একজন রাজনৈতিক নেতার সাক্ষাৎকার প্রকাশ করা হলো। তিনি বলেছেন নাম প্রকাশ করলে তিনি ভেজাল কথা বলবেন এবং নাম প্রকাশ না করলে খাঁটি কথা বলবেন। আমরা খাঁটি কথাগুলো শুনতে চেয়েছিলাম, তাই তাঁর আসল নাম প্রকাশ করা গেল না। তবে তিনি ‘নেয়ামত তালেব’ নামটা ব্যবহার করার অনুমতি দিয়েছেন। আমরা মাঝে মাঝে বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক বিষয়ে নেয়ামত সাহেবের সঙ্গে কথা বলব।
প্রশ্ন: আপনি রাজনীতিতে কেন এসেছেন দয়া করে একটু বলবেন কি?
নেতা: উত্তরটা আমার একদম মুখস্থ—জনগণ ও দেশের সেবা করার জন্য রাজনীতিতে এসেছি।
প্রশ্ন: জনগণের মধ্যে কি আপনি ও আপনার পরিবারও আছেন?
নেতা: হ্যাঁ, আমরাও সেবা ভোক্তাদের দলে।
প্রশ্ন: দেশসেবা করতে হলে অন্য কত কাজ আছে। রাজনীতি কেন?
নেতা: রাজনীতি না করলে বড়ভাবে দেশসেবা করা খুব কঠিন। দেশের কাজ করার জন্য যেসব উপকরণ দরকার, ক্ষমতায় না গেলে আপনি তা কোথায় পাবেন?
প্রশ্ন: সেই উপকরণগুলো কী?
নেতা: স্কুল বানাতে কী লাগে? হাসপাতাল বানাতে কী লাগে? জনসেবা করার জন্য যে টাকাকড়ি ও ক্ষমতা দরকার, সেটা শুধু রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীনদের হাতের নাগালে থাকে।
প্রশ্ন: কত লোকেই তো আজকাল চাঁদা তুলে দেশসেবা করেন। আপনি সেই বিকল্প পথে দেশসেবা করার কথা ভেবেছেন কখনো?
নেতা: রাজনীতিবিদদের কিছু কিছু চাঁদা সব সময়েই তুলতে হয়। চাঁদা তোলাটা আগে আরেকটু সম্মানের ছিল।
প্রশ্ন: এখন কেমন?
নেতা: আপনি যদি পত্রিকা খোলেন দেখবেন, চাঁদা তোলার কত যে বিড়ম্বনা! এইতো কিছুদিন আগে একজন ভদ্রলোক একটা কলেজে চাঁদা চাইতে গিয়ে এক মহিলার হাতে চড় খেলেন।
প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়ে আপনি কিছুদিন শিক্ষকতা করেছেন, সেটা ছেড়ে দিলেন কেন? শিক্ষকতাও তো একটা দেশসেবা।
নেতা: শিক্ষকতা করতেও দল করা লাগে—সাদা দল বা নীল দল। তা ছাড়া আপনাকে তো বলেছি আমার ইচ্ছা বড় লেভেলে দেশসেবা করা।
প্রশ্ন: তাহলে আপনি চাচ্ছেন বড়ভাবে দেশসেবা করতে?
নেতা: আপনি ঠিকই বলেছেন। চেষ্টা করছি, বড় কিছু করার। তবে দারুণ কম্পিটিশন।
প্রশ্ন: দেশসেবায় কম্পিটিশন হবে কেন?
নেতা: বলছিলাম, মন্ত্রী–মিনিস্টার হয়ে দেশসেবার কথা। অনেক কম্পিটিশন।
প্রশ্ন: মন্ত্রী–মিনিস্টার হওয়ার ক্রাইটেরিয়া কী?
নেতা: সেটা প্রতিবারই বদলায়। আগে জানলে বড় দলে না ভিড়ে, একটা ছোট দল করে বড় দলের পেছনে লেগে থাকতাম। দেখছেন না প্রত্যেক ছোট দল থেকে একজন মন্ত্রী হয়েছেন।
প্রশ্ন: আপনার কী মনে হয়, আমাদের দেশটা গণতান্ত্রিকভাবে চলছে?
নেতা: সেটার বিভিন্ন উত্তর আছে। সরকারে যাঁরা, তাঁরা বলবেন যেহেতু তাঁরা জনগণের ভোট পেয়েছেন, তাঁরা গণতন্ত্রের পরীক্ষা পাস করে ফেলেছেন। গণতন্ত্রে তাঁদের আর পরীক্ষা দেওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার যাঁরা বিরোধী দলে, তাঁরা চেষ্টা করছেন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে। গণতন্ত্রটা তাঁদেরই বেশি প্রয়োজন।
প্রশ্ন: অনেকে বলেন মন্ত্রী হওয়া খুব কঠিন ব্যাপার নয়, আপনার এত কঠিন মনে হয় কেন?
নেতা: আপনি যদি বিষয়টা এত সহজ মনে করেন, তাহলে অবশ্যই আপনি রাজনীতির রা-ও বোঝেন না। আগেই বলেছি, ব্যাপারটা এত সহজ নয়। একজন রাজনীতিবিদকে অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে এমপি বা মন্ত্রী-মিনিস্টার হতে হয়।
প্রশ্ন: স্বাভাবিকভাবে প্রশ্ন আসবে, সেই ‘কাঠখড়’টা কী?
নেতা: সেটারও নানা উত্তর আছে। এমপি হতে একধরনের ‘কাঠখড়’ লাগে, মন্ত্রী হতে আরেক রকম। এত বছর রাজনীতি করেও আমি এখনো চেষ্টা করছি বিষয়গুলো বুঝতে, আপনাকে কীভাবে বোঝাব?
প্রশ্ন: বাংলাদেশের রাজনীতিবিদেরা একবার ক্ষমতায় গেলে ক্ষমতা ছাড়তে চান না। কারণটা আপনার কী মনে হয়?
নেতা: পাঁচ বছর দেশসেবার চেয়েও পঁচিশ বছর দেশসেবা করা কি আরও উত্তম নয়?
প্রশ্ন: আপনার কথাটায় যুক্তি আছে, পাঁচ বছরের চেয়েও পঁচিশ বছর দেশসেবা অবশ্যই উত্তম। তবে গদিনশিনেরা যদি এতটা বছর দেশসেবা করেন, তাহলে বিরোধীরা করবেন কখন?
নেতা: সেটাতো আমাদের জানার কথা নয়। আলী রীয়াজ সাহেব জুলাই সনদের কোথাও নিশ্চয় লিখে গেছেন।
প্রশ্ন: এইবার একটা সেনসিটিভ প্রশ্ন। মব নিয়ে আপনার ধারণা কী?
নেতা: আমি মাঝে মাঝে ভাবি, মব শিল্পটা আমাদের দেশে এতটা বছর কীভাবে অনাবিষ্কৃত ছিল! মাজার-দরবার বাংলাদেশে চিরকালই ছিল, বাউলগানের চর্চা বাংলার আলো-বাতাসের মতোই পুরোনো, ৩২ নম্বর বাড়ি শেখ মুজিব বানিয়েছিলেন ৬৫ বছর আগে; কিন্তু বাংলাদেশে মব আসতে একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দরকার হলো কেন? মব নিয়ে আমি খুব ক্ষুব্ধ।
প্রশ্ন: ক্ষমতায় গেলে সবাই মবের পক্ষে সাফাই গান, আপনারও কি তাই মনে হয়?
নেতা: আপনি ঠিকই বলেছেন। যেহেতু বাংলাদেশে পুলিশ ফোর্স অকেজো হয়ে গেছে, তাই ক্ষমতাসীনেরা সময়ে সময়ে মবকে কাজে লাগান। হিসাব করে দেখুন, গত ২২ মাসে যেসব ‘ডেভিলরা’ জেলে গেছেন, তাঁদের কয়জনকে পুলিশ ধরেছে আর কয়জনকে মব দিয়ে ধরিয়েছে?
পৃথিবীর আদিকাল থেকেই এসব চলে আসছে, সম্ভবত যখন ব্যাংক ছিল না তখন থেকেই। আপনি নিশ্চয় রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ পড়েছেন। ‘বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়’—কে চোর, কে সাধু এটা নির্ণয় করতে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো হিমশিম খাচ্ছে। কাল যাঁরা ছিলেন সাধু, আজ তাঁরা চোর।
প্রশ্ন: মব কি এখন আমাদের সমাজে স্বাভাবিক হয়ে গেছে?
নেতা: আমি বলব, এখন অনেকটা সয়ে গেছে। আপনি হয়তো দেখেছেন, ক্ষমতা থেকে বের হয়ে উপদেষ্টারা ‘প্রথম আলো’র পোড়ানো বিল্ডিংটার সামনে গিয়ে হাসিমুখে ছবি তুলেছেন। কেউ কেউ মবটা বন্ধ করতে পারেননি বলে সামান্য দুঃখও প্রকাশ করেছেন। কিন্তু কেন পারেননি, কোথায় বাধা ছিল—এই প্রশ্নটা আজ পর্যন্ত তাঁদের কেউ জিজ্ঞেস করল না। যেন সেটাই স্বাভাবিক ছিল!
প্রশ্ন: আপনিতো একসময় অর্থনীতির অধ্যাপক ছিলেন। দেশের অর্থনীতি কেমন দেখছেন?
নেতা: অর্থনীতির সংখ্যাগুলো এখন আমি আর ঘাঁটাঘাঁটি করি না। তবে ধনীদের দিকে তাকালে মনে হয় অর্থনীতি ভালো। গরিবেরা সব সময়ই একটু কষ্টতেই থাকেন।
প্রশ্ন: এই যে ব্যাংকগুলো লুট হয়েছে, প্রভাবশালীরা ঋণ নিয়ে টাকা দিচ্ছেন না, একের পর এক পুনঃতফসিল করছেন। এইগুলো সব তো সাধারণ মানুষের টাকা।
নেতা: পৃথিবীর আদিকাল থেকেই এসব চলে আসছে, সম্ভবত যখন ব্যাংক ছিল না তখন থেকেই। আপনি নিশ্চয় রবীন্দ্রনাথের ‘দুই বিঘা জমি’ পড়েছেন। ‘বেটা সাধুবেশে পাকা চোর অতিশয়’—কে চোর, কে সাধু এটা নির্ণয় করতে আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রগুলো হিমশিম খাচ্ছে। কাল যাঁরা ছিলেন সাধু, আজ তাঁরা চোর।
প্রশ্ন: তাহলে আপনি এগুলোকে স্বাভাবিক মনে করেন?
নেতা: স্বাভাবিক বলব না, বলব রাষ্ট্রের প্রয়োজনে এসব দেখা দিয়েছে। দেশ চালাতে ইন্ডাস্ট্রি দরকার, ইন্ডাস্ট্রি করতে বড়লোক দরকার। আর একজনকে বড়লোক বানাতে হলে অনেককে গরিব হতে হবে। কার্ল মার্ক্স সাহেব চেষ্টা করেছিলেন সবাইকে সমান বানাতে, সেই চেষ্টাও ফেল হয়ে গেছে।
প্রশ্ন: এস আলম বড়লোক হয়ে দেশের কোন লাভ হলো?
নেতা: আমাদের হয়নি, ব্রিটেনের তো হয়েছে। সেখানে তিনি অসংখ্য বাড়ি কিনেছেন। শুনেছি একজন বাঙালি ট্যুর অপারেটর পর্যটকদের বাড়িগুলো দেখাবার জন্য লন্ডনে ট্যুর সার্ভিস খুলেছেন।
প্রশ্ন: আমাদের দেশে যাঁরা ঋণখেলাপি তাঁরা কেউ ইন্ডাস্ট্রির মালিক, আবার কেউ রাজনৈতিক নেতা। আপনি কি বলবেন সরকারি প্রশ্রয়ে এসব হচ্ছে?
নেতা: আমি শুধু বলব, এরা সবাই জনগণকে ‘সেবা’ দিচ্ছেন, তাই সরকার কিছুটা সহনশীল।
মার্কিনদের একজন খুব মজার প্রেসিডেন্ট ছিলেন, প্রেসিডেন্ট রিগ্যান। তাঁর অর্থনৈতিক পলিসি ছিল—‘ট্রিকল ডাউন ইকোনমি’; আমাদের দেশে আমরা বলি ‘তেলা মাথায় তেল দেওয়া’—বড়লোকদের মাথায় বেশি তেল দিলে গরিবদের মাথায়ও একটু গড়িয়ে বা ছিটিয়ে পড়বে।
প্রশ্নকর্তা: ভেরি ইন্টারেস্টিং! নেয়ামত সাহেব, আপনাকে অনেক ধন্যবাদ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা বলার জন্য।
নেতা: আপনাকেও ধন্যবাদ।
সালেহ উদ্দিন আহমদ শিক্ষক, লেখক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
ই-মেইল: [email protected]
