দেশে এখন অসংখ্য পত্রিকা ও কয়েক ডজন বেসরকারি টেলিভিশন আছে। সরকার তো এটাকেই সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা বলে প্রচার করতে চাইছে।

নূরুল কবীর: সংবাদমাধ্যম হচ্ছে শল্যবিদের ছুরির মতো। শল্যবিদের হাতে পড়লে মানুষ বাঁচে আর ডাকাতের হাতে পড়লে মানুষের মৃত্যুও হতে পারে। সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সরকার নিজেদের লোকদের দিয়ে নিজের দুঃশাসনের ন্যায্যতা প্রদানের জন্য ব্যবহার করে। সরকারের অনুগত বুদ্ধিজীবীদেরই দাপট এখন। ফলে ১০ হাজার টেলিভিশন বা পত্রপত্রিকা থাকলেই এখানে মানুষের গণতন্ত্রপরায়ণ চিন্তা প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে, এমন ভাবার কারণ নেই।

বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম–সংশ্লিষ্ট অনেক আইন আছে। সবচেয়ে বিপজ্জনক আইন কোনটি, কেন?

নূরুল কবীর: প্রত্যক্ষভাবে ডজনখানেক আইন আছে। তবে গুরুতর হিসেবে বেশি আলোচনায় আসে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। যেকোনো রাষ্ট্রের কতগুলো কৌশলগত তথ্য থাকে, যেগুলো জনস্বার্থের জন্যই গোপন রাখা দরকার। সেগুলোর নিরাপত্তা তো আমরা চাই। কিন্তু কী বাস্তবতা আমরা দেখি। বাংলাদেশ ব্যাংকের কম্পিউটার সিস্টেমের নিরাপত্তা যাঁরা সুরক্ষিত রাখতে পারেননি, এর জন্য যাঁরা দায়ী, তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তার কিছুই করা হয়নি। অথচ এই আইনের ধারা প্রায়ই সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হচ্ছে। এগুলো এ দেশের শাসকশ্রেণির আইনপ্রণেতা ও প্রশাসনের অন্তর্গত অগণতান্ত্রিক ও স্বৈরতান্ত্রিক চিন্তা ও তৎপরতার বহিঃপ্রকাশ। এই আইনকে মোকাবিলা করার নৈতিক যোগ্যতা ও সংঘবদ্ধতা অর্জন করা ছাড়া কোনো পথ নেই। আমি মনে করি না, সরকারের সঙ্গে ছোটখাটো দেনদরবার করে বা বিবৃতি দিয়ে এমন একটি অগণতান্ত্রিক কাঠামো থেকে বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমকে বের করা যাবে। এটি সামগ্রিকভাবে রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের সঙ্গে সম্পর্কিত।

সম্প্রতি সরকার ২৯টি প্রতিষ্ঠানকে সংরক্ষিত পরিকাঠামো হিসেবে ঘোষণা করেছে। এ নিয়ে প্রতিবাদ উঠলে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় সাংবাদিকদের কাজে বাধা দেওয়া হবে না। আপনি কী মনে করেন?

নূরুল কবীর: সত্যি বলতে তাদের কথায় আমি কথায় আমি খুবই বিরক্ত। একটি রাষ্ট্র ও তার প্রশাসন যখন নাগরিকদের নির্বোধ মনে করে, তখন একজন নাগরিক হিসেবে আমি অপমানিতবোধ করি। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে এটি করেছে তারা, যেখানে বলা হয়েছে, অনেকগুলো প্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকেরা প্রবেশ করতে পারবে না। ধরুন, ব্যাংকগুলোর হাজার হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণগ্রস্ত কারা—এ খবর মানুষকে জানানো দরকার বলে আমি মনে করি। প্রতিটি ব্যাংকে খোঁজাখুঁজির চাইতে এর জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকেই যাওয়া উচিত। সরকার বলছে, সেখানে সাংবাদিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ। আমি দায়িত্ব নিয়ে বলছি, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অধীনে এই বিধিমালা তৈরির আগে থেকেই জনগণের স্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য সংগ্রহের জন্য নানা পাবলিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ঢোকার পথ সাংবাদিকদের জন্য বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

পুরো গণমাধ্যমে একধরনের সেল্ফ সেন্সরশিপ ব্যবস্থা চলছে বলে অভিযোগ আছে।

নূরুল কবীর: একটি উদাহরণ দিই। আমি বলতে অহংকারবোধ করি যে আমি যে পত্রিকা সম্পাদনা করি, এখানে আপসকামী লোক নেই, কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের অ্যাজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য কেউ এখানে কিছু লেখেন না। তাঁদের সাহসের কোনো অভাবও ছিল না কখনো। কিন্তু সাম্প্রতিককালে তাঁদের মধ্যে সাহসের ঘাটতি আমি লক্ষ করি। তাঁরা জানেন যে সাংবাদিকতার কারণে কোনো বিপদে পড়লে সবার আগে তাঁদের সম্পাদক নিজের বুক ও মাথা দিয়ে তাঁদের রক্ষা করবেন। কিন্তু এখন তাঁরা ভাবেন সম্পাদকের কাছে খবর পৌঁছানোর আগে, যদি রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক কোনো সংস্থা ধরে নিয়ে যায় কিংবা সরকারি দলের উচ্ছৃঙ্খল কোনো নেতা-কর্মী যদি তাঁকে অপহরণ করে, তখন প্রথমেই তাঁর ওপর যে অত্যাচার হবে, সেটি থেকে সম্পাদক তঁাকে কীভাবে রক্ষা করবেন। তাঁদের এ চিন্তা তো ন্যায্য। এই চিন্তা এসেছে বিশেষত গত ১০ বছরে। এমনকি আওয়ামী লীগের ২০০৮ সালে নির্বাচিত সরকারের সময়েও এমন ভাবনা সংবাদকর্মীদের ভেতর ছিল না। একটি সরকার যখন যথাযথভাবে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় না আসে, তখন একটি নিপীড়নমূলক ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে তাকে টিকে থাকতে হয়। তখন মুক্ত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম তাদের জন্য প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়ায়। ফলে সেখানে নানাভাবে ভয়ের সংস্কৃতি সঞ্চার করা হয়েছে।

সংবাদমাধ্যমের এই দুরবস্থার জন্য এর অংশীজনদেরও কি দায় নেই? সামরিক শাসনামলেও তাদের প্রতিবাদী ভূমিকায় দেখেছি। এখন সেই ভূমিকা নেই কেন?

নূরুল কবীর: আমি প্রায়ই বলে থাকি, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা শুধু সংবাদমাধ্যম বা তার কর্মীদের জন্যই প্রয়োজন নয়। সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর যখন কোনো হুমকি আসে, সেটি গোটা জনগণের ওপরই আসে। কারণ, জনগণ তখন প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হয়। ফলে এর অংশীজন শুধু সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানের মালিক, সংবাদকর্মী ও সাংবাদিকদের ইউনিয়নই নয়; পাঠক, দর্শক আরও বৃহত্তর অর্থে গণতন্ত্রবাদী রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, যারা আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তর চায়, তারা প্রত্যেকে এর অংশীজন। ফলে সাংবাদিকতা–সংক্রান্ত সংবাদমাধ্যমের যে কমিটমেন্ট বা প্রতিশ্রুতি, তা রক্ষার দায় শুধু আমাদের নয়, জনগণকে বুঝতে হবে, এটি তার জন্যও সমস্যা।

সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ যে প্রেস কাউন্সিল আইন নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে, তাতে দোষী সংবাদপত্র ও সাংবাদিকে যথাক্রমে ১০ লাখ টাকা জরিমানা, অ্যাক্রেডিটেশন কার্ড বাতিল ও এক বছরের জন্য ডিক্লারেশন স্থগিত করার বিধান আছে। বিষয়টি কীভাবে দেখছেন?

নূরুল কবীর: সাংবাদিকতা করতে গেলে তো কিছু কিছু ভুল হতে পারে। এখন ভুল হলে তার প্রতিকার ব্যবস্থাও থাকা দরকার। যখন এ প্রেস কাউন্সিল আইন ছিল না, তখন অন্যান্য ফৌজদারি মামলা সংবাদমাধ্যম ও সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধে দেওয়া হতো। এর থেকে পরিত্রাণ পেতে সাংবাদিক ইউনিয়নের বড় নেতাদের দাবির মুখে প্রেস কাউন্সিল করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে যা হয়েছে, ফৌজদারি মামলাও আসে, এইটাও আসে। ফলে সাংবাদিকেরা দ্বৈত হয়রানির শিকারে পরিণত হয়েছে। এখন দাবি হওয়া উচিত, আমাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার সাপেক্ষে প্রেস কাউন্সিলকে শক্তিমান করা। ফৌজদারি আইনের আরোপ সাংবাদিকতার বিরুদ্ধে বন্ধ করা হোক। এখন দুইটাই জারি রাখে দুইভাবে সাংবাদিকদের শাস্তি দেওয়ার বিষয়টি সাংবাদিকতার জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর।

সম্পাদক হিসেবে কতটা স্বাধীনতা ভোগ করছেন? আপনি যা ভাবেন, তা কি নির্ভয়ে লিখতে বা বলতে পারেন?

নূরুল কবীর: আমি পারি। কারণ, এর ঝুঁকিগুলো আমি নিতে অভ্যস্ত। তার জন্য আমাদের পত্রিকা নানানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মালিকও ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। অনেকেই সংবাদপত্রকে ব্যবসায়িকভাবে লাভবান করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন, সরকারি বিজ্ঞাপনের ওপর সংবাদপত্রের নির্ভরশীলতা থেকে মুক্ত থাকার কথা বলেন। সাধারণভাবে এটা গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি। কিন্তু এটাও মনে রাখা দরকার, জনগণের জন্য দরকারি তথ্য সরকারি বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে দেওয়া হয় জনগণের অর্থেই। ফলে সেখানে সেই বিজ্ঞাপনের অর্থ ভালো সংবাদপত্রগুলো দাবি করবে না কেন? সে ক্ষেত্রে নিউ এজকে ভীষণভাবে বঞ্চিত করা হয়। ইংরেজি পত্রিকাগুলোর র‌্যাঙ্কিংয়ে নিউ এজকে ১৪ নম্বরে অধঃপতিত করা হয়েছে। অথচ অনেক মন্ত্রীও বাকি ১৩টির অধিকাংশের নামও জানেন না। বস্তুনিষ্ঠ তৎপরতার জন্য নিউ এজকে শায়েস্তা করার উদ্দেশ্যেই এটি করা হয়েছে বলে আমি মনে করি। এতে পত্রিকার আয় কমে যায়, ফলে মালিক ও সংবাদকর্মী, তথা গোটা পত্রিকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। জীবন, সম্ভ্রম ও জীবিকা—এ তিন ঝুঁকি নেওয়া ছাড়া বাংলাদেশে স্বাধীন সাংবাদিকতার কোনো পরিবেশ এই মুহূর্তে নেই।

কিন্তু যেসব দেশে গণতন্ত্র সংহত, সেসব দেশেও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হচ্ছে। কারণ কি?

নুরুল কবির: গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক বা স্বৈরতান্ত্রিক হোক—পৃথিবীর সব ধরনের সরকারেরই সাধারণের মানুষের কাছে তথ্য লুকানোর প্রয়োজন হয়। সব দেশে সব সরকারের ভেতরেই একটা অগণতান্ত্রিক শক্তি থাকে, যত দিন মানুষের নিরঙ্কুশ গণতান্ত্রিক স্বাধীনতা নিশ্চিত না হবে, তত দিন এ সমস্যা থাকবে। তবে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ওই সব স্বৈরতান্ত্রিকতা বা অগণতান্ত্রিক সরকারের তৎপরতার বিরুদ্ধে সেই সব সমাজে প্রতিবাদ আছে কী না। গণতন্ত্র সংহত আছে দেশগুলোতে, অনেকাংশেই সেটি দেখা যায়। ফলে সেখানে অতটা ভয় পেতে হয় না।

প্রথম আলো দুই যুগপূর্তি হলো। সংবাদমাধ্যম হিসেবে এর সাফল্য ও ব্যর্থতা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

নূরুল কবীর: পত্রিকা হিসেবে প্রথম আলো বাণিজ্যিকভাবে ভীষণ সফল। এই সময়ে এটি একটি বিরাট ব্যাপার। ওদিকে, বড় পত্রিকার সমস্যাও বড় হয়। যেহেতু তাদের খবর অনেক বেশি মানুষের কাছে পৌঁছায়, ফলে অনুমান করতে পারি, এই পত্রিকার সম্পাদক ও প্রকাশকের ওপর নানামুখী চাপটাও তত বেশি। সরকার ও রাষ্ট্রের সেসব চাপ সহ্য করে প্রথম আলো মানুষের পক্ষে অনেক কাজ করছে। তবে এই পত্রিকার মধ্যে নানা ঘরানার গণতান্ত্রিক মতামতের আরও বেশি প্রতিফলন দেখতে চাই। আমার মতে, সেটি পরিপূর্ণভাবে হচ্ছে না। তবে এটি প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নীতির বিষয়। ফলে বলব, এটি সমালোচনা নয়, আমার আকাঙ্ক্ষা মাত্র।

আপনাকে ধন্যবাদ।

নূরুল কবীর: আপনাদেরও ধন্যবাদ।