ইসলামের আলোকে নেতৃত্বের গুণাবলি

ইসলাম একমাত্র আল্লাহর মনোনীত ও গ্রহণযোগ্য পরিপূর্ণ জীবনবিধান। ইসলামি বিধিবিধানের পূর্ণাঙ্গ অনুসরণ করাই দুনিয়ার শান্তি ও পরকালে মুক্তির একমাত্র পথ। মানুষ সামাজিক জীব; সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করতে প্রয়োজন হয় নেতৃত্ব। যোগ্য নেতৃত্বের জন্য রয়েছে কিছু মহৎ গুণ।

জীবনে সফল ব্যক্তিই নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত হবেন, এটাই স্বাভাবিক। তাই সফল নেতৃত্বের জন্য প্রয়োজন বিশ্বাস, সৎকর্ম, কল্যাণকামিতা ও সহিষ্ণুতা। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘সময়ের শপথ! নিশ্চয় মানুষ ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। তবে তারা নয়, যারা বিশ্বাস করে, সৎকর্ম করে, একে অন্যকে সত্যের উপদেশ দেয় এবং ধৈর্যধারণে পরামর্শ দেয়।’ (সুরা-১০৩ আসর, আয়াত: ১-৩)

সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নেতৃত্বের উদাহরণ, ইনসানে কামিল, সর্বশেষ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদ (সা.)। সত্যতা, পবিত্রতা ও প্রেমিকতা এবং বিশ্বাস, আশা ও ভালোবাসায় পরিপূর্ণ ছিল তাঁর জীবন। নেতা হবেন স্নেহশীল ও দয়ালু। প্রিয় নবী (সা.)–এর বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তোমাদের কাছে এসেছে তোমাদের মধ্য থেকেই একজন এমন রাসুল, তোমাদের দুঃখকষ্ট তাঁর পক্ষে দুঃসহ, তিনি তোমাদের কল্যাণকামী, বিশ্বাসীদের প্রতি স্নেহশীল, দয়ালু।’ (সুরা-৯ তাওবা, আয়াত: ১২৮) 

নেতার স্বভাব রূঢ় হবে না। আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘হে নবী! আপনি যদি কর্কশভাষী, রূঢ় প্রকৃতির ও কঠোর স্বভাবের হতেন, তবে লোকেরা আপনার আশপাশ ছেড়ে চলে যেত।’ (সুরা-৩ আলে ইমরান, আয়াত: ১৫৯) 

নেতাকে সবার কল্যাণকামী হতে হবে। একবার সাহাবাগণ (রা.) বললেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.)! সাকিফ গোত্রের তিরগুলো আমাদের শেষ করে দিল। আপনি তাদের জন্য বদদোয়া করুন।’ তিনি বলেন, ‘আয় আল্লাহ! সাকিফ গোত্রকে হিদায়াত দান করুন।’ (তিরমিজি: ৩৯৪২)

নেতার নীতি হবে সবার সঙ্গে পরামর্শ করে কাজ করা। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) অপেক্ষা নিজের সাথিদের সঙ্গে অধিক পরামর্শ করতে আমি কাউকে দেখিনি।’ (তিরমিজি: ১৭১৪) নবী করিম (সা.) বলেন, ‘আমার উম্মতের মধ্যে যে ব্যক্তি পরামর্শ করে সে সোজা পথের ওপর থাকে, আর যে ব্যক্তি পরামর্শ করে না, সে চিন্তাযুক্ত থাকে।’ (বায়হাকি, খণ্ড: ৬, পৃষ্ঠা: ৭৬) 

নেতা সহজ–সরল ও ইতিবাচক হবেন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘মানুষের সঙ্গে সহজ আচরণ করো এবং কঠিন আচরণ কোরো না; সুসংবাদ শোনাও, বিমুখ
কোরো না।’ (বুখারি: ৬৯)

হজরত আয়েশা (রা.) বলেন, ‘আমার এ ঘরে রাসুল (সা.)–কে দোয়া করতে শুনেছি, “হে আল্লাহ! যে ব্যক্তি আমার উম্মতের যেকোনো কাজের দায়িত্বশীল নিযুক্ত হয় এবং লোকদের সঙ্গে নম্র ব্যবহার করে, আপনিও তার সঙ্গে নম্র ব্যবহার করুন।”’ (মুসলিম: ৪৭২২) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মুসলমান জনগোষ্ঠীর নেতা হয়, অতঃপর তাদের সঙ্গে প্রতারণামূলক কাজ করে এবং ওই অবস্থায় তার মৃত্যু হয়; তবে আল্লাহ–তাআলা তার জন্য জান্নাত হারাম করে দেবেন।’ (বুখারি) ‘যে ব্যক্তিকে আল্লাহ–তাআলা মুসলমানদের কোনো কাজের নেতা বানিয়েছেন, আর সে মুসলমানদের অবস্থা, প্রয়োজনগুলো ও তাদের অভাব–অনটন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ–তাআলা তার অবস্থা ও প্রয়োজনগুলো এবং অভাব–অনটন থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখবেন।’ (আবু দাউদ: ২৯৪৮) 

নবীজি (সা.) বলেন, ‘যদি কোনো কওম বা জামাতের মধ্যে কোনো ব্যক্তি কোনো গুনাহের কাজে লিপ্ত হয় এবং ওই কওম বা জামাতের মধ্যে শক্তি থাকা সত্ত্বেও তাকে বাধা না দেয়, তাহলে মৃত্যুর আগে দুনিয়াতেই তাদের ওপর আল্লাহর আজাব এসে যাবে।’ (আবু দাউদ)

নেতাদের করণীয় সম্বন্ধে আল্লাহ–তাআলা বলেন, ‘তাদের যদি আমি পৃথিবীতে নেতৃত্বের আসনে অধিষ্ঠিত করি, তারা নামাজ কায়েম করবে, জাকাত আদায় করবে, সৎকাজের আদেশ দেবে ও মন্দ কাজে বাধা দেবে; আর সব কর্মের পরিণতি আল্লাহর নিকট রয়েছে।’ (সুরা-২২ হজ, আয়াত: ৪১)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কাউকে দলের নেতা নিযুক্ত করল; কিন্তু তার চেয়ে বেশি আল্লাহ–তাআলাকে সন্তুষ্টকারী ব্যক্তি বিদ্যমান রয়েছে, সে আল্লাহ–তাআলার সঙ্গে খিয়ানত করল, রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর সঙ্গে খিয়ানত করল এবং ইমানদারদের সঙ্গে খিয়ানত করল।’ (মুসতাদরাকে হাকিম, খণ্ড: ৪, পৃষ্ঠা: ৯২)

অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী 

সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম

[email protected]