বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বিংশ শতাব্দীর অন্যতম প্রভাবশালী কবি নাজিম হিকমত কিন্তু বিপ্লবী ধারার কবি হিসেবেই প্রতিষ্ঠিত। রোমান্টিক কমিউনিস্ট হিসেবেই তাঁর পরিচিতি। শিল্পের জন্য, শিল্প বা কবিতার জন্য কবিতা নয়; বরং ‘মানুষের জন্য সবকিছু’ এই কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে উজ্জীবিত হয়েছিলেন নাজিম হিকমত ছেলেবেলা থেকেই। ছেলেবেলা থেকে তিনি স্বপ্ন দেখতেন—একদিন মানুষের মুক্তি হবে। স্বপ্ন দেখতেন, দরিদ্র ও নিম্ন বর্গের মানুষ একদিন রাষ্ট্রে তাদের ন্যায্য অধিকার ফিরে পাবে। স্বপ্ন থেকেই শুরু হয় সংগ্রাম। খুব অল্প বয়সেই তিনি বুঝতে পারলেন, বিপ্লব ছাড়া মুক্তি নেই। বুঝলেন, বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট–ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই পূর্ণ হতে পারে তাঁর সেই স্বপ্ন। যুক্ত হয়ে গেলেন বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে। লেখালেখি শুরু করে দিলেন বিপ্লবী ধারার পত্রিকায়।
কিন্তু জন্মভূমি তুরস্কে তখন চলছে চরম দক্ষিণপন্থী সরকারের শাসন। যেকোনো বামপন্থী কার্যক্রম কঠোর হাতে দমন করা হচ্ছিল। ১৯২৪ সালে মাত্র ২২ বছর বয়সে বন্দী হলেন প্রথমবার। কিন্তু স্বৈরশাসক বেশি দিন রাখতে পারেননি তাঁকে জেলে। তাঁর মুক্তির জন্য বিবৃতি দিলেন, মিছিল করলেন পাবলো নেরুদা, জ্যঁ পল সার্ত্র ও আরও অনেক সাহিত্যিক ও বুদ্ধিজীবী। বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ হলো। মুক্তি দিতে বাধ্য হলো সরকার।

মুক্তি পেয়েই নাজিম সোজা চলে গেলেন রাশিয়ায়। দীক্ষা নিলেন মার্ক্সীয় রাজনীতির। সান্নিধ্য পেলেন কালজয়ী রুশ কবি মায়াকোভস্কির। লিখতে থাকলেন একের পর এক কবিতা। ছাপা হতে লাগল একের পর এক বই। যে বই বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ল। বহু ভাষায় অনূদিত হলো। দেশে দেশে বিপ্লবের প্রেরণা হয়ে উঠল নাজিমের কবিতা।

স্বদেশের জন্য কাজ করার মানসে নাজিম ফিরে গেলেন ইস্তাম্বুলে। কিন্তু আবার বন্দী হলেন। এবার জেলে থাকলেন একটানা আট বছর। এ সময়েই তাঁর কলম দিয়ে বেরোল কালজয়ী কবিতা ‘জেলখানার চিঠি’ যা এক দিকে মর্মস্পর্শী, অন্য দিকে বিপ্লবের জন্য গভীর প্রেরণা। দেশে দেশে খোলা আকাশের নিচে, সড়ক দ্বীপে, মিছিলে আজও ধ্বনিত হয় ‘জেলখানার চিঠি’। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর হলো ‘জেলখানার চিঠি’র নায়িকা শুধুই কাল্পনিক। মেয়েটির অস্তিত্ব ছিল কেবলই স্বপ্নে, যেন মার্ক্সীয় ভাবধারার কবি বিষ্ণু দের ‘ঘোড় সওয়ার’ কবিতার মতো, যা তিনি পেয়েছিলেন স্বপ্নে। হিকমত লিখেছেন, ‘আমি কল্পনায় নির্দিষ্ট চেহারার একটি মেয়েকে দেখতে পেতাম। তাঁকে স্বপ্নে দেখতাম। তাঁকে ঘিরেই কেটেছে আমার বন্দিজীবন। তাঁকে নিয়েই লিখেছি সব কবিতা। সে-ই ছিল আমার ভালোবাসা ও প্রেরণা। এ কাল্পনিক ভালোবাসা আর প্রেরণাই আমাকে বাঁচিয়ে রেখেছে জেলখানার নির্জন প্রকোষ্ঠে।’

নাজিম শেষবারের মতো দেশ ছাড়েন ১৯৫১ সালে। বসবাস শুরু করেন রাশিয়ায়। এক পার্টিতে দেখা হয় ভেরা নামের এক রুশ তরুণীর সঙ্গে, যে ছিল নাজিমের চেয়ে ৩০ বছরের ছোট। দেখামাত্রই প্রেম। কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে নাজিম লিখেছেন, ‘বন্দিজীবনে ১৭ বছর যে মেয়েটিকে আমি কল্পনায় দেখতে পেতাম, স্বপ্নে দেখতাম, তাঁর চেহারা আর ভেরার একই চেহারা, যা বিস্ময়েরও অতীত। অতএব, ভেরার প্রেমে না পড়ে উপায় ছিল না।’

দেখা হওয়ার পর থেকেই প্রতিদিন কয়েকবার করে ফোন করা শুরু করলেন ভেরাকে। ভেরার জীবনে নাজিমের আবির্ভাবও ছিল স্বপ্নের মতো কারণ, তিনি শুধু নামই শুনেছেন নাজিমের, রুশ ভাষায় অনূদিত কবিতা পড়েছেন, হয়তো প্রেমেও পড়েছেন কবির কিংবা কবিতার। ভেরার জন্য নাজিমের কাছে আসা এতটা সহজ ছিল না কারণ, তিনি ছিলেন বিবাহিত। কিন্তু প্রেমের তোড়ে এক সময় ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল সেই বিয়ের বন্ধন। গভীর প্রেমের বন্যায় ভেসে গেল দুজনেরই জীবনের তরি।

বিয়ে করলেন নাজিম ও ভেরা। কিন্তু আটপৌরে জীবনের মতো সংসার বাঁধা হলো না কাব্য সাধনায়; বরং এক ছাদের নিচে বাস করেও প্রেম গাঢ় থেকে গাঢ়তর হলো, যা কবিতা লেখায় আরও বেশি শক্তি জোগাল। এভাবে চলছিল প্রেম, সংসার ও কাব্যসাধনা। কিন্তু ছন্দপতন ঘটল জীবনে হঠাৎ। বড় ধরনের হার্ট অ্যাটাক হলো নাজিমের। বেঁচে গেলেন সেই যাত্রায়। তবে ভয় জেঁকে বসল গভীরভাবে। নাজিম অনেক দিন বাঁচতে চেয়েছিলেন, শুধু ভেরাকে ভালোবেসে জীবনপাত্র পূর্ণ করতে চেয়েছিলেন। সেই ভয়ই সত্যি হলো। আবার হার্ট অ্যাটাক হলো। এবার আর ফিরে এলেন না কবি। ১৯৬৩ সালে এক গ্রীষ্মের রাতে বিদায় নিলেন ভেরার কাছ থেকে, বিদায় নিলেন পৃথিবী থেকে। আর পৃথিবীর জন্য রেখে গেলেন এক কাব্যসম্ভার যা এতই গভীর, এতই সুদূরপ্রসারী যে তা ভেসে বেড়াবে কাল থেকে কালান্তরে।

নাজিমের মৃত্যুর পর আক্ষরিক অর্থেই পাগলের মতো হয়ে গিয়েছিলেন ভেরা। প্রতিদিন কবরের কাছে চলে যেতেন তিনি। আর কথা বলতেন কবরে শুয়ে থাকা নাজিমের সঙ্গে। এভাবে অনেক দিন চলছিল। অনেক দিন লেগেছিল তাঁর স্বাভাবিক হতে। নাজিমের সঙ্গে যেসব কথা নিয়ে বই বের হয়েছে ‘নাজিমের সঙ্গে শেষ কথোপকথন’ শিরোনামে, যা তুর্কি ও রুশ ভাষায় পাওয়া যায়। নাজিম-ভেরার প্রেমকাহিনি রূপকথাকেও হার মানায়। শ্রেষ্ঠ প্রেমকাহিনিতে জায়গাও করে নিয়েছে পৃথিবীর ইতিহাসে।

নাজিম হিকমতের কবিতায় দেশপ্রেম ও ব্যক্তিপ্রেম মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় যেন প্রেমিকের ভালোবাসা ও দেশপ্রেমের যুগলবন্দী। নাজিমের কবিতা মানুষের, বিশেষ করে খেটে খাওয়া মানুষের মুক্তির কথা বলে। প্রেমিকার জন্য কবির যে ভালোবাসা, তাঁর গভীরে থাকে মাটি ও মানুষ। ভূপেন হাজারিকার গানের মতো, ‘আমি ভালোবাসি মানুষকে, তুমি ভালোবাসো আমাকে। আমাদের দুজনের সব ভালোবাসা আজ এসো বিলিয়ে দেই এই দেশটাকে।’

বাংলাদেশে ও ভারতে কমিউনিস্ট আন্দোলনে গভীর প্রেরণা ছিল নাজিম হিকমতের কবিতা। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় যে কটি কবিতা অনুবাদ করেছেন, তার মধ্যে ‘জেলখানার চিঠি’ কবিতাটিই শ্রেষ্ঠ। আমাদের মুক্তি আজও হয়নি। জোড়াতালি দিয়ে চলছে সমাজ, রাষ্ট্র ও জীবন। সে জন্য, মুক্তিকামী মানুষ আবার নিশ্চয়ই একদিন ঘুরে দাঁড়াবে, মিছিলে যাবে। রাজপথে, সড়কদ্বীপে হয়তো আবার শোনা যাবে নাজিমের কবিতা:
‘প্রিয়তমা আমার,
তোমার শেষ চিঠিতে
তুমি লিখেছ:
যদি ওরা তোমাকে ফাঁসি দেয়
তোমাকে যদি হারাই,
আমি বাঁচব না
.........’

[আজ ১৫ জানুয়ারি এই মহান কবির জন্মদিনে তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসা]

এন এন তরুণ রাশিয়ার সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর ও সাউথ এশিয়া জার্নালের এডিটর অ্যাট লার্জ
এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ মালয়েশিয়ার ইউনিভার্সিটি মালায়ার উন্নয়ন অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক
শুভ বসু কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক

স্মরণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন