বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এর কিছুকাল পূর্বে কুয়ালালামপুরের জাপানি সুবিশাল বইয়ের দোকান কিনোকুনিয়া থেকে তুর্কি লেখক ওরহান পামুকের সদ্য প্রকাশিত ও ইংরেজিতে অনূদিত ইস্তাম্বুলসহ বিভিন্ন লেখকের আরও গুটিকয় বই কিনেছিলাম। ওই বইয়ের ওপর একটি আলোচনা-নিবন্ধ লিখেছিলাম। ওরহান পামুক এর পরের বছর সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পান। বন্ধুবান্ধবের দু-একজন তখন রসিকতা করে আমাকে বলেছিলেন, আপনার আলোচনার জন্যই ওরহান পামুক নোবেল পুরস্কার পেলেন!

হাসান আজিজুল হকের ওই উপন্যাসখানি তো আর এককথায় কিংবা এক দিনে তৈরি হয়নি! ঝিনুকের বুকে কোনোভাবে বালুকণা ঢুকলে, যে অসহনীয় অস্বস্তি ও তীব্র যন্ত্রণা তৈরি হয় তার বুকের মধ্যে, সেই যন্ত্রণার ফলই হচ্ছে মুক্তা।

হাসানের উপন্যাসখানাও বালুকণায় সতত যন্ত্রণাবিদ্ধ ঝিনুকের মতো। ১৯৪৭-এর সে সময়ের অবিভক্ত বাংলার সাম্প্রদায়িক বিভক্তি তাঁর পরিবারকে যেভাবে ভেঙেচুরে ফেলেছে, স্কুলের ছাত্র থাকা অবস্থায় যেভাবে তিনি এসে ছিটকে পড়েছিলেন, ঘটনাচক্রে তখন পূর্ব পাকিস্তানে কলেজের অধ্যাপক ভগ্নিপতি ও বোনের কাছে, সেই যন্ত্রণার শিল্পরূপ এই উপন্যাস। আনুষঙ্গিক যে ঘটনাগুলো একটা সময়ে, কোনো সমাজে থাকে, তারও কিছু কিছু চিত্রিত হয়েছে ওই উপন্যাসে। এখন আমি অবশ্য ওই উপন্যাস নিয়ে আলোচনার জন্য এ লেখা লিখছি না।

বাংলা সাহিত্যের যাঁরা খোঁজখবর রাখেন, এ সাহিত্য নিয়ে যাঁদের চর্চা ও পড়াশোনা আছে, তাঁরা জানেন হাসান আজিজুল হক অত্যন্ত উঁচু মাপের লেখক। বাংলা ছোটগল্পে হাসানের অবদান অবিস্মরণীয়। তাঁর গল্পের বিষয়বস্তু ও চরিত্রচিত্রণ তাঁর গল্পগুলোকে একটি সর্বজনস্বীকৃত ভিন্নমাত্রা দিয়েছে।

মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও কেউ কেউ এই ধারার লেখক হিসেবে সাহিত্যিক অমরত্ব পেলেও হাসান একটু ভিন্ন ধরন যোগ করে উঁচু মাপের কিন্তু তাঁদের থেকে আলাদা, অথচ অমরত্বের দাবিদার হতে পারেন বলে আমার বিশ্বাস। এ রায় আমি বা আমরা কেউই দিতে পারি না; সময়—সুদীর্ঘ সময়ই এই রায় নিয়ে একদিন অনাগত বাঙালি পাঠকের সামনে দাঁড়াবে। তবে তাঁর ছোটগল্পে, এমনকি অন্যান্য সব লেখায়ও, বাংলা ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগ এবং তাঁর লেখায় উপমা-উৎপ্রেক্ষা যেভাবে তিনি ব্যবহার করেছেন, তা অসাধারণই শুধু নয়, অনন্যও।

হাসান ভাইয়ের (ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে হাসান আজিজুল হককে ওভাবেই ডাকতাম) সঙ্গে আমার সম্পর্কের উষ্ণতা শুরু হয়েছিল গত শতকের আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে, আমার খুলনায় থাকার সময়ে। ওই দশকের শেষের দিকে, ঢাকায় হাসান আজিজুল হককে আমরা একটি সংবর্ধনা দিয়েছিলাম। এতে এক বিশাল ভূমিকা পালন করে মনু ইসলাম নামীয় একজন সজ্জন সাংস্কৃতিক সংগঠক। সেই উপলক্ষে আমরা যে স্মরণিকা বের করেছিলাম, সেখানে হাসানের সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ও ঘনিষ্ঠ হওয়ার সংক্ষিপ্ত কাহিনি নিয়ে আমার একটি লেখা আছে। পরবর্তী সময়ে, এখন থেকে প্রায় বছর তিনেক আগে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একজন সাবেক চেয়ারম্যান, আমার অনুজপ্রতিম ড. মুহাম্মদ আব্দুল মজিদের সম্পাদনায় এবং পূর্বোল্লেখিত মনু ইসলামের তত্ত্বাবধানে হাসান আজিজুল হক স্মারকগ্রন্থ নাম দিয়ে শক্ত মলাটের বেশ বড়সড় একখানা বই বের করে সকলের প্রশংসা অর্জন করেছেন।

আমার সেই পুরোনো লেখাটিও তাঁরা দয়া করে সেখানে পুনর্মুদ্রণ করেছেন। সে জন্য আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু আমার সঙ্গে যোগাযোগ করলে, আমি হালনাগাদ তথ্য দিয়ে লেখাটিকে আরও সমৃদ্ধ করতে পারতাম। তবু হাসান আজিজুল হকের ওপর অমন সুন্দর একটি স্মারকগ্রন্থ বের করার জন্য সাহিত্যমোদী মহলের সবার সঙ্গে আমিও আনন্দিত ও কৃতজ্ঞ।

যাহোক, বলছিলাম হাসান আজিজুল হকের প্রথম উপন্যাস আগুনপাখির কথা। হাসান ভাই আর আমি তত দিনে বেশ ঘনিষ্ঠ হয়েছি। তিনি একদিন আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আচ্ছা, আপনি লেখার পর ছাপতে দেওয়ার আগে কি আবার পড়ে দেখেন?’ আমার সহজ, সরল স্বীকারোক্তি, ‘না, দেখি না। কারণ, কাজের চাপ আর ভিত্তিহীন আত্মবিশ্বাসের কারণে লেখার পর আর দেখি না।’

হাসান ভাই বলার পর, দেখা শুরু করলাম এবং বুঝলাম কেন তিনি ও কথা বলেছিলেন! কারণ, লেখায় মাঝেমধ্যেই ভুল থাকত। হাসান ভাইকে অবশ্য ও রকম নয়, অন্য কথা, অন্যভাবে বলেছি দু-চারবার। যেমন ছোটগল্পের কথা। বলেছি, দেখেন হাসান ভাই, ভাষার সৌকর্য ভালো জিনিস, কিন্তু তা কোনো লেখাকে মহত্ত্ব দেয় না, লেখার মহত্ত্ব ও স্থায়ী আবেদন অন্যখানে। তাঁর লেখায় সে স্থায়ী আবেদন অবশ্য আছে।

আরেকটা কথা তখন বলেছি তাঁকে—সাহিত্যের গদ্য শাখায় যাঁরা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন, তাঁরা নামী ছোটগল্পকার হলেও, সাহিত্যিক খ্যাতি কিন্তু উপন্যাসের জন্য। খুব মন দিয়ে শুনতেন কথাগুলো। ২০১৩ সালে কানাডীয় লেখিকা এলিস মানরো শুধুই ছোটগল্প লিখে নোবেল পুরস্কার পেয়ে ওই কথা অসত্য প্রমাণ করেছেন। তারপর একদিন জানলাম, হাসান ভাইয়ের কাছেই, তিনি উপন্যাস লেখা শুরু করেছেন।

তাঁকে একাকী বললাম, ‘আপনি যদি উপন্যাস লেখেন, তাহলে সেই প্রথম উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ করব আমি।’ একদিন তিনি বললেন, ‘আমি উপন্যাস লেখা শেষ করেছি।’ আমি বললাম, ‘আমিও এবার অনুবাদ করা শুরু করব।’ তারপর সেই বাংলা উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ করেছি। তা ছেপেও বেরিয়েছে, দ্য ফায়ার বার্ড নেম নামে। অনূদিত বইটির একাধিক সংস্করণ ও তার পুনর্মুদ্রণ হয়েছে। আরও দু-একটি বিষয় নিয়ে উপন্যাস লেখার কথা বলতেন তিনি, শুরুও করেছিলেন, কিন্তু শেষ আর করে যেতে পারেননি। আর একটিমাত্র ছোট উপন্যাস বেরিয়েছে আগুনপাখির পর।
হাসান আজিজুল হকের ছোটগল্পের চরিত্রগুলো সব সময়ই নিগৃহীত। নীরবে শুধুই মার খায় তারা। পাঠকের হৃদয় তাতে ভেঙে যায়। মন কেঁদে ওঠে।

আমি বললাম একদিন, ‘আপনার চরিত্রেরা কি শুধুই মার খাবে? তারা কোথাও কি রুখে দাঁড়াবে না কোনো দিন?’

আমার একটা ছোট্ট সাময়িকীর জন্য মৌলিক একটা লেখা চেয়েছিলাম একবার। লেখা দিয়েছিলেন তিনি। ওই একই সংখ্যায় কবি শামসুর রাহমান, রফিক আজাদ, বেলাল চৌধুরী, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম এবং আরও অনেকের লেখা ছিল, এবং সব কটিই মৌলিক রচনা। হাসান আজিজুল হক লিখেছিলেন ‘মা ও মেয়ের গল্প’। এখানে তাঁর চরিত্রেরা নির্যাতিত হলেও রুখে দাঁড়ায় এবং তাদের প্রতিবাদ সশস্ত্র হয়ে ওঠে। পরে ওই শিরোনামে তাঁর একটি গল্পের বইও বেরোয়।

হাসান ভাই সপরিবার আমার বাসায় কয়েকবার গিয়েছেন। আর রাজশাহীতে চাকরি করার সময় আমি তাঁর বাড়ি ‘উজান’-এ গিয়েছি বহুবার। খেয়েছি ভাবির হাতের সুস্বাদু রান্না, আর পেয়েছি তাঁদের দুজনের ও সব ছেলেমেয়ের আন্তরিক ভালোবাসা। ভাবি আগেই প্রয়াত। হাসান ভাই এবার চলে গেলেন।

ছেলেমেয়েরা সবাই চেনে, আপন ভাবে, কিন্তু ওখানে গেলে হাসান ভাই-ভাবিকে আর পাব না। ওখানে আড্ডা হতো প্রতিবেশী মতিন ভাই, সনৎকুমার সাহা, আলী আনোয়ার (প্রয়াত)—তাঁদের সবার সঙ্গে। সবাই দল বেঁধে সাঁওতালপল্লিতে যাওয়া, সাঁওতাল বিয়েতে যোগ দেওয়া, ওদের সঙ্গে আনন্দ ভাগাভাগি করা, আর তো হবে না! হাসান ভাইয়ের বাসায় কি কম আড্ডা মেরেছি? কিন্তু এই সবকিছুরই মধ্যমণি ছিলেন হাসান আজিজুল হক।

অসুস্থ অবস্থায় তিনি যখন সবাইকে ঠিক পাচ্ছিলেন না, কথা ঠিকমতো বলতে পারছিলেন না, তখন তাঁর একমাত্র ছেলে ইমতিয়াজ হাসান (মৌলি) জানাল সেই কথা। মৌলি জাপান থেকে পিএইচডি করেছে; বর্তমানে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণরসায়ন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক। যাহোক, সনৎদা জানালেন হাসানের আসল সমস্যার কথা। তাঁর হৃৎপিণ্ডের যে সমস্যা ছিল, তার বিস্তারিত আমাকে জানিয়েছিলেন একদিন।

সনৎদা বললেন, হাসানের আড্ডা মারার স্বভাবের কথা, জানালেন তাঁর হো হো করে হাসার কথা, জানালেন তাঁর অকল্পনীয় রসরঞ্জিত গল্পকাহিনির কথা। বললেন, করোনায় কেউ আর কোথাও যায় না, কোনো আড্ডা নেই, তাহলে হাসান বাঁচে কী করে?
করোনার ওপরে, তাঁর বন্ধুবান্ধবের ওপরে, তাঁর গুণগ্রাহীদের ওপরে, সর্বোপরি, আমাদের সবার ওপরে অভিমান করেই কি চলে গেলেন হাসান আজিজুল হক? তিনি কি ভাবার কোনো সুযোগ পেয়েছেন কখনো, যে অনাকাঙ্ক্ষিত শূন্যতা তিনি পেছনে ফেলে গেলেন, তা কখনো পূরণ হওয়ার নয়?

আলী আহমদ লেখক ও অনুবাদক

স্মরণ থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন