মতামত
মার্ক টালির চোখে ‘নিয়ন্ত্রিত সাংবাদিকতা’
একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশের পাশে দাঁড়ানো খ্যাতনামা সাংবাদিক মার্ক টালির জীবনাবসান হয়েছে। ১৯৭১ সালে তিনি বিবিসির দক্ষিণ এশিয়াবিষয়ক সংবাদদাতা। মার্ক টালির পাঠানো খবর বাংলাদেশের পক্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গঠনে ভূমিকা রেখেছিল। এ জন্য বাংলাদেশ সরকার তাঁকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’য় ভূষিত করে। তাঁর প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রথম আলোয় ২০২০ সালে প্রকাশিত লেখাটি সংক্ষেপিত আকারে পুনরায় প্রকাশিত হলো।
মার্ক টালির মতে, সার্বিকভাবে টিভি সাংবাদিকতার মান মারাত্মকভাবে নেমে গেছে। তারা সাংবাদিকতার সস্তা পথ বেছে নিয়েছে। শুধু সাক্ষাৎকারের ভিত্তিতে সংবাদ পরিবেশন করছে। তৃণমূলের মানুষ কী ভাবছে, তা খতিয়ে দেখছে না। এ ছাড়া কোনো গণমাধ্যম ফলোআপ করতেও আগ্রহ দেখায় না। একটা-দুটো প্রতিবেদন করে দায়িত্ব শেষ করে। এটি কাঙ্ক্ষিত নয়।
তবে ভারতের মুদ্রিত মাধ্যমের সাংবাদিকতার প্রশংসা করে তিনি বলেছেন, সংবাদপত্রের চিত্রটা উজ্জ্বল। অনেক পত্রিকাই গুরুত্ব দিয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করে। কেউ কেউ সরকারকে সমর্থন করছে। ঠিকই আছে। ব্রিটেনের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ওইখানের সংবাদপত্রগুলো এভাবে না হয় ওভাবে একটি রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে থাকে। ভারতে সেটা নয়। যেসব পত্রিকা একসময় অধিক সরকার-সমর্থক ছিল, তারা পরে আর সরকারের সঙ্গে যুক্ততা রাখেনি। সরকারকে চ্যালেঞ্জও করছে। ব্রিটেনের অনেক পত্রিকা ঘোষণা দিয়ে কোনো রাজনৈতিক দলকে সমর্থন বা বিরোধিতা করে। এই ধারা পশ্চিমের আরও অনেক দেশে আছে।
মার্ক টালি মনে করেন, শুধু গণমাধ্যম নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সবল হয়েছে পুলিশ ও আমলাতন্ত্র। সরকার পুলিশ ও তদন্ত সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ভারতের গণমাধ্যমের সাম্প্রতিক প্রবণতায় মার্ক টালি উদ্বিগ্ন। তিনি বলেন, বর্তমান অবস্থা ভিন্ন। লোকজন মনে করে, গণমাধ্যমের ওপর অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। ইন্দিরা গান্ধীর আমলে যখন জরুরি অবস্থা ছিল, তখন গণমাধ্যমের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল। কুলদীপ নায়ারসহ অনেক সাংবাদিক গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। বিবিসিতে সরকারের সমালোচনা করায় মার্ক টালিকেও লন্ডনে ফেরত যেতে হয়েছিল। জরুরি অবস্থা প্রত্যাহার করা হলে তিনি আবার দিল্লিতে আসেন।
সম্ভবত এসব মনে রেখেই মার্ক টালি গণমাধ্যমে অঘোষিত জরুরি অবস্থা আছে বলে মন্তব্য করেছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঘোষিত জরুরি অবস্থার চেয়ে অঘোষিত জরুরি অবস্থা আরও বিপজ্জনক। ঘোষিত জরুরি অবস্থায় সরকার থেকে জানিয়ে দেওয়া হয় কী লেখা যাবে, কী লেখা যাবে না। কিন্তু অঘোষিত জরুরি অবস্থায় আগে থেকে কিছু বলা হয় না। সরকার তক্কে তক্কে থাকে। সুযোগ পেলেই খড়্গহস্ত হয়।
