সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান: নিভৃতচারী এক গবেষকের নিঃসঙ্গ প্রয়াণ

সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান, যিনি ফেসবুকে সিদ্দিক মাহমুদ নামে পরিচিত ছিলেন।ছবি: ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে সংগৃহীত

২০১৪ সালে প্রথম ফেসবুকে যুক্ত হলেও অনিয়মিত থাকা এবং ফোন নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে প্রথম অ্যাকাউন্টটির তথ্য হারিয়ে ফেলি। পরে ২০১৬ সালে নতুন আইডিতে যুক্ত হওয়ার পর প্রথম কোনো প্রকৃত গবেষক ও সাহিত্যিক হিসেবে সিদ্দিক মাহমুদ আমার ফ্রেন্ডলিস্টে যুক্ত হন। জীবিত ও নিয়মিত লিখে যাওয়া এমন একজন জ্ঞানতাপস মানুষকে ফেসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এত কাছে পাওয়াটা ছিল অত্যন্ত আনন্দের ও রোমাঞ্চকর।

প্রথম থেকেই ওনার পোস্ট ও লেখাগুলো নিয়মিত পড়তে শুরু করি। কোনোরকম অহংবোধ বা কৃত্রিমতা প্রকাশ না করে নিভৃতে কাজ করে যাওয়াই ছিল ওনার প্রধান বৈশিষ্ট্য। অনেকটা ঠোঁটকাটা স্বভাবের হওয়ায় যখন যা মনে এসেছে, লিখে গেছেন অকপটে।

ফেসবুকে তিনি সিদ্দিক মাহমুদ নামে পরিচিত হলেও, তাঁর যাবতীয় লেখালিখি সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান নামে। তাঁর মৌলিক ও অনূদিত বইগুলোর মানদণ্ড উঁচু হওয়ায় এবং শিক্ষানবিশ তরুণ পাঠক হিসেবে সব বই কেনা আমার পক্ষে তখন সম্ভব হতো না। তবে একদিন ওনার লেখা ছোট ও সহজ বই ‘দৈনন্দিন জীবনের ব্যবহারিক হাদিস’ সংগ্রহের ইচ্ছার কথা ইনবক্সে জানাই। বিন্দুমাত্র ইতস্তত না করে তিনি আমার ঠিকানা চেয়ে নেন এবং সম্পূর্ণ নিজের খরচে বইটি কুরিয়ার করে পাঠিয়ে দেন।

বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা নিয়ে সিদ্দিক মাহমুদুর রহমানের কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ
ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এই যুগে যখন মানুষে মানুষে দূরত্ব বাড়ছে, তখন একজন প্রবীণ ও শ্রদ্ধেয় লেখকের এমন অকৃত্রিম ভালোবাসা ও মানবিক রূপ আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছিল।

এই অকৃত্রিম শ্রদ্ধার সম্পর্কের এক দশক পার হতে না হতেই ১০ আগস্ট ২০২৬, সোমবার রাত ১০টার দিকে হঠাৎ বন্ধু কিবরিয়ার একটি ফোনকল এল। ফোনে কিবরিয়া জানাল, প্রবীণ এই গবেষক ও অনুবাদক আর আমাদের মাঝে নেই! উত্তরা আহছানিয়া মিশন ক্যানসার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত ৯টা নাগাদ তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)।

মৃত্যুসংবাদটি শুনে আমি কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকায় কিবরিয়াই কিছু স্মৃতি রোমন্থন করছিল; বলছিল আমিই নাকি প্রথম তাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম এই মানুষটার লেখার সঙ্গে! যেকোনো মৃত্যুর খবরই ভারী, কিন্তু যে মানুষটির লেখনী ও স্নেহের সঙ্গে এক দশক ধরে আত্মিক টান তৈরি হয়েছিল, তাঁর চিরবিদায়ের সংবাদটি বুকের মধ্যে অন্য রকম এক হাহাকার তৈরি করে গেল।

প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক সৈয়দ আলী আহসানকে নিজের বই উপহার দেওয়ার সময়। পাশে প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক ও শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. এম আর খান ২৬ মার্চ, ২০০১ (বামে)। ২০০২ সালে ঢাকা ক্লাবের একটি অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের লেখক শঙ্কর ও প্রয়াত জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সঙ্গে (ডানে)
ছবি: সিদ্দিক মাহমুদুর রহমানের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে

ফেসবুক ও ই–মেইল, এই দুই মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগের সুবাদে ধীরে ধীরে জানতে পারি এই নিভৃতচারী লেখক সম্পর্কে এবং তাঁর অনন্য সব কাজের পরিধি সম্পর্কেও।

সিদ্দিক মাহমুদের জন্ম ৪ সেপ্টেম্বর ১৯৪৬, যশোরে। পিতার চাকরিসূত্রে তাঁর স্কুল জীবন (১৯৫৩-১৯৬৫) ছিল কলকাতায় আর কলেজ জীবন (১৯৬৫-৬৯) যশোরে। স্নাতক পাশ করার পর মুক্তিযুদ্ধের কারণে স্নাতকোত্তর শেষ করতে পারেননি। পরবর্তীতে ১৯৮০ সালে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে শিক্ষা, প্রশাসন, প্রকাশনা, সম্পাদনা, অনুবাদ, সমন্বয়, জনসংযোগ বিভিন্ন পেশায় দীর্ঘ ত্রিশ বছর কাটান তিনি। ২০১৯-২০২০ মেয়াদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রিন্টিং অ্যান্ড পাবলিকেশন স্টাডিজ’ বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষকও ছিলেন তিনি।

সিদ্দিক মাহমুদ অনুবাদকর্মে দেখিয়েছেন অসামান্য দক্ষতা। একই সঙ্গে তিনি ছিলেন বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা, ডাকটিকিট, ধাতব ও কাগজি মুদ্রার ইতিহাসের অন্যতম পথিকৃৎ গবেষক। ১৯৮৬ সাল থেকে তিনি এই বিরল বিষয়ে আত্মনিয়োগ করেছিলেন।

সিদ্দিক মাহমুদুর রহমানের লেখা ও অনূদিত কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ
ছবি: সংগৃহীত

এই খাতে ওনার রচিত ‘A History of Bangladesh Philately 1971-1985-86’, ‘Bangladesh Stamp and Postal History, 1988’, ‘বাংলাদেশ ফিলাটেলির দুই দশক’, ‘বাংলাদেশের ডাকব্যবস্থা’, ‘বাংলাদেশের ডাকটিকিট’, ‘কড়ি থেকে টাকা’, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ডাকব্যবস্থা ও ডাকটিকিট’, ‘Tagore Philately’, এবং ‘Postage Stamps of Bangladesh 1971-2013’—এর মতো অগণিত গবেষণাধর্মী বই ও প্রবন্ধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে এক অমূল্য দলিল হয়ে থাকবে।

ফিলাটেলি ও ডাকব্যবস্থা নিয়ে ওনার এসব আন্তর্জাতিক মানের বই ও মৌলিক গবেষণার স্বীকৃতি হিসেবে দেশ-বিদেশের নানা প্রদর্শনী থেকে তিনি বহু সম্মাননা অর্জন করেছেন। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্রাজিলিয়ানা ২০১৩ ও মালয়েশিয়া ২০১৪ থেকে সিলভার ব্রোঞ্জ মেডেল, ইউএসএ স্ট্যাম্পশো ২০১৩ ও ২০১০ থেকে সিলভার মেডেল, ২০০৮ সালের ২২তম এশিয়ান ইন্টারন্যাশনাল স্ট্যাম্পস এক্সিবিশন থেকে সিলভার ব্রোঞ্জ মেডেল, অস্ট্রেলিয়ান ফিলাটেলিক ফেডারেশন (১৯৯৩) থেকে সিলভার ব্রোঞ্জ মেডেল এবং জাতীয় পর্যায়ে বাংলাপেক্স ‘৮৪, বাংলাপেক্স ’৯২ ও খুলনাপেক্স ’৯২–সহ অস্ট্রেলিয়ান ফিলাটেলিক এক্সপ্লোরার (২০০৫) থেকে প্রাপ্ত অসংখ্য অ্যাওয়ার্ড।

এমন একজন প্রজ্ঞাবান ও গুণী মানুষের সারা জীবন আমাদের মূলধারার সাহিত্য অঙ্গনের কিছুটা আড়ালে কাটিয়ে দেওয়াটা অত্যন্ত বেদনার। এমন তো নয় যে তিনি নিজে থেকেই গুটিয়ে ছিলেন! বহু জাতীয় ব্যক্তিত্ব এবং দেশি-বিদেশি একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল।

মৌলিক গবেষণার পাশাপাশি বাংলা অনুবাদ সাহিত্যে ওনার অবদান ছিল অলোকসামান্য। বিশেষ করে কবিতা অনুবাদের ক্ষেত্রে তিনি যে কীর্তি স্থাপন করেছেন, তা এককথায় অবিশ্বাস্য। একক ব্যক্তি হিসেবে তিনিই সম্ভবত বাংলা ভাষায় প্রকাশিত সবচেয়ে বেশি (প্রায় দুই হাজার) কবিতা ইংরেজিতে অনুবাদ ও প্রকাশ করেছেন।

পরিচিত অনেক কবির সৃষ্টিকে তিনি আন্তর্জাতিক ভাষায় রূপ দিয়েছেন। বিশেষ করে কবি কাজী জহিরুল ইসলাম সম্পাদিত ‘Bengali Poems of Thousands Years’ বইটিতে তিনি প্রাচীন চর্যাপদ থেকে শুরু করে বর্তমান কাল পর্যন্ত ১৭০ জন কবির প্রকাশিত বাংলা কবিতাকে অত্যন্ত মুনশিয়ানার সঙ্গে ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন।

ফেসবুকেই সিদ্দিক মাহমুদের মাধ্যমে পরিচয় হয় সাম্প্রতিক সময়ের জনপ্রিয় কবি কাজী জহিরুল ইসলামের সঙ্গে। ২০১৭ সালের কথা; খেয়াল করলাম কাজী জহিরুল ইসলাম নিয়মিত ‘দেহকাব্য’ শিরোনামে চমৎকার সব কবিতা পোস্ট করে যাচ্ছেন। ঠিক তার পরপরই ঘটল আরও এক জাদুকরি ঘটনা—কাজী জহিরের কবিতাগুলো পরম মমতায় ইংরেজিতে অনুবাদ করে পোস্ট করতে শুরু করলেন সিদ্দিক মাহমুদ।

মূল কবিতা পড়ার পাশাপাশি অনুবাদের প্রতিও এক অদ্ভুত মুগ্ধতা তৈরি হয়েছিল, কারণ অনুবাদ পড়ে মনে হতো মূল কবিতাই যেন পড়ছি। অনুবাদের কাজ যে এত দরদ দিয়ে করা যায়, তা ওনাকে না দেখলে হয়তো অজানাই থেকে যেত।

জীবনের নানা পর্বে সিদ্দিক মাহমুদুর রহমান। বাম থেকে ডানে—রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজিতে মাস্টার্স পড়ার সময়, ১৯৭৮ সালে। মা সাজেদা রহমানের সঙ্গে, ১৯৭৯ সালে। ২০২৫ সালে জীবনের শেষ পর্যায়ে। ২০১৩ সালে রংপুর ক্যাডেট কলেজে সস্ত্রীক।
ছবি: ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে

ওনার অনুবাদ সাহিত্যের প্রতি আমার অনুরাগ আরও পুরোনো। ওনার অনূদিত প্রথম যে বইটি আমি পড়ি, তা হলো বিশ্বসাহিত্যের কালজয়ী গ্রন্থ ‘আনা ফ্রাঙ্কের ডায়েরি’। এই বইটির একাধিক বাংলা অনুবাদ থাকলেও সিদ্দিক মাহমুদের মতো এত ডিটেইল ও প্রাঞ্জলভাবে খুব কম অনুবাদকই ফুটিয়ে তুলতে পেরেছেন।

ওনার কাজের প্রতি আমার এই মুগ্ধতা থেকে বন্ধুদের কাছে প্রায়ই ওনার গল্প করতাম। সেই আলাপের সূত্রে একদিন আমার এক স্কুলবন্ধু আমাকে সিদ্দিক মাহমুদের অনূদিত প্রখ্যাত ব্রিটিশ ঔপন্যাসিক ও নাট্যকার দাফনে দু মোরিয়্যের বই ‘অকৃতজ্ঞ অভিসারিকা’ উপহার দেয়। প্রিয় লেখকের বই উপহার পাওয়ার আনন্দটি ছিল বর্ণনাতীত। পরবর্তী সময়ে জাপানি সাহিত্যিক হারুকি মুরাকামির ‘বিড়ালের শহর ও অন্যান্য গল্প’ এবং নিজের মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা সেমিবায়োগ্রাফি ‘পলাতক কাল’ পড়ে ওনার বহুমুখী লেখনীর প্রেমে পড়ে যাই।

এমন একজন প্রজ্ঞাবান ও গুণী মানুষের সারা জীবন আমাদের মূলধারার সাহিত্য অঙ্গনের কিছুটা আড়ালে কাটিয়ে দেওয়াটা অত্যন্ত বেদনার। এমন তো নয় যে তিনি নিজে থেকেই গুটিয়ে ছিলেন! বহু জাতীয় ব্যক্তিত্ব এবং দেশি-বিদেশি একাডেমিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে তাঁর প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা ছিল। তাঁর অসাধারণ গবেষণাকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ লন্ডনের ঐতিহাসিক ‘রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটি’ তাঁকে সম্মানিত ‘ফেলো’ নির্বাচিত করে।

এ ছাড়া তিনি বাংলা একাডেমি, এশিয়াটিক সোসাইটি অব বাংলাদেশ, বাংলাদেশ হিস্টোরিক্যাল সোসাইটি, এডিশন অ্যান্ড পাবলিকেশন অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশ ন্যাশনাল ফিলাটেলিক অ্যাসোসিয়েশনের আজীবন সদস্য ছিলেন।

এত সমৃদ্ধ স্বীকৃতি ও যোগ্যতার পরেও আমাদের সাহিত্য ও সংস্কৃতি অঙ্গনে তিনি উপযুক্ত প্রচার ও মূল্যায়ন পাননি। কারণ, আমাদের সমাজে বেঁচে থাকতে গুণী মানুষকে সম্মানিত না করার এক চর্চা দীর্ঘদিনের। আর এই আত্মপ্রবঞ্চনায় আমি নিজেও কিছুটা দোষী বলা চলে; না হলে এই অসাধারণ মানুষটি বেঁচে থাকতেই হয়তো ওনার অবদান নিয়ে কলম ধরার চেষ্টা করতাম।

সিদ্দিক মাহমুদুর রহমানের লেখা ও অনূদিত কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ
ছবি: সংগৃহীত

সিদ্দিক মাহমুদের বাবা মোহাম্মদ ফজলুর রহমান প্রথমে শিক্ষা বিভাগ ও পরে পররাষ্ট্র দপ্তর, সবশেষে বেনাপোল সীমান্তে কাস্টমস লিয়াজোঁ অফিসার। তিনিও বেশ কিছু শিশুতোষ বই রচনা করে গেছেন। আর মা সাজেদা রহমান বিশ্বভারতী থেকে পড়াশোনা করে দীর্ঘকাল সাহিত্য রচনা করে গেছেন। মা–বাবার সাহিত্যচর্চাকেই যেন ধরে রেখেছিলেন সিদ্দিক মাহমুদ। (দেখুন: এক নজরে তাঁর জীবনবৃত্তান্ত ও সাহিত্যচর্চা

সাহিত্য ও গবেষণার এই আলোঝলমলে জগতের নেপথ্যে ওনার ব্যক্তিগত জীবন কেটেছে অপূরণীয় বিষাদে। ওনার একমাত্র সন্তান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সায়েম মাহমুদ যখন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান, সেই পিতা-পুত্রের নির্মম ট্র্যাজেডির শোক তিনি ফুটিয়ে তুলেছিলেন ‘সায়েম মাহমুদের নিষ্ফল দ্বৈরথ’ গ্রন্থে।

পরবর্তী সময়ে সহধর্মিণীর বিয়োগ ওনাকে তীব্র নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে ঠেলে দেয়। স্বজনেরা প্রতিষ্ঠিত থাকলেও জীবনের দীর্ঘ সময় তিনি একেবারেই একাকী কাটিয়েছেন। শতাধিক গ্রন্থ রচনা ও প্রকাশ করলেও আমাদের প্রকাশনা জগতের অবহেলা ও রয়্যালটি না পাওয়ার আক্ষেপ তিনি শেষ দিনগুলোতেও নিঃশব্দে বয়ে গেছেন।

তবে ব্যক্তি সিদ্দিক মাহমুদ বিদায় নিলেও তাঁর রেখে যাওয়া বিশাল সাহিত্যিক ও গবেষণামূলক কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এক অনন্য পথপ্রদর্শক হয়ে থাকবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের ফিলাটেলি, মুদ্রাব্যবস্থা, ডাক ইতিহাস কিংবা উচ্চমানের অনুবাদের ক্ষেত্রে আগ্রহী তরুণ গবেষকদের জন্য তাঁর প্রকাশনাগুলো এক সমৃদ্ধ এবং নির্ভরযোগ্য আকরগ্রন্থ (রিসোর্স) হিসেবে কাজ করবে। নতুন প্রজন্মকে নিজ দেশের শিকড় ও মৌলিক গবেষণার দিকে ধাবিত হতে তাঁর লেখনী চিরকাল অনুপ্রেরণা জুগিয়ে যাবে।

১১ আগস্ট ২০২৬, মঙ্গলবার বেলা সোয়া একটায় মিরপুর-০১ এর হজরত শাহ আলী বোগদাদী মাজার মসজিদে মরহুমের জানাজা নামাজ অনুষ্ঠিত হয়েছে। হয়তো পার্থিব জীবনের সব কষ্ট, অবহেলা ও একাকিত্ব পেরিয়ে তিনি না-ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন, কিন্তু তাঁর রচিত ও অনূদিত শতাধিক গ্রন্থের মধ্য দিয়েই তিনি অমর হয়ে থাকবেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মতো সামাজিক জগতেও যে কোনো মানুষ এতটা আপন হয়ে উঠতে পারে, সিদ্দিক মাহমুদ না থাকলে তা কখনো জানা হতো না। মহান আল্লাহ–তাআলা এই নিভৃতসাধককে জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন। আমিন।

  • সাজিদ মাহমুদ উন্নয়নকর্মী

    ই–মেইল: [email protected]