দিলারা হাফিজ: ইডেনের সেই শুকতারার বিদায়

দিলারা হাফিজছবি: সংগৃহীত

‘ভুল আমরা সবাই করি। কিন্তু ভুল থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়া উচিত।’ এই হলো আমাদের তপ্ত কাঞ্চন বর্ণ আর মিষ্টি হাসির প্রফেসর দিলারা হাফিজ আপা। আমার ইডেন কলেজের জীবনে শুনিনি কাউকে তিনি বকাবকি করেছেন। আমাদের সেই মিষ্টি আপা গত ২৯ মার্চ সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেছেন।

জীবনসঙ্গীকে কর্তব্যের জন্য দায়িত্বপালনের নিমিত্তে একা রেখে চিকিৎসার জন্য যেতে হয়েছে। এর আগেও যেতেন ব্যাংকক ডাক্তার দেখাবার জন্য। একাই চলে যেতেন। শুনে অবাক হতাম। তিনি বলতেন, ‘আমার জন্য কারও কাজ নষ্ট হবে, আমি তা চাই না।’ এমনই ছিলেন তিনি।

কোনো দিন প্রকাশ করেননি—‘আমি মন্ত্রীর বউ, আমি এবং আমার স্বামী বেগম জিয়ার স্নেহধন্য।’ আমি হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘আপা উনি (বেগম জিয়া) দেখতে কেমন?’ একটু উচ্ছ্বসিত হয়ে বললেন, ‘ছবিতে যা দেখো, তার চেয়ে অনেক বেশি সুন্দর। আমার ছেলে হওয়ার পরে তাঁর বাগানের অনেক ফল নিয়ে দেখতে এসেছিলেন।’ ওই এক দিনই। এ ছাড়া আর কখনোই তাঁর ছেলেমেয়ে, স্বামী কিংবা রাজনীতি নিয়ে কোনো আলাপ করেননি।

তাঁর কলেজে চাকরির শেষের দিকে আমি তখন বাংলা বিভাগীয় প্রধান। উপাধ্যক্ষ মহোদয়ের অবসরের সময় হয়েছে। আমাকে ডেকে নিয়ে বললেন, ‘তুমি ভাইস প্রিন্সিপালের জন্য দরখাস্ত করো।’ ‘বলেন কী আপা, আমার কি সেই যোগ্যতা আছে?’ ওই সময় আমি শিক্ষক পরিষদ সচিব, হোস্টেল কমিটির আহ্বায়ক। ইডেন কলেজের হোস্টেল সঠিকভাবে পরিচালনা করা একটা কঠিন দায়িত্ব। তিনি বললেন, ‘তুমি কি পারবে, না পারবে, সেটা আমি জানি।’

মনে পড়ে হিসাববিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক শিরীন আপার কথা। যেকোনো দায়িত্ব দিলে তিনি নিখুঁতভাবে করতেন। তিনিও আমার সঙ্গে হোস্টেল কমিটিতে ছিলেন। তিনিসহ হোস্টেলের সব দায়িত্ব কমিটির অন্য সদস্যরা নিলেন। আর আমাকে উপাধ্যক্ষের দায়িত্ব নিতেই হলো। যোগদানের দিন কত অনুষ্ঠান হলো। ফুলের শুভেচ্ছায় উপাধ্যক্ষের কক্ষ ভরে গেল।

আপা যেদিন অধ্যক্ষের দায়িত্ব নিতে ইডেনে এসেছিলেন, কাকতালীয়ভাবে আমি ওই সময় অধ্যক্ষের কক্ষে ছিলাম। জয়েন করে যাওয়া পর্যন্ত আমি তাঁর সঙ্গেই ছিলাম। তাঁকে আমি অনেক আগে থেকেই চিনতাম, তিতুমীর কলেজে তিনি আমার সিনিয়র কলিগ ছিলেন। খুব পছন্দ করতাম, এত হাসিখুশি থাকতেন। তাই ভালো লাগত। তাঁকে বলতাম, ‘আপনি তো আমাদের বরিশালের বউ। তা ছাড়া তাঁর শ্বশুর ডা. আজহারউদ্দিন সাহেব ছিলেন আমার আব্বার শ্রদ্ধাভাজন।’  

আপা জয়েন করতে এলে কয়েকজন টিচার আড়ালে বলছিল, স্বামীর (মেজর অব. হাফিজ উদ্দিন আহমদ, বীর বিক্রম) মন্ত্রিত্বের ক্ষমতায় তিনি প্রিন্সিপাল হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন। কিন্তু পরবর্তী সময়ে দেখেছি যোগ্যতা কাকে বলে! শিক্ষা বিভাগের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি শীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছেছিলেন এবং যোগ্যতার স্বাক্ষর রেখেছিলেন। যোগ্যতা, কর্তব্য, দায়িত্ব, চারিত্রিক মাধুর্য সবটুকু দিয়ে তিনি সবার হৃদয় জয় করেছিলেন। কে বিএনপি, কে আওয়ামী লীগ, কে জামায়াত কোনো পার্থক্য করেননি। এ বিষয়টা তাঁর মনেই আসেনি।

সব বিভাগের শিক্ষকদের তিনি বিভিন্ন দায়িত্ব দিতেন। প্রত্যেকে সচেষ্ট ছিল যার যার কাজ সুচারুরূপে সম্পন্ন করার জন্য। প্রায়ই তিনি আমাকে নিয়ে কলেজ রাউন্ডে যেতেন। কাউকে বিব্রত করতে নয়, সজাগ করতে। দেখতেন সব টেবিল-চেয়ার গোছানো আছে কি না। আমাদের দু-একজন কর্মচারী সঙ্গে থাকত। সব কখন কীভাবে গুছিয়ে রাখতে হবে। ওদেরকে বলতেন, দিনের শুরুতে নয় ছাত্রীরা চলে যাওয়ার পরই রুম ভালো করে পরিষ্কার করে লাইট-ফ্যান বন্ধ করে যেতে হবে। এমনকি ছাদের দিকে ঝুল আছে কি না, তা–ও তার দৃষ্টি এড়াত না। সঙ্গে সঙ্গে আমাকেও নানা উপদেশ দিতেন। তাঁর কাছ থেকে অনেক কিছু শিখেছি। অবাক হয়ে যেতাম এত এনার্জি তিনি পান কেমন করে।

কলেজের পাঠদান কর্মসূচির পাশাপাশি যেকোনো অনুষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতেন দিলারা হাফিজ
ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষাবিষয়ক নানা অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। এসব অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য ক্লাসের পরে তাঁর ঘরে বসে কাজ করতে করতে সন্ধ্যা নেমে রাত হয়ে আসত। আমাদের ক্লান্তিও আসত না। কী যে ভালো লাগত! সকাল হলেই মনে হতো কখন কলেজে যাব। শুধু দায়িত্ব ছাড়া সবকিছু থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রাখার একটা প্রবণতা ছিল আমার। কিন্তু তিনি ইডেনে আসার পর সব কোথায় ভেসে গেল। প্রায় সব কাজে নিজেকে জড়িয়ে ফেললাম, খুব ভালো লাগত, প্রাণ ভরে উপভোগ করতাম।

পুরোনো একটা একতলা বিল্ডিং আগে যেটা অধ্যক্ষের অফিস ছিল, সঙ্গে স্টাফদের। পরবর্তী সময়ে অবশ্যই নতুন দোতলা বিল্ডিং হওয়ার পরে প্রিন্সিপালের সঙ্গে সঙ্গে স্টাফদের জায়গা পরিবর্তিত হয়েছিল। অনেক দিন থেকেই আমরা দেখে আসছি পুরোনো বিল্ডিংটার সামনে বেশ খানিকটা জায়গা ঘের দেওয়া আছে—আপা ষাটের দশকে প্রথমে ইডেনে জয়েন করেছিলেন। আপা বললেন ওই জায়গাটায় সুন্দর ফুলের বাগান ছিল। বর্তমানে মাটি শুকিয়ে একেবারে খটখটে হয়ে আছে। সাব্যস্ত হলো ওখানে আগের মতো বাগান করবেন। করে ফেললেন বাগান। সে বাগানের জন্য অনেক সময় কলেজে আসার পথে কিনে নিয়ে আসতেন গাছের চারা। সেই মাটি উপযুক্ত করে ফুল ফুটিয়ে ছাড়লেন। তাই বলে কলেজের একটি টাকা কখনো অপচয় করতেন না। যেমন পাই-পয়সার হিসাব নিতেন, তেমনি নির্দিষ্ট জায়গায় জমা দিয়ে দিতেন।

এভাবে দিলারা হাফিজ পরিশ্রম, দক্ষতা আর সততার উজ্জ্বল উদাহরণ হয়ে থাকলেন। ক্লাসের ব্যাপারে কোনো আপস ছিল না। পথে যানজটের কথা বললে বলতেন, ‘কেন হাতে একটু সময় নিয়ে বের হও না।’

শৃঙ্খলা কমিটি, পরীক্ষা কমিটি, স্পোর্টস কমিটি, ছাত্রীদের জন্য আর্থিক সহায়তা কমিটি, হোস্টেল কমিটি—বিভিন্ন নামের নানা রকম কমিটি করে বলতে গেলে পুরো ইডেন কলেজকে ব্যস্ত রাখতেন। সব কমিটির সঙ্গে আবার আলাদাভাবে মিটিং করতেন। সাধ্যমতো পরামর্শ দিতেন। তাঁর বিদায়ের পর বেশ কয়েকজনের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে। সবার এক কথা—আপা আমাকে এত ভালোবাসতেন। অর্থাৎ আমরা যার যার মতো মনে করতাম তিনি আমাকেই বেশি ভালোবাসতেন। পরবর্তী সময়ে আমি যখন অধ্যক্ষ হিসেবে ইডেনের দায়িত্ব পেলাম, যত দিন ছিলাম তাঁর দেখানো পথেই হেঁটেছি।

দিলারা হাফিজ, তাঁর একটা মিষ্টি নাম আছে। আপনজনেরা তাঁকে সেই নামেই ডাকত—‘ঝর্ণা’—‘তরলিত চন্দ্রিকা চন্দন বর্ণনা’। প্রকৃতপক্ষে তিনিও তা–ই ছিলেন, হারিয়ে গেলেন কোন সুদূরে। সেই বিপুল সুদূরের নাগাল কি পাওয়া যায়? এবারের নির্বাচনের দিন দুই আগে ভাবলাম একটু খোঁজ নিয়ে দেখি আপা কোথায়। ফোন পেয়ে বললেন, ‘আমি সিএমএইচ–এ।’ কেন আপা? অনেক কথার পরে বললেন, ‘আমি ভালো। কিন্তু আমাকে নির্বাচনী প্রচারণার জন্য ছেলেমেয়েরা নিল না। বলল, তুমি রেস্ট নাও।’ ওখানে একা থাকেন বলাতে বললেন, ডাক্তাররাও আমার এত যত্ন নেয় তোমাকে কী বলব! শেষ কথা মনেই হয়নি। আজ তাঁর কাছে যাব, কাল যাব—এমনি করে আর যাওয়াই হলো না।

আমার শিক্ষকতা জীবনের শ্রেষ্ঠ সময় তাঁর সঙ্গে কাটিয়েছি। কত স্মৃতি, কত ঘটনা, কত আনন্দ-উচ্ছ্বাস ছোট সময়টুকু তিনি ভরিয়ে দিয়েছিলেন। হৃদয় মন উজাড় করা বিনম্র শ্রদ্ধা সেই শুকতারার প্রতি। ভালো থাকুন। আল্লাহ সহায় হোন।

ফাসুবহানাল্লাজি বিয়াদিহি মালাকুতু কুল্লি শাইয়িন ওয়া ইলাইহি তুরজাউন

(অতএব পবিত্র সেই সত্তা, যাঁর হাতে প্রতিটি বিষয়ের সার্বভৌম ক্ষমতা এবং যাঁর কাছেই তোমাদের ফিরে যেতে হবে। সুরা ইয়াসিন, আয়াত ৮৩)

  • অধ্যাপক তাহমিনা হোসেন সাবেক অধ্যক্ষ, ইডেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