বিভুদার চলে যাওয়ার এক বছর

বিভুরঞ্জন সরকারছবি: সংগৃহীত

গত বছরের ২১ আগস্ট অফিসের কথা বলে বাসা থেকে বের হয়েছিলেন আমার মেঝদা বিভুরঞ্জন সরকার। তারপর আর ফেরেননি। পরদিন দুপুরে মুন্সিগঞ্জের গজারিয়ায় মেঘনা নদী থেকে তাঁর লাশ উদ্ধার করা হয়।

একটি মানুষ সকালে ঘর থেকে বের হলেন। পরিবারের মানুষ হয়তো ভেবেছিলেন, অন্য দিনের মতোই কাজ শেষে ফিরে আসবেন। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হলো, রাত পেরিয়ে সকাল হলো, তারপর একটি নদী তাঁকে ফিরিয়ে দিল।

একজন আপন মানুষকে এভাবে হারানোর বেদনা হয়তো কোনো ভাষাতেই পুরোপুরি প্রকাশ করা যায় না। এক বছর পরও আমি পারিনি।

বড়দা মারা যাওয়ার পর বিভুদাই আসলে আমাদের সবচেয়ে বড় ভাই হয়ে উঠেছিলেন। মেঝদা বলে ডাকতাম, কিন্তু তাঁর মধ্যে বড় ভাইয়ের দায়িত্ববোধটাও ছিল। পরিবারে কে কেমন আছে, কার কী প্রয়োজন, কার কী সমস্যা, এসব নিয়ে তিনি নিজের মতো করে ভাবতেন। নিজের সামর্থ্যের সীমা যতটুকু, তার চেয়েও একটু বেশি দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা করতেন। তাঁর জীবনের একটি বড় বৈশিষ্ট্য ছিল, তিনি আপনজনের বিপদে খুব বেশি কথা বলতেন না, পাশে দাঁড়াতেন।

বন্ধু, সহকর্মী, পরিচিতজন, আত্মীয়স্বজন, অনেক মানুষের সঙ্গেই তাঁর সম্পর্ক ছিল। তাঁদের জন্যও তাঁর দরজা খোলা থাকত। মানুষের প্রতি তাঁর একটা সহজাত মমতা ছিল। কাউকে ছোট করে দেখা, কাউকে অপমান করে নিজেকে বড় করে তোলা, এই প্রবণতা তাঁর মধ্যে দেখিনি। বরং মানুষের দুর্বলতার জায়গাটুকু তিনি বুঝতেন। হয়তো এ কারণেই অনেক মানুষ তাঁকে আপন করে নিয়েছিলেন।

কিন্তু নিজের জীবনের কষ্টের কথা তিনি খুব বেশি বলতেন না।

এখানেই বিভুদাকে নিয়ে আমাদের সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। যে মানুষটি অন্যের কথা এত গভীরভাবে বুঝতেন, তাঁর নিজের কষ্টের কতটুকু আমরা বুঝতে পেরেছি?

সম্মান, মর্যাদা, স্বীকৃতি, এসব পেলে ভালো লাগে না, এমন মানুষ পৃথিবীতে বোধ হয় নেই। বিভুদাও তার ব্যতিক্রম ছিলেন না। অথচ জীবনে এই স্বীকৃতিটুকুই তিনি সবচেয়ে কম পেয়েছেন।

বাংলাদেশে স্মার্ট রাজনৈতিক ধারাভাষ্য লেখার ক্ষেত্রে বিভুরঞ্জন সরকার ছিলেন একটি স্বতন্ত্র নাম। তাঁর লেখার সহজবোধ্যতা, বিশ্লেষণের গভীরতা, যুক্তির স্বচ্ছতা এবং ভাষার ভারসাম্য ছিল ঈর্ষণীয়। আশির দশকে সাপ্তাহিক যায় যায় দিন-এ ছদ্মনামে প্রকাশিত তারিখ ইব্রাহিমের কলাম সে সময়ের রাজনৈতিকভাবে সচেতন পাঠকদের কাছে ছিল প্রায় অবশ্যপাঠ্য।

আরও পড়ুন

আজকের পাঠকের কাছে হয়তো সেই সময়ের রাজনৈতিক আবহ পুরোপুরি কল্পনা করা কঠিন। তখন তথ্যের এত সহজলভ্যতা ছিল না, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ছিল না, মুহূর্তের মধ্যে হাজারো মতামত ছড়িয়ে পড়ত না। সংবাদপত্র ও সাময়িকীর পাতায় প্রকাশিত একটি ভালো রাজনৈতিক বিশ্লেষণ তাই পাঠকের চিন্তার জগতে বড় প্রভাব ফেলত।

বিভুদার লেখার শক্তি ছিল, তিনি জটিল রাজনৈতিক বিষয়কে পাঠকের কাছে সহজ করে তুলতে পারতেন। তিনি শুধু কী ঘটেছে তা বলতেন না, কেন ঘটছে এবং এর পরিণতি কী হতে পারে, সেটিও বোঝানোর চেষ্টা করতেন।

তাঁর ভাষায় ছিল মেধা, কিন্তু মেধার অহংকার ছিল না। যুক্তি ছিল, কিন্তু যুক্তির নামে পাঠককে ভয় দেখানোর চেষ্টা ছিল না। ব্যঙ্গ ছিল, রসবোধ ছিল, কিন্তু ব্যক্তিগত বিদ্বেষ ছিল না। রাজনৈতিক মতের সঙ্গে দ্বিমত হতে পারে, কিন্তু তাঁর বিশ্লেষণকে অগ্রাহ্য করা সহজ ছিল না।

একজন রাজনৈতিক লেখকের সবচেয়ে বড় সম্পদ সম্ভবত তাঁর স্বাধীন বিবেক। বিভুদার সেই সম্পদটি ছিল। তিনি ক্ষমতার কাছাকাছি থাকার চেয়ে নিজের মতো করে ভাবাকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। আর এ কারণেই হয়তো তাঁর পথ কখনো খুব মসৃণ হয়নি।

দেশের একজন মেধাবী ও সৎ সাংবাদিক হয়েও তাঁকে জীবনের বড় একটা সময় রুটি-রুজির অনিশ্চয়তার সঙ্গে লড়তে হয়েছে। চাকরি পাওয়ার জন্য লড়াই, চাকরি টিকিয়ে রাখার লড়াই, নতুন করে শুরু করার লড়াই, এসব তাঁর জীবনের অংশ ছিল। সাংবাদিকতা যাঁদের কাছে বাইরে থেকে রোমাঞ্চকর একটি পেশা, তাঁদের অনেকেই জানেন না, এই পেশার আড়ালে কত মানুষের কত দীর্ঘ অনিশ্চয়তা লুকিয়ে থাকে।

বিভুদার জীবন সেই বাস্তবতার একটি কঠিন উদাহরণ।

বিভুরঞ্জন সরকার
ছবি : সংগৃহীত

মাঝে মাঝে মনে হয়, আমাদের সমাজও বড় অদ্ভুত। এখানে পরিচিতি অনেক সময় যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে ওঠে, উচ্চকণ্ঠতা অনেক সময় মেধার বিকল্প হয়ে যায়। কেউ কেউ সামান্য কাজ করেই বড় স্বীকৃতি পেয়ে যান, আবার কেউ দীর্ঘদিন অসাধারণ কাজ করেও নীরবে থেকে যান। সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম নেই।

বিভুদা সেই নীরব মানুষদের একজন।

জীবিত অবস্থায় তিনি যে স্বীকৃতি, মর্যাদা ও সম্মান পাওয়ার যোগ্য ছিলেন, তার কতটুকু পেয়েছেন, সেই প্রশ্ন আজও আমাকে তাড়িয়ে বেড়ায়। তবে তাঁর চলে যাওয়ার পর অন্তত আমাদের নতুন করে ভাবা উচিত, আমরা একজন মানুষের মূল্যায়ন করতে এত দেরি করি কেন?

একজন সাংবাদিকের মূল্য কি শুধু তাঁর পদবি দিয়ে মাপা যায়? কত বড় প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন, কত বড় পদে ছিলেন, কত পুরস্কার পেয়েছেন, এসব কি একজন লেখকের প্রকৃত মূল্য নির্ধারণ করে? নাকি তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তা, তাঁর সততা, তাঁর ভাষা, তাঁর পাঠকের মনে তৈরি করা প্রশ্নই শেষ পর্যন্ত বড় হয়ে থাকে?

বিভুদার ক্ষেত্রে আমি দ্বিতীয়টিই বিশ্বাস করি।

তবে সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকারকে নিয়ে যত কথাই বলা হোক, আমার কাছে তিনি সবার আগে আমার মেঝদা। এ পরিচয়ের সঙ্গে কোনো পেশাগত পরিচয়ের তুলনা হয় না। তাঁর বাসার দেয়ালে টাঙানো ছবিগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, ছবির মানুষটি যেন এখনও আমাদের মধ্যে আছেন। কোনো ছবিতে ছেলেমেয়ের সঙ্গে, কোনো ছবিতে বৌদির সঙ্গে, কোনো ছবিতে একা। কোথাও মুখে হাসি। সেই ছবিগুলো এখন শুধু স্মৃতি নয়, আমাদের কাছে এক অনুপস্থিত মানুষের উপস্থিতির দলিল।

ছবির মানুষটি কথা বলেন না। কিন্তু তাঁর মুখ যেন অনেক কথা বলে। মনে হয়, মানুষ কি সত্যিই চলে যায়? হয়তো যায় না। থেকে যায় তাঁর কণ্ঠস্বরে, তাঁর ব্যবহারে, তাঁর লেখা বইয়ের পাতায়, পুরোনো কাগজে, পরিচিত মানুষের স্মৃতিতে। থেকে যায় তাঁর সঙ্গে কাটানো সময়ের মধ্যে। এমনকি তাঁর কিছু না বলা কথার মধ্যেও। বিভুদাও থেকে গেছেন।

পত্রপত্রিকার পাতায় তাঁর অসংখ্য লেখা আছে। তাঁর বই আছে। তাঁর রাজনৈতিক বিশ্লেষণ আছে। সহকর্মীদের স্মৃতি আছে। বন্ধুদের কাছে তাঁর গল্প আছে। পরিবারের কাছে তাঁর অসংখ্য স্মৃতি আছে। আর আমাদের কাছে আছে তাঁর সঙ্গে কাটানো সেই দীর্ঘ জীবনের টুকরো টুকরো মুহূর্ত।

কিন্তু সবকিছুর পরও একটি কষ্ট থেকে যায়। এত কথা বলার, এত স্মৃতি থাকার পরও মানুষটির সঙ্গে আর একবার কথা বলা যাবে না।

আরেকবার তাঁকে জিজ্ঞেস করা যাবে না, কেমন আছিস? আর কোনো রাজনৈতিক ঘটনার পর তাঁর বিশ্লেষণ শোনা যাবে না। কোনো লেখা পড়ে তাঁর মতামত জানা যাবে না। আর কোনো দিন হঠাৎ ফোন করে বলা যাবে না, মেঝদা, আগামী সংখ্যায় আমি কী নিয়ে লিখব?

এই না-পারাগুলোই হয়তো মৃত্যুর সবচেয়ে বড় নিষ্ঠুরতা।

মেঘনার জল এক বছর ধরে অনেক দূর বয়ে গেছে। দেশের রাজনীতিও অনেক বদলেছে। কত ঘটনা ঘটেছে, কত মানুষ এসেছেন, কত মানুষ চলে গেছেন। সংবাদপত্রের পাতায় প্রতিদিন নতুন খবর এসেছে। পুরোনো খবর হারিয়ে গেছে নতুন খবরের ভিড়ে।

কিন্তু আমাদের পরিবারের একটি খবর বদলায়নি। বিভুদা আর ফিরবেন না!

বাসায় তাঁর লেখার চেয়ার-টেবিলটা এখনও আগের মতো আছে। বইগুলো আছে। পুরোনো কাগজপত্র আছে। ছবিগুলো আছে। তাঁর লেখা আছে। স্মৃতিগুলো আছে। শুধু মানুষটি নেই।

এই না থাকার সঙ্গে বেঁচে থাকাই এখন আমাদের নিয়তি।

এক বছর আগে মেঘনা নদী বিভুদার শরীরটাকে আমাদের কাছ থেকে নিয়ে গেছে। কিন্তু তাঁর হাসি, তাঁর কণ্ঠস্বর, তাঁর লেখা, তাঁর মমতা, তাঁর অভিমান, তাঁর অসমাপ্ত কথাগুলো আমাদের কাছ থেকে নিতে পারেনি। সেগুলো আমাদের মধ্যেই রয়ে গেছে।

আর তাই এক বছর পরও মনে হয়, বিভুদা কোথাও হারিয়ে যাননি। শুধু আমাদের চোখের আড়ালে চলে গেছেন।

তারপরও মন মানে না। বারবার মনে হয়, যদি আর একবার তাঁকে দেখা যেত। আর একবার যদি সেই চেনা হাসিটা দেখা যেত!

শুধু একবার!

  • চিররঞ্জন সরকার লেখক ও কলামিস্ট