বিশেষ সাক্ষাৎকার: হাফিজ উদ্দিন আহমদ

একাত্তরে আমরা এক দুঃসাহসী জাতি হয়ে উঠেছিলাম

মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের স্পিকার। মুক্তিযুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তিনি বীর বিক্রম খেতাব পান। প্রথম আলোর সঙ্গে সাক্ষাৎকারে প্রথম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের বিদ্রোহ, কামালপুর যুদ্ধ, জিয়াউর রহমানের সঙ্গে যুদ্ধের স্মৃতিসহ মুক্তিযুদ্ধের নানা প্রসঙ্গে কথা বলেছেন।

সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনা সম্পাদক আনিসুল হক

প্রথম আলোকে নির্ভরযোগ্য সূত্র হিসেবে পেতে হলেএখানে ক্লিক করুন
প্রথম আলো:

আপনার সৈনিক জীবন: গৌরবের একাত্তর রক্তাক্ত পঁচাত্তর বইয়ে আপনি লিখেছেন যে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের আগে আপনাদের সীমান্তে পাঠানো হয়েছিল। তাহলে ২৫ মার্চ কী হয়েছিল—২৬ বা ২৭ মার্চের ঘটনাবলি—এই সবকিছুই কি আপনার জানা ছিল না?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ১৯৭১ সালের ১৬ মার্চ আমি পশ্চিম পাকিস্তান থেকে ঢাকায় ফিরি। তাই মার্চের শুরুর দিকের উত্তাল গণ–আন্দোলন কিংবা ৭ মার্চের ভাষণ স্বচক্ষে দেখার সুযোগ আমার হয়নি। তবে মানুষের তীব্র ক্ষোভ বুঝতে পারছিলাম। বিশেষ করে পার্লামেন্টের অধিবেশন পিছিয়ে দেওয়ায় বাঙালিরা কতটা সংক্ষুব্ধ ছিল, তা অনুভব করা যাচ্ছিল। ঢাকায় আসার পরপরই আমাদের সীমান্ত এলাকায় শীতকালীন মহড়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে সৈনিকদের নিয়ে দিন–রাত যুদ্ধের কলাকৌশল রপ্ত করছিলাম। ২৯ মার্চ পর্যন্ত আমরা সেই সামরিক অনুশীলনেই ব্যস্ত ছিলাম। ফলে ২৫ মার্চের ভয়াবহ ক্র্যাকডাউন কিংবা ২৬ ও ২৭ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে জানার সুযোগ আমাদের ছিল না।

২৯ মার্চ আমাদের ক্যান্টনমেন্টে ডেকে পাঠানো হয়। গভীর রাতে সেখানে পৌঁছাই। পরদিন ৩০ মার্চ সকাল সাড়ে সাতটায় ব্রিগেড কমান্ডার ব্রিগেডিয়ার আবদুর রহিম দুররানি নির্দেশ দিলেন যে আমাদের ব্যাটালিয়ন অর্থাৎ প্রথম ইস্ট বেঙ্গলকে নিরস্ত্র করা হয়েছে। ইতিমধ্যে অন্যান্য ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট বিদ্রোহ করলেও আমরা শীতকালীন মহড়ায় থাকায় খবরটি জানতাম না। ব্রিগেড কমান্ডার আমাদের নিরস্ত্র করার নির্দেশের সঙ্গে সঙ্গেই বাঙালি সৈনিকেরা বিক্ষোভে ফেটে পড়ে এবং অস্ত্রাগার ভেঙে অস্ত্র নিয়ে নেয়। শুরু হয় এক ঐতিহাসিক বিদ্রোহ। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে টানা আট ঘণ্টা সম্মুখযুদ্ধ চলে। আমাদের কমান্ডিং অফিসার ছিলেন একজন বাঙালি। লেফটেন্যান্ট কর্নেল রেজাউল জলিল। অত্যন্ত স্মার্ট এই অফিসার সংকট মুহূর্তে সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারলেন না। সৈনিকেরা আমাকে বিদ্রোহের নেতৃত্ব দিতে অনুরোধ করল। ব্যাচেলর হওয়ায় আমার কোনো পিছুটান ছিল না। একটি পিলারের পেছনে দাঁড়িয়ে আমি এক–দুই মিনিট চিন্তা করলাম। আমার বিবেক বলল, সৈনিকদের সঙ্গে থাকাই সঠিক কাজ। আমি যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। সেই ইউনিটের সাহসী সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট আনোয়ার হোসেনকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম তিনি কী করবেন। আনোয়ার বিনা দ্বিধায় আমার সঙ্গে যোগ দিলেন। দুঃসাহসী এই ছেলেটি সেদিনকার যুদ্ধের একপর্যায়ে শহীদ হলেন।

