বিজ্ঞাপন

সাংবাদিকেরা তাঁদের অন্য উৎস থেকে খোঁজ নিয়ে সংবাদ ছাপতেন। কখনো সরকারের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হলে অথবা ভুল সংবাদ ছাপা হলে প্রতিবাদলিপি পাঠাতাম। তাঁরা গুরুত্ব দিয়ে আমাদের প্রতিবাদলিপি ছাপতেন এবং তাঁদের আত্মপক্ষ সমর্থনে বক্তব্য দিতেন। কিন্তু যোগাযোগ কখনোই বিচ্ছিন্ন হয়নি অথবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক নষ্ট হয়নি। ফলে মাঝেমধ্যে সরকারি কাজে সহায়ক এমন কিছু আগাম সংবাদও আমি তাঁদের কাছে পেতাম। এরপর ১৯৮২ সালে ঢাকায় শুল্ক ভবনে বদলি হয়ে এলে ঢাকার সাংবাদিকদের সঙ্গে যোগাযোগের সূত্রপাত হয়। তাঁদের ছাপানো সব সংবাদের সঙ্গে সব সময় একমত না হলেও এমনকি বিব্রত হলেও ভেবেছি তাঁরা তাঁদের কাজ করছেন, আমরা আমাদের কাজ করছি।

একবার এক সাংবাদিক আমাকে একটা বিষয়ে জিজ্ঞেস করে ঘটনার সত্যাসত্য জানতে চান। আমি তাঁকে বিষয়টি সম্পর্কে জানাতে অপারগতা প্রকাশ করলে তিনি আমাদের দপ্তরের একটি নথির ছবিলিপি আমার নিজের, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নোট, এমনকি রাষ্ট্রপতির দপ্তরের নথির নোট দেখান। আমি তাঁকে জিজ্ঞেস করি এগুলো কোথায়, কীভাবে পেলেন? তিনি হেসে বলেন, আমাদের তথ্যসূত্র আছে। আমি বলি কাজটি কি অন্যায় নয়? তিনি বললেন, আমাদের উপায় কী? আপনারা আমাদের জানাবেন না, অথচ বিষয়টি জনগুরুত্বপূর্ণ, তাই আমাকে এ পথ বেছে নিতে হয়েছে। উল্লেখ্য, তখন তথ্য অধিকার আইন হয়নি। আমি কিন্তু সাংবাদিককে গালমন্দ করিনি, কিংবা দরজার বাইরে থাকা সেপাই ডেকে হেনস্তা করিনি। তবে ভবিষ্যতে নথি যাতে এভাবে ফটোকপি না হয়, সে জন্য ব্যবস্থা নিয়েছি। তাই সাংবাদিকের ‘তথ্য চুরি’ নতুন কোনো বিষয় নয়। বরং স্মার্টফোন ছবি তোলার কাজটি আরও সহজ করে দিয়েছে।

বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে ফেরার পর জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে পদস্থ হই। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে সম্পর্ক আরও নিবিড় হয়। আমার ক্ষেত্রভুক্ত তিনটি বিষয়ে তাঁদের বিস্তর আগ্রহ ছিল। এক. চলমান রাজস্ব সংস্কার কার্যক্রম নিয়ে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের সঙ্গে আলোচনা, দুই. নতুন বাজেটে শুল্ক ও আবগারি (পরে মূসক) করের হার পরিবর্তন এবং তিন. সাপটা ও সাফটা বাণিজ্য বিষয়ে দর-কষাকষি। অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গে, সাংবাদিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আমি আরও কুশলী হয়ে উঠি। বলতে দ্বিধা নেই, কোনো নীতি গ্রহণের আগে সাংবাদিকদের আগাম সংবাদ দিয়ে ধারণার বেলুন (ট্রায়াল বেলুন) ওড়াই ও জনগণের প্রতিক্রিয়া জানতে চেষ্টা করি। আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে আলোচনাসহায়ক সংবাদ প্রচার করি।

স্বার্থান্বেষী রাজনীতিবিদের জনস্বার্থবিরোধী কোনো সিদ্ধান্ত ঠেকানোর জন্য সাংবাদিকদের সহায়তা নিই। বলতে দ্বিধা নেই, সংবাদপত্রের বেশ কয়েকটি প্রধান শিরোনামের অজ্ঞাত সূত্র ছিলাম আমি। অনেক সময় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার অনুমতি নিয়ে এটা করতাম। আবার কখনো কখনো অনুমতি ছাড়াই। ফলে সচিব আমাকেই জিজ্ঞেস করতেন সংবাদটি খবরের কাগজে গেল কীভাবে? তবে সব ক্ষেত্রেই, ব্যক্তিগত নয়, জনস্বার্থ এর পেছনে কাজ করত এবং এ ধরনের ‘গোপন সূত্রের’ সংবাদ আমাদের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সহায়ক হতো!

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে থাকার সময়ই ভালো সম্পর্কের কারণে, আমরা যখন যমুনা সেতুর অর্থনৈতিক পুনর্মূল্যায়ন করে বিশ্বব্যাংককে অর্থায়নে ফিরিয়ে আনি, তখন সাংবাদিক শাকিল আনোয়ার (বর্তমানে বিবিসিতে কর্মরত) ইউএনবি থেকে তা প্রচার করেন, যা অনেক সংবাদপত্রেই শীর্ষ সংবাদ হিসেবে প্রচারিত হয়।

এরপর ইডকলে গেলেও সেখানে তেমন কোনো বিশেষ জনগুরুত্বপূর্ণ সংবাদ না থাকলেও ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে কেউ কেউ সেখানে গল্পসল্প করতে যেতেন। আমাদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের ভালো কাভারেজ দিতেন।

দু–একজন সাংবাদিক ব্যক্তিগত বন্ধুও হয়ে ওঠেন।

সর্বশেষ বিদ্যুৎ বিভাগেও সাংবাদিকদের সঙ্গে নিয়মিত ও ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ অব্যাহত থাকে। কেউ কেউ আমাদের কাজের সমালোচনা করে সংবাদ ছেপেছেন। ভিত্তিহীন হলে ডেকে সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে ব্যাখ্যা করেছি। সংগত সমালোচনা মেনে নিয়েছি। সংশোধনের চেষ্টা করেছি। কারণ, সরকারি কর্মচারী হিসেবে আমরা কেউই তো জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নই। তা ছাড়া আমাদের প্রতিটি সিদ্ধান্তই যে সঠিক, তা কে হলফ করে বলতে পারে? বিদ্যুৎ বিভাগে আসা সাংবাদিকদের মধ্যে সাগর-রুনি ও অন্যদের সঙ্গে রোজিনা ইসলামও ছিলেন। তিনি তখন দৈনিক সংবাদ–এ কাজ করতেন। তাঁদের কাউকেই আমার অপেশাদার মনে হয়নি। যা জানানো সম্ভব তাঁদের জানিয়েছি। যা সম্ভব নয়, তা চেপে গিয়েছি। তাঁরা তাঁদের কাজ করেছেন, আমরা আমাদের কাজ করেছি। কিন্তু কেউ কারও মনঃপীড়ার কারণ হইনি বা বিদ্বেষপূর্ণ আচরণ করিনি। বরং পারস্পরিক সম্মানবোধ অক্ষুণ্ন রেখেছি।

কেন এমন হলো

অনুমান করি, দুই পক্ষের কারণেই সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে। আমাদের সময়েও ছাত্রনেতারা নিজ মেধায় সরকারি চাকরিতে যোগ দিতেন। তবে সরকারি চাকরিতে এসে প্রাক্তন ছাত্রসংগঠনের পরিচয় ধারণ করতেন না। এখন দেখি সরকারি চাকরিতে এসেও ছাত্রসংগঠনের পরিচয় ধারণ করেন। তার ফলে কর্মক্ষেত্রেও নিরপেক্ষতা ধারণ করতে পারেন না।

তেমনিভাবে, রাজনীতিবিদদের সঙ্গে সরকারি কর্মকর্তাদের আত্মীয়তা ও অন্যান্য সম্পর্ক তখনো ছিল। আমরা সবাই জানতাম, চট্টগ্রাম শুল্ক ভবনের একজন কর্মকর্তা তৎকালীন রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। তাঁর আচরণে তা কখনো প্রকাশ পেত না এবং পরিচয় ভাঙিয়ে তিনি সুযোগ গ্রহণ করতেন না। এখন পদ, পদায়ন, পদোন্নতি—সবকিছু নির্ভর করছে এসব সম্পর্কের ওপর। ফলে কর্মকর্তারা আর কর্মকর্তার মতো আচরণ করছেন না। দলীয় ক্যাডারের আচরণ করছেন।

সাংবাদিকেরাও আজ সাংবাদিকতায় সীমাবদ্ধ থাকছেন না। তোষামোদি, ব্ল্যাকমেল, রাজনীতি ও ব্যবসা—অনেক সাংবাদিকের এখন বড় পরিচয়। ফলে তাঁরা এখন সাংবাদিকের সম্মান হারাচ্ছেন। এসব বিচ্যুতি না থাকলে একজন পেশাদার সরকারি কর্মকর্তা ও পেশাদার সাংবাদিকের মধ্যে বিরোধ হওয়ার কথা নয়।

করণীয় কী

গোপনীয়তা হচ্ছে সুশাসনের সবচেয়ে বড় শত্রু ও দুর্নীতির জিয়নকাঠি। তাই সরকারি দপ্তরে গোপনীয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে আনতে হবে। তথ্য অধিকার আইনের কার্যকর প্রয়োগ করতে হবে। জনস্বার্থে চাহিত তথ্য সঠিকভাবে ও দ্রুত সরবরাহ করতে হবে।

দলীয় ক্যাডার পরিচয় ব্যবহারকারীদের সরকারি চাকরিতে পুনর্বাসন বন্ধ করতে হবে।

পাঠকহীন, নামসর্বস্ব সংবাদপত্র ও মাধ্যমসমূহের ডিক্লারেশন বাতিল করতে হবে। জাতীয় প্রেস কাউন্সিল এবং সাংবাদিকেরা নিজেদের পেশার জন্য আচরণবিধি তৈরি করতে পারেন। সাংবাদিকদের, সাংবাদিকতা, চাটুকারিতা, রাজনীতি ও ব্যবসার যেকোনো একটিকে বেছে নিতে হবে। তা না হলে যে ধস শুরু হয়েছে, তা থামানো যাবে না, বরং ভবিষ্যতে সংকট আরও প্রকট হবে।

মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান সাবেক সচিব ও অর্থনীতিবিদ

[email protected]

প্রতিক্রিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন