লেখার উপসংহার টানতে গিয়ে প্রশ্ন করা হয়েছে ‘তাহলে কি ফেসবুক ব্যবহার করব না আমরা?’ ফেসবুকে অতি আসক্তির ক্ষতিকর দিকটি মাথায় রাখার কথা বলে উত্তরও দেওয়া হয়েছে, ‘নিশ্চয়ই করব।’ এই প্রশ্ন আর উত্তরের সমীকরণটি আসলে এতটা সোজাসাপটা নয়। একটু গভীরভাবে চিন্তা করলেই অনুধাবন করা যাবে, কোকেনের নেশা আর লাস ভেগাসের জুয়ার সঙ্গে ফেসবুক আসক্তির সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। কোকেনের ক্ষেত্রে আমরা বলি না যে নিশ্চয় কোকেন ব্যবহার করব, তবে এর আসক্তির কথা মাথায় রেখে। অথবা আমরা বলি না যে অবশ্যই লাস ভেগাসে জুয়া খেলব, তবে পরিমিত মাত্রায়। মাদক কিংবা জুয়াকে আমরা যতটা সহজে ‘না’ করতে পারি, ফেসবুক কিংবা অন্যান্য নতুন কিছু প্রযুক্তির ক্ষেত্রে এককথায় ‘না’ করতে পারি না।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি ও ক্ষতিকারক দিক নিয়ে সারা বিশ্বব্যাপী আলোচনা হচ্ছে; সমাধান নিয়ে হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণা। আশার কথা হচ্ছে, এই বিষয়গুলো নিয়ে দেরিতে হলেও আমাদের দেশেও বিভিন্ন পেশার মানুষ কথা বলতে শুরু করেছেন এবং সেটি নিয়মিতভাবেই বলতে হবে।

ফেক নিউজ বা ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়ানোর ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ব্যর্থতার কথাটি লেখায় এসেছে। সেই ব্যর্থতার ক্ষতিকর দিক ইতিমধ্যেই আমাদের দেশে দেখার দুর্ভাগ্য আমাদের হয়েছে। ভুক্তভোগী হয়েছে ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র। তবে সেই ব্যর্থতা যে সব সময় ইচ্ছাকৃতভাবে হতে হবে, তেমনটি কিন্তু নয়। কোটি কোটি ব্যবহারকারীর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের জন্য যে লোকবল প্রয়োজন, সেটি বাস্তবসম্মত না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক মাধ্যমগুলো আশ্রয় নেয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক এই সমস্ত সমাধানগুলোর রয়েছে সহজাত দুর্বলতা। সেটি ভুয়া অথবা বিদ্বেষ ছড়ানো সংবাদ, কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড ভঙ্গ হওয়ার অনেকগুলো ঘটনা সফলভাবে চিহ্নিত করতে পারলেও সব কটি চিহ্নিত করতে পারে না। বিশেষ করে, নতুন ধরনের ঘটনা বা অপরাধ, যেটি আগে সংঘটিত হওয়ার নজির নেই। সেসব ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সমাধানগুলো নিদারুণভাবে ব্যর্থ হয়ে পড়ে। তার ওপর কোনটিতে নিয়ম ভঙ্গ হয়েছে, কোনটিতে ভঙ্গ হয়নি, সেটি নির্ধারণ করারও সর্বজনসম্মত উপায় নেই। সেটির মানদণ্ডও দেশ কিংবা সংস্কৃতিভেদে ভিন্ন হতে পারে।

বস্তুত ডিজিটালাইজেশন একটি বৈশ্বিক পরিবর্তন। এই পরিবর্তনের ভেতর জন্ম নেওয়া বেশ কিছু সেবা বা প্রযুক্তি পরিচালিত হওয়ার জন্য বৈশ্বিক সহায়তা ও সমন্বয় প্রয়োজন হয় (যেমন ইন্টারনেট)। অন্যদিকে আইনকানুন, কৃষ্টিকালচার, রীতিনীতি পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন রকম। ডিজিটাল প্রযুক্তিগুলোকে এই বৈচিত্র্য ডিঙিয়ে সাধারণত একটি একক সমাধান উপস্থাপন করতে হয়। একটি অগ্রসর সমাজের নাগরিকদের নিজেদের ভালোমন্দ বিচার করার যে সক্ষমতা আছে বা যে পরিমাণ ডিজিটাল সাক্ষরতা আছে, তুলনামূলকভাবে অনগ্রসর সমাজের নাগরিকদের সেটি থাকার কথা নয়। কিন্তু উভয় সমাজের নাগরিকেরাই একই প্ল্যাটফর্ম, একই প্রযুক্তি, একই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে যাচ্ছে।

এ কথা অনস্বীকার্য যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বড় ধরনের সামাজিