বছর বছর ঢাকার মানুষ কি এভাবেই পুড়ে মরতে থাকবে?
জালাল আহমেদ: আমরা সাম্প্রতিক কালে দুই ধরনের ভবনেই অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটতে দেখছি। এর আগে নিমতলীতে, চুড়িহাট্টায় আগুনের উৎস এমন ভবন থেকে হয়েছে, যেগুলো স্থপতি ও প্রকৌশলীর নকশা অনুযায়ী এবং রাজউকের অনুমোদন অনুযায়ী নির্মিত হয়নি। আর বেইলি রোডের এই ভবনসহ বনানীর এফ আর টাওয়ার কিংবা গুলশানে মানারাত স্কুলের উল্টো পাশের যে আবাসিক ভবন, সেই ভবনগুলো রাজউকের অনুমোদন নিয়ে নির্মিত ছিল। তা–ও আগুন লাগল এবং মানুষ মারা গেল। দেখা যাচ্ছে, স্থপতি-প্রকৌশলী নকশা অনুযায়ী এবং রাজউক অনুমোদিত ব্যবহার অনুযায়ী ভবন তৈরির পর অনেক মালিকই ইচ্ছেমতো ব্যবহার পরিবর্তন করছেন, নিয়মকানুনের ধার ধারছেন না।
একটু বুঝিয়ে বলবেন?
জালাল আহমেদ: ধরেন একজন স্থপতি ফায়ার ডোর, ফায়ার স্টেয়ার, স্প্রিংকলারসহ অগ্নিনিরাপত্তা নিশ্চিতে যা যা দরকার, সেগুলোর কথা মাথায় রেখে নকশা করেন। তড়িৎ প্রকৌশলীরা ভবনের বৈদ্যুতিক নিরাপত্তা ও যন্ত্র প্রকৌশলী অগ্নিনিরাপত্তা কেমন হবে, সে অনুযায়ী নকশা প্রণয়ন করেন। তাঁরা যথাযথভাবে কাজ শেষ করার পর মালিকেরা কি করছেন, সেটা এখন বড় প্রশ্ন। বনানীর এফ আর টাওয়ারে ফায়ার স্টেয়ার বা বিকল্প সিঁড়ি ফাঁকা ছিল না। ফলে আগুন লাগার পর মানুষ ওই সিঁড়ি দিয়ে নামতে পারেননি। বেইলি রোডের ওই ভবনের সিঁড়িতে অসংখ্য গ্যাসের সিলিন্ডার ছিল। ওখানে সিলিন্ডার রাখার কথা নয়। আগুন লাগার মোক্ষম পরিস্থিতি তৈরি হয়েই ছিল।
এই যে নিয়ম মানা হয়নি, এসব দেখার দায়িত্ব কাদের?
জালাল আহমেদ: ভবনের নিরাপত্তা নিশ্চিতে অনেকগুলো পক্ষ থাকে। একজন ব্যক্তি যখন ঢাকা শহরে কোনো ভবন তৈরি করতে যান, তখন রাজউক ঠিক করে দেয় ওই ভবন আবাসিক হবে নাকি বাণিজ্যিক, তার উচ্চতা, ফ্লোর স্পেস কতটুকু হবে। কত জায়গা ছাড়তে হবে। সব শর্ত মেনে ভবন তৈরির পর রাজউক অকুপেন্সি সার্টিফিকেট দেয়, অর্থাৎ ভবনটি ব্যবহারোপযোগী কি না জানায়। এই অকুপেন্সি সার্টিফিকেট পাঁচ বছর পরপর নবায়ন করার কথা। তার আগে নিয়ম অনুযায়ী রাজউকের ভবন পরিদর্শন করার কথা। সেই কাজ ঠিকমতো হয় না। ভবনের মালিক, ব্যবহারকারীরাও বেপরোয়া। ভবনের নিরাপত্তার ব্যাপারে তাদের খুব এটা ভ্রুক্ষেপ নেই।
আমরা যে দেশগুলোকে উন্নত দেশ বলি, সেসব দেশে তো বটেই, আমাদের কাছে–পিঠের দেশগুলোতেও পরিদর্শনের কাজটা ঠিকঠাকমতো হয়। যেমন সিঙ্গাপুর। কানাডার টরন্টোর কথা বলি। ওখানকার ভবন পরিদর্শকেরা নিয়মকানুনের ব্যাপারে খুবই কঠোর। ওরা যে শুধু টেকনিক্যাল বিষয়ে লেখাপড়া করে তা-ই নয়, বরং তাদের নীতিনৈতিকতার প্রশিক্ষণও দেওয়া হয়। আমাদের দেশের অনেক ছেলেমেয়েও সেখানে পরিদর্শক হিসেবে কাজ করেন। কোথাও যদি নির্মাণ পরিদর্শকের গাফিলতি প্রমাণিত হয়, সঙ্গে সঙ্গে তাঁদের লাইসেন্স কেড়ে নেওয়া হয়। আমাদের দেশে কেন এটা সম্ভব হচ্ছে না? কারণ, পুরো ব্যবস্থাতেই গলদ।
আমরা যদি আবার একটু বেইলি রোডের অগ্নিদুর্ঘটনায় ফিরি। প্রতিবার আগুন লাগা বা ভবন ধসে পড়ার পর রাজউক জানায় যে ভবনের অনুমতি ছিল না। এটা আগে কেন বলা হচ্ছে না?
জালাল আহমেদ: দেশে বিল্ডিং কনস্ট্রাকশন অ্যাক্ট আছে এবং এই আইনে জেল-জরিমানার বিধান আছে। আইন প্রয়োগ করে রাজউক ভবনমালিকদের জবাবদিহি করতে পারে। কিন্তু সেটা তারা বেশির ভাগ সময়ই করে না। রাজউক একটা অথর্ব প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানের নাম উচ্চারণ করাটাও একটা যন্ত্রণার বিষয়। ভবন পরিদর্শনের জন্য রাজউকের কি পর্যাপ্ত দক্ষ প্রকৌশলী, অগ্নিদুর্ঘটনার বিষয়ে জানাবোঝা লোকজন আছে? আমরা বহু বছর ধরে বলার চেষ্টা করছি রাজউকের আমূল পরিবর্তন দরকার। কিন্তু পরিবর্তন হচ্ছে না। এই পরিবর্তন তো সরকারকে করতে হবে। অংশীজনদের সঙ্গে কথা বলে রাজউক পুনর্গঠন করা এখন খুবই প্রয়োজন।
আরও যে কথাটা আমার মনে হয়েছে, তা হলো রাজউক নাহয় নিয়মিত পরিদর্শন করে না। ঢাকায় যে সিটি করপোরেশন আছে, তারা কি করে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই না করে রেস্তোরাঁগুলোকে ট্রেড লাইসেন্স দিল?
আমাদের আসলে পুরো ব্যবস্থায় গলদ আর অনিয়ম। বাংলাদেশে ইমারত নির্মাণ বিধিমালা আছে। এর বাইরে ইন্টারন্যাশনাল কোড কাউন্সিল আছে। বিশ্বের বহু দেশ এই ইন্টারন্যাশনাল কোড কাউন্সিলের পরামর্শ সরাসরি গ্রহণ করে। কারণ, তারা নিয়মিত ভবন নির্মাণ ও নিরাপত্তা নিশ্চিতের নিয়মকানুনগুলো হালনাগাদ করে। আমাদের দেশে কী হলো দেখুন। বিএনবিসি কোড হলো ২০১৩ সালে, সেটা গ্রহণ করা হলো ২০২১ সালে। এর মধ্যে চলে গেল আট বছর, অনেক কিছু তত দিনে বদলে গেছে। আমি মনে করি, ইন্টারন্যাশনাল কোড কাউন্সিলকে দিয়ে আমাদের ভবনগুলোর একটা মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
অনেকেই রেস্তোরাঁর ইন্টেরিয়র ডিজাইনের কথা বলছেন। তাঁরা বলছেন, দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে ইন্টেরিয়র করায় আগুনের ঝুঁকি বাড়ছে।
জালাল আহমেদ: এটাও একটি ইস্যু। তবে একমাত্র ইস্যু নয়। আমি বরং বলব আগে গোড়ায় হাত দিন। জবাবদিহি নিশ্চিত করুন। ভবনগুলোয় কি ঠিকঠাক ফায়ার ড্রিল হচ্ছে? ড্রিল হলে ফায়ার স্টেয়ারগুলোর তো এমন দশা হওয়ার কথা নয়। ফায়ার এক্সটিঙ্গুইশার বা যে অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্রগুলো আছে, সেগুলো নিয়মিত পরীক্ষা করতে হয়। দুই বছর পরপর এই নির্বাপণ যন্ত্রগুলো নবায়ন করার কথা। সেটা তো হচ্ছে না। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, জাপান গার্ডেন সিটিতে আগুন লাগার পর বিপন্ন মানুষ যখন ছাদে উঠেছে, তখন দেখেছে ছাদের দরজা বন্ধ। যদি ভবনগুলোয় পরিদর্শন হতো, তাহলে এমন হওয়ার কথা নয়।
মানুষ তো অসহায়। তাদের কী করার আছে এখন?
জালাল আহমেদ: মানুষ কী করবে? ঢাকা শহরে খেলার মাঠ, পার্ক কটা আছে? যে কটা আছে, সেটাও দখলের পথে। মানুষ যাবেটা কোথায়? তাদের যাওয়ার জায়গা বলতে তো রেস্তোরাঁই। এগুলো নিরাপদ করতেই হবে। আপনি সাতমসজিদ রোড বা বনানী ১১ নম্বরে যান। এত রেস্তোরাঁ। এগুলোর কী অবস্থা দেখা দরকার। আসলে নগর–পরিকল্পনায় গলতি থেকে গেল। ধানমন্ডি ও গুলশানের দ্বিতল ভবনগুলোয় বাণিজ্যিক ভবন হয়ে গেছে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক ভবনের জন্য এলাকা নির্দিষ্ট থাকার কথা। সেটা এখন নেই বললেই চলে। ঢাকা শহরে জায়গার অপ্রচুলতার কারণে নতুন বসতবাড়ি, আবাসিক বা বাণিজ্যিক ভবনকে জায়গা দেওয়ার মতো অবস্থা নেই। তবে আমি ওই কথাই বলব, আমাদের নগর ব্যবস্থাপনায় গলদ থেকে যাচ্ছে। এই ভুল থেকে বেরিয়ে আসতে হবে।
প্রথম আলো: আপনাকে ধন্যবাদ।
জালাল আহমেদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।