বয়ানের যুদ্ধ: সীমান্ত ছাড়িয়ে অপতথ্যের শিকার বাংলাদেশ

আজকাল দক্ষিণ এশিয়ার দিকে তাকালে মনে হয়, এখানে সবচেয়ে শক্তিশালী রাজনৈতিক অস্ত্র কোনো নীতি, সক্ষমতা, ক্ষেপণাস্ত্র বা নিষেধাজ্ঞা নয়—সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্রটি এখন কিছু গল্পের মাধ্যমে উপস্থাপিত ও প্রতিষ্ঠিত বয়ান।

চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানপরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ যখন জাতীয় নির্বাচনের দিকে এগোচ্ছে, তখন ক্রমশই দেশটি এক ক্রমবর্ধমান তথ্যযুদ্ধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। দেশের অভ্যন্তরের বিবদমান শক্তিগুলোর বাইরেও এই তথ্যযুদ্ধের পেছনে রয়েছে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা। ভারত ও পাকিস্তানভিত্তিক গণমাধ্যম ও অনলাইন নেটওয়ার্কগুলো বাংলাদেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, নির্বাচন, নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ নিয়ে একে অপরের বিপরীত, বিভ্রান্তিকর এবং প্রায়ই সূত্র, সত্য ও যাচাইহীন গল্প ও বয়ান ছড়াচ্ছে।

এটি সাধারণ প্রোপাগান্ডা নয়। এটি ক্ষেত্রবিশেষে ফরেন ইনফরমেশন ম্যানিপুলেশন অ্যান্ড ইন্টারফেয়ারেন্স বা বহিঃশক্তির তথ্য বিকৃতি, কারসাজি ও হস্তক্ষেপের শামিল, যা নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা এবং নিজস্ব বয়ান উপস্থাপন ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে।

কেস স্টাডি

ভারতভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমে গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে দেখানো হয়েছে ইসলামপন্থী উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়া একটি রাষ্ট্র হিসেবে, যার পেছনে নাকি পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থার মদদ রয়েছে। শিরোনাম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সতর্কবার্তা দেওয়া হচ্ছে উগ্রমিলিশিয়া, সন্ত্রাসী অনুপ্রবেশ ও আসন্ন বিশৃঙ্খলা নিয়ে। অথচ এসব দাবির পক্ষে নেই কোনো যাচাইকৃত গোয়েন্দা তথ্য বা সরকারি ভাষ্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব গল্পের উৎস অজ্ঞাতনামা সূত্র, প্রান্তিক ওয়েবসাইট কিংবা পুনর্ব্যবহৃত গুজব, যেগুলো পরে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পক্ষপাতদুষ্ট নেটওয়ার্কের মাধ্যমে।

বাংলাদেশে কানাডা সরকারের অর্থায়নে পরিচালিত ইলেকশন ইন্টিগ্রিটি টাস্কফোর্স বা ইআইটিএফের সিচুয়েশন রুম প্রায় ২৭টি অনলাইন নিবন্ধ ও অন্তত ৪০টির বেশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পোস্ট শনাক্ত করেছে, যেগুলো একই ধরনের দাবি করা হয়েছে। এসব আধেয় ফেসবুক, এক্স ও ইউটিউবে ছড়ানো হয়, যার বড় অংশই পরিচিত রাজনৈতিক বা ভুয়া তথ্য ছড়ানো অ্যাকাউন্ট থেকে এসেছে।

ইআইটিএফের একটি কেস বিশ্লেষণে দেখা যায়, নর্থইস্ট নিউজ ছিল এসব দাবির প্রাথমিক উৎস। পরে আইএএনএস ও অস্ট্রেলিয়া ইন্ডিয়া নিউজসহ অন্যান্য মাধ্যমে, সেগুলো আরও বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন

অন্যদিকে পাকিস্তানভিত্তিক কিছু গণমাধ্যম ও কমিউনিটি পেজ একটি ভিন্ন গল্প তুলে ধরছে। সেখানে বাংলাদেশকে কখনো ভারতের গোপন অপারেশনের শিকার, আবার কখনো একটি উদীয়মান মুসলিম ভূরাজনৈতিক জোটের কৌশলগত অংশ হিসেবে দেখানো হচ্ছে। কিছু পাকিস্তানভিত্তিক মিডিয়া দাবি করেছে, বাংলাদেশ নাকি পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা জোটে যোগ দিতে যাচ্ছে, যার পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট বাংলাদেশি নীতিনির্ধারক বা বিশ্বাসযোগ্য কূটনৈতিক সূত্রের উল্লেখ নেই।

এই দুটি কেসের দুটি বয়ান ও গল্পই মিথ্যা। কিন্তু দুটিরই কৌশলগত উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করা হয়। এসব গল্প অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করা হয়, জাতীয়তাবাদী আবেগ উসকে দেওয়া হয় এবং বাংলাদেশকে কখনো নিরাপত্তা হুমকি, কখনো ভূরাজনৈতিক কূটনীতির অর্জন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এর ফলে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক বাস্তবতা—প্রতিষ্ঠান, নাগরিক ও ভোটের অধিকার—একটি আঞ্চলিক গল্পযুদ্ধের দাবার ঘুঁটিতে পরিণত হয়।

ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পর বয়ানযুদ্ধ

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশকে ঘিরে ভারত-পাকিস্তান বয়ানযুদ্ধকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। গুলির ঘটনার অল্প সময়ের মধ্যেই ভারত ও পাকিস্তানভিত্তিক অ্যাকাউন্টগুলো ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা ছড়াতে শুরু করে। ভারত ঘেঁষা বয়ানে হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে হাদির ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে করা একটি কথিত পোস্টকে যুক্ত করা হয়, যেখানে নাকি ‘গ্রেটার বাংলাদেশ’-এর মানচিত্রে ভারতের ভূখণ্ড দেখানো হয়েছিল। কিছু গণমাধ্যম ও প্রভাবশালী অ্যাকাউন্ট তাঁকে চরম জাতীয়তাবাদী হিসেবে তুলে ধরে এবং বিদ্রূপ ও আগ্রাসী ভাষায় বিষয়টি ছড়িয়ে দেয়।

এর বিপরীতে পাকিস্তান ঘেঁষা বর্ণনায় হাদিকে ‘রাজনৈতিক শহীদ’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয় এবং হত্যাকাণ্ডের জন্য ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা র-কে দায়ী করা হয়। মুসলিম ঐক্য ও ভারতবিরোধী আবেগকে সামনে রেখে তাঁকে ‘গ্রেটার বাংলা’ ধারণার প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়। এসব আবেগঘন বার্তা প্রবাসী ও ধর্মীয় পরিচয়ভিত্তিক নেটওয়ার্কে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।

উভয় ক্ষেত্রেই যাচাইহীন দাবি, খণ্ডিত ও অপূর্ণাঙ্গ তথ্য ও সমন্বিত প্রচারণা সত্য নিরূপণের আগেই জনমত গঠনে প্রভাব ফেলে। এই উত্তেজনার বাস্তব প্রভাব দেখা যায় অফলাইনে। হাদির মৃত্যুর পর ঢাকায় প্রথম আলো ও দ্য ডেইলি স্টার কার্যালয়ে হামলা ও অগ্নিসংযোগ হয়। ‘ভারতপন্থী’ তকমা দিয়ে এসব হামলায় সাংবাদিকেরা ভবনের ভেতরে আটকা পড়েন। পরে জরুরি বাহিনীর হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে।

বাংলাদেশ আগেও অপতথ্যের মুখোমুখি হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ের প্রচারণার ব্যাপ্তি ও সীমান্ত ছাড়ানো চরিত্র অভূতপূর্ব। গণতান্ত্রিক পরিসর রক্ষায় স্বাধীন সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের সঙ্গে দ্রুত ও স্বচ্ছ যোগাযোগ অপরিহার্য। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

