বিশ শতকের বাঙালি মুসলমান সমাজের নবজাগরণ, রাজনৈতিক বিবর্তন ও সাহিত্যচর্চায় আবুল মনসুর আহমদ এক দুর্লভ ও বহুমাত্রিক চরিত্র।
১৮৯৮ সালে ময়মনসিংহের ধানিখোলা গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন আধুনিক বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক কাঠামোর অগ্রগণ্য ব্যক্তি। বর্তমান সময়ের প্রেক্ষাপটে যখন আমরা সামাজিক অবক্ষয়, রাজনৈতিক আদর্শের সংকট ও বুদ্ধিবৃত্তিক দৈন্যের মুখোমুখি দাঁড়াই, তখন আবুল মনসুর আহমদের প্রাসঙ্গিকতা কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয়, বরং আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার এক অপরিহার্য দলিলে পরিণত হয়।
তাঁর প্রাসঙ্গিকতা অনুধাবনের জন্য আমাদের তাকাতে হবে তাঁর কালজয়ী সাহিত্য, দূরদর্শী রাজনীতি, নির্ভীক সাংবাদিকতা ও গভীর ভাষাচিন্তার দিকে। বিশেষ করে তাঁর ব্যঙ্গাত্মক সাহিত্যকর্মগুলো যেভাবে সমকালীন সমাজকে ব্যবচ্ছেদ করেছে, তা বিশ্বসাহিত্যের শ্রেষ্ঠ স্যাটায়ারগুলোর সমতুল্য।
আবুল মনসুর আহমদের প্রাসঙ্গিকতার প্রধানতম ভিত্তি হলো তাঁর অপরাজেয় ব্যঙ্গ সাহিত্য বা স্যাটায়ার। ১৯৩৫ সালে প্রকাশিত তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ আয়না বাংলা সাহিত্যে এক নতুন যুগের সূচনা করে। এই গ্রন্থে তিনি ধর্মীয় গোঁড়ামি, ভণ্ড পীর-মুরিদি প্রথা এবং সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকা কুসংস্কারকে অত্যন্ত তীক্ষ্ণভাবে আক্রমণ করেছেন। ‘হুজুর কেবলা’, ‘নায়েবে নবী’ বা ‘ধর্মরাজ্য’র মতো গল্পগুলোয় তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ধর্মের পবিত্র লেবাস পরে একদল মানুষ সাধারণ মানুষকে শোষণ করে।
আজ প্রায় এক শতক পরও আমাদের সমাজে সেই ভণ্ডামির কোনো কমতি নেই, বরং তা নতুন নতুন মোড়কে আত্মপ্রকাশ করেছে। ধর্মের নামে রাজনৈতিক সুবিধা নেওয়া বা আধ্যাত্মিকতার আড়ালে ব্যবসায়িক সাম্রাজ্য গড়ার যে প্রবণতা বর্তমানে দৃশ্যমান, তার প্রকৃত স্বরূপ বহু আগেই আবুল মনসুর আহমদ তাঁর আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছেন। তাঁর এই ব্যঙ্গাত্মক দৃষ্টিভঙ্গি পাঠককে কেবল হাসায় না, বরং সমাজকে ভেতর থেকে শুদ্ধ করার এক তীব্র তাগিদ দেয়।
অন্যদিকে ১৯৪৪ সালে প্রকাশিত আবুল মনসুর আহমদের দ্বিতীয় শ্রেষ্ঠ কীর্তি ফুড কনফারেন্স। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও পঞ্চাশের মন্বন্তরের (১৯৪৩) ভয়াবহ প্রেক্ষাপটে লেখা এই বইয়ের গল্পগুলো আজও আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্রের বিকল কলকবজার দিকে আঙুল তোলে। ফুড কনফারেন্স গল্পে তিনি দেখিয়েছেন, যখন নিরন্ন মানুষ খাদ্যের অভাবে রাস্তায় প্রাণ দিচ্ছে, তখন তথাকথিত ‘ভদ্রলোক’ ও ‘নেতৃস্থানীয়’ ব্যক্তিরা কনফারেন্সের নামে ভূরিভোজ করছে এবং নিজেদের আখের গোছাচ্ছে। বর্তমানের বাজার সিন্ডিকেট, কৃত্রিম খাদ্যসংকট ও মজুতদারির মাধ্যমে মানুষের পকেট কাটার যে সংস্কৃতি, তার সঙ্গে ফুড কনফারেন্স-এর চরিত্রগুলোর অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়।
গল্পের শেষে যখন দেখা যায়, কেবল আইনসভার মেম্বার আর কমিটির লোক ছাড়া আর কেউ বেঁচে নেই, তখন তা আমাদের শাসনব্যবস্থার অমানবিকতাকে নগ্ন করে দেয়। লেখকের এই ‘বিস্ট ফেবল’ বা পশু-রূপকধর্মী নামকরণের সার্থকতা এখানেই যে তিনি শোষক শ্রেণির ভেতরের পশুবৃত্তিকে জনসমক্ষে তুলে ধরেছেন। তাঁর সায়েন্টিফিক বিজনেস বা এআইসিসির মতো গল্পগুলো আজও আমাদের চারপাশের ধাপ্পাবাজ ও পরিশ্রমবিমুখ সুবিধাভোগীদের চরিত্র চিনিয়ে দেয়।
আবুল মনসুর আহমদের উপন্যাসগুলোও সামাজিক বাস্তবতার নিরিখে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর জীবনক্ষুধা উপন্যাসে তিনি গ্রামীণ ও নাগরিক সমাজের অর্থনৈতিক টানাপোড়েন এবং নিম্নবিত্ত মানুষের জীবনসংগ্রামের এক নিপুণ চিত্র এঁকেছেন। এ ছাড়া সত্যমিথ্যা ও আবে হায়াত উপন্যাসের মাধ্যমে তিনি মানুষের মনস্তত্ত্ব এবং নৈতিকতার দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। ব্যঙ্গ সাহিত্যের বাইরে তাঁর এই সৃষ্টিশীল রচনাগুলো প্রমাণ করে, তিনি কেবল বিদ্রূপ করতেই জানতেন না, বরং মানুষের প্রতি তাঁর ছিল গভীর মমত্ববোধ। তাঁর রচনায় সব সময়ই প্রাধান্য পেয়েছে ‘শিল্প সমাজের জন্য’—এই আদর্শ।
তিনি বিশ্বাস করতেন, সাহিত্যের কাজ কেবল বিনোদন দেওয়া নয়, বরং সমাজের জঞ্জাল পরিষ্কার করা। তাঁর ভাষাচিন্তাও ছিল অত্যন্ত বৈপ্লবিক। তিনি প্রমিত বাংলার পাশাপাশি পূর্ব বাংলার মানুষের মুখের ভাষা ও শব্দভান্ডারকে সাহিত্যে স্থান দেওয়ার পক্ষে ছিলেন। তাঁর মতে, কৃত্রিম আভিজাত্যের চেয়ে গণমানুষের প্রাণবন্ত ভাষাই সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ বাহন। আধুনিক ভাষাতত্ত্বের গবেষকেরা আজও তাঁর এই স্বকীয় ভাষাদর্শ নিয়ে গবেষণা করছেন, যা প্রমাণ করে, তিনি সময়ের চেয়ে কতটা অগ্রবর্তী ছিলেন।
আবুল মনসুর আহমদ কেন আজও প্রাসঙ্গিক, এর একটি বড় কারণ হলো তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও যুক্তিবাদী চেতনা। তিনি বাঙালি মুসলমানের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা বলতেন, কিন্তু তা কখনোই অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে নয়। তিনি চেয়েছিলেন একটি আধুনিক, শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ। তাঁর মতে, বিবেকহীন মানুষের হাতে পরিচালিত রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের কোনো বিবেক থাকে না। এই যে নৈতিকতার প্রশ্ন, তা আজ আমাদের সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
রাজনৈতিক দূরদর্শিতার ক্ষেত্রে আবুল মনসুর আহমদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক ‘২১ দফা’ ইশতেহারের মূল রূপকার হিসেবে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। বর্তমান বাংলাদেশের যে স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব, এর বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির পেছনে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। তিনি প্রথম থেকেই পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পূর্ণ আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তুলেছিলেন এবং দুই পাকিস্তানের মধ্যকার অর্থনৈতিক বৈষম্যকে সংসদীয় বিতর্কে অত্যন্ত জোরালোভাবে উপস্থাপন করেছিলেন।
আবুল মনসুর আহমদের ঐতিহাসিক রাজনৈতিক স্মৃতিকথা আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর এই অঞ্চলের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক প্রামাণিক দলিল। দেশ বিভাগ থেকে শুরু করে পাকিস্তান আমলের রাজনীতির ব্যবচ্ছেদ তিনি যেভাবে করেছেন, তা আজও ঐতিহাসিকদের কাছে অপরিহার্য। আজকের রাজনীতিতে যখন আদর্শের চেয়ে ব্যক্তিস্বার্থ বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে, তখন আবুল মনসুর আহমদের মতো নীতিবান রাজনীতিকের প্রাসঙ্গিকতা আরও বেড়ে যায়। তিনি ক্ষমতার কেন্দ্রে থেকেও কখনো সাধারণ মানুষের দাবি থেকে বিচ্যুত হননি।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন এক নির্ভীক পথিকৃৎ। দৈনিক ইত্তেহাদ, দৈনিক নবযুগ বা দৈনিক মোহাম্মদীর মতো পত্রিকায় তাঁর সাহসী সম্পাদনা ও সম্পাদকীয় লেখনী তৎকালীন জনমত গঠনে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। তিনি সাংবাদিকতাকে কেবল পেশা হিসেবে নয়, বরং শোষিতের কণ্ঠস্বর হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। বর্তমানের করপোরেট নিয়ন্ত্রিত সংবাদমাধ্যমের যুগে তাঁর নৈতিকতা ও অকুতোভয় সাংবাদিকতা এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে কলমকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে হয়। এ ছাড়া তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ আত্মকথা পাঠ করলে একজন মানুষের সংগ্রাম ও নৈতিকতার উত্তরণের গল্প পাওয়া যায়, যা তরুণ প্রজন্মের জন্য এক শিক্ষণীয় পাঠ।
আবুল মনসুর আহমদ কেন আজও প্রাসঙ্গিক, এর একটি বড় কারণ হলো তাঁর অসাম্প্রদায়িক ও যুক্তিবাদী চেতনা। তিনি বাঙালি মুসলমানের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক পরিচয়ের কথা বলতেন, কিন্তু তা কখনোই অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ ছড়িয়ে নয়। তিনি চেয়েছিলেন একটি আধুনিক, শিক্ষিত ও বিজ্ঞানমনস্ক সমাজ। তাঁর মতে, বিবেকহীন মানুষের হাতে পরিচালিত রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের কোনো বিবেক থাকে না। এই যে নৈতিকতার প্রশ্ন, তা আজ আমাদের সমাজের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
দুর্নীতি, লুটপাট এবং মূল্যবোধের যে চরম অবক্ষয় আমরা বর্তমানে প্রত্যক্ষ করছি, তার সঠিক রোগনির্ণয় আবুল মনসুর আহমদের সাহিত্যে বহু আগেই করা হয়েছে। তাঁর ‘লঙ্গরখানা’ বা ‘রিলিফওয়ার্ক’ গল্পগুলো পাঠ করলে মনে হয় যেন লেখক বর্তমান সময়ের ত্রাণ চুরির মহোৎসবকেই উপজীব্য করেছেন। রিজেন্ট শাহেদের মতো আধুনিক প্রতারকদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য যে বহু আগে তাঁর ‘এআইসিসি’ গল্পের শহীদ চরিত্রের মাধ্যমে ফুটে উঠেছিল, তা ভাবলে তাঁর দূরদর্শিতা দেখে বিস্মিত হতে হয়।
শেষে বলা যায়, আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন একাধারে সাহিত্যের জাদুকর, রাজনীতির ধীমান কারিগর এবং সমাজের তীক্ষ্ণ পর্যবেক্ষক। তাঁর লেখনী কেবল একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং তা চিরকালীন মানবচরিত্রের দুর্বলতা ও অসংগতিগুলো ধারণ করে আছে।
অন্নদাশঙ্কর রায় যথার্থই বলেছিলেন, ‘আয়না লিখিয়া আবুল মনসুর আহমদ প্রাতঃস্মরণীয় হইয়াছিলেন, ফুড কনফারেন্স লিখিয়া তিনি অমর হইলেন।’ বর্তমান বাংলাদেশের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে আমরা যত বেশি সংকটের সম্মুখীন হচ্ছি, আবুল মনসুর আহমদের প্রাসঙ্গিকতা তত বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হচ্ছে।
তিনি আমাদের জন্য যে আয়না রেখে গেছেন, সেই আয়নায় নিজেদের ভুলগুলো দেখা এবং সমাজকে পুনর্গঠন করাই হবে তাঁর প্রতি শ্রেষ্ঠ সম্মান। তিনি কেবল অতীতের কোনো কিংবদন্তি নন, বরং তিনি আমাদের বর্তমানের সঠিক পথপ্রদর্শক। যত দিন সমাজে ভণ্ডামি থাকবে, শোষকের আস্ফালন থাকবে এবং সত্যের অপলাপ ঘটবে, তত দিন আবুল মনসুর আহমদ তাঁর শাণিত কলম হাতে আমাদের বিবেককে জাগ্রত করে যাবেন।
আলমগীর মোহাম্মদ বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ও অনুবাদক