সুনীল কর্মকার: কাছ থেকে দেখা এক মরমি সাধক

সুনীল কর্মকার (১৫ জানুয়ারি ১৯৫৯-৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬)ছবি: সংগৃহীত

বাংলা লোকজ সংগীতের আকাশ থেকে এক গীতল নক্ষত্র ঝরে পড়ল বড় অবেলায়; তিনি পূর্ব ময়মনসিংহ অঞ্চলের লোকসংগীতের প্রবাদপুরুষ সুনীল কর্মকার। তাঁর ৬৭ বছরের সুবর্ণ সংগীতজীবনের সূচনা হয়েছিল বাউল কবি ওস্তাদ জালাল উদ্দীন খাঁর সুর-সান্নিধ্যে। জালালগীতিকায় নিজের সুরের পরশপাথর ছুঁইয়ে সেই অনবদ্য গীত ও বাণীকে তিনি বাঁচিয়ে রেখেছিলেন আজন্ম, পৌঁছে দিয়েছিলেন বাংলার সীমানা ছাড়িয়ে দূর দেশান্তরে।

৬ ফেব্রুয়ারি শুক্রবার ভোর ৪টায় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। বেশ কয়েক দিন ধরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।

ছেলেবেলায় দৃষ্টিশক্তি হারানো এই মায়াবী মানুষটার সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে তাঁর দরাজ মায়াবী গলার স্বর শুনে আলতো হাত ছুঁয়ে অনুভব করতে চেয়েছিলাম তাঁর সুরশক্তির আধ্যাত্মিকতা।

নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার বান্দনাল গ্রামে জন্ম নেওয়া মানুষটি আজন্ম চষে বেড়িয়েছেন ময়মনসিংহ অঞ্চলের হাটঘাট আর পথপ্রান্তর। কয়েক বছরের গভীর সান্নিধ্যে থাকার সুবাদে সুনীল কর্মকারের অন্তর্লোকের কিছু কথা আজ গহিন থেকে উপচে পড়ছে।

আরও পড়ুন

তাঁর জন্মস্থান কেন্দুয়া আদিকাল থেকেই বাংলার লোকসংস্কৃতির এক উর্বর ভূমি। চর্যাপদের আমল থেকে মৈমনসিংহ গীতিকা হয়ে হাল আমলের জালাল-সুনীলেরা এই অঞ্চলকে পরিচিত করেছেন এক গীতল জনপদরূপে। আধুনিকতার নামে শিকড় হারানো সমাজে বি–উপনিবেশায়নের লড়াকু এই সৈনিককে নিয়ে আমাদের যাত্রা শুরু হয়েছিল অঞ্চলের আদি ভাবকে জাগ্রত করতে।

২০২৪ সালে কেন্দুয়ায় আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘জালাল মেলায়’ তিনি যেন বহু বছর পর ফিরে পেয়েছিলেন প্রাণের স্পন্দন। সেখানে প্রতিদিন উপস্থিত থেকে সুরের মোহে আন্দোলিত করেছেন পূর্ব ময়মনসিংহের আদি মানসকে। সেইবার মধ্যরাতে জালাল খাঁর ‘অতৃপ্ত আশায়, ঘুরিছে সদায়, অস্তিত্ববিহীন মানুষেরই মন’ গাইতে গিয়ে গানের যে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, তাতে ফুটে উঠেছিল এক নিগূঢ় ‘সুনীল-মন’।

মানুষের চিরায়ত লালসা আর অসীম চাহিদার পেছনে ছোটা মানবমনের স্বরূপ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি তুলে ধরেন জালালের এই গানের মর্মার্থ। উপস্থিত হাজারো শ্রোতাকে মনে করিয়ে দেন—মানুষ আসলে এক অদ্ভুত মোহের পেছনে ছুটছে, যার শেষটা আদতে শূন্য। সে সময় যেন রবীন্দ্রনাথের সেই জিজ্ঞাসা—‘পথের শেষ কোথায়, কী আছে শেষে’—মিশে গিয়েছিল জালাল-সুনীলের অন্তঃদর্শনের সমবিন্দুতে।

সুনীল কর্মকার। কেন্দুয়ার জালাল মেলা ২০২৪
ছবি: ভিডিও থেকে সংগৃহীত
সুনীল কর্মকার পূর্ব ময়মনসিংহের সীমানা ছাড়িয়ে আমাদের লোকজ গীতধারাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্বদরবারে। রাতভর আলাপনে প্রায়ই আমি তাঁর মরমি দর্শন আবিষ্কারের চেষ্টা করতাম। সনাতন ধর্মের পারিবারিক পরিচয় আর আধ্যাত্মিক জগতের বহুবিশ্বাসের তুলনামূলক আলোচনায় তিনি সরাসরি লিপ্ত না হলেও, নিভৃত আলাপনে বুঝিয়ে দিতেন—আদতে তিনি সর্বজনীন মানবতাবাদে দীক্ষিত এক মরমি সাধক।

ব্যক্তিগত আলাপনে একবার দ্বিতীয় পুত্রের বিসিএস (ট্যাক্স) ক্যাডারে চাকরি হওয়া প্রসঙ্গে সুনীল কর্মকার তাঁর অবস্থান পরিষ্কার করেছিলেন এভাবে—পুত্রকে স্পষ্ট বলে দিয়েছিলেন, ‘যদি সততা নিয়ে চাকরি করতে পারো তবেই করো, নইলে এ চাকরির আমার দরকার নেই।’

জালাল মেলার মঞ্চে সুনীল কর্মকার প্রশাসনের কাছে কিছু জোরালো দাবি জানিয়েছিলেন। যার অন্যতম ছিল বাউলগানের নামে অশ্লীলতা বন্ধ করা এবং জালালগীতিকা চর্চার জন্য একটি ‘জালাল একাডেমি’ নির্মাণ। তাঁর সেই আহ্বান স্থানীয় মানুষের মনে দাগ কেটেছিল এবং অশ্লীল সংগীতের বিরুদ্ধে একধরনের জাগরণ তৈরি হয়েছিল। তাঁর স্বপ্নের সেই জালাল একাডেমির বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা আমি চালিয়ে যাচ্ছি নিরন্তর।

একাডেমি না হলেও আমাদের স্বল্প সাধ্যে একটি দৃষ্টিনন্দন ‘জালাল মঞ্চ’ নির্মাণ করা হয়েছিল। সেই মঞ্চের উদ্বোধনে সুনীল কর্মকার কেন্দুয়ার অপর দুই বিখ্যাত পালাকার কুদ্দুস বয়াতি ও সালাম সরকারকে নিয়ে গানে গানে জানান দিয়েছিলেন এই অঞ্চলের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক প্রবাহকে। তবে সেই উদ্বোধনের পর একটি বিশেষ গোষ্ঠীর সাম্প্রদায়িক সাইবার আক্রমণের শিকার হয়েছিলেন এই তিন গুণী শিল্পী। সেবার সুনীল কর্মকারের সেই নীরব অশ্রুবিসর্জন আমাদের বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল।

সম্প্রতি একুশে পদকের মনোনয়ন প্রেরণের জন্য দাপ্তরিক কাগজপত্রের প্রয়োজনে তাঁর সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করি। অদ্ভুত, এই সাধক পদক বা স্বীকৃতির বিষয়ে ছিলেন একেবারেই উদাসীন। অথচ কোনো আড্ডা বা ঘরোয়া গানের আসরে ডাকলেই শিশুদের মতো ছুটে আসতেন। ময়মনসিংহ শহরের অদূরে শম্ভুগঞ্জের খোলা রেস্তোরাঁ, জয়নুল পার্ক–সংলগ্ন কাচারি ঘাট কিংবা শিষ্যদের আঙিনায় জীবনবোধ বিলিয়ে দিতেই তিনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।

মিতভাষী ও প্রচার বিমুখ এই গুণী মানুষের তালিম নিয়ে গড়ে উঠেছেন অসংখ্য বাউলশিল্পী। সুনীল কর্মকারের কাছে ছুটে গিয়েছেন বরেণ্য সব গবেষক। এপার বাংলা ছাড়িয়ে ওপার বাংলাতেও সুনীল ছিলেন অত্যন্ত পরিচিত কণ্ঠস্বর। পালাকার সায়িক সিদ্দিকীর কাছে জেনেছি, কলকাতার জনপ্রিয় লোকসংস্কৃতি উৎসব ‘সহজ পরব’-এ সুনীল কর্মকারের পরিবেশনা শ্রোতাদের বিমোহিত করেছিল।

ঢাকায় আন্তর্জাতিক ফোক ফেস্টেও তাঁর গাওয়া জালালগীতি ‘পিরিতি জান্নাতেরই ফল ধরল না মোর বাগানে’ আজও ডিজিটাল মাধ্যমে শ্রোতাদের মুগ্ধ করে। সুনীল কর্মকারের প্রয়াণের খবরটি শিল্পী মৌসুমী ভৌমিককে জানানোর পর তিনি স্মৃতিচারণা করে বললেন, তাঁর গবেষণার কাজে তিনি দুবার সুনীল বাবুর সান্নিধ্য পেয়েছিলেন।

সুনীল কর্মকার
ছবি: সংগৃহীত

সুনীল কর্মকার পূর্ব ময়মনসিংহের সীমানা ছাড়িয়ে আমাদের লোকজ গীতধারাকে পৌঁছে দিয়েছিলেন বিশ্বদরবারে। রাতভর আলাপনে প্রায়ই আমি তাঁর মরমি দর্শন আবিষ্কারের চেষ্টা করতাম। সনাতন ধর্মের পারিবারিক পরিচয় আর আধ্যাত্মিক জগতের বহুবিশ্বাসের তুলনামূলক আলোচনায় তিনি সরাসরি লিপ্ত না হলেও, নিভৃত আলাপনে বুঝিয়ে দিতেন—আদতে তিনি সর্বজনীন মানবতাবাদে দীক্ষিত এক মরমি সাধক।

এই মহান সাধকের প্রয়াণলগ্নে তাঁর দরাজ গলায় গাওয়া জালালগীতিকার সেই অমোঘ কথাগুলোই কানে বাজছে: ‘পর্বত পিরিতে অটল সমুদ্দুরের সাথেতে/ তাইতে পানি বাষ্প হইয়া ওঠে গিয়া তার মাথে/ সেথায় গিয়া মেঘ বাঁধিয়া হয়রে বারি বরিষণ/ থাকতে ক্ষুধা প্রেমের সুধা পান করে যা পাগল মন।’

জীবনচক্রের এই অমোঘ ধারায় কোনো এক মহাশূন্যে পৌঁছে সুরের মেঘ বেঁধে আবারও গীতবর্ষণ হয়ে ফিরে আসুক বাউল সুনীলের মরমি বোধ—এই বাংলায়।

  • ইমদাদুল হক তালুকদার সাবেক উপজেলা নির্বাহী অফিসার, কেন্দুয়া, নেত্রকোনা এবং মানসিক জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