্ভব? পুরো ব্যবস্থাটি একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক। তাই প্রাতিষ্ঠানিক খণ্ডবিখণ্ড উপায়ে এই সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব নয়। আমাদের অগ্রাধিকার হতে হবে শহরের বাসযোগ্যতা রক্ষা করা, প্রকল্প বা পদপদবি দিয়ে রাজনৈতিক দলের নেতাদের পুনর্বাসন করা নয়।
দ্বিতীয়ত, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে ড্রোন বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করতে হবে। এর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন একটি ‘ইউনিফাইড ডেটাবেজ’ বা সমন্বিত তথ্যব্যবস্থা। ঢাকার পানি ও ড্রেনেজ–ব্যবস্থার সুনির্দিষ্ট এবং হালনাগাদ তথ্য একটি সিঙ্গেল ড্যাশবোর্ডে থাকবে, যা রাজউক, সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ওয়াসা কিংবা বিএডিসির মতো সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠান শেয়ার করবে।
প্রতিটি প্রতিষ্ঠান তাদের কাজ ও টেন্ডারের তথ্য নিয়মিত এই ডাইনামিক সিস্টেমে আপলোড করবে। এর ফলে পুরো ব্যবস্থার ওপর সার্বক্ষণিক নজরদারি বজায় থাকবে। কোন কাজের জন্য কত বরাদ্দ লাগবে, তা-ও এই ডেটাবেজের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই নির্ধারিত হবে। এই একটি ডিজিটাল সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে কোনো নতুন প্রতিষ্ঠান তৈরি না করেও বর্তমান কাঠামোর মধ্য থেকেই ঢাকার বেশির ভাগ সংকটের সমাধান করা সম্ভব।
ঢাকার বাসযোগ্যতা বাড়াতে হলে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে কোন পদক্ষেপগুলো নেওয়া উচিত বলে মনে করেন?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: প্রথমত, ড্যাপে প্রস্তাবিত পাঁচটি রিটেনশন এরিয়া দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। এগুলোকে শুধু জলাধার নয়, হাতিরঝিলের মতো বহুমুখী জনপরিসর হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
এসব জনপরিসরের চারপাশে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে উন্নত মানের আবাসন ও বাণিজ্যিক উন্নয়ন করা যায়, এতে জমির মূল্যবৃদ্ধি থেকে প্রাপ্ত আয়ের (ল্যান্ড ভ্যালু ক্যাপচার) মাধ্যমে প্রকল্পের অর্থায়নের একটি বড় অংশ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। ফলে সরকারের সীমিত বিনিয়োগেই এ ধরনের প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যাবে।
দ্বিতীয়ত, ভূমি ব্যবহার ও যাতায়াতব্যবস্থার সমন্বিত পরিকল্পনা নিশ্চিত করতে হবে। অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের অতিরিক্ত ঢাকাকেন্দ্রিকতা কমিয়ে অর্থনৈতিক বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে।
২০৫০ সালে বাংলাদেশের জনসংখ্যা প্রায় ২৫ কোটিতে পৌঁছালে সবাই যেন ঢাকামুখী না হয়, সে জন্য এখনই আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধি কেন্দ্রগুলোয় কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও উন্নত নগরায়ণ নিশ্চিত করতে হবে। বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া ঢাকার ওপর চাপ কমানো সম্ভব নয়।
ঢাকার জনসংখ্যা যেভাবে দিন দিন বাড়ছে, এত কিছুর পরও এর বাসযোগ্যতা ধরে রাখা সম্ভব কি না?
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: টোকিওর জনসংখ্যা তো ঢাকার চেয়ে বেশি। একসময় টোকিওর পরিস্থিতিও ঢাকার মতোই করুণ ছিল। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স থার্ড ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে টোকিও মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট অথরিটির একটা টিম এসেছিল। তারা প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে দেখিয়েছিল, ধারাবাহিকভাবে টোকিও কীভাবে আজকের অবস্থানে এল। ওরা পারল, আমরা পারলাম না কেন?
প্রশ্ন তো এই জায়গাটাতেই। অবশ্যই পরিবর্তন সম্ভব। এর জন্য বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী নেতৃত্ব দরকার। কারণ, এটা বাস্তবায়ন করতে গেলে কিছু অজনপ্রিয় কাজ করতে হবে। প্রয়োজন হবে সংস্কারের। প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে আধুনিক প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন কর্মকর্তা ও পেশাজীবীদের সমন্বয় এবং প্রয়োজনীয় আর্থিক সংস্থানের মাধ্যমে।
এ বিষয়গুলো নিশ্চিত করতে পারলে কিন্তু ঢাকা শহরের অবস্থাও পরিবর্তন করা সম্ভব। সময় লাগবে, রাতারাতি এটা হবে না। অসম্ভব বলে আমি মনে করি না।
আপনাকে ধন্যবাদ।
শেখ মুহম্মদ মেহেদী আহসান: আপনাকেও ধন্যবাদ।