অনলাইনে লেখাপড়ার কাল এটা। গুগল, উইকিপিডিয়া এ যুগের সবচেয়ে প্রভাবশালী শিক্ষক। পরীক্ষা নেওয়া, মার্কিং ইত্যাদির ধরনও পাল্টে গেছে আমূল। স্বভাবত ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্কও বদলে গেছে এবং যাচ্ছে। ফলে একজন পুরানো শিক্ষার্থী হিসেবে যখন একালের নবীনদের সামনে প্রিয় শিক্ষকের গল্প করি, গল্প করতে করতে আবেগে উদ্বেল হই তখন তাঁরা সেটা ছুঁয়ে যেতে পারেন না। ছাত্র-শিক্ষক সম্পর্ক যে লেকচার দেওয়া-নেওয়া বা তথ্য-উপাত্ত বিনিময়ের চেয়েও ভিন্ন কিছু, বড় কিছু সেটা এ সময়ে এসে বোঝানো সত্যি খানিক দুরূহ হয়ে গেছে। ঠিক যেভাবে কঠিন সেই কৃষক-মমতার অনুবাদ যা মাটি ফুঁড়ে ফসল ফলায়।
সবাই না হলেও, কেউ কেউ নিশ্চয়ই মানবেন যে, এক-দুই দশক আগেও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অবস্থা এখনকার মতো ক্যারিয়ারমুখী ছিল না। তখন বিসিএস গাইডবই নয়—জ্ঞান, মূল্যবোধ, সংস্কৃতি ও দেশ ভাবনা এবং পরিবর্তন চিন্তা ক্যাম্পাস জীবনকে শাসন করতো। গালিব আহসান খানেরা সেই ক্যাম্পাসের শেষ শিক্ষকদল ছিলেন। তাঁদের কাছে শিক্ষার্থীরা ছিল বীজতলার মতো—যেখানে তাঁরা প্রাণ জাগাতে চাইতেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগে এরকম আরও অনেক শিক্ষক ছিলেন। অন্যান্য বিভাগেও ছিলেন। ক্যাম্পাস এরকম শিক্ষক-শিক্ষিকাদের নানান মিথে মৌ মৌ করতো। বিজ্ঞান অনুষদের খবর আমরা কম পেতাম। তবে কলাভবনে হাঁটাহাঁটি শুরুর কালে ড. আহমদ শরীফ, আবু হেনা মোস্তফা কামাল, সাদউদ্দীন, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীসহ আরও নানান শিক্ষকের মিথে সেখানকার পরিবেশ ছিল উদ্দাম-উচ্ছ্বল। অর্থনীতি বিভাগ, ইতিহাস বিভাগের গবেষক শিক্ষকরা সেসময় দেশের বড় গর্বের ধন ছিলেন। এসব শিক্ষককে নিয়মিত লাইব্রেরিতে ঢুকতে-বেরোতে দেখা যেত, নিয়মিত সেমিনারে বক্তব্য দিতেন তাঁরা, ছাত্র-তরুণদের সামরিক শাসনবিরোধী লড়াইয়েও এঁরা ছিলেন প্রেরণা ও সাহসের উৎস। রাষ্ট্রীয় অনাচারে এরা নিপীড়িতের প্রতিরোধের পক্ষে থাকতেন—আজকের মতো ‘বিবৃতিবাজ’ বা ‘চাটুকারিতা’ এদের পেশাগত জীবনকে কলংকিত করেনি।
একজন মানুষ নীতির প্রশ্নে কতটা দৃঢ় ও নিঃসঙ্গ হতে পারেন গালিব আহসান খান ছিলেন তার বড় এক নজির। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় পুরো শিক্ষক সমাজ যখন চাকুরির বয়স বাড়ানোর আন্দোলন করছে—তিনি তখন বলছিলেন এটা জাতীয় স্বার্থে ভালো কাজ হবে না। বরং শিক্ষকদের এই লোভ সংবরণ করা দরকার। এটুকু বলেই তিনি থামেননি। নিজের চাকুরি জীবনে সেটাই তিনি অনুসরণ করেন। বিভাগ ছেড়ে চলে যান।
ক্যাম্পাসকেন্দ্রীক একটিভিজমে দর্শন বিভাগের শিক্ষকদের অংশগ্রহণ তুলনামূলক কমই ছিল। এই বিভাগটি ছিল তুলনামূলকভাবে ‘একাডেমি’ ধাঁচের। এখানকার নেতৃস্থানীয়রা চাইতেন শিক্ষার্থীরা সময়ের রাজনৈতিক দাবি পূরণের পাশাপাশি শিক্ষাজীবনকে এগিয়ে রাখুক। এরকম ভারসাম্য রক্ষা করে চলা সামরিক শাসনের ছায়ায় দুরূহ ছিল। তারপরও সুযোগ পেলেই ড. আবুদল মতীন, ড. গালিব আহসান খান, নীরুকুমার চাকমা প্রমুখ শিক্ষকের সঙ্গে গল্প করতে চাইতাম। এঁদের ভাবমূর্তি তখন এমনই ছিল যে, তাঁদের রুমের দরজা খুলে দুটো কথা বলতে চাওয়াতে ব্যাপক সাহসের দরকার পড়তো। পরে অবশ্য বুঝেছি, বিপুল ব্যস্ততার মাঝেও পুরো বিভাগের সকল ব্যাচের ‘পড়ুয়াদের’ উপর তাঁদের নজরদারি ও খোঁজখবর ছিল। এরকম শিক্ষার্থীদের উদারভাবে সময় দিতে রাজি ছিলেন তাঁরা। কিন্তু সেটা মোটেই আগ বাড়িয়ে নয়।
এটুকু আবিষ্কার করতে করতে অনেক দেরি করে ফেলেছিলাম অবশ্য। তারপরও বিভাগের শেষ বছরগুলোর কোর্সসমূহে বিশ্লেষণী চিন্তার দক্ষতা অর্জনের যে জরুরি প্রয়োজন ছিল সে কাজে গালিব আহসান খানের খুব সাহায্য পেয়েছি। তিনি তখন বিজ্ঞানের দর্শন নিয়ে মৌলিক কিছু কাজ করছিলেন। বাংলাদেশে এ বিষয়ে চিন্তাচর্চায় অন্যতম গুরু তিনি। একই সময় দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দর্শন বিভাগগুলোর পাঠ্যসূচিকে যুগোপযোগী করতে রীতিমতো যুদ্ধ চালাচ্ছিলেন এই শিক্ষক।
একজন মানুষ নীতির প্রশ্নে কতটা দৃঢ় ও নিঃসঙ্গ হতে পারেন গালিব আহসান খান ছিলেন তার বড় এক নজির। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় পুরো শিক্ষক সমাজ যখন চাকুরির বয়স বাড়ানোর আন্দোলন করছে—তিনি তখন বলছিলেন এটা জাতীয় স্বার্থে ভালো কাজ হবে না। বরং শিক্ষকদের এই লোভ সংবরণ করা দরকার। এটুকু বলেই তিনি থামেননি। নিজের চাকুরি জীবনে সেটাই তিনি অনুসরণ করেন। বিভাগ ছেড়ে চলে যান।
অন্তরঙ্গ আলাপে ‘স্যার’ প্রায়ই বলতেন, ‘তোমরা পরিবর্তন চিন্তায় মূল্যবোধ বদলানোর বিষয়ে কম গুরুত্ব দিচ্ছো। বাংলাদেশে এটা জরুরি।’ তিনি ‘নৈতিক উন্নয়নে’র জন্য প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগের কথা বলতেন। আজ এত বছর পর বাংলাদেশে চারিদিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছে ওই ভাবনাটা কত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
অতি একরোখা এই মানুষটি অতি অকালে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এখনও বিশ্বাস হয় না আজ তাঁর দ্বিতীয় মৃত্যু বার্ষিকী। তাঁর গুণমুগ্ধ সকল ছাত্র-ছাত্রীর পক্ষ থেকে ‘স্যারের’ আত্মার শান্তি কামনা করছি।
আলতাফ পারভেজ লেখক ও গবেষক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের প্রাক্তন শিক্ষার্থী।