ইসলামের আলোকে সমাজসেবার তাৎপর্য 

ইসলাম সমাজকল্যাণমূলক ধর্ম। মানবকল্যাণ ও সমাজকল্যাণ ইসলামের অন্যতম লক্ষ্য। ইসলাম ও সমাজকল্যাণ একটির সঙ্গে অন্যটি ওতপ্রোতভাবে
জড়িত। সামাজিক জীবনে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। 

ইসলাম মানুষকে অন্যের কল্যাণে পারস্পরিক সাহায্য-সহযোগিতা করতে অনুপ্রাণিত করে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা সৎকর্ম ও আল্লাহভীতি কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে পরস্পরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা-৫ মায়িদাহ, আয়াত: ২) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কল্যাণকামিতাই দ্বীন, কল্যাণকামিতাই দ্বীন, কল্যাণকামিতাই দ্বীন।’ (নাসাঈ: ৪২১০; আবু দাউদ: ৪৯৪৪) 

জারির বিন আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘আমি এ মর্মে রাসুলুল্লাহ (সা.)–এর কাছে বায়াত গ্রহণ করেছি যে সালাত প্রতিষ্ঠা করব, জাকাত দেব এবং প্রত্যেক মুসলমানের জন্য কল্যাণ কামনা করব।’ (বুখারি: ৫৭,৫২৪ ও ১৪০১; মুসলিম: ৫৬; তিরমিজি: ১৯২৫) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের ততক্ষণ পর্যন্ত সাহায্য করতে থাকেন, যতক্ষণ সে তার ভাইকে সাহায্য করতে থাকে।’ (মুসলিম: ২৬৯৯; তিরমিজি: ২৯৪৫; আবু দাউদ: ৪৯৪৬; ইবনু মাজাহ: ১৮৫) 

কাফেরদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তুমি কি দেখেছ তাকে, যে বিচার দিবসকে অস্বীকার করে? সে হলো ওই ব্যক্তি, যে ইয়াতিমকে গলাধাক্কা দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদানে উৎসাহিত করে না।’ (সুরা-১০৭ মাউন, আয়াত: ১-৩) 

আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘পূর্ব ও পশ্চিমে মুখ ফেরানোটাই কেবল সৎকর্ম নয়, বরং প্রকৃত সৎকর্মশীল সেই ব্যক্তি, যে বিশ্বাস স্থাপন করে আল্লাহতে, বিচার দিবসে, ফেরেশতায়, আল্লাহর কিতাবে ও নবীগণে এবং যে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন, মুসাফির, প্রার্থী ও দাসমুক্তির জন্য সম্পদ ব্যয় করে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ১৭৭) 

‘তোমরা আল্লাহ ব্যতীত কারও দাসত্ব করবে না এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, ইয়াতিম ও অভাবগ্রস্তদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করবে।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ৮৩) 

যুদ্ধলব্ধ সম্পদের একটি অংশ ইয়াতিমদের জন্য নির্ধারিত করে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা জেনে নাও যে যুদ্ধে তোমরা যেসব বস্তু গনিমতরূপে লাভ করেছ, তার এক–পঞ্চমাংশ হলো আল্লাহ, তাঁর রাসুল, তাঁর নিকটাত্মীয়, ইয়াতিম, মিসকিন ও মুসাফিরদের জন্য।’ (সুরা-৮ আনফাল, আয়াত: ৪১) 

জান্নাতি লোকদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘তারা আল্লাহর মহব্বতে অভাবগ্রস্ত, ইয়াতিম ও বন্দীদের আহার্য প্রদান করে। (তারা বলে) শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য আমরা তোমাদের খাদ্য দান করি। আর আমরা তোমাদের নিকট থেকে কোনো প্রতিদান ও কৃতজ্ঞতা কামনা করি না।’ (সুরা-৭৬ দাহার, আয়াত: ৮-৯)

ইয়াতিম প্রতিপালনকারীদের মর্যাদা সম্পর্কে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আমি ও ইয়াতিম প্রতিপালনকারী জান্নাতে এভাবে থাকব।’ এ বলে তিনি তর্জনী ও মধ্যমা অঙ্গুলি দিয়ে ইশারা করলেন এবং এ দুটির মধ্যে কিছুটা ফাঁকা করলেন। (বুখারি: ৫৩০৪; মুসলিম: ২৯৮৩; সুনানে আবু দাউদ: ১১০; মিশকাত: ৪৯৫২) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মাতা-পিতা মারা যাওয়া কোনো মুসলিম ইয়াতিমকে স্বাবলম্বী হওয়া পর্যন্ত নিজ পানাহারে শামিল করে, ওই ব্যক্তির জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যায়।’ (মুসনাদে আহমাদ: ১৯০৫; সহিহ আলবানি: ৬/৮৯৪) 

প্রিয় নবীজি (সা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি বিধবা ও মিসকিনদের সমস্যা সমাধানের জন্য ছোটাছুটি করে, সে যেন আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে লিপ্ত। বর্ণনাকারী বলেন, আমার মনে হয় রাসুলুল্লাহ (সা.) এ কথাও বলেছেন, সে যেন ওই ব্যক্তির ন্যায় যে সারা রাত সালাত আদায় করে এবং সারা বছরই সিয়াম পালন করে।’ (বুখারি: ৫৩৫৩,৬০০৬, ৬০০৭; মুসলিম: ২৯৮২; তিরমিজি: ১৯৬৯; ইবনু মাজাহ: ১৭৫৩; নাসাঈ: ২৫৭৬) 

নিঃস্ব, দরিদ্র ও ক্ষুধার্তকে খাদ্য দান করার জন্য মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ও রাসুলুল্লাহ (সা.) তাগিদ দিয়েছেন। 

কাফেরদের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘তুমি কি দেখেছ তাকে, যে বিচার দিবসকে অস্বীকার করে? সে হলো ওই ব্যক্তি, যে ইয়াতিমকে গলাধাক্কা দেয় এবং অভাবগ্রস্তকে খাদ্যদানে উৎসাহিত করে না।’ (সুরা-১০৭ মাউন, আয়াত: ১-৩) 

অভাবীদের খাদ্য দান না করা জাহান্নামিদের বৈশিষ্ট্য। পরকালে জান্নাতিরা জাহান্নামিদের জিজ্ঞাসা করবে, ‘কোন বস্তু তোমাদের “সাকারে” (জাহান্নামে) প্রবেশ করাল? তারা বলবে, আমরা মুসল্লিদের অন্তর্ভুক্ত ছিলাম না, আর আমরা অভাবগ্রস্তকে আহার্য দিতাম না।’ (সুরা-৭৪ মুদ্দাছছির, আয়াত: ৪২-৪৪)। 

অধ্যক্ষ মুফতি মাওলানা শাঈখ মুহাম্মাদ উছমান গনী 

সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয় ইমাম সমিতি; সহকারী অধ্যাপক, আহ্ছানিয়া ইনস্টিটিউট অব সুফিজম। [email protected]