প্রথম আলো:

তিনি শহীদ হওয়ার পর আপনারা কি ক্যান্টনমেন্ট ছেড়ে চলে গেলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমরা ক্যান্টনমেন্ট থেকে বেরিয়ে এলাম। ওখান থেকে মাত্র এক হাজার গজ দূরেই খিতিবদিয়া নামে একটি গ্রাম। সেখানে প্রবেশ করতেই দেখলাম এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। হাজার হাজার সাধারণ মানুষ দা, খুন্তি, কুড়াল আর লাঠিসোঁটা নিয়ে রুখে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের দেখামাত্রই তারা পরম মমতায় জড়িয়ে ধরল। চারদিকে ‘আল্লাহু আকবর’ আর ‘জয় বাংলা’ স্লোগান শোনা যাচ্ছিল। গ্রামবাসী আমাদের গাছ থেকে ডাব পেড়ে খাওয়াল, মুড়িমুড়কি দিয়ে আপ্যায়ন করল। বিশেষ করে কিশোর-তরুণ ছাত্ররা এসে আমাদের কাছে দাবি জানাল, ‘স্যার, আমাদের অস্ত্র দিন, আমরা যুদ্ধ করব।’

প্রথম আলো:

চুয়াডাঙ্গা, যশোর, কুষ্টিয়া তো অনেক দিন পর্যন্ত স্বাধীনই ছিল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: হ্যাঁ। শুরুতে পাকিস্তানি সৈন্যরা ভারতের আক্রমণ এবং বাঙালি সৈনিকদের বিদ্রোহের ভয়ে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরে পাকিস্তান থেকে নতুন সৈন্য ও গোলাবারুদ এলে তারা লোকালয়ে বেরিয়ে নির্বিচার হত্যা ও অগ্নিসংযোগ শুরু করে। এপ্রিল মাসে যশোর সেনানিবাসে বিদ্রোহের এক সপ্তাহ পর আমি বেনাপোল এলাকায় যাই। বেনাপোল থেকে প্রায় ছয় মাইল উত্তরে যশোর অভিমুখী কাগজপুকুর নামক স্থানে আমরা একটি রক্ষণব্যূহ গড়ে তুলি। বিদ্রোহ করে আসা ২০০ জন বাঙালি সৈনিক এবং ১৫০ জন ইপিআর সদস্য নিয়ে গঠিত ছোট দলটি নিয়ে আমি সেখানে অবস্থান নিই। এই জনবল নিয়ে এপ্রিল ও মে মাসের টানা দুই মাস আমরা সফলভাবে পাকিস্তানি বাহিনীকে ঠেকিয়ে রাখি।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

১৭ এপ্রিল বৈদ্যনাথতলায় সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও তাজউদ্দীন আহমদের যে মুজিবনগর সরকারের শপথ অনুষ্ঠিত হলো, সেখানে কি আপনি পৌঁছাতে পেরেছিলেন?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: কাকতালীয়ভাবে আমি সেই ঐতিহাসিক অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলাম। সেখানেই আমার দেখা হয় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর সঙ্গে। তাঁর সঙ্গে আমার আগে থেকেই জানাশোনা ছিল। এ ছাড়া মেহেরপুরের সেই আম্রকাননে সেদিন সারা বাংলাদেশের প্রাদেশিক ও জাতীয় পরিষদের অনেক সদস্য উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের অনেকের সঙ্গেই আমার পরিচয় ছিল, কেউ ছিলেন আমার সহপাঠী বা বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধু। সেখানেই বাংলাদেশ সরকার গঠিত হলো। ওই দিন তাজউদ্দীন আহমদ সাহেব বাংলা ও ইংরেজি—উভয় ভাষায় এক অনবদ্য ভাষণ দিয়েছিলেন। মঞ্চের ঠিক পাশেই একটি চেয়ারে আমরা চারজন বসা ছিলাম, যে দৃশ্য আজও আমার চোখে ভাসে। মেহেরপুরের সেই আম্রকাননের অদূরেই পলাশীতে একসময় বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। আবার সেখানেই আমরা বাংলার স্বাধীনতার নতুন সূর্য উদিত হতে দেখলাম।

প্রথম আলো:

আমরা কামালপুর যুদ্ধ নিয়ে একটু শুনতে চাই।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: ৩১ জুলাই কামালপুর যুদ্ধ সংঘটিত হয়। বলতে গেলে, পুরো মুক্তিযুদ্ধে এটিই ছিল আমাদের পরিচালিত একমাত্র পূর্ণাঙ্গ প্রথাগত বা কনভেনশনাল আক্রমণ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ এক লড়াই।

মেজর জিয়াউর রহমান সেই মুহূর্তে আমার একদম পাশেই বসা ছিলেন। পরিস্থিতি দেখে আমি তাঁকে পেছনে চলে যেতে বললাম। তিনি উত্তরে জানালেন যে তোমরা যেখানে জীবন দিচ্ছ, সেখানে আমি পেছনে থাকতে পারি না। একেই উর্দুতে গায়রাত বা প্রবল আত্মসম্মানবোধ বলে
প্রথম আলো:

সেখানে পাকিস্তানি বাহিনীর প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নাকি অত্যন্ত সুসংগঠিত ও শক্তিশালী ছিল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: হ্যাঁ, পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থান ছিল ভীষণ শক্তিশালী। তাদের কংক্রিটের তৈরি মজবুত বাংকার ছিল। সেখানে পাকিস্তানি বালুচ রেজিমেন্টের এক কোম্পানি সেনাসহ প্রায় ১৫০ সৈন্য অবস্থান করছিল। তাদের কাছে ভারী কামান ছিল, যা দিয়ে তারা অনায়াসেই আমাদের ওপর গোলাবর্ষণ করতে পারত। সামরিক পরিভাষায় এমন অবস্থানকে বলা হয় ‘স্ট্রং পয়েন্ট’। পুরো এলাকাটি তারা মাইন ফিল্ড দিয়ে সুরক্ষিত করে রেখেছিল। নিয়ম অনুযায়ী এমন একটি শক্তিশালী ঘাঁটিতে আক্রমণ করতে হলে কামানের (আর্টিলারি) সাহায্য প্রয়োজন হয়, কিন্তু আমাদের কাছে তখন কোনো আর্টিলারি ছিল না। গোলন্দাজ বাহিনীর সহায়তা ছাড়াই আমরা ২৫০ জন মুক্তিযোদ্ধা সেখানে আক্রমণ চালিয়েছিলাম। ফলে লড়াইটি ছিল অত্যন্ত রক্তক্ষয়ী। আমাদের প্রায় ১০০ জন সহযোদ্ধা হতাহত হয়েছিলেন। সেই যুদ্ধেই আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ক্যাপ্টেন সালাউদ্দিন মমতাজ শহীদ হন এবং আমিও গুরুতর আহত হই।

প্রথম আলো:

আপনার কি গুলি লেগেছিল?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: মর্টারের স্প্লিন্টার আমার শরীরের আটটি জায়গায় লেগেছিল। আমি অলৌকিকভাবে বেঁচে ফিরেছি। কামালপুর যুদ্ধে আক্রমণের দৃশ্য বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই। আমরা শত্রু বাংকারের দিকে এগিয়ে চলেছি। শত্রু আমাদের অগ্রসরমাণ পুরো শরীর দেখতে পাচ্ছে আমরা তাদের দেখতে পাচ্ছি না, দেখি শুধু বাংকারের মধ্যে কালো মেশিনগানের নল ও গুলির ফ্ল্যাশ। একটা ছোট নালা পেরিয়েই মাইন ফিল্ডে পড়ে গেলাম। এক ফুট দূরত্ব বজায় রেখে এগিয়ে চলেছি হ্যান্ডসেট হাতে আমি ও বেতারযন্ত্র পিঠে নিয়ে অপারেটর সিরাজ। হঠাৎ অ্যান্টি পারসোনেল মাইনে সিরাজের একটি পা উড়ে গেল, আমার হাত থেকে হ্যান্ডসেট ছিটকে পড়ল। বেতারযন্ত্র আরেকজনের কাঁধে দিয়ে আমরা এগিয়ে গেলাম এবং সর্ব বাঁয়ে একটি বাংকার দখল করলাম। হঠাৎ একটি মর্টারের শেলের টুকরা আমার হাতের চায়নিজ স্টেনের বাঁটে আঘাত করে। ব্যারেল ছিটকে পড়ে কয়েক ফুট দূরে। গোলাটি মাত্র ২ ইঞ্চি এপাশ দিয়ে গেলে আমাকে দ্বিখণ্ডিত করে দিত।

এভাবেই আমরা কামালপুর বর্ডার আউটপোস্টের কিছু অংশ দখল করেছিলাম। জামালপুরের এই সীমান্ত ফাঁড়ি উদ্ধারে আমরা দুজন অফিসার নেতৃত্ব দিয়েছিলাম। সেই যুদ্ধে আমার সহযোদ্ধা অফিসার শহীদ হন এবং আমি আহত হওয়ায় আমাদের পিছু হটতে হয়। অভিযানে অংশ নেওয়া ২৫০ জনের মধ্যে ২০০ জনই ছিলেন ছাত্র, যাদের ভারতের তেলঢালায় মাত্র এক মাসের ট্রেনিং দেওয়া হয়েছিল। কোনো গোলন্দাজ সহায়তা বা পেশাদার পরিকল্পনা ছাড়াই তাঁরা অসমসাহসে লড়াই করেছিলেন। পরে ১৯৭৩ সালে ইংল্যান্ডে স্টাফ কলেজে কোর্স করার সময় ইনস্ট্রাক্টররা আমার যুদ্ধ অভিজ্ঞতা শুনে অবাক হতেন। তাঁরা বলতেন সুইসাইড স্কোয়াড ছাড়া এমন দুঃসাহস কেউ দেখাতে পারে না।

একাত্তরে আমরা একটি দুঃসাহসী জাতি হয়ে উঠেছিলাম। রিক্রুট করতে গিয়ে দেখেছি হাজার হাজার ছেলে মাসের পর মাস পচা ডাল আর কুমড়ার মতো সবজি খেয়ে অস্ত্রের জন্য অপেক্ষা করছে। সেনাবাহিনীতে ৫ ফুট ৬ ইঞ্চি উচ্চতা মেলা ভার ছিল। উচ্চতার কারণে বাদ দিতে চাইলে তারা কেঁদে ফেলত। এক শিক্ষিত তরুণ তো বলেই ফেলল যে আমরা রেগুলার আর্মি না, বরং মুক্তিযোদ্ধা। সে দাবি জানাল উচ্চতা না দেখে হাতে গ্রেনেড দিয়ে শত্রুর বাংকার দেখিয়ে দিতে, যাতে গ্রেনেড মেরে আসতে পারে। রিক্রুট হওয়ার জন্য তাদের আবেগ এতই তীব্র ছিল যে মাঝেমধ্যে আমাদের জিপের সামনে শুয়ে পড়ত, যাতে তাদের না নিয়ে আমরা না যাই।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ
ছবি: প্রথম আলো
প্রথম আলো:

আমরা যখন ভোরের কাগজ–এ কাজ করি, তখন আপনি একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, জিয়াউর রহমান ও আপনি পাশাপাশি যুদ্ধ করেছিলেন। এটি কি সিলেটের দিকের ঘটনা?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: সিলেটের জকিগঞ্জের গৌরীপুরে পাকিস্তান আর্মির ৩১ পাঞ্জাব ব্যাটালিয়ন আমাদের ওপর আক্রমণ করেছিল। আমরা ডিফেন্সে ছিলাম। চার ঘণ্টার ওই যুদ্ধে পাকিস্তানের মেজর সারোয়ারসহ ৮০ জন নিহত হন এবং আমরা ৩২ জন পাঞ্জাবি সৈন্যকে জীবিত বন্দী করি। যুদ্ধের একপর্যায়ে মেজর জিয়াউর রহমান আমাদের ট্রেঞ্চে এসে বসেন। সেই সময়ে ভারতীয় বাহিনীর সহায়তায় আমরা গোলন্দাজ বাহিনীর সাপোর্ট পাচ্ছিলাম। ম্যাপ দেখে বেতার সেটের মাধ্যমে আমি টার্গেটের স্থানাঙ্ক বললে সেই অনুযায়ী ওপার থেকে গোলাবর্ষণ করা হচ্ছিল।

আমার পাশের কোম্পানির কমান্ডার ছিলেন ক্যাপ্টেন মাহবুবুর রহমান। তিনি টার্গেট লোকেট করে আর্টিলারি সাপোর্ট চাইলেন। ওপার থেকে ছয়টি গোলাবর্ষণ করার পর যখন নিখুঁতভাবে পাকিস্তানি পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ওপর সেগুলো পড়ল, মাহবুব আনন্দে চিৎকার করে বলছিলেন, ‘ওয়েল ডান! অন টার্গেট! রিপিট ফায়ার!’ অথচ ঠিক সেই মুহূর্তেই পাকিস্তানিদের ছোড়া কামানের গোলা এসে পড়ল মাহবুবের ওপর। তিনি শহীদ হলেন। যিনি ১ সেকেন্ড আগে বিজয়োল্লাস করছিলেন, পরের সেকেন্ডেই তিনি নিজেই শত্রুর লক্ষ্যবস্তু হয়ে গেলেন। বেতার সেটে তখন আর্টিলারি অফিসারের ডাক আসছে, ‘রিপোর্ট সিচুয়েশন!’ কিন্তু ওপাশে কোনো সাড়াশব্দ নেই। মাহবুবের কল সাইন ছিল ওয়ান, আমার টু। আমি অনেক ডেকেও কোনো সাড়া পেলাম না। আমার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন মাহবুব, তাঁর বাড়ি ছিল দিনাজপুরে। যুদ্ধ এমনই এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, যেখানে বাঁচা আর মরার মাঝে ১ সেকেন্ডেরও ব্যবধান থাকে না।

মেজর জিয়াউর রহমান সেই মুহূর্তে আমার একদম পাশেই বসা ছিলেন। পরিস্থিতি দেখে আমি তাঁকে পেছনে চলে যেতে বললাম। তিনি উত্তরে জানালেন যে তোমরা যেখানে জীবন দিচ্ছ, সেখানে আমি পেছনে থাকতে পারি না। একেই উর্দুতে গায়রাত বা প্রবল আত্মসম্মানবোধ বলে। মুক্তিযোদ্ধারা জীবন বাজি রাখছে দেখে তিনি নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে রাজি হননি। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে রণাঙ্গনের সেই স্মৃতি আজও অম্লান।

এই যুদ্ধের পর পাকিস্তানিদের মনোবল ভেঙে যায়। তারা সিলেটের দিকে পিছু হটতে শুরু করে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম যে তাদের ধাওয়া করে আগে সিলেটে পৌঁছাতে হবে। ডিসেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ম্যাপ দেখে হাওর ও চা–বাগানের ভেতর দিয়ে দুর্গম পথে রওনা হলাম। মেজর জিয়াউর রহমানসহ আমরা প্রায় ১ হাজার ২০০ সৈনিক ছিলাম।

প্রত্যেকের ব্যাগে চিড়া, গুড় ও শুকনো খাবার ছিল। তিন দিন পর খাবার ফুরিয়ে যাওয়ায় চতুর্থ দিনে আমরা সবাই প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ও ক্লান্ত ছিলাম। ১৪ ডিসেম্বর সকালে আমরা সামনে এমসি কলেজের প্রিন্সিপালের বাসভবন দেখতে পেলাম। ভবনটি উঁচু টিলার ওপরে ছিল। যার চারপাশে পাকিস্তানিদের শক্তিশালী ঘাঁটি ছিল। পাকিস্তানি সেনারা ভাবতেই পারেনি মুক্তিবাহিনীর বিশাল দল সরাসরি শহরের এমসি কলেজের টিলায় হানা দেবে।

৩০০ গজ দূর থেকে তারা আমাদের পরিচয় জানতে চাইলে আমরা উত্তর না দিয়ে দ্রুত পরিখা তৈরির কাজে লেগে গেলাম। ওরা আমাদের চিনে ফেলে আক্রমণ শুরু করল এবং মূল ধাক্কাটা আমার কোম্পানির ওপর এল। পরিখাগুলো অসম্পূর্ণ থাকায় আমার কোম্পানির ১৮ জন সৈনিক এবং প্লাটুন কমান্ডার সুবেদার ফয়েজ শহীদ হলেন। অবস্থা এমন বেগতিক ছিল যে আমি নিজেও তখন নিশ্চিত মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করছিলাম।

সেটা ছিল একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বরে। দুপুরের দিকে আমাদের সঙ্গে থাকা ভারতীয় মেজর রাওয়ের বেতার সেটটি সচল হয়। তিনি আমাকে কামানের গোলাবর্ষণের প্রস্তাব দিলে আমি তা ফিরিয়ে দিই। কেননা, শত্রুর অবস্থান আর আমাদের অবস্থান কাছাকাছি হওয়ায় আমাদের ওপর গোলা পড়ার ঝুঁকি ছিল। আমি কামানের বদলে বিমান হামলার অনুরোধ জানাই। আধা ঘণ্টা পর দুটি ভারতীয় মিগ বিমান পাকিস্তানি বাংকার লক্ষ্য করে ১৫ মিনিট রকেট হামলা চালায়। এই ভয়াবহ আক্রমণে পাকিস্তানি সেনারা পর্যুদস্ত হয়ে আত্মসমর্পণ করে। ৩০ মার্চের বিদ্রোহের সার্থকতা আসে এমসি কলেজের এই বিজয়ে। তৎকালীন ১৮টি জেলার মধ্যে একমাত্র সিলেট জেলাই মুক্তিবাহিনী নিজেদের প্রচেষ্টায় শত্রুমুক্ত করতে পেরেছিল।

প্রথম আলো:

একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনি কি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল দেখেন, নাকি মনে করেন সামনে আরও অনেক সংগ্রাম বাকি?

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আমি বাংলাদেশের একটি চমৎকার ভবিষ্যৎ দেখি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে এ দেশের মানুষের যে অসমসাহস ও দেশপ্রেম আমি দেখেছি, তা ছিল অতুলনীয়। এর দীর্ঘ সময় পর ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণ-অভ্যুত্থানে যেভাবে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নেমে এসেছে, সেটিও আমার কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মনে হয়েছে। এই আন্দোলনে শুধু ছাত্রছাত্রীরা নয়, সর্বস্তরের মানুষ অংশ নিয়েছেন। আমি নিজে দেখেছি, শিক্ষার্থীদের অভিভাবকেরাও রাস্তায় নেমে এসেছেন। নারী-পুরুষনির্বিশেষে সাধারণ পেশার মানুষ, এমনকি দরিদ্র ও খেটে খাওয়া মানুষও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে শামিল হয়েছে। এসব দেখেই আমার মনে হয়, বাংলাদেশের সামনে এক উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে।

প্রথম আলো:

আপনাকে ধন্যবাদ।

হাফিজ উদ্দিন আহমদ: আপনাকেও ধন্যবাদ।