সাখাওয়াত আলী খান: মানুষের মৃত্যু হলে তবু মানব থেকে যায়

প্রয়াত সাখাওয়াত আলী খানফাইল ছবি

আমরা তখন বইয়ের ডানায় উড়ে যাই। সত্য পিপাসায় ঘুরে বেড়াই লাইব্রেরিতে, জার্নাল সেকশনে, টিএসসিতে। কবিতার মতো ঢাকা শহরে নতজানু প্রার্থনার মতো ডুব দিই। দেখি, ক্যাম্পাসে শুয়ে থাকে রৌদ্রদুপুর, পায়ে জোড়া পাতার নূপুর। কিন্তু ভার্সিটিতে ভর্তি হতে না হতে শুনি ‘সাইন-এ-ডাই’। তখন এরশাদের আমল। কবিতার মতো শহর উত্তাল হচ্ছে, ক্যাম্পাসে তখন সবুজ দিন। অবাক চোখে দেখি ফুলের বদলে ফুটছে আগুনের ফুলকি। ক্যাম্পাসে তারুণ্যের আঠারোর অহংকার।

নিরীহ, অন্তর্মুখী বইপ্রেমী মানুষ আমি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে ভর্তি হয়ে দেখলাম অসীম আশ্চর্য সব বাস্তবতাকে। আমরা চাঁদের সঙ্গে বড় হয়ে ওঠা তরুণ, কবিতা ভালোবেসে বড় হওয়া তরুণ। সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষকেরা সব ম্যাজিশিয়ান—জাদুকর তাঁরা কিংবা বাজিকর।

আজ সব শিক্ষক নয়, বলতে চাই সদ্য প্রয়াত ড. সাখাওয়াত আলী খান স্যারের কথা। ব্যাকব্রাশ করা একমাথা চুল, সৌম্যকান্তিময় চেহারার মায়াময় হাসিতে আচ্ছন্ন অবয়বের শিক্ষক তিনি। দূরে কোথাও স্লোগান হচ্ছে, তরুণ তুর্কি কবিরা বানাচ্ছেন কবিতা পড়ার প্রহর। অথচ আমরা আলো–ছায়া ক্লাসরুমে।

সাখাওয়াত স্যার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে আমাদের ক্যাম্পাস পৃথিবী থেকে আলাদা করে দেন। স্যার যেন ভিন্ন নীরব মঞ্চ, মিতভাষী কণ্ঠস্বরে সময়ের কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেন। কখনো সাংবাদিকতার ইতিহাস পড়ান, কখনো এডিটিং আর পেজ মেকআপ। আমি খুব মুগ্ধ বিস্ময়ে দেখি, শিক্ষকেরা আসলে ক্লাসে পড়ান না। তাঁরা নির্মাণ করেন পৃথিবী। গণমাধ্যমের অর্জন, বর্জন আর বিসর্জন নিয়ে পড়ান স্যার। লেখার যেমন মূল্যায়ন হয়, কথাশৈলীর তেমন মূল্যায়ন হয় না। অথচ এটি একটি দারুণ শিল্প।

স্যার যখন পড়ান সাংবাদিকতার ইতিহাস, তখন পড়াগুলো গল্প হয়ে যায়। আমরা দেখি, মানুষ ফুলেফেঁপে বিত্তের প্রভাবে হতে পারে অতিকায় দৈত্য। একটি একচোখা পৃথিবী, ক্ষুধা, যুদ্ধ, মানুষের লড়াই আমরা নতুনভাবে দেখি। সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেঙে পড়া, রুয়ান্ডা নামের দেশটির দুটি জাতি হুতু আর তুতসিদের ক্রমাগত অন্তর্দ্বন্দ্ব, সার্ব বাহিনীর জাতিগত নিধন—দুনিয়াকাঁপানো ঘটনাগুলোর ব্যাখ্যা খুঁজি আমরা।

সাখাওয়াত স্যার আসলে এমন এক শিক্ষক ছিলেন, যিনি শিক্ষার্থীদের নিয়ে যেতে পারতেন অন্য জগতে। ক্লাস শেষে আমরা যখন ক্যাম্পাসে হাঁটি, তখন অন্তর-চোখে আমরা নতুন ক্যাম্পাস দেখতে পারি। বইপড়ুয়া, সিরিয়াস আর নীরব ছাত্র বলে স্যারের স্নেহ পাই। আমার দু-একটা লেখা দেখে উৎসাহ দেন। শিক্ষক আসলে প্রকৃত অভিভাবক। ক্লাসের ছেলেমেয়েরা যারা বিভিন্ন পত্রিকায় সাংবাদিকতা করছে, তাদের আলাদা পরামর্শ দিচ্ছেন স্যার। ভাষা নিয়ে স্যারের ক্লাস ছিল দারুণ, ক্লাস ছিল সংবাদজগতের নৈতিকতা নিয়েও। একাডেমিক তত্ত্বের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবনের অপূর্ব সমীকরণে ক্লাসগুলো ছিল প্রাণবন্ত, উপভোগ্য।

আরও পড়ুন

অধ্যাপক সাখাওয়াত স্যারের ছাত্র হিসেবে আমরা গর্ব বোধ করি। তিনি সাংবাদিকতা বিভাগের একজন শিক্ষাগুরু ছিলেন, ছিলেন মহাপ্রাণ। ‘ছিলেন’ শব্দটি বলার সঙ্গে সঙ্গে যে ‘অতীত’ প্রকাশ পায়, আমি তার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করি। প্রকৃত শিক্ষকের কোনো মৃত্যু নেই, বিদায় নেই। স্যারের মতো শিক্ষকেরা নির্মাণ করেছেন বহু শিক্ষার্থীর মেধা ও মনন। স্যারকে দেখেছি নব্বইয়ের দশকেও ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়ার যোগসূত্র স্থাপনে ছিলেন উদ্যোগী এক মানুষ। তিনি শিক্ষক, প্রশিক্ষক, সাংবাদিক, গবেষক ও লেখক হিসেবে সব কটি পেশায় ছিলেন যুগপৎ সফল।

গণমাধ্যমের উজ্জ্বল নক্ষত্র সাখাওয়াত স্যারের শোকসংবাদে মনে হচ্ছে, রাস্তার বাতিগুলো নিভে যাচ্ছে, বনভূমি হয়ে যাচ্ছে মরুভূমি। মানুষের মৃত্যু হলে তবু মানব থেকে যায়। থেকে যাবে স্যারের পরিমিত আর পরিশীলিত জীবনবোধ, নৈতিকতা শিক্ষা ও দর্শন।

  • ফারহিম ভীনা প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী