ডেসমন্ড টুটু: একটি নক্ষত্রের কক্ষচ্যুতি

ডেসমন্ড টুটু

ন্যায্যতার আকাশ থেকে ঝরে পড়ল আরেকটি নক্ষত্র। ডেসমন্ড টুটু, দক্ষিণ আফ্রিকার অ্যাংলিকান চার্চের আর্চবিশপ। তিনি ছিলেন ন্যায় ও নৈতিকতার প্রতীক। তাঁর জন্ম হয়েছিল ১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ৭ অক্টোবর জোহানেসবার্গের ক্লাকসড্রপে একটি শিক্ষক পরিবারে। বাবা জাকাইরয়া টুটু ছিলেন ট্রান্সভালের সোনার খনি অঞ্চলের শিক্ষক আর মা আলোট ছিলেন গৃহিণী। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পিতার শিক্ষকতাকেই তিনি পেশা হিসেবে বেছে নেন। ১৯৬০ খ্রিষ্টাব্দে তিনি চার্চের সেবায় দীক্ষিত হন এবং লন্ডনের কিংস কলেজে ধর্মতত্ত্ব অধ্যয়ন করেন। অধ্যয়নকালে দক্ষিণ আফ্রিকার রাজনৈতিক-সামাজিক প্রেক্ষাপটের ওপর বিভিন্ন চার্চে ও প্রতিষ্ঠানে বক্তৃতা করে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করেন। ১৯৭২ খ্রিষ্টাব্দে তিনি ‘ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চেস’-এর থিওলজিক্যাল এডুকেশন ফান্ডের সহযোগী পরিচালক পদে নিযুক্ত হন।

১৯৭৫ সালের সেপ্টেম্বরের দ্বিতীয়ার্ধে কেনিয়ার রাজধানী নাইরোবিতে ‘ওয়ার্ল্ড কাউন্সিল অব চার্চেস’-এর মহাসমাবেশ হয়। আমি তখন ‘ন্যাশনাল কাউন্সিল অব চার্চেস বাংলাদেশ’-এর সাধারণ সম্পাদক। নাইরোবির ওই সমাবেশে যোগ দেওয়ার সুযোগ পাই। এ সময় সমাবেশ কেন্দ্রের কফি শপে রেভারেন্ড টুটুর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয়। তিনি বাংলাদেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল ছিলেন। বিশেষ করে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকাণ্ডকে মানবতার প্রতি নির্মম আঘাত বলে অভিমত ব্যক্ত করেন। বাংলাদেশের চার্চের থিওলজিক্যাল এডুকেশন বিষয়ে খোঁজখবর নেন। পরবর্তীকালে জেনেভায় দুবার তাঁর সঙ্গে দেখা হয়েছে, আলোচনা হয়েছে।

১৯৭৭ খ্রিষ্টাব্দে তিনি লেসোথোর বিশপের দায়িত্ব গ্রহণ করেন, একই সঙ্গে তিনি ‘সাউথ আফ্রিকান কাউন্সিল অব চার্চ’-এর জেনারেল সেক্রেটারি নিযুক্ত হন। সত্তরের দশক থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী সরকারের নীতির কঠোর সমালোচক ছিলেন তিনি। নেলসন ম্যান্ডেলার মুক্তি ও আফ্রিকার কালো মানুষের মুক্তির সংগ্রামে ব্রতী হন। ১৯৮৪ সালে তাঁকে শান্তির জন্য নোবেল পুরস্কার প্রদান করা হয়। ১৯৮৫ সালে তিনি জোহানেসবার্গের বিশপ এবং পরবর্তী বছরে দক্ষিণ আফ্রিকার আর্চবিশপের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ আর্চবিশপ।

তাঁর সঙ্গে আমার শেষবার দেখা হয় ২০০০ সালে ‘ইউনাইটেড বাইবেল সোসাইটি’র বিশ্ব সম্মেলনে জোহানেসবার্গে। তখন তিনি বার্ধক্যে কিছুটা মন্থর কিন্তু কথনে কোনো পরিবর্তন ছিল না। সেই উজ্জ্বল হাসিতে উদ্ভাসিত মুখ।

আর্চবিশপ টুটু যে শুধু দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন, তা নয়! ফিলিস্তিনিদের ন্যায্য অধিকার, ইরাকে মার্কিন বাহিনীর জঘন্য হামলা এবং বিশ্বে যেখানে মানবতা লাঞ্ছিত হয়েছে, সেখানেই তাঁর কণ্ঠ সরব হয়েছে। তাঁকে বলা হতো ‘দক্ষিণ আফ্রিকার নৈতিকতার দিকনির্দেশক, বর্ণবাদী সরকারের বৈষম্যের পথের কাঁটা’। তিনি দক্ষিণ আফ্রিকার বিখ্যাত ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন’-এর প্রবক্তা ও প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তাঁর একটি বিখ্যাত উক্তি, ‘মৃত্যুপথযাত্রী ব্যক্তির পৃথিবী ছেড়ে যাওয়ার সময়ও নির্বাচনের অধিকার রয়েছে।’

ব্যক্তিজীবনে তিনি চার সন্তানের জনক। ৯০ বছর বয়সে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে বড়দিনের পরদিন গত ডিসেম্বর ২৬ ইহলোক ত্যাগ করেন। তিনি একজন লেখকও ছিলেন। চার্চে তাঁর উপদেশগুলোর কয়েকটি প্রকাশনাসহ তাঁর উল্লেখযোগ্য বই হচ্ছে ‘ক্রাইং ইন দ্য ওয়াইল্ডারনেস’ (১৯৮২) ও ‘হোপ অ্যান্ড সাফারিং’ (১৯৯৩)। তিনি অহিংস নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন। এমন সংগ্রামী ন্যায্যতার প্রতীককে ‘পৃথিবী একবার পায় তারে/ পায় নাকো আর’।

ড. ডেনিস দিলীপ দত্ত অবসরপ্রাপ্ত চার্চকর্মী