চব্বিশের গণ–অভ্যুত্থান একটি বৈষম্যহীন, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশ গড়ার সম্ভাবনা তৈরি করে দিয়েছে। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী যে ২৬ দফার ইশতেহার দিয়েছে, সেখানে এর প্রতিফলন কতটা ঘটেছে?
ওয়ারেসুল করিম: এটা হয়তো অপ্রথাগত মনে হতে পারে; কিন্তু বাস্তবতা হলো এবারের ইশতেহারের বৈষম্যের প্রশ্নে জামায়াত তার ঐতিহ্যগত অবস্থান থেকে অনেকটাই সরে এসেছে। এটা বলছি এ কারণে যে জামায়াতসহ ইসলামপন্থী দলগুলো ঐতিহ্যগতভাবেই নারী–পুরুষের সমতাসহ বৈষম্যের প্রশ্নে সংবেদনশীল ছিল না।
উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইশতেহারে জামায়াত নারী ও বেকারদের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দিয়েছে। সেখানে প্রথম শ্রেণি থেকে স্নাতক পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা অবৈতনিক করার প্রস্তাব রয়েছে। মেয়েদের তিনটি কলেজ নিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় বিশ্ববিদ্যালয় করার প্রস্তাব দিয়েছে। মাতৃত্বকালীন সময়ে বিনা মূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। পাশাপাশি ৬০ বছরের ঊর্ধ্বে বয়স্ক নাগরিক এবং ৫ বছরের নিচে শিশুদের জন্য বিনা মূল্যে স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে। বেকারত্ব কমাতে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামো পুনর্বিন্যাসের প্রস্তাব দিয়েছে। পুরোনো বিশ্ববিদ্যালয় কলেজগুলোকে স্বতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের কথা বলা হয়েছে। এতে তুলনামূলক কম বিনিয়োগে ল্যাব, লাইব্রেরি ও অবকাঠামো উন্নত করে শিক্ষার মান বাড়ানো সম্ভব হবে। এটা ঢাকার সঙ্গে দেশের অন্য এলাকাগুলোর শিক্ষাগত বৈষম্য কমাতে সহায়ক হবে।
জামায়াত তার ইশতেহারে ২০৪০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ২ ট্রিলিয়ন অর্থনীতির দেশে রূপান্তর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তবসম্মত?
ওয়ারেসুল করিম: এখানে জামায়াতের হিসাবে কিছুটা অসংগতি রয়েছে। একদিকে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ২০৪০ সালের মধ্যে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য ধরা হয়েছে। বাস্তবে ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে ১০ বছরে অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ হয় না। চার গুণ হতে অন্তত ২০–২৫ বছর সময় লেগে যায়। বাংলাদেশের বাস্তবতায় ধারাবাহিকভাবে প্রবৃদ্ধি ৭–৮ শতাংশ অর্জন করাটা কঠিন। বাস্তবতা হলো, ২০৫০ সালের আগে বাংলাদেশের পক্ষে ২ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছানো কঠিন।
ইশতেহারে ২০৩০ সালের মধ্যে ১৫ বিলিয়ন ডলারের এফডিআর আনার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা ও অনিশ্চয়তা মিলিয়ে আমরা দেখছি, দেশি বিনিয়োগকারীরাই তাঁদের পকেটের টাকা বিনিয়োগ করতে চাইছেন না। বাংলাদেশের বিভাজিত রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই পরিস্থিতির উন্নতি হবে তার নিশ্চয়তা কী?
ওয়ারেসুল করিম: আমার কাছে মনে হয়েছে এটা অতি উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রত্যাশা। বিনিয়োগ তখনই আসে, যখন একটা শর্ত তৈরি হয়। বিনিয়োগ আসার জন্য প্রথমেই দরকার নিরাপত্তা। এটা শুধু বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তা নয়, তাঁদের পুঁজির নিরাপত্তা। তাঁরা চান তাঁদের বিনিয়োগটা যেন পানিতে না পড়ে। তবে ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী করপোরেট ট্যাক্স যদি ১৯ শতাংশ ও ভ্যাট যদি ১০ শতাংশে নামিয়ে আনা যায়, তাহলে বিদেশি বড় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে আগ্রহী হতে পারে। কেননা আশপাশের দেশগুলোর কোথাও এত কম ট্যাক্স নেই।
তবে বিনিয়োগ বাড়াতে গেলে নিরাপত্তার পাশাপাশি রাজনৈতিক বিভাজন ও অস্থিরতা কমিয়ে আনা জরুরি। দূষণমুক্ত বাতাস আর দূষণমুক্ত পানি নিশ্চিত না করা গেলে বিনিয়োগ আসার কোনো আশা নেই। কেননা এমন দূষিত পরিবেশে বিনিয়োগ তো দূরে থাক, বেড়াতেও কেউ আসবে না। তবে মনে রাখা দরকার, জামায়াতের প্রস্তাবগুলোকে প্যাকেজ প্রস্তাব আকারে দেখতে হবে। তারা দুর্নীতিমুক্ত সরকারের কথা বলছে, সেখানে প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলা হয়েছে।
বাংলাদেশের কর-জিডিপি দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বনিম্ন। শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ এবং স্বাস্থ্যে বর্তমান বাজেটের তিন গুণ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, এত টাকা কোথা থেকে আসবে? তাহলে কি আগের সরকারগুলো মতোই টাকা ছাপিয়ে আর ভ্যাটের মতো পরোক্ষ করের বোঝা বাড়ানো হবে?
ওয়ারেসুল করিম: ইশতেহারে কর কমিয়ে খরচ বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। কোনো অর্থনীতিবিদই এটাতে একমত হবেন না। তবে ইশতেহারের মূল প্যারাডক্সটা হলো এখানে কর কমানো, সুদহার কমানো, মূল্যস্ফীতি কমানো, দুর্নীতি কমানোর সঙ্গে উচ্চ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হয়েছে। কর, সুদহার, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি কমলে কস্ট অব ডুয়িং বিজনেস কমে যাবে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমলে মানুষের হাতে উদ্বৃত্ত টাকা থাকবে। ফলে দেশে ব্যাপক হারে কনসামশন (ভোগ) বাড়বে। করহার কমলেও ভ্যাট থেকে রাজস্ব আয় বাড়বে। জামায়াত বলেছে, করহার কমলেও করের আওতা বাড়বে। জামায়াতের ইশতেহারে ‘স্মার্ট সোশ্যাল সিকিউরিটি কার্ড’ প্রবর্তনের কথা বলেছে। সেটা হলে এনআইডি কার্ড টিন নম্বর হিসেবে বিবেচিত হবে। ফলে রাতারাতি করের জালে আসা নাগরিকের সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। জামায়াতের ইশতেহারে করমুক্ত আয়সীমা ৫ লাখ টাকা করার প্রস্তাব করায় নিম্ন আয়ের মানুষের ওপর চাপটা কম পড়বে।
এ ছাড়া কর ফাঁকির লুপহোলগুলো বন্ধ করা গেলে কিন্তু সরকারের রাজস্ব আয় অনেক বেড়ে যাবে। সিপিডির একটা গবেষণায় দেখা গেছে, কর ব্যবস্থাপনা ও কর ফাঁকির কারণে বছরে প্রায় ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারায়। যদি রাজস্ব খাতে ব্যাপক প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার করা যায়, নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি এড়িয়ে মেধাতন্ত্রের নীতি প্রতিষ্ঠা করা যায়, তবে এটা অসম্ভব কিছু নয়।
প্রশ্ন উঠেছে, যেখানে জামায়াতের প্রতিষ্ঠানগুলো রয়েছে, সেখানে দলীয় মতাদর্শের লোকদের বাইরে অন্য কাউকেই জায়গা দেওয়া হয় না, সেখানে ক্ষমতায় গেলে অন্য রাজনৈতিক মতাদর্শ কিংবা ধর্ম ও লিঙ্গের মানুষেরা চাকরি, ব্যবসার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হবে না, সেই নিশ্চয়তা কী?
ওয়ারেসুল করিম: আপনার এই সংশয়টা অবান্তর নয়, কেননা জামায়াত মতাদর্শিক রাজনীতি করে। শুধু জামায়াত নয়, সরকার পরিচালনায় যারাই আসুক, কাউকে তাদের ইচ্ছার ওপর ছেড়ে দেওয়া যাবে না। এখানে কোনো প্রতিষ্ঠানে নিয়োগের ক্ষেত্রে, কোনো রাজনৈতিক দল যে তাদের লোকটা দেবে, সেটাকে কঠিন করে তুলতে হবে। আমার মতে, স্বাধীনতা রক্ষা করতে হলে নাগরিকদের নিরবচ্ছিন্ন নজরদারি করে যেতে হবে।
ইশতেহারে নারীদের জন্য নিরাপদ, মর্যাদাপূর্ণ ও অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠন করার কথা বলা হয়েছে। অথচ জাতীয় নির্বাচনে একজন নারীকেও প্রার্থী করেনি জামায়াত এবং দলটির আমির বলেছেন, দলের নেতৃত্বে নারী আসতে পারবেন না। এখানে অংশগ্রহণমূলক রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারটি কি শুধু কথার কথা?
ওয়ারেসুল করিম: ইসলামে নারী নেতৃত্ব নেই বা সংগঠন পর্যায়ে নারীরা নেতৃত্ব দিতে পারবেন না, এ ব্যাপারে কোনো স্কলারলি এভিডেন্স নেই। আমি মনে করি, রাজনৈতিক দলের নেতা হিসেবে জামায়াতের আমিরের এমন বক্তব্য দেওয়া ঠিক হয়নি। বিষয়টি ইসলামি পণ্ডিতদের হাতেই তাঁর ছেড়ে দেওয়া উচিত ছিল।
নারীদের মনোনয়ন না দেওয়াটা জামায়াতের কৌশলগত ভুল। জামায়াত যদি তাদের কয়েকজন নারী সদস্যকে নির্বাচনে মনোনয়ন দিত এবং দেখাতে পারত যে পর্দার ভেতরে থেকেও যেকোনো দায়িত্ব পালন সম্ভব, তবে সেটি সমাজে একটি শক্তিশালী ও ইতিবাচক বার্তা দিত। বাস্তবতা হলো বাংলাদেশের নারীরা আজ হিমালয় পর্বত জয় করছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ক্রিকেট ও ফুটবল খেলছে। নারী যে সব দায়িত্ব পালন করতে পারে, সমাজকে এই বার্তাটা দিতে ব্যর্থ হয়েছে জামায়াত। এর জন্য নির্বাচনে তাদের মূল্যও দিতে হতে পারে।
আপনাকে ধন্যবাদ।
ওয়ারেসুল করিম: আপনাদেরও ধন্যবাদ।