গোপন বোমা কারখানা আতঙ্ক

নির্বাচনের আগে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা আইএএনএসের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, বাংলাদেশজুড়ে নাকি ‘গোপন বোমা কারখানা’ সক্রিয় রয়েছে। এসব প্রতিবেদনে অজ্ঞাতনামা গোয়েন্দা সূত্রের উল্লেখ থাকলেও কোনো যাচাইযোগ্য প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়নি।

একটি ভুলভাবে উপস্থাপিত ছবি, যা এক দশকের বেশি পুরোনো একটি অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনার, বাংলাদেশের নির্বাচন-পূর্ববর্তী অস্থির সময়ে ব্যবহার করা হয়। এমনকি প্রমাণ ছাড়াই দাবি করা হয়, জঙ্গি নেতা হাফিজ সাঈদ বাংলাদেশে আসতে পারেন। এসব প্রতিবেদন বহু আঞ্চলিক মাধ্যমে একই ভাষায় ছড়িয়ে পড়ে, যা বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ রাষ্ট্র হিসেবে তুলে ধরে।

আরও পড়ুন

প্রভাব বিস্তারের আধুনিক কৌশল

এসব ঘটনা একটি স্পষ্ট চিত্র তুলে ধরে। আধুনিক প্রভাব বিস্তারের জন্য আর সেনা বা ভূখণ্ডের প্রয়োজন নেই। অ্যালগরিদম, আবেগ, প্রবাসী নেটওয়ার্ক, ইতিহাসের ক্ষত ও ভূরাজনৈতিক দ্বন্দ্বই যথেষ্ট। একটি দেশে ছড়ানো গুজব মুহূর্তেই অন্য দেশে পৌঁছে যায়, অনুবাদ হয়, নতুন মোড় নেয় এবং কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে যায়—ফ্যাক্ট চেকাররা পৌঁছানোর আগেই।

এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। অপতথ্য নির্বাচনের প্রতি আস্থা নষ্ট করে, সমাজে মেরুকরণ বাড়ায়, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং প্রত্যাশিত ফলাফল নিয়ে বিরোধ তৈরি হলে অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ায়।

বাংলাদেশের করণীয়

বাংলাদেশ আগেও অপতথ্যের মুখোমুখি হয়েছে। তবে বর্তমান সময়ের প্রচারণার ব্যাপ্তি ও সীমান্ত ছাড়ানো চরিত্র অভূতপূর্ব। গণতান্ত্রিক পরিসর রক্ষায় স্বাধীন সাংবাদিকতা ও অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারের পক্ষ থেকে জনগণের সঙ্গে দ্রুত ও স্বচ্ছ যোগাযোগ অপরিহার্য। পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে হবে।

তবে সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা হলো নাগরিক সচেতনতা। চাঞ্চল্যকর তথ্য শেয়ার করার আগে থামা, প্রশ্ন করা—কার লাভ হচ্ছে এই গল্পে বা বয়ানে এবং প্রমাণকে আবেগের ওপরে স্থান দেওয়াই এখন গণতন্ত্র রক্ষার প্রধান হাতিয়ার।

বাংলাদেশের নির্বাচন শুধু ব্যালট বাক্সে নয়। লড়াই হবে নিউজফিডে, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, প্রবাসী ফোরামে ও টেলিভিশনের পর্দায়। ভারত ও পাকিস্তান তাদের ইচ্ছেমতো বাংলাদেশকে নিয়ে বয়ান তৈরির প্রতিযোগিতা করতে পারে; কিন্তু নিজের গল্প বলার, নিজের সত্য বয়ান প্রতিষ্ঠার অধিকার বাংলাদেশের সর্বাগ্রে।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হওয়া উচিত তার ভোটারদের হাতে, সীমান্তের বাইরে তৈরি গুজবের মাধ্যমে নয়। এই লড়াইয়ে সত্য শুধু নৈতিক মূল্য নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন।

  • মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক, সাবেক ফুলব্রাইট হিউবার্ট এইচ হামফ্রে ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব মেরিল্যান্ড