মার্ক টালি মনে করেন, শুধু গণমাধ্যম নয়, রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোও দুর্বল হয়ে পড়েছে। সবল হয়েছে পুলিশ ও আমলাতন্ত্র। সরকার পুলিশ ও তদন্ত সংস্থাগুলোকে রাজনৈতিক স্বার্থে কাজে লাগাচ্ছে। ফলে ন্যায়বিচার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
মার্ক টালি ভারতের প্রেক্ষাপটে কথাগুলো বললেও বাংলাদেশের বাস্তবতার অনেক ক্ষেত্রে হুবহু মিলে যায়। মার্ক টালি গণমাধ্যমের স্বাধীনতা প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয়ের প্রতি গুরুত্ব দিয়েছেন। সংবাদপত্র বা টেলিভিশনের মালিকানা কার হবে? তাঁর মতে, সংবাদপত্র বা টেলিভিশন ব্যক্তিমালিকানায় থাকলে মালিকের কথা শুনবে। সরকারের কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা নিলে তার সমালোচনা করতে পারে না। আবার তারা বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীল হলে বিজ্ঞাপনদাতার মন জুগিয়ে চলতে হয়।
মার্ক টালি মনে করেন, জনমালিকানায় পরিচালিত গণমাধ্যম অধিকতর স্বাধীনতা ভোগ করে। উদাহরণ হিসেবে তিনি ব্রিটেনের পত্রিকা গার্ডিয়ান ও সম্প্রচার প্রতিষ্ঠান বিবিসির কথা বলেছেন। টেলিভিশন লাইসেন্স ফি দিয়ে যে আয় হয়, সেটাই বিবিসির আয়ের প্রধান উৎস। আগে বহির্বিশ্বের অনুষ্ঠানের জন্য সরকার বরাদ্দ দিত। এখন সেটিও নেই। অন্যদিকে ভারতের নিউজ পোর্টাল দ্য ওয়্যার ও ব্রিটেনের পত্রিকা গার্ডিয়ানও চলে সমর্থক ও গ্রাহকদের চাঁদা বা অর্থায়নে। গার্ডিয়ান গণবিজ্ঞপ্তি দিয়ে তহবিল সংগ্রহ করছে।
মার্ক টালি বলেছেন, বিবিসি জনগণের কাছ থেকে লাইসেন্স ফি দিয়ে চলছে বলেই সরকারের নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত। টেলিভিশন কী প্রচার করবে কী করবে না, তা বলার এখতিয়ার সরকারের নেই।
কিন্তু বাংলাদেশের বাস্তবতায় গ্রাহক মাশুল কিংবা লাইসেন্স ফি দিয়ে পত্রিকা ও টিভি চালানো সম্ভব নয় বলেই সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। আর বাংলাদেশে সংবাদপত্রের বড় সমস্যা হলো, এর উৎপাদন খরচ অনেক বেশি। ফলে বিজ্ঞাপনই আয়ের প্রধান উৎস। বিজ্ঞাপনের ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে হলে পত্রিকার দাম বাড়াতে হবে। কিন্তু আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির যুগে যেখানে পাঠক প্রায় বিনা মূল্যে সব তথ্য হাতের কাছে পেয়ে যাচ্ছেন, সেখানে পত্রিকার দাম বাড়ানো কতটা বাস্তবসম্মত, তা-ও ভেবে দেখার বিষয়।
মার্ক টালি ভারত ও ব্রিটেনের গণমাধ্যমের সংকটের কথা বলেছেন, তাঁর মতো করে সংকট উত্তরণের পথ বাতলেছেন। কিন্তু বাংলাদেশের গণমাধ্যমের সংকট আরও গভীর, উত্তরণের পথ অধিকতর সংকুচিত।
সোহরাব হাসান কবি ও সাংবাদিক
