সংকটকালের নেতৃত্ব ও একজন জিয়াউর রহমান

জিয়াউর রহমানফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসকে যতজন প্রবাদপ্রতিম পুরুষ আলোকিত করেছেন, তাঁদের মধ্যে সর্বাগ্রে স্থান করে নেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এর প্রধান কারণ হলো, বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ যখনই কোনো গভীর সংকটে পড়েছে, ঠিক তখনই তিনি ছায়ার মতো পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং দিয়েছেন সঠিক দিকনির্দেশনা। নিজের এবং নিজের পরিবারের জীবন বিপন্ন হবে জেনেও তিনি সমস্ত মানসিক ও শারীরিক শক্তি দিয়ে জনগণের পাশে অবস্থান করেছেন।

১৯৭১ সালে যখন এ দেশের মানুষ সম্পূর্ণ দিশাহীন, কী হচ্ছে, কী ঘটবে, কী করতে হবে, কোন পথে এগোতে হবে, সে বিষয়ে কোনো স্পষ্ট দিকনির্দেশনা ছিল না; ঠিক সেই সময় মানুষের হৃদয়ে আশার আলো হয়ে কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে ভেসে আসে এক বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, ‘আমি মেজর জিয়া বলছি।’

এই সময়োচিত ও যথাযথ স্বাধীনতার ঘোষণা মুক্তিকামী জনতার মধ্যে এক নতুন প্রাণসঞ্চার করে। মানুষ নিজেদের একেকটি স্ফুলিঙ্গ হিসেবে অনুভব করতে শুরু করে এবং ঝাঁপিয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে। এর একটি অকাট্য প্রমাণ পাওয়া যায় মুক্তিযুদ্ধের উপ–অধিনায়ক এ কে খন্দকারের বয়ানে। তিনি বলেন, ‘আমি নিজে জানি, যুদ্ধের সময় জানি, যুদ্ধের পরবর্তী সময়ও জানি যে মেজর জিয়ার এই ঘোষণাটি পড়ার ফলে সারা দেশের ভেতরে এবং সীমান্তে যত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন, তাঁদের মধ্যে এবং সাধারণ মানুষের মনে সাংঘাতিক একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে!’ (মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর, পৃষ্ঠা ৩০, প্রথমা প্রকাশন)

জিয়াউর রহমান ছিলেন একাধারে সেক্টর কমান্ডার এবং জেড ফোর্সের প্রধান। সম্মুখ থেকে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রামে অতুলনীয় অবদান রাখেন। পুরো যুদ্ধকালজুড়ে স্ত্রী ও সন্তানদের নিরাপত্তার কথা চিন্তা না করে তিনি স্বাধীনতাকামী মানুষের জনযুদ্ধকেই সর্বাগ্রে প্রাধান্য দিয়েছেন।

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে জিয়াউর রহমান দেশে এক নতুন ধরনের রাজনীতির দিগন্ত উন্মোচন করেন। তিনি প্রবর্তন করেন বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। তাঁর মতে, বাংলাদেশ নামক ভূখণ্ডে বসবাসকারী সবাই, হোক সে মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান কিংবা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মানুষ, সবার পরিচয় একটাই, তারা বাংলাদেশি। এই অসাধারণ রাজনৈতিক দর্শন সামনে রেখে তিনি গ্রাম থেকে গ্রামে ছুটে বেড়ান। একাধারে তিনি ২০ থেকে ৩০ মাইল পর্যন্ত হেঁটে প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষের সঙ্গে হাত মেলাতেন, তাঁদের কথা শুনতেন।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতি নিশ্চিত করা এবং বহির্বিশ্বে দেশকে আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ১৯ দফা কর্মসূচি প্রণয়ন করেন। সে সময় এই ১৯ দফা ছিল অত্যন্ত যুগান্তকারী ও সময়োচিত রাজনৈতিক বন্দোবস্ত, যার প্রয়োগে শেখ মুজিবের অপশাসন থেকে দেশ ধীরে ধীরে সুশাসনের দিকে অগ্রসর হতে শুরু করে।

জিয়াউর রহমানের খাল খনন কর্মসূচি ছিল এতটাই কার্যকর যে আজকের বাংলাদেশেও তা সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এই কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি কৃষিতে এক নতুন বিপ্লবের সূচনা করেন। কৃষকদের নিয়মিতভাবে উদ্বুদ্ধ করতেন উৎপাদন দ্বিগুণ করার জন্য এবং কোনো অনাবাদি জমি ফেলে না রাখার আহ্বান জানাতেন। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তিনি শিল্পায়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেন। তাঁর হাত ধরেই ১৯৮০ সালে বাংলাদেশে তৈরি পোশাকশিল্পের সূচনা হয়, দেশ গার্মেন্টস ছিল বাংলাদেশের প্রথম গার্মেন্টস শিল্পপ্রতিষ্ঠান। আজ এই তৈরি পোশাকশিল্পের খাতই দেশের প্রধান রপ্তানি আয়ের উৎস। জিয়াউর রহমান মুক্তবাজার অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রবর্তন করে সুস্থ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করেন।

বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি বলতেন, ‘সমষ্টিগত স্বেচ্ছাশ্রম কোনো দিন বৃথা যায় না। কারও মুখাপেক্ষী হয়ে নয়, নিজ শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে স্থানীয় সমস্যার সমাধান করতে হবে।’

শিশু–কিশোরদের সাংস্কৃতিক বিকাশের লক্ষ্যে তিনি বিটিভির মাধ্যমে নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতার আয়োজন করেন। আজও মানুষের কানে বাজে সেই প্রমো গান, ‘আমরা নতুন, আমরা কুঁড়ি, নিখিল বন বন্দনে।’

হিজবুল বাহার জাহাজের মাধ্যমে তিনি দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ড ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাতালিকায় শীর্ষস্থান অর্জনকারী ১ হাজার ৬০০–এর বেশি তরুণকে সমুদ্রভ্রমণের সুযোগ করে দেন। সেই বহরে যেমন সাংস্কৃতিক আয়োজন ছিল, তেমনি সমুদ্রবিজ্ঞানীরা সাগরতলের সম্পদ আহরণ ও ব্যবহার নিয়ে তরুণদের দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেন। ১৯৭৬ সালে তিনি দেশের প্রথিতযশা ব্যক্তিদের সম্মানিত করতে একুশে পদক প্রবর্তন করেন। ১৯৭৭ সালের ২৬ মার্চ থেকে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে স্বাধীনতা পুরস্কার চালু করেন। এভাবেই তিনি বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যান।

জিয়াউর রহমান ছিলেন প্রথম বাংলাদেশি, যাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টার হোয়াইট হাউসে আমন্ত্রণ জানান। ১৯৮০ সালের ২৭ আগস্ট তিনি প্রথম বাংলাদেশি রাষ্ট্রপতি হিসেবে হোয়াইট হাউস সফর করেন।

পররাষ্ট্রনীতিতে তাঁর অবদান ছিল অসামান্য। বিশেষ করে সৌদি আরব ও চীনের কাছ থেকে বাংলাদেশের স্বীকৃতি আদায়ে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ওআইসি ও অন্যান্য আরব রাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। ১৯৭৯ সালে তাঁর নেতৃত্বে বাংলাদেশ জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অস্থায়ী সদস্যপদ লাভ করে। তিনি ভারতকে বন্ধু হিসেবে দেখেছেন, তবে আধিপত্যবাদ কখনো মেনে নেননি। ভারতের প্রধানমন্ত্রী মোরারজি দেশাইয়ের ১৯৭৯ সালের এপ্রিল মাসের বাংলাদেশ সফরে যৌথ নদী কমিশন গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।

দক্ষিণ এশিয়ায় আঞ্চলিক যোগাযোগ ও বাণিজ্য সম্প্রসারণের লক্ষ্যে তিনি ১৯৮০ সালে সার্ক প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। ১৯৮১ সালের ফেব্রুয়ারিতে তিনি ইরান–ইরাক যুদ্ধে মধ্যস্থতাকারী হিসেবেও ভূমিকা রাখেন। মধ্যপ্রাচ্য, এশিয়া, ইউরোপ ও আমেরিকা, সব মহলেই তিনি ছিলেন সমানভাবে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব।

বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে তিনি নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন। তিনি বলতেন, ‘সমষ্টিগত স্বেচ্ছাশ্রম কোনো দিন বৃথা যায় না। কারও মুখাপেক্ষী হয়ে নয়, নিজ শক্তির বলে বলীয়ান হয়ে স্থানীয় সমস্যার সমাধান করতে হবে।’

জিয়াউর রহমানের সততা ছিল সর্বজনস্বীকৃত। তাঁর প্রবল সমালোচকেরাও কখনো তাঁর সততা নিয়ে প্রশ্ন তোলেননি। ভারত সফরের সময় ইন্দিরা গান্ধী তাঁর ব্যক্তিগত তহবিল থেকে জিয়াউর রহমান ও তাঁর পরিবারকে চারটি ঘড়ি উপহার দেন। দেশে ফিরে তিনি সেই ঘড়িগুলো রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেন এবং বলেন, তিনি রাষ্ট্রপতি না হলে এই উপহার পেতেন না। নিজের দেশের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ ও সততার এটাই প্রমাণ। গণমানুষের কাছে বিএনপির সুদৃঢ় অবস্থানের অন্যতম কারণ ছিল এই সততা।

ভয়েস অব আমেরিকার সাবেক সংবাদ পাঠক কফি খান, যিনি পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমানের প্রেস সচিব হন, বলেন, ‘আত্মীয়স্বজনদের কেউ কোনো তদবিরের জন্য বঙ্গভবনে বা তাঁর বাসায় আসার সাহস পায়নি। বেগম খালেদা জিয়া অফিসের ধারেকাছেও আসতেন না। তিন থেকে চার হাজার টাকার বেতন থেকে তিনি নিয়মিত ১৫০ টাকা রাষ্ট্রপতির ত্রাণ তহবিলে দিতেন এবং বাকি টাকা দিয়ে সংসার চালাতেন।’
বিএনপির বর্তমান চেয়ারম্যান তারেক রহমানের এক সাক্ষাৎকারে জানা যায়, তাঁর বাবার নির্দেশে প্যান্ট–শার্ট দরজির মাধ্যমে ছোট করে পরতে হতো। একজন সৎ রাষ্ট্রনায়ক একটি দেশের জন্য সবচেয়ে বড় আশীর্বাদ। খুব অল্প সময় পেয়েই তিনি একটি ভঙ্গুর দেশকে শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কাজ শুরু করেছিলেন। অর্থনীতি, সামাজিক সংস্কার ও পররাষ্ট্রনীতিতে বাংলাদেশের ইতিবাচক যাত্রার সূচনা হয়েছিল তাঁর হাত ধরেই। জিয়াউর রহমান বলতেন, ‘আমাদের হাত কোটি হাতিয়ার, অঙ্গীকার আমাদের দেশ গড়বার!’ (আশা নিরাশার উলশী, জিয়াউর রহমান, লেখক মাহফুজউল্লা, পৃষ্ঠা ২১৫)

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের সবচেয়ে কলঙ্কময় দিন ৩০ মে। যে শহর থেকে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন, সেই চট্টগ্রাম শহরের সার্কিট হাউসেই কতিপয় বিপথগামী সেনাসদস্য তাঁকে হত্যা করে। যখন বাংলাদেশ তাঁর দৃঢ় নেতৃত্বে তলাবিহীন ঝুড়ি থেকে সমৃদ্ধির পথে এগোচ্ছিল, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হচ্ছিল এবং অর্থনীতি নিজের ভিত্তি গড়ে তুলছিল, ঠিক সেই সময়ই তাঁকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। জাতীয়তাবাদী শক্তিকে নিশ্চিহ্ন করার অপচেষ্টা শুরু হয়। বাংলাদেশকে আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার ভিত শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান গড়ে দিয়ে গেছেন। এই জন্য বাংলাদেশের গণমানুষ তাঁকে আজীবন কৃতজ্ঞচিত্তে স্মরণ করবে।

  • সালাহউদ্দিন আহমেদ রায়হান প্রকৌশলী, কলামিস্ট ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক
    *মতামত লেখকের নিজস্ব