বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

আরেকজন সাক্ষী আবদুর রশিদ, আবদুল কাহার আকন্দের তদন্ত অনুসারে যিনি মুফতি হান্নানের সঙ্গে বিএনপির একজন নেতার কার্যালয়ে গিয়েছিলেন, তাঁকেও আদালতে জেরার জন্য হাজির করা হয়নি। এই হামলার সঙ্গে বিএনপি নেতাদের জড়িত থাকার দাবিকারী এবং তার কথিত সাক্ষী—দুজনের একজনকেও জেরা করার সুযোগ আসামিপক্ষকে না দেওয়ার মাধ্যমে এই বিচারকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছে।

এই বিচারের স্বচ্ছতার স্বার্থে দেশের প্রধান দৈনিক হিসেবে প্রথম আলোর উচিত ছিল বিষয়টি নিয়ে জোরালো অবস্থান নেওয়ার, যা নিতে প্রথম আলো ব্যর্থ হয়েছে। এর ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো মামলায় দেশের যেকোনো নাগরিককে শুধু জবানবন্দির ভিত্তিতে ফাঁসি দেওয়ার পথ দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে, যা একদিন খোদ সোহরাব হাসানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত হতে পারে।

২.
প্রথমত, বাংলাদেশে ২১ আগস্ট একমাত্র জঙ্গি হামলা নয়, যেখানে বিরোধী দলের সমাবেশে বোমা হামলা চালানো হয়েছে। ২০০১ সালের ২০ জানুয়ারি পল্টনে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) এক ছাত্র-শ্রমিক সমাবেশে বোমা হামলা চালানো হয়েছিল এবং পাঁচজন মারা যান। সেই পাঁচজন সাধারণ ছাত্র-শ্রমিক যেহেতু আওয়ামী লীগ করতেন না এবং ঘটনাটি যেহেতু আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ঘটেছিল, তাই প্রথম আলোসহ বাংলাদেশের গণমাধ্যমে তাঁদের প্রতিবছর স্মরণ করা হয় না। এই হামলার বিষয়ে বিস্তারিত জানার তাগিদও কেউ অনুভব করে না। অথচ সেদিন সিপিবিও একটি বিরোধী দলই ছিল। অর্থাৎ ২১ আগস্টের হামলাই বাংলাদেশের প্রথম বিরোধী দলের সমাবেশে চালানো জঙ্গি হামলা নয়।

৩.
মুফতি হান্নানের উত্থানপর্বের দিকে যদি তাকাই, তাহলে আমরা দেখতে পাই যে মুফতি হান্নান ছিলেন এক আফগানিস্তানফেরত বাংলাদেশি নাগরিক, যাঁরা বাংলাদেশে শরিয়াহ আইনভিত্তিক শাসন কায়েমের ইচ্ছা ছিল। সেই ইচ্ছা বাস্তবায়নে তিনি হরকাতুল জিহাদ নামের একটা সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মুফতি হান্নানের পরিবারকে সরকারের পক্ষ থেকে শেখ হাসিনার নির্বাচনী এলাকায় বিসিক শিল্পনগরীতে সরকারি জমি বরাদ্দ দেওয়া হয়। সেই জমিতে তিনি একটা সাবান কারখানা গড়ে তোলার নাম করে বোমার কারখানা গড়ে তোলেন। সেই বোমার কারখানায় যেসব বোমা উৎপাদিত হয়েছিল, সেগুলোতে ৮০ থেকে ৯০ জন মানুষ মারা গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে।

অন্যদিকে বিএনপির নেতৃত্বাধীন সরকারের সময় ২০০৩ সালে মুফতি হান্নানকে শেখ হাসিনার হত্যাচেষ্টা মামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলে ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডার বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল মুফতি হান্নানকে।

দেখা যাচ্ছে, একদিকে আওয়ামী লীগ সরকার মুফতি হান্নানকে সরকারি জমি দিয়েছিল এবং সেখানে বোমা তৈরিতে আওয়ামী লীগের দুই নেতা মদদ দিয়েছিলেন, অন্যদিকে বিএনপি সরকার মুফতি হান্নানকে তাঁর অপরাধের শাস্তি দিয়েছিল এবং তাঁকে গ্রেপ্তারও করেছিল। বাংলাদেশের কোনো গণমাধ্যম কখনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি এবং কখনো পারবেও না যে বিএনপি সরকার কোনো দিন মুফতি হান্নানকে এক টাকার সহায়তাও দিয়েছিল।

সোহরাব হাসান জানতে চেয়েছেন, কেন ২১ আগস্টে হামলার অভিযোগ বিএনপির ওপর এল। আমরাও তাঁর কাছে জানতে চাই, মুফতি হান্নানকে আওয়ামী লীগ সরকার এত সহায়তা দেওয়ার প্রমাণ থাকার পরও কেন তিনি ও তাঁর পত্রিকা বারবার জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে বিএনপিকে দায়ী করতে থাকে?

৪.
সোহরাব হাসানের দাবি, ‘হামলার একপর্যায়ে তারা কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়লে চারদিকে ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি হয়। হামলাকারীদের পালানোর পথ করে দেওয়ার জন্যই সেটি করা হয়েছিল।’

সোহরাব হাসানকে অনুরোধ করছি, তিনি যেন বাদীপক্ষের প্রথম সাক্ষী পুলিশ কর্মকর্তা শহীদ ফারুক আহমেদের সাক্ষ্য পড়েন। রায়ের ৯৫ পৃষ্ঠায় তাঁর সাক্ষ্যে তিনি স্পষ্টই বলেছেন, ‘আমরা আহতদের তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে প্রেরণ করি। এর কিছুক্ষণের মধ্যে সভায় আগত নেতা-কর্মী উত্তেজিত হয়ে চলমান গাড়িতে ইটপাটকেল নিক্ষেপ ও ভাঙচুর শুরু করে। পুলিশ তখন লাঠিপেটা, টিয়ার গ্যাস ও রাবার বুলেট নিক্ষেপ করে।’

আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ভাঙচুরের মুখে পুলিশের কিছু সদস্যের স্বতঃপ্রণোদিতভাবে কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপকে সোহরাব হাসান যেভাবে আওয়ামী লীগের পাতিনেতাদের মতো ‘হামলাকারীদের পালানোর পথ করে দেওয়ার’ চেষ্টা হিসেবে অভিহিত করেছেন, তাতে সচেতন পাঠকমাত্রেরই অবাক হওয়ার কথা। এখানে উল্লেখ্য, শহীদ ফারুক আহমেদ ছিলেন বাদীপক্ষের সাক্ষী, বিবাদীপক্ষের নয়।

৫.
সোহরাব হাসান লেখেন, ‘হামলার মুখে যখন দলীয় নেতা-কর্মীরা শেখ হাসিনাকে গাড়িতে তুলে দেন, সেখান থেকে নিরাপদে কোথাও চলে যাওয়ার জন্য, তখন সন্ত্রাসীরা সেই গাড়ি লক্ষ্য করেও কয়েক দফা গুলি ছোড়ে।’

প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক যদি নিজের পত্রিকাটাও পড়তেন, তাহলে জানার কথা যে মুফতি হান্নানের সহযোগীরা সেদিন ১৫টা গ্রেনেড নিয়ে হামলা চালাতে গিয়েছিল, কোনো বন্দুক বা আগ্নেয়াস্ত্র তাদের কারও সঙ্গেই ছিল না। এমনকি সেদিন শেখ হাসিনার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাদীপক্ষের ১৩২তম সাক্ষী মেজর (অব.) সোয়েব মো. তারিকউল্লাহ তাঁর সাক্ষ্যের কোথাও এই ধরনের গুলিবর্ষণের কথা উল্লেখ করেননি। আওয়ামী লীগের কিছু নেতা বাদে শেখ হাসিনার গাড়ি লক্ষ্য করে ‘কয়েক দফা গুলি’ ছোড়ার এই অভিযোগ কাউকে করতেও শোনা যায়নি।

এ ধরনের অভিযোগ আওয়ামী লীগের নেতাদের মুখে মানালেও প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদকের মুখে মানায় কি না, সেটা ভেবে দেখার অনুরোধ রইল।

৬.
সোহরাব হাসান আরেকটি দাবি করেছেন, ‘২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর ক্ষমতাসীন বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, এটি আওয়ামী লীগের কাজ। আওয়ামী লীগ জনগণের সহানুভূতি পেতেই নাকি এ হামলা চালিয়েছিল।’
সেদিন হামলার পর কুলদীপ নায়ার প্রকাশিত একটি লেখার সূত্রে জানা যায়, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া হামলার পর সেদিনই শেখ হাসিনাকে দেখতে যাওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন কিন্তু শেখ হাসিনা নিজেই তাঁকে নিষেধ করেছিলেন। এ ছাড়া প্রথম আলোর ২০০৪ সালের ২২ ও ২৩ আগস্টের পত্রিকা থেকে জানা যায়, বেগম জিয়া এই ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছিলেন, এমনকি বিটিভি এই হামলার খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার না করায় বিটিভির মহাপরিচালকের প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন।

কিন্তু হামলার পরদিন থেকেই শেখ হাসিনা এই হামলায় সরকারকে দায়ী করতে থাকেন এবং ২০০৫ সালের ১২ জুন সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, এই গ্রেনেড হামলায় প্রধানমন্ত্রীর পরিবার জড়িত। ১৩ জুন প্রথম আলো এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ করে, যেখানে শেখ হাসিনার ভাষ্যে জানানো হয় যে বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার দুই আসামি এই হামলায় জড়িত ছিল। হামলাকারীরা হামলার আগে বগুড়ার ঠনঠনিয়া বাজারে বৈঠক করেছে। একজন প্রতিমন্ত্রী হামলাকারীদের ঢাকায় নিয়ে আসেন। হামলাকারীদের জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছিল।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর মিথ্যা দাবিকে আড়াল করে যখন প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক শেখ হাসিনার বক্তব্যের পাল্টা জবাব হিসেবে দেওয়া বিএনপি নেতাদের বক্তব্যগুলোকে ব্যবহার করেন, পাঠকদের বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেন, তখন পাঠকদের মনে তাঁর লেখার বস্তুনিষ্ঠতা নিয়ে প্রশ্ন জাগতে পারে।

৭.
সোহরাব হাসান দাবি করেছেন, ‘জঙ্গিদের বাঁচাতে কেন বিএনপি আষাঢ়ে গল্প ফেঁদেছিল, কেন জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নান ও মাওলানা তাজউদ্দিনকে বাঁচাতে মরিয়া হয়ে উঠেছিল, সে প্রশ্নের জবাব তাদের দিতেই হবে।’

এই প্রসঙ্গে আমরা জানতে চাই, জজ মিয়া নাটক কি বাংলাদেশের ইতিহাসে পুলিশের ভুয়া আসামি তৈরির প্রথম এবং একমাত্র ঘটনা ছিল এবং যদি বিএনপি মুফতি হান্নানকে বাঁচাতে চাইত, তাঁকে গ্রেপ্তার কেন করা হয়েছিল ২০০৫ সালে?

প্রথম আলোর পাতায় প্রায়ই খবর প্রকাশিত হয় কীভাবে একজন আসামির বদলে পুলিশের ভুলে আরেকজন ব্যক্তি দীর্ঘদিন জেল খেটেছেন। বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত দেশে এ ঘটনা তো সব সরকারের আমলেই ঘটেছে। এমনকি সম্প্রতি একজন নারীকে ধর্ষণ ও হত্যার দায়ে তিনজন যুবককে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর দেখা গেছে সেই নারী জীবিত আছেন। এখানে পুলিশ কি আসলেই সত্যকে ধামাচাপা দিতে চেয়েছিল, নাকি চাপের মুখে তড়িঘড়ি করে প্রতিবেদন দিতে গিয়ে এই ভুল করেছিল?

জজ মিয়া নিজেই তাঁর সাক্ষ্যে বলেছেন যে তদন্তকারী কর্মকর্তারা তখন প্রচণ্ড চাপের মুখে ছিলেন এই হামলার ঘটনার রহস্য সমাধানের ব্যাপারে। তাই এখানে এভাবে সোহরাব হাসান বিষয়টিকে ‘ধামাচাপা’ দেওয়ার ষড়যন্ত্র আখ্যা দিচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতাদের মতো। ভবিষ্যতে সঠিক তদন্ত হলে প্রকৃত সত্য বের হয়ে আসবে।
তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে প্রথম আলোর উচিত মামলার এই দিকগুলো জনগণের সামনে তুলে ধরা।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক সোহরাব হাসানের রচিত উপসম্পাদকীয়তে ২১ আগস্ট বোমা হামলার মামলা নিয়ে বিভ্রান্তমূলক তথ্যের তীব্র প্রতিবাদ জানাচ্ছে।

অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।

দায় এড়ানোর ব্যর্থ প্রয়াস বিএনপির

সোহরাব হাসান

‘২১ আগস্টের দায় বিএনপি কীভাবে এড়াবে’-প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে প্রকাশিত কলামটি নিয়ে বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রতিবাদ করতে গিয়ে ধান ভানতে শিবের গীত গেয়েছেন। আমার কলামে উত্তাপিত তার ভাষায় ‘ভুল তথ্যসমৃদ্ধ’ বক্তব্য খণ্ডন না করে এমন কিছু কথা বলেছেন, যা দায় এড়ানোর ব্যর্থ চেষ্টা ছাড়া কিছু নয়।

প্রশ্ন হলো, এই দায় কীভাবে নিরূপিত হবে? ২১ আগস্টে আওয়ামী লীগের সমাবেশে যেই জঙ্গিরা গ্রেনেড হামলা চালিয়ে মানুষ হত্যা করেছেন, তাদের কারও সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতা-কর্মীর আগে থেকে যোগযোগ ছিল কি না? দ্বিতীয়ত বিএনপি সরকার এই ঘৃণ্য হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় এনেছে কি না, কোনো আসামিকে নিরাপদে দেশ থেকে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে কিনা?
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিবের প্রতিবাদের জবাব দিতেই ফের আমাকে কলাম লিখতে হলো:

১.
পুলিশ কর্মকর্তা আবদুল কাহার আকন্দের তদন্ত প্রতিবেদন ও হামলাকারীদের সাক্ষ্যই আমার লেখার মূলভিত্তি বলে বিএনপির নেতা যে অভিযোগ করেছেন, তা মোটেই সত্য নয়। তাঁর আপত্তি আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর মামলাকে ভিন্ন খাতে নিয়ে যেতে নির্যাতন চালিয়ে জঙ্গি নেতা মুফতি হান্নানের কাছ থেকে দ্বিতীয়বার জবানবন্দী নেওয়ায়। কিন্তু আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার আগে মুফতি হান্নান আদালতে প্রথমবার যে জবানবন্দি দিয়েছেন, সে বিষয়ে তিনি আপত্তি জানাননি। এখন দেখা যাক মুফতি হান্নানের প্রথম জবানবন্দিতে কী ছিল। তিনি বলেছেন, ‘হরকাতুল জিহাদ আল ইসলামের ঢাকা মহানগর অফিস মোহাম্মদপুর সুপার মার্কেটের কাছে নিচ তলায় একটি ভাড়া বাড়িতে ১৮.৮‍.০৪ তারিখে আমাকে ও আহসান উল্লাহকে সাক্ষাৎ করতে বলেন। আমরা সেখানে গিয়ে সাক্ষাৎ করি। তখন তিনি আমাকে বলেন, আমরা কেন্দ্রীয়ভাবে পরামর্শ করেছি এবং আবদুস সালাম পিন্টুর( তৎকালীন উপমন্ত্রী) সঙ্গে আমরা বৈঠক করেছি। যাতে ২১ আগস্ট ২০০৪ তারিখে শেখ হাসিনার জনসভায় হামলা করে তাঁকে মেরে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এরপর আমাকে ও কাজলকে ( ২১ আগস্টের হামলার আরেক আসামি) আবদুস সালাম পিন্টুর ধানমন্ডির লেকপাড়ের বাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। .....২০ তারিখ বেলা ১১টার দিকে জান্দাল ও কাজল পিন্টু সাহেবের বাসায় যান। তখন আবদুস সালাম পিন্টু ও তার ভাই তাজউদ্দীন মাওলানা সাহেবের উপস্থিতিতে হামলার জন্য ১৫টি গ্রেনেড জান্দাল ও কাজলকে দেন।( সূত্র প্রথম আলো, ২১ আগস্ট ২০০৮)।

এতে কি প্রমাণিত হয় , হামলার আগে মুফতি হান্নানের সঙ্গে বিএনপির কোনো নেতা-মন্ত্রীর যোগযোগ ছিল না? জঙ্গিদের সঙ্গে বিএনপি সরকার কত উদার ছিল জেএমবির দ্বিতীয় প্রধান নেতা সিদ্দিকুর রহমান ওরফে বাংলাভাইয়ের জবানবন্দীতেও বেরিয়ে এসেছে। তাঁর ভাষ্য: ‘সর্বহারা নিধন অভিযান চলাকালে ব্যারিস্টার আমিনুল হক, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার, আলমগীর কবির, নাদিম মোস্তফা, মিজানুর রহমান মিনু আমাদের সমর্থন দেন।’( প্রথম আলো, ২০ আগস্ট ২০০৭)

২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার বিচারের স্বচ্ছতা আদায়ে প্রথম আলো জোরালো অবস্থান নিতে পারেনি বলে রিজভী সাহেব আক্ষেপ করেছেন। তবে তিনি নিশ্চয়ই স্বীকার করবেন বিচারের স্বচ্ছতার জন্য গণমাধ্যমের জোরালো ভূমিকার চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্ত। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার পর বিএনপি দুই বছর ক্ষমতায় ছিল। তারা সেই সময়ে তদন্তটা কেন শেষ করলেন না, কেন জজ মিয়া ও প্রতিবেশী দেশের গোয়েন্দা সংস্থার সম্পৃক্তা আবিষ্কারের অক্ষম চেষ্টা চালালেন, সেই প্রশ্নের জবাব নেই।

২.
বিএনপি নেতা লিখেছেন, বাংলাদেশে ২১ আগস্ট আওয়ামী লীগের সমাবেশে হামলা ছাড়াও বিরোধী দলের সমাবেশে আরও হামলা হয়েছে। প্রথম আলো প্রতি বছর একুশে আগস্টের ঘটনা স্মরণ করলেও অন্যদের স্মরণ করে না। রাজনীতিকেরা সবকিছু দলীয় দৃষ্টিতে দেখতে অভ্যস্ত। প্রথম আলো তা কখনোই দেখেনি, ভবিষ্যতেও দেখবে না। যে কোনো সন্ত্রাসী হামলা ও হত্যার প্রতিবাদ-নিন্দা করা এবং সত্যানুসন্ধান প্রথম আলোর সম্পাদকীয় নীতি। রিজভী সাহেব কি দেখাতে পারবেন, আমরা একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলার নিন্দা করেছি এবং সিপিবির সমাবেশে হামলার সময় নিরব থেকেছি? তিনি আওয়ামী লীগ আমলে সিপিবির সমাবেশ বোমা হামলার কথা উল্লেখ করেছেন। কিন্তু সেই আওয়ামী লীগ সরকারই যে পরবর্তীকালে সেই হামলার বিচার কবরেছেন, তা বলেছেন। সিপিবির সমাবেশে হামলার দায়ে ১০আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে ময়মনসিংহে সিনেমা হলে জঙ্গি হামলার দায়ে বিএনপি সরকার লেখক শাহরিয়ার কবির ও ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুনকে গ্রেপ্তার করেছিল। এটি কি সত্যকে আড়াল করা ও জঙ্গিদের রক্ষার আরেকটি চেষ্টা ছিল না?

৩.
রুহুল কবির রিজভী ২০০৫ সালের ১ অক্টোবর রাজধানীর বাড্ডার বাসা থেকে মুফতি হান্নানকে গ্রেপ্তারকে তার সরকারের কৃতিত্ব হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন। এ কথা সত্য যে বিএনপি সরকারের আমলেই মুফতি হান্নান ও তার কোনো কোনো সহযোগী গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। কিন্তু যে একুশে আগস্টের গ্রেনেড হামলা নিয়ে সারা দেশে তোলপাড় চলছিল, সেই ঘটনায় তাঁকে আসামি করা হয়নি। থলের বিড়াল বেরিয়ে পড়ার ভয়ে রিজভী সাহেবরা কি তা করেছিলেন ? তিনি আওয়ামী লীগ আমলে মুফতি হান্নান কতগুলো সমাবেশে হামলা চালিয়ে কত মানুষ মেরেছেন, তার হিসেব দিয়েছেন। কিন্তু এসব হামলার লক্ষ্যবস্তু যে আওয়ামী লীগ, সিপিবি, ছায়ানট, উদীচী, গির্জা ছিল তা বলেননি। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, কেন প্রথম আলো ও এর কলাম লেখক বারবার জঙ্গিবাদী কার্যক্রমে বিএনপিকে দায়ী করছে? রিজভী সাহেব আমার লেখাটি মনোযোগ দিয়ে পড়লে দেখতে পেতেন, আমি শুরুতেই বলেছি, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির আমলে বহু জঙ্গি হামলা ঘটনা ঘটেছে, কিন্তু একুশে আগস্টের হামলা ছাড়া দ্বিতীয় কোনো ঘটনার সঙ্গে বিএনপির নাম আসেনি।
৪.
বিএনপি নেতা বলেছেন, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের ভাঙচুরের মুখে পুলিশের কিছু সদস্য স্বতঃস্ফূর্তভাবে টিয়ারগ্যাস ছুড়েছেন। সেখানে নাকি জঙ্গিদের পালানোর পথ করে দেওয়ার মতো কোনো ঘটনা ঘটেনি। কিন্তু ২০০৪ সালের ২২ আগস্ট প্রথম আলোর প্রতিবেদনে বলা হয়, পুলিশের টিয়ার গ্যাস ও লাঠিপেটা চলার কারণে সাংবাদিকদের তথ্য সংগ্রহে বিঘ্ন ঘটে। একজন পুলিশ কমিশনারকে বায়ট কার নিয়ে টহল দিতে দেখা যায় (প্রথম আলো ২২ আগস্ট, ২০০৪)। রায়ট কার জঙ্গিদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হয়েছে না বিক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগ কর্মীদের বিরুদ্ধে-সে্ই প্রশ্নের উত্তর তাঁর কাছেই জানতে চাইছি।

৫.
রুহুল কবির রিজভী লিখেছেন, মুফতি হান্নানের সহযোগীরা সেদিন ১৫টা গ্রেনেড নিয়ে হামলা চালাতে গিয়েছিলেন, কোনো বন্দুক বা আগ্নেয়াস্ত্র তাদের কারও সঙ্গেই ছিল না। এমনকি সেদিন শেখ হাসিনার নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বাদীপক্ষের ১৩২তম সাক্ষী মেজর (অব.) সোয়েব মো. তারিকউল্লাহ তাঁর সাক্ষ্যের কোথাও এ ধরনের গুলিবর্ষণের কথা উল্লেখ করেননি। তার এই বক্তব্যের জবাবে আমরা ২৩ আগস্ট প্রথম আলোয় প্রখ্যাত সাংবাদিক আতাউস সামাদের লেখার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি তুলে ধরছি। তিনি লিখেছেন, ‘খুনিরা গ্রেনেড নিক্ষেপ করেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা যখন দেখতে পায় যে তাদের বোমা শেখ হাসিনার গায়ে লাগেনি, তখন তারা তাঁকে লক্ষ্য করে গুলি চালায়।’ (প্রথম আলো, ২৩ আগস্ট, ২০০৪)। রুহুল কবির রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী জঙ্গিরা যদি গুলি না ছুড়ে থাকে, শেখ হাসিনার গাড়ি লক্ষ্য করে কে বা কারা গুলি ছুড়েছে, তা-ও তাঁকে বলতে হবে।

৬.
রিজভী সাহেব লিখেছেন, বিএনপির বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের ক্রমাগত অভিযোগের জবাবেই নাকি বিএনপি নেতারা এই হামলার জন্য আওয়ামী লীগ দায়ী বলে পাল্টা বক্তব্য দিয়েছেন। এই প্রসঙ্গে তিনি ২০০৫ সালের ১২ জুন শেখ হাসিনার সংবাদ সম্মেলনেরও উদ্ধৃতিও দিয়েছেন। কিন্তু ওই সংবাদ সম্মেলনের ১০ মাস আগে ২০০৪ সালের ৩০ আগস্ট মুক্তাঙ্গনের সমাবেশে বিএনপির নেতারা কী বলেছিলেন, তা রিজভী সাহেব পুরোপুরি চেপে গেছেন। মুক্তাঙ্গনের আয়োজিত বিএনপির সমাবেশে দুজন মন্ত্রী ও দুজন সাংসদের বক্তব্য উদ্ধৃত করছি। ১. আওয়ামী লীগ বোমা মেরে ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়: আবদুল্লাহ আল নোমান। ২. শেখ হাসিনা তার দলের কর্মীদের হত্যা করে ক্ষমতায় যাওয়ার স্বপ্ন দেখেন: মির্জা আব্বাস। শেখ হাসিনা নিজে বোমা ফাটিয়ে সরকারকে দোষারোপ করছে: নাসিরউদ্দিন আহমেদ পিন্টু ও এম এ খালেক। (প্রথম আলো, ৩১ আগস্ট ২০০৪)। এখন পাঠকই বিচার করুন, কে বস্তুনিষ্ঠতা ক্ষুণ্ন করেছেন।

৭.
বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব জজ মিয়া-কাহিনি বা আষাঢ়ে গল্প সম্পর্কে যেসব মন্তব্য করেছেন, তা কৌতুককরই বটে। তিনি স্বীকার করেছেন যে জজ মিয়া ভুয়া আসামি ছিলেন। সেই সঙ্গে বলেছেন, ভুয়া আসামি তৈরির ঘটনা ওটাই প্রথম ও একমাত্র নয়। ওই ঘটনার আগেও হয়েছে, পরেও হয়েছে। তাঁর কাছে এগুলো ঘটনা ‘ধামাচাপা’ দেওয়া নয়, চাপের মুখে তড়িঘড়ি করে প্রতিবেদন দিতে গিয়ে পুলিশের ভুল করা। রিজভী সাহেবের কথা মেনে নিলে আওয়ামী লীগ আমলে বিএনপির নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যত মামলা হয়েছে, আসামিদের কাছ থেকে জবানবন্দী আদায় করা হয়েছে, তার কোনোটিকে সত্য আড়াল করা বলা যাবে না। বলতে হবে পুলিশের সামান্য ভুল। তাঁর এই তত্ত্ব তদন্তের নামে সব সরকারের সব অপকর্ম ঢাকার কৌশল কি না পাঠকই তা বিচার করবেন।

আমার লেখায় বিচারপতি জয়নুল আবেদিন কমিশনের উদ্ভট আবিষ্কার ও গ্রেনেড হামলার অন্যতম আসামি মাওলানা তাজউদ্দীনের দেশত্যাগে তৎকালীন সরকারের সহায়তার কথা উল্লেখ করা হয়েছিল। রিজভী সাহেব সে সম্পর্কে একটি কথাও বলেননি। মুফতি হান্নানকে গ্রেপ্তার করা হলেও বিএনপি ক্ষমতায় থাকতে তাঁকে গ্রেনেড হামলার আসামি করা হয়নি। একুশের গ্রেনেড হামলার সঠিক তদন্ত করেননি। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় আসার পরই ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার রহস্য উন্মোচিত হয়। রিজভী সাহেব নিজেকে কেবল বিএনপির নেতা নন, একজন আইনজীবী হিসেবেও পরিচয় দিয়েছেন। তিনি দয়া করে বলবেন কি কোন আইন বলে তারা ২১ আগস্টের হামলাকারীদের রক্ষা করেছিলেন?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

প্রতিক্রিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন