বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এখনো আদালতপাড়ায় যখন কিছু ঘটতে দেখি, মিজানুর রহমানের খানের কথা ভীষণ মনে পড়ে; তাঁর অভাব বোধ করি। ঢাকার বাইরে থেকে, এমনকি দেশের বাইরে থেকেও অনেক টেলিফোন করে তার পুরোনো লেখা নিয়ে কথা বলতেন।

গত এক বছরে বিভিন্ন সভা-অনুষ্ঠানে যখনই কোনো জ্যেষ্ঠ আইনজীবীর সঙ্গে দেখা হয়েছে, আক্ষেপ করে বলেছেন, মিজান নেই, এখন পত্রিকায় আদালতপাড়া নিয়ে তোলপাড় করা খবর হয় না। বিচার বিভাগের অনিয়ম নিয়ে তেমন কেউ লেখেন না। এ আমাদের অপূরণীয় ক্ষতি। বিচারক থেকে আইনজীবী—সবাই তাঁর রিপোর্ট ও বিশ্লেষণের ওপর ভরসা করতেন। এখন তাঁরা কার ওপর ভরসা করবেন?

আদালতের বিচারকদের পদায়ন-বদলি থেকে শুরু করে উচ্চ আদালতের পাইকারি জামিন-সবকিছু নিয়ে লিখতেন; তাঁর কলামে প্রতিটি তথ্যে বিশ্লেষণ থাকত; কেউ তাঁর বিশ্লেষণের সঙ্গে একমত না হলেও তথ্য ও যুক্তি অস্বীকার করতে পারতেন না। একটি কলাম নিয়ে তাঁকে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছিল, আদালত চলাকালে কারাদণ্ডও দেওয়া হয়েছিল তাঁকে। আমাদের সাংবাদিকতার ইতিহাসে এমন নজিরও দুর্লভ।

কেবল আদালতপাড়া নয়, গ্রামে স্বামীর সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত নারী থেকে শুরু করে নদীদূষণের হোতা, হাসপাতালে চিকিৎসা না পাওয়া শিশুর আহাজারি থেকে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়নের ভয়াবহ চিত্রও থাকত তাঁর কলামে, অনুসন্ধানী রিপোর্টে। মৃত্যুর কয়েক মাস প্রথম আলোয় তাঁর কলামের নাম ছিল ‘সরল গরল’। সমাজের, রাজনীতির, প্রশাসনের যেখানে গরল বা অসংগতি দেখতেন, তাঁর শাণিত ভাষায় তুলে ধরতেন। আবার সরকারের ভালো কাজের প্রশংসা করতেন অকুণ্ঠচিত্তে।

default-image

আইন ও বিচার বিষয়ে লেখালেখি করে মিজানুর রহমান খান খ্যাতি অর্জন করেছেন; কিন্তু তাঁর অনুসন্ধিৎসা কেবল আইনের অঙ্গনেই সীমিত ছিল না; ইতিহাস, রাজনীতি, মুক্তিযুদ্ধ, জনপ্রশাসন, নির্বাচন, মানবাধিকার, বৈদেশিক সম্পর্ক, রোহিঙ্গা সমস্যা—সবকিছু নিয়ে তিনি লিখেছেন, সভা-সেমিনারে কথা বলেছেন। আমাদের সংবিধান যে গণতান্ত্রিক নয়, একনায়কতন্ত্রের উৎস, সে কথা বিভিন্ন অনুচ্ছেদ ধরে ধরে তিনি পত্রিকার পাতায় তুলে ধরেন।

যেসব প্রখ্যাত আইনজীবী সংবিধান রচনার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, ব্যক্তিগত সুসম্পর্কের সুবাদে তিনি তাদের জিজ্ঞেসও করেছেন। তাঁরা সদুত্তর দিতে পারেননি। এখন অনেক রাজনীতিকও সংবিধানের এই দুর্বলতার কথা বলেন। কিন্তু সে সময়ে তাঁরা এটাকে সমস্যাই মনে করেননি। কেবল ৭০ অনুচ্ছেদ নিয়ে কথা বলেছেন।

পেশায় সাংবাদিক হলেও মিজানুরের মধ্যে একটি গবেষক মন ছিল। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ কংগ্রেসে দুই মাস নিরন্তর পরিশ্রম করে বের করেছেন পঞ্চাশ থেকে সত্তরের দশক পর্যন্ত বাংলাদেশ নিয়ে মার্কিন দলিল-নথি-ডেসপাস ইত্যাদি। সেই তথ্য ভান্ডারের প্রায় পুরোটা ফটো কপি করে নিয়ে এসেছেন।

২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমার সরকারের গণহত্যার বিরুদ্ধে কুয়ালালামপুরে আয়োজিত আন্তর্জাতিক গণ-আদালতে যে শুনানি হয়, তার খবর সংগ্রহের জন্য সেখানে গিয়েছিলেন মিজানুর রহমান খান। কুয়ালালামপুর থেকে তিনি প্রতিদিনের রিপোর্ট করার পাশাপাশি গণ-আদালতের বিচারক ও আইনজীবীদের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। রাশিয়ার মস্কোয় তিনি একাধিকবার আন্তর্জাতিক সেমিনারে অংশ নিয়েছেন। সেখানেও খুঁজে বের করেছেন বিপ্লব-উত্তর সোভিয়েত ইউনিয়নে বাঙালি কমিউনিস্ট নেতাদের সম্পর্কিত দলিলপত্র।

যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী মিয়ানমারের মানবাধিকারকর্মী মং জার্নি, জার্মান নিরাপত্তা বিশ্লেষক সিগফ্রিড উলফকে বাংলাদেশের পাঠকদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কৃতিত্বও তাঁর। কিংবা যদি আমরা ভারতের সাবেকে সেনা কর্মকর্তা জে এফ আর জ্যাকবের কথা ধরি, যিনি ১৯৭১ সালে ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানিদের আত্মসমর্পণের অন্যতম কারিগর। জ্যাকবের লেখা সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা বইয়ের বাইরেও অনেক তথ্য মিজানুর বের করে এনেছেন তাঁর সঙ্গে ই-মেইল চালাচালি ও আলাপচারিতায়।

মিজানুর রহমান খান যখন বিচার বিভাগ নিয়ে লিখতেন, মনে হতো এ বিষয়ে তিনি বিশেষজ্ঞ, যদিও তাঁর একাডেমিক পড়াশোনা হিসাববিজ্ঞানে। তিনি যখন করোনা মহামারির আদ্যোপান্ত রিপোর্ট করতেন, মনে হতো স্বাস্থ্যসেবাই তাঁর আগ্রহের প্রধান বিষয়। কিংবা যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি নিয়ে লিখতেন, মনে হতো এ বিষয়েও তাঁর জ্ঞানের গভীরতা আছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, তিনি এক সময় কূটনৈতিক রিপোর্টার হিসেবেও তিনি সুনাম কুড়িয়েছিলেন।

কূটনৈতিক রিপোর্টারদের সংগঠন ডিকাব এ জন্য তাকে সম্মানানাও দিয়েছিল। মিজানুর তাঁর অনুশীলন ও অধ্যবসায় দিয়ে নিজেকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, অন্যদের ছাড়িয়ে গিয়েছিলেন। আমাদের সাংবাদিকতায় এই উদাহরণ খুব বেশি নেই।

মিজানুর রহমান খানের সাংবাদিকতার শুরু স্কুলে পড়া অবস্থায়, জন্মস্থান ঝালকাঠীর নলছিটি উপজেলা থেকে বরিশালের পত্রিকায় খবর পাঠানোর মাধ্যমে। এরপর কলেজে উঠে বরিশালের দুটি পত্রিকায় কাজ করেন—দক্ষিণাঞ্চল ও বিপ্লবী বাংলাদেশ। দিনে শ্রেণিকক্ষে, রাতে পত্রিকার অফিসে। পড়াশোনা শেষ হলে বরিশালের পাট চুকিয়ে তিনি ঢাকা আসেন এবং দৈনিক খবর-এ রিপোর্টিং শুরু করেন। এরপর নিউ নেশন, মুক্তকণ্ঠ, যুগান্তর, সমকাল হয়ে প্রথম আলোতে স্থিত হন।

কলাম লিখে জনপ্রিয়তা লাভ করলেও মিজানুর রহমান খান নিজেকে একজন রিপোর্টার হিসেবে পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন। কলামের পাশাপাশি প্রথম আলোতে রিপোর্ট ছাপা হলে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতেন, না হলে মন খারাপ করতেন। তবে তাঁর এই মন খারাপের মেয়াদ ২৪ ঘণ্টার বেশি ছিল না। পরদিন সম্পাদক অন্য কোনো বিষয়ে রিপোর্ট করতে বললে সেই দায়িত্ব সানন্দে গ্রহণ করতেন এবং রিপোর্টটি ছাপা হওয়া নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত অফিসে থাকতেন।

মিজানুর রহমান খান ছিলেন ২৪ ঘণ্টার সাংবাদিক। দিনে-রাতে সব সময় তিনি তথ্য নিয়ে থাকতেন। কেবল নথি বা কাগজের ওপর নির্ভর করতেন না। যত দূরেই হোক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের খুঁজে বের করতেন, তাদের সঙ্গে কথা বলতেন। তাঁর একটি আশ্চর্য গুণ ছিল—পেশাগত কিংবা অন্য কারণে যার সঙ্গে একবার সম্পর্ক হতো, তার সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। তক্কে তক্কে থাকতেন নতুন কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না। এক কথায় বলা যায়, ‘সংবাদ শিকারি।’

আমরা অফিসে প্রায়ই দেখতাম বিচারবঞ্চিত গরিব ও প্রান্তিক মানুষ তাঁর কাছে এসে নিজেদের দুঃখ ও বেদনার কথা বলছেন। তাঁদের ধারণা, তিনি কিছু লিখলে বা কাউকে বলে দিলে প্রতিকার হবে। অনেকে তাঁর বাসায় গিয়েও ধরনা দিতেন। শুনেছি, এদের দেশের বাড়িতে ফেরার জন্য যাওয়ার জন্য লঞ্চ ভাড়া, বাস ভাড়াও থাকত না। তিনি নিজের পকেট থেকে তাদের যাওয়ার ভাড়াটা দিয়ে দিতেন। যদিও প্রতি মাসে তাঁকে সংসার চালানোর জন্য ধারকর্জ করতে হতো। এই ছিলেন মিজানুর রহমান খান। কেবল সাংবাদিক হিসেবে বড় ছিলেন না, মানুষ হিসেবেও বড় ছিলেন।

আমরা বিস্মিত হতাম সারা দিন অফিসে পড়ে থাকা মানুষটির পরিবার, বিশেষ করে স্ত্রী, দুই ছেলে ও এক মেয়ের প্রতি তাঁর দায়িত্বশীলতা দেখে। অফিসে বসেও সন্তানদের পড়াশোনার অগ্রগতি ও পরীক্ষা সম্পর্কে নিয়মিত খোঁজখবর নিতেন। তাঁর বড় ছেলে সাদমান মিজানুর খান আইনশাস্ত্রে স্নাতক করে এখন প্র্যাকটিস করছে, ছোট ছেলে আনান মিজানুর খান এ লেবেল দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। মেয়ে আফসারা মিজানুর খান স্থাপত্যবিদ্যায় স্নাতক তৃতীয় বর্ষে পড়ছে। বাবার ইচ্ছা ছিল বড় ছেলে সাদমানকে যুক্তরাজ্যে পাঠাবেন বার অ্যাট ল পড়াতে। সবকিছু ঠিকঠাক ছিল, এরই মধ্যে করোনার প্রকোপ বেড়ে যাওয়ায় তার যাওয়া পিছিয়ে যায়। আমরা নিশ্চিত, বাবার সেই ইচ্ছা পুত্র পূরণ করবেই।

করোনা সংক্রমণের শুরুতে সবাই যখন ঘরবন্দী, তখন মিজানুর এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটে বেড়িয়েছেন কোথায় রোগ পরীক্ষায়, স্বাস্থ্যসেবায় কী সমস্যা, সেসব নিয়ে রিপোর্ট করতে। জনস্বাস্থ্য কেন্দ্রের তৎকালীন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বিজন কুমার শীলের র‍্যাপিড টেস্ট কিড চালুর বিষয়টি তিনি নিয়েছিলেন জিহাদ হিসেবে। কোন হাসপাতালে কোন সাংবাদিক বন্ধু বা আত্মীয় ভর্তি হয়েছেন, তাঁদের চিকিৎসা নিয়েও উদ্বিগ্ন থাকতেন।

একদিন অ্যান্টিজেন পরীক্ষা করে এসে বললেন, তাঁর শরীরে অ্যান্টিবডি তৈরি হয়েছে। এখন আর সংক্রমণের ভয় নেই। আমরাও মোটামুটি নিশ্চিন্ত ছিলাম। তিনি করোনামুক্ত। দুদিন পরই দুঃসংবাদটা এল—মিজানুর করোনায় আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। তিনি ধানমন্ডির বাসা থেকে হেঁটে গণস্বাস্থ্য কেন্দ্র গেলেন। এরপর সেখান থেকে মহাখালীতে ইউনিভার্সাল হাসপাতালে। প্রায় দেড় মাস করোনার সঙ্গে যুদ্ধ। সাংবাদিকতার যুদ্ধে জয়ী মিজানুর রহমান করোনাযুদ্ধে পরাজিত হলেন, মধ্য পঞ্চাশেরও কম বয়সে।

মিজানুর রহমান খানের অকালমৃত্যু প্রথম আলো ও বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য বিরাট ক্ষতি। এ ক্ষতি হয়তো ভবিষ্যতে কেউ পূরণ করবেন। কিন্তু তাঁর মৃত্যু স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য যে অপরিসীম শূন্যতা বয়ে নিয়ে এল, তা কখনোই পূরণ হওয়ার নয়। বাবার শূন্যতা সন্তানদের, স্বামীর শূন্যতা স্ত্রীকে, সন্তানের শূন্যতা মাকে এবং ভাইয়ের শূন্যতা ভাইদের আজীবন বহন করতে হবে।

একটি ঘটনার কথা উল্লেখ করেই লেখাটি শেষ করব। গত বছর মিজানুর রহমান খানের মৃত্যুর পর তাঁর বৃদ্ধা মা প্রথম আলোর অফিসে এসেছিলেন, পুত্র কোথায় বসতেন, সেই স্থানটি দেখতে। সঙ্গে তাঁর নাতি-নাতনিরাও ছিল। মিজানুর যে চেয়ারে বসতেন, সেই চেয়ারটি বারবার হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখছিলেন মা। তিনি হয়তো সেই চেয়ারে সদ্য বিদায়ী সন্তানের স্পর্শ অনুভব করছিলেন।
মিজানুর রহমান খান আমাদের সঙ্গে ছিলেন, আছেন, থাকবেন। তাঁর প্রতি আমাদের ভালোবাসা।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

স্মরণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন