বিশেষ সাক্ষাৎকার: পিটার সিঙ্গার

বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার গল্প সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক

পিটার সিঙ্গার একজন অস্ট্রেলীয় নীতিদার্শনিক, লেখক ও জনবুদ্ধিজীবী। তিনি ‘দ্য লাইফ ইউ ক্যান সেভ’, ‘দ্য স্কুল ফর মোরাল অ্যাম্বিশন’ এবং ‘প্রফিট ফর গুড’-এর সহপ্রতিষ্ঠাতা। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে বায়োএথিকসের ইমেরিটাস অধ্যাপক। ‘জীবিত দার্শনিকদের মধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী’ হিসেবে পরিচিত পিটার সিঙ্গার সম্প্রতি বাংলাদেশের বিভিন্ন উন্নয়ন কর্মসূচি পরিদর্শনে এসেছিলেন। এসব কর্মসূচির মধ্যে ছিল ব্র্যাকের বিভিন্ন উদ্যোগ, যার মধ্যে রয়েছে আড়ং ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের শরণার্থীদের দুর্দশা তাঁকে কীভাবে চরম দারিদ্র্যে থাকা মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসার চিন্তায় উদ্বুদ্ধ করেছিল, ‘কার্যকর পরোপকার’ ধারণা, নৈতিক আচরণের প্রচলিত ধারা পরিবর্তনসহ নানা বিষয়ে প্রথম আলোর সঙ্গে কথা বলেছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আয়েশা কবির

প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন
প্রথম আলো:

বাংলাদেশে আপনাকে স্বাগত। এখন পর্যন্ত আপনার বাংলাদেশ সফর কেমন কাটছে?

পিটার সিঙ্গার: ধন্যবাদ। আমার সময়টা বেশ আনন্দদায়ক কাটছে। অনেক কিছু শিখেছি। গত দু-তিন দিন বেশ ব্যস্ততার মধ্য দিয়ে কেটেছে।

প্রথম আলো:

আপনি বিশ্বের জীবিত দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। আপনি প্রায়ই ‘সবচেয়ে ফলপ্রসূ পরোপকার’ বা ‘ইফেক্টিভ অ্যালট্রুইজম’ শব্দটি ব্যবহার করেন। এই ধারণা একটু ব্যাখ্যা করবেন? এর অর্থ কী?

পিটার সিঙ্গার: পরোপকারের ধারণাটি মোটামুটি সবারই পরিচিত। পরোপকারী ব্যক্তি হলেন এমন একজন, যিনি শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও কাজ করেন। তবে কার্যকর পরোপকার আন্দোলন মানুষের কাছে সাধু-সন্ত হওয়ার প্রত্যাশা করে না। সবাইকে শুধু অন্যের কথা ভেবে চলতে হবে, এমনটাও মনে করে না। বরং এর মূল কথা হলো, পৃথিবীকে আরও ভালো জায়গায় পরিণত করার চেষ্টা করা। এটি আমাদের সবারই অভিন্ন লক্ষ্য হওয়া উচিত।

দ্বিতীয়ত, অন্যের কল্যাণে কাজ করার জন্য আমাদের প্রত্যেকের সম্পদই সীমিত। এমনকি বিল গেটসেরও সম্পদ সীমাহীন নয়। তাই যখন আমাদের হাতে সীমিত সম্পদ থাকে, তখন আমরা সাধারণত সেই সম্পদ থেকে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়ার চেষ্টা করি। ধরুন, আপনার একটি নতুন ফোন দরকার। কিন্তু খরচ করার জন্য আপনার হাতে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা আছে। তখন আপনি চেষ্টা করবেন ওই টাকায় সবচেয়ে ভালো ফোনটি কিনতে।

কিন্তু দাতব্য কাজে অর্থ দেওয়ার ক্ষেত্রে অধিকাংশ মানুষ একই মানদণ্ড অনুসরণ করেন না। তাঁরা সাধারণত খোঁজখবর নেন না, কোথায় দান করলে সবচেয়ে বেশি উপকার হবে। অথচ তাঁরা যে অর্থ, সময় বা দক্ষতা অন্যের কল্যাণে ব্যয় করতে চান, সেগুলো কোথায় কাজে লাগালে সবচেয়ে বেশি মানুষের উপকার হবে, তা নিয়ে গবেষণা করা জরুরি। কার্যকর পরোপকার আন্দোলন মূলত এই কথাটিই বলে, অন্যদের সহায়তা করার সবচেয়ে কার্যকর উপায়গুলো খুঁজে বের করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, কম কার্যকর ও বেশি কার্যকর উপায়ে সহায়তা করার মধ্যে পার্থক্যটা অনেক বড় হতে পারে।

অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠান আন্তরিকভাবেই মানুষের কল্যাণে কাজ করার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা তাদের হাতে থাকা সম্পদ সবচেয়ে কম খরচে কীভাবে সবচেয়ে বেশি মানুষের উপকারে লাগানো যায়, সেই কার্যকর পদ্ধতিটি খুঁজে পায়নি। সবচেয়ে ফলপ্রসূ পরোপকারের ধারণাটি এই দুটি বিষয়কে এক জায়গায় নিয়ে আসে।

প্রথম আলো:

সার্থক পরোপকারের এই দর্শনে আপনি কীভাবে পৌঁছালেন?

পিটার সিঙ্গার: আমার চিন্তার মূল বিষয় হলো, চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষকে সহায়তা করার ক্ষেত্রে আমাদের দায়িত্ব কী। আমি এমন মানুষের কথা বলছি, যাঁদের হাতে অর্থ আছে। নিজেদের মৌলিক চাহিদা মেটানোর পরও বিলাসী পণ্য ও সেবার পেছনে খরচ করার মতো অর্থ তাঁদের থাকে।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপটে আমি একটি প্রবন্ধ লিখেছিলাম। এর শিরোনাম ছিল ‘ফেমিন, অ্যাফ্লুয়েন্স অ্যান্ড মোরালিটি’ (দুর্ভিক্ষ, প্রাচুর্য ও নৈতিকতা)। ১৯৭১ সালে এটি লিখেছিলাম, প্রকাশিত হয় ১৯৭২ সালে। প্রবন্ধের শুরুতেই আমি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে আশ্রয় নেওয়া ৯০ লাখ শরণার্থীর কথা উল্লেখ করি। এত বিপুলসংখ্যক মানুষের খাদ্য, আশ্রয় ও পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করতে গিয়ে ভারত তখন হিমশিম খাচ্ছিল।

সেই সময় আমি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষার্থী। বিশেষভাবে নীতিশাস্ত্র নিয়ে পড়াশোনা করছিলাম। এই পরিস্থিতিতে আমার নৈতিক দায়িত্ব কী, তা নিয়ে ভাবতে শুরু করি। তখন আমি একটি উদাহরণ হাজির করি, যা পরে বেশ পরিচিতি পায়। ধরুন, আপনি একটি অগভীর পুকুরের পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছেন। সেখানে একটি ছোট শিশু পড়ে গেছে। শিশুটি ডুবে যাওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পুকুরের আশপাশে আর কেউ নেই। আপনি চাইলেই শিশুটিকে বাঁচাতে পারেন। তবে তা করতে গেলে আপনার জুতা নষ্ট হবে এবং নতুন এক জোড়া জুতা কিনতে হবে। এখন প্রশ্ন হলো, নতুন জুতা কেনার টাকা খরচ করতে চান না বলে শিশুটিকে বিপদে ফেলে রেখে চলে যাওয়া কি অন্যায় হবে না? নিশ্চয়ই সবাই বলবেন, এমন কাজ করা ভয়াবহ অন্যায়।

আমি যুক্তি দিয়েছিলাম, ভারতের শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। অথচ সচ্ছল বিশ্বের অধিকাংশ মানুষ তাঁদের দুর্দশা লাঘবে কিছুই করছিলেন না। শরণার্থীরা অনেক দূরে ছিলেন। তাঁদের সরাসরি চোখের সামনেও দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু নৈতিকতার দৃষ্টিতে এই পরিস্থিতি পুকুরে ডুবে যেতে থাকা শিশুটিকে উপেক্ষা করার মতোই। সামান্য কিছু অর্থ ব্যয় করলেই হয়তো একজন মানুষের জীবন বাঁচানো সম্ভব। আর অন্যদের সঙ্গে সম্মিলিতভাবে এগিয়ে এলে নিশ্চিতভাবেই বহু মানুষের জীবন রক্ষায় অবদান রাখা সম্ভব। আমাদের সেটাই করা উচিত।

প্রবন্ধটি বহুবার পুনর্মুদ্রিত হয়েছিল। অনেক শিক্ষার্থী এটি পড়েছিলেন। অনেক অধ্যাপক তাঁদের ক্লাসেও প্রবন্ধটি পড়িয়েছিলেন। কয়েক দশক পর কয়েকজন শিক্ষার্থী সিদ্ধান্ত নেন, এই ধারণাটিকে আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁরা একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করবেন। তাঁরা গবেষণা শুরু করেন, মানুষের কল্যাণে অর্থ ব্যয়ের সবচেয়ে ভালো পদ্ধতি এবং সাধারণভাবে অর্থ ব্যয়ের পদ্ধতির মধ্যে কতটা পার্থক্য হতে পারে।

এভাবেই বিষয়টির ওপর পরিমাণগত হিসাব ও মূল্যায়নের গুরুত্ব দেওয়া হয়। অর্থাৎ তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে নির্ধারণ করা—আপনার অর্থ কোথায় ব্যয় করলে সবচেয়ে বেশি মানুষের উপকার হবে।

পিটার সিঙ্গার
ছবি: ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌজন্যে
প্রথম আলো:

আপনি ১৯৭১ সালের শরণার্থীদের কথা বললেন। নিশ্চয়ই আপনি জানেন, বর্তমানে বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শরণার্থী রয়েছে। তাদের জন্য আন্তর্জাতিক সহায়তার অর্থায়নও কমে আসছে। এই পরিস্থিতিতে আপনার বক্তব্য কী?

পিটার সিঙ্গার: এটি অত্যন্ত কঠিন একটি পরিস্থিতি। স্বাভাবিকভাবেই আমরা চাইব শরণার্থীদের কাজ করার সুযোগ দেওয়া হোক এবং শেষ পর্যন্ত তাদের নাগরিকত্ব পাওয়ার পথ তৈরি করে দেওয়া হোক। তবে আমি বুঝতে পারছি, বাংলাদেশ সরকার এ নিয়ে উদ্বিগ্ন। কারণ, সরকার যদি এমন সুযোগ দেয়, তাহলে আরও বেশি শরণার্থী বাংলাদেশে আসতে পারে।

আর বাংলাদেশ এমনিতেই অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ একটি দেশ। তাই বিষয়টি যে সহজ নয়, তা আমি বুঝতে পারছি। কোনো না কোনোভাবে এমন নিশ্চয়তা দেওয়া প্রয়োজন, যাতে এই সুযোগ দেওয়ার ফলে সীমান্ত পেরিয়ে আরও বেশি শরণার্থী বাংলাদেশে আসার পরিস্থিতি তৈরি না হয়।

প্রথম আলো:

আপনি অতি ধনী ও চরম দরিদ্র মানুষের মধ্যকার বৈষম্যের কথা বলছিলেন। দারিদ্র্য দূরীকরণে অতি ধনীরা বড় ধরনের পরিবর্তন আনবেন, এমন প্রত্যাশা কি অবাস্তব? আপনার প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়ন করা সম্ভব। কিন্তু সেগুলো বাস্তবায়িত হচ্ছে না কেন? মানুষ কি আসলে শুধু স্বার্থপর ও অন্যের প্রতি উদাসীন?

পিটার সিঙ্গার: আমার মনে হয় না, সব ধনী মানুষ এক রকম। এমন কিছু ধনী মানুষ রয়েছেন, যাঁরা বিপুল পরিমাণ অর্থ দান করেছেন। বিল ও মেলিন্ডা গেটস মিলে গেটস ফাউন্ডেশন প্রতিষ্ঠা করেছেন। ওয়ারেন বাফেটও একজন অতি ধনী ব্যক্তি। তিনি তাঁর সম্পদের বড় অংশ দান করেছেন। এ ছাড়া আরও অনেকে কার্যকর পরোপকারের বিভিন্ন উদ্যোগে সহায়তা করছেন।

ডাস্টিন মস্কোভিৎস ও তাঁর স্ত্রী তথ্যপ্রযুক্তি খাত থেকে বিপুল অর্থ উপার্জন করেছেন। তাঁরাও তাঁদের সম্পদের বেশির ভাগ দান করছেন। শুধু তা-ই নয়, মানুষকে দারিদ্র্য থেকে বের করে আনার সবচেয়ে কার্যকর উপায় খুঁজে বের করতে তাঁরা অনেক গবেষণায় অর্থায়ন করছেন। তাই আমি মনে করি না, সব ধনী মানুষ একই রকম। তবে দুর্ভাগ্যজনকভাবে, অধিকাংশ ধনীর ক্ষেত্রে আপনার বক্তব্য ঠিক। অবশ্য এই মুহূর্তে বিশ্বের সবচেয়ে আলোচিত এবং সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি যে কার্যকর পরোপকারের অনুসারী নন, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।

আমাদের শুধু নৈতিক আচরণের প্রচলিত ধারা পরিবর্তনের চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, আমাদের এমন কিছু নেতা রয়েছেন, যাঁরা নৈতিক আচরণের ক্ষেত্রে খুব খারাপ দৃষ্টান্ত স্থাপন করছেন। ইন্টারনেটের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিও একই কাজ করছেন। তবে কার্যকর পরোপকার আন্দোলনের মাধ্যমে যাঁরা খুব নৈতিক কাজ করছেন, তাঁদের অনেকের সঙ্গেই আমার যোগাযোগ রয়েছে। তাই আমি মনে করি না, হঠাৎ করেই সবাই স্বার্থপর হয়ে গেছেন। এটি মোটেও সত্য নয়।

প্রথম আলো:

তাহলে আপনি কি মনে করেন, আপনার মতো চিন্তাভাবনার মানুষ সত্যিই বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারেন?

পিটার সিঙ্গার: আমার মনে হয়, প্রায় প্রত্যেকেই কিছু না কিছু প্রভাব ফেলতে পারেন। এর জন্য শুধু সবচেয়ে কার্যকর প্রতিষ্ঠানগুলো খুঁজে বের করতে হবে। আমি ‘দ্য লাইফ ইউ ক্যান সেভ’ নামের একটি সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছি। এই সংগঠন চরম দারিদ্র্যের মধ্যে থাকা মানুষের সহায়তায় সবচেয়ে কার্যকর দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর সুপারিশ করে। ফলে যে কেউ সহজেই এ-সংক্রান্ত তথ্য পেতে পারেন। তাঁরা বুঝতে পারবেন, খুব বেশি ধনী না হয়েও কীভাবে বড় ধরনের পরিবর্তন আনা সম্ভব। আপনি যদি সঠিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান বেছে নেন, তাহলে আপনার দেওয়া অর্থ খুব কার্যকরভাবে কাজে লাগবে। আর এর মধ্য দিয়ে আপনি নিজের কাজের মধ্যেও তৃপ্তি খুঁজে পাবেন।

প্রথম আলো:

ব্র্যাকের মতো প্রতিষ্ঠান এবং বিশ্বের বিভিন্ন দাতব্য সংস্থা অনেক কিছু করতে পারে। কিন্তু নীতি নির্ধারণ করে সরকার। আপনার কি মনে হয়, সরকারগুলোকেও একই ধরনের উদ্যোগ নিতে প্রভাবিত করা প্রয়োজন?

পিটার সিঙ্গার: হ্যাঁ, অবশ্যই। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, সরকারগুলো এখন তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করছে না। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টান্ত খুবই খারাপ, বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে। অন্য সরকারগুলোও বলছে, যুক্তরাষ্ট্র যদি বিদেশি সহায়তা ব্যাপকভাবে কমিয়ে দেয়, তাহলে আমরাও তা-ই করব। এটি অনুসরণ করার মতো খুব খারাপ দৃষ্টান্ত।

আমি আরও চাই কোম্পানিগুলো তাদের মুনাফার পুরোটা না হলেও অন্তত কিছু অংশ জনকল্যাণমূলক কাজে দান করুক। সম্প্রতি আমি ‘প্রফিট ফর গুড অ্যালায়েন্স’ নামের একটি উদ্যোগের সহপ্রতিষ্ঠাতা হয়েছি। এটি এমন কিছু কোম্পানির জোট, যারা তাদের মুনাফার অন্তত ১০ শতাংশ জনকল্যাণমূলক কাজে ব্যয় করে।

আমরা এসব কোম্পানির পরিচিতি বাড়াতে চাই। ভোক্তারা যেন তাদের পণ্য ও সেবা কেনার ক্ষেত্রে এসব কোম্পানিকে অগ্রাধিকার দেন, সেই চেষ্টা করতে চাই। আমরা এই ধারণা ছড়িয়ে দিতে চাই যে শুধু মুনাফা করাই যথেষ্ট নয়। সেই মুনাফার অন্তত কিছু অংশ দিয়ে মানুষের জীবনে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে।

এ বিষয়ে ‘প্রফিট ফর গুড ডটকম’ নামের একটি ওয়েবসাইট রয়েছে। চাইলে সেখানে দেখতে পারেন। তবে ওয়েবসাইটটি এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়নি। আগামী জুনে ইউরোপে একটি বড় সম্মেলনের মাধ্যমে আমরা এর আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করতে যাচ্ছি।

প্রথম আলো:

জাতিসংঘের কথা কী বলবেন? এ ধরনের পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আনার লক্ষ্য নিয়েই তো জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠানটি কি এখন পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে?

পিটার সিঙ্গার: না, জাতিসংঘ পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়েছে বলে আমি মনে করি না। তবে বিশ্বের কিছু নেতা প্রতিষ্ঠানটিকে উপেক্ষা করছেন। ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের সময় পুতিন স্পষ্টতই জাতিসংঘকে উপেক্ষা করেছিলেন। ট্রাম্পও একই কাজ করছেন বলে মনে হচ্ছে।

তুলনামূলক ছোট পরিসরে ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরোকে আটক করার ঘটনাটি জাতিসংঘ সনদের সুস্পষ্ট লঙ্ঘন ছিল। আর আরও বড় পরিসরে বলতে গেলে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের কথাই ধরুন। ওই যুদ্ধের কোনো প্রকৃত প্রয়োজন ছিল না। আলোচনা চালিয়ে যাওয়া উচিত ছিল। যুদ্ধকে সব সময় শেষ অবলম্বন হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ইরানে হামলাকে কোনোভাবেই শেষ অবলম্বন বলা যায় না।

প্রথম আলো:

ইউনিসেফ, ইউএনডিপি ও ইউনেসকোর মতো জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর কথা কী বলবেন? তারা যে পরিমাণ অর্থায়ন পায়, তা কি কার্যকরভাবে ব্যয় করছে বলে আপনার মনে হয়?

পিটার সিঙ্গার: আপনার উল্লেখ করা এসব সংস্থার কোনোটিই ‘দ্য লাইফ ইউ ক্যান সেভ’-এর সবচেয়ে কার্যকর দাতব্য প্রতিষ্ঠানের তালিকায় নেই। তারা বিভিন্ন ধরনের কাজ করে। তাদের কিছু কাজ অবশ্যই ভালো। কিন্তু তাদের সব কাজই যে ভালো, তা আমি মনে করি না। ব্র্যাকের মতো স্থানীয় মানুষের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ ততটা নিবিড় নয়। আমার মনে হয়, শুরু থেকেই ব্র্যাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে তাঁদের চাহিদা সম্পর্কে জানা এবং তাঁদের কাছ থেকেই অভিজ্ঞতা ও জ্ঞান অর্জন করা।

প্রথম আলো:

সবশেষে বাংলাদেশের মানুষের জন্য আপনার কোনো বার্তা আছে?

পিটার সিঙ্গার: যেমনটা বলেছি, দারিদ্র্য নিয়ে আমার চিন্তাভাবনার শুরুটা হয়েছিল বাংলাদেশকে ঘিরেই। স্বাধীন দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনেকেই তখন খুব হতাশাজনক পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু সেসব পূর্বাভাস সত্যি হয়নি। বরং বাংলাদেশ অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে বের করে আনতে পেরেছে।

তাই আমার মনে হয়, বাংলাদেশের অগ্রযাত্রার গল্প সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক। এই গল্প বিশ্বের সর্বত্র চরম দারিদ্র্য দূর করার লক্ষ্যে কাজ চালিয়ে যেতে মানুষকে আশা ও উৎসাহ জোগাতে পারে।

প্রথম আলো:

ধন্যবাদ। ইতিবাচক একটি বার্তা দিয়ে আমরা শেষ করছি।

পিটার সিঙ্গার: আপনাকেও ধন্যবাদ।