৭ এপ্রিল ২০২৬ ফেসবুকে শাহজালাল ভাই এবং আমার একটি ছবি পোস্ট করেছিলাম। সেখানে লিখেছিলাম—‘শালমারা নদী উদ্ধারের অগ্রনায়ক রিভারাইন পিপল, শালমারী নদী সুরক্ষা কমিটির আহ্বায়ক অদম্য লড়াকু শাহজালাল ভাই সত্তর বছর বয়সে ১০ কিলোমিটার দূর থেকে একটি সাইকেল চালিয়ে আজ এসেছিলেন। তাঁর প্রতি অকৃত্রিম ভালোবাসা।’
এরপর ৮, ১১ এবং ১৩ এপ্রিল দুপুরেও তাঁর সঙ্গে মুঠোফোনে কথা হয়। ১৩ তারিখ রাতে শুনি তিনি মারা গেছেন।
৭০ বছর বয়সী শাহজালাল ভাই আশির দশকে যখন যৌবনে পদার্পণ করেছিলেন, তখন নদী রক্ষার আন্দোলন করতে গিয়ে প্রভাবশালী দখলদারের করা মামলায় প্রায় পাঁচ মাস জেল খেটেছেন।
রংপুর থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে যে নদীটি দখলমুক্ত করতে গিয়ে শাহজালাল ভাই জেল খেটেছেন, সেই নদীর নাম আমি জেনেছি ২০২০ সালে। নদীটিতে দখল আছে জেনে নদীটির সরেজমিন খবর নিতে গিয়েছিলাম। প্রথম দিনেই দেখা হয়েছিল শাহজালাল ভাইসহ আরও জেল খাটা দুজন ব্যক্তির সঙ্গে। আশির দশকে যে নদী মুক্ত করতে গিয়ে জেল খেটেছেন, সেই নদীটি তাঁদের জীবদ্দশায় মুক্ত দেখে যেতে চান।
শালমারা নদী মুক্ত করার জন্য নতুনভাবে লড়াইয়ের জন্য আমি আহ্বান জানাই। যৌবনে যা পারেননি, বিগতযৌবনে আরেকবার চেষ্টা করার প্রস্তাব ফিরিয়ে দেননি শাহজালাল ভাই। আমার সঙ্গে একমত হওয়ায় আমি সেখানে রিভারাইন পিপলের শালমারা নদী সুরক্ষা কমিটি গঠন করি। শাহজালাল ভাইয়ের দৃপ্ত কথাবার্তা আর গভীর আকাঙ্ক্ষা দেখে তাঁকে আহ্বায়ক করি। শালমারা নদী উদ্ধার আন্দোলনের অগ্রসৈনিক শাহজালাল ভাই হঠাৎই পরপারের উদ্দেশে যাত্রা করার আগে শালমারা নদী অবৈধ দখলদারের হাত থেকে মুক্ত করে গেছেন।
দীর্ঘ প্রায় ছয় বছর তাঁর সঙ্গে নদী উদ্ধারের কাজ করতে গিয়ে দেখেছি তিনি কোনো সাধারণ মানুষ নন। প্রভাবশালী দখলদার, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, স্থানীয় প্রশাসন, অর্থাৎ এসি ল্যান্ড-ইউএনও তাঁদের বিরুদ্ধে গিয়ে তিনি যে লড়াই অব্যাহত রেখেছেন, এতে তাঁকে ‘বীর’ বললে অত্যুক্তি হবে না।
শাহজালাল ভাই ২০২১ সালে আমাকে নিয়ে নদীর পাড় ধরে একদিন চার ঘণ্টা হেঁটেছেন। শুনিয়েছেন নদীপারের অসংখ্য গল্প। নদীটির পারে যেখানে ব্রিটিশ কুঠি ছিল, যেখানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা হতো, যেখানে মুসলিম ধর্মাবলম্বীদের একটি মেলা হতো, সেসব স্থানে নিয়ে যান। একজন পীর নাকি এই নদীপথে এসেছিলেন সেই জনশ্রুতিও শুনিয়েছেন আমাকে।
শালমারা উদ্ধারে একের পর এক সভা-সমাবেশ চলতে থাকে। মিঠাপুকুর উপজেলায় ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে, এসি ল্যান্ডের কাছে, ইউএনও, ডিসির কাছে যেতে হয়েছে বহুবার। কোনো দিন তাঁকে বিরক্ত হতে দেখিনি। শালমারা নদী নিয়ে প্রতিটি কর্মসূচিতে আমি উপস্থিত ছিলাম।
শালমারা রেকর্ডমূলে নদী হলেও পানি উন্নয়ন বোর্ড, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশন কারও তালিকায় এর নাম ছিল না। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের ২০২৩ সালে প্রণীত তালিকায় নদীটি না রাখার প্রতিবাদে ‘অন্ধের নদী দর্শন’ লিখে শাহজালাল ভাইসহ একটি সাইনবোর্ড টানিয়েছিলাম। তুমুল আন্দোলনের মুখে রংপুরের জেলা প্রশাসন নদীটি থেকে অবৈধ দখলদারের মালিকানা বাতিল করতে বাধ্য হয়।
নদীপারে বয়ে যায় আনন্দের স্রোত। ঢোল বাজিয়ে একদিন নদী মুক্তির উৎসবও করা হয়। বর্তমানে নদীটি সরকারের তালিকাভুক্ত নদী। নদীটি উদ্ধারের খবর শুনে শাহজালাল ভাইয়ের দুচোখ দিয়ে আনন্দ-অশ্রু গড়িয়ে পড়েছে। তাঁকে আনন্দে শিশুর মতো কাঁদতে দেখেছি।
বরেন্দ্র উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের রংপুরের কর্মকর্তাদের অনুরোধ করলে তাঁরা খনন শুরু করেন। অবৈধ দখলদারেরা খননে বাধা দিতে আসত। শাহজালাল ভাই সাহসিকতার সঙ্গে দাঁড়িয়ে থেকে নদী খনন করাতেন। খননে বাধা দিলেও প্রশাসন একবার নীরব ভূমিকা পালন করছিল। তখন আমরা প্রশাসনের বিরুদ্ধে কর্মসূচি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম।
সেই সময়ের জেলা প্রশাসক তাৎক্ষণিক দখলদার হটিয়ে সরকারের একজন কর্মকর্তাকে পাঠিয়ে একটি ছোট কাগজে শাহজালাল ভাইয়ের স্বাক্ষর নেন। সেখানে লেখা ছিল ‘শালমারা নদী বুঝে পেলাম’। নিচে শাহজালাল ভাইয়ের স্বাক্ষর। এই ছোট কাগজটির ছবি তুলে ডিসি আমার কাছে পাঠিয়েছিলেন। দখলদারেরা থানায় অভিযোগ করেছিল শাহজালাল ভাইসহ কয়েকজনের নামে, মামলাও দিয়েছিল।
শালমারা মুক্ত করার পর রংপুর জেলা প্রশাসন বিল হিসেবে লিজ দিয়েছিল। আবারও আন্দোলন শুরু হয়। শাহজালাল ভাইয়ের নেতৃত্বে এবার আন্দোলন শুরু হয় ডিসির বিরুদ্ধে। ডিসি সেই লিজ বাতিল করতে বাধ্য হন।
স্থানীয় প্রভাবশালী, স্থানীয় রাজনীতিক, স্থানীয় প্রশাসন মিলে এক পক্ষ, আর আমরা নদী উদ্ধারে গড়ে ওঠা সংগ্রামের কর্মীরা আরেক পক্ষ। আমাদের সঙ্গে জেলে, মাঝি, অটোরিকশার চালক, রাজমিস্ত্রি এমনকি ভিক্ষুকও আছেন। শাহজালাল ভাই তাঁদের সংগঠিত করেছিলেন। শালমারা নদী তাঁর কাছে হয়ে উঠেছিল সন্তানতুল্য।
শাহজালাল ভাই, আপনি মারা যাওয়ার দিনে দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য আসতে চেয়েছিলেন। ওই দিন শিক্ষার্থীদের ভাইভা থাকার কারণে আপনার সঙ্গে দেখা হয়নি। আপনি এভাবে চলে যাবেন জানলে কি শত ব্যস্ততার মধ্যেও দেখা না করে থাকতে পারতাম? আপনি বয়সের কারণে একটি বাঁশের লাঠি নিয়ে চলাফেরা করতেন। আমার কাছে একটি বেতের লাঠি চেয়েছিলেন। তারপর তো আর দেখাই হলো না ভাই। সেই লাঠি তো আমি আর কিনে দিতে পারলাম না শাহজালাল ভাই।
ছেড়ে যাওয়ার সাত দিন আগেও আপনি ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। আমি যে কয়েকজনকে উৎসর্গ করে ‘নদী সুরক্ষায় দায়িত্বশীলতা’ শীর্ষক আমার বইটি প্রকাশ করেছি, তাঁদের একজন আপনি। ওই বইটি ১০ কপি নিয়ে গেলেন। দুপুরে একসঙ্গে খেলাম। রিকশায় আসার ভাড়ার টাকা না থাকার কারণে এই বয়সেও একটি বাইসাইকেল চালিয়ে আপনি ক্যাম্পাসে এসেছিলেন। আর কোনো দিন আপনার আসা হবে না।
শাহজালাল ভাই, ‘নয়নসমুখে তুমি নাই, নয়নের মাঝখানে নিয়েছ যে ঠাঁই।’ এভাবেই আপনি আমাদের মাঝে বেঁচে থাকবেন। নূরলদীন, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন যে উপজেলায় জন্ম নিয়েছেন, সেই উপজেলায় জন্ম নিয়ে আপনিও সময়ের বুকে চিহ্ন রেখে চলে গেলেন। প্রত্যন্ত গ্রামে থেকে আপনার সাহসিকতা, নৈতিকতা, দৃঢ়তা দিয়ে নদী আন্দোলনের যে পথ রচনা করে গেছেন, তা অনুসরণ করে আগামীর পথে হাঁটব। ওপারে ভালো থাকুন। নদীযোদ্ধা শাহজালালের প্রতি প্রণতি জানাই।
তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক এবং নদী–বিষয়ক সংগঠন রিভারাইন পিপলের পরিচালক
ই–মেইল: [email protected]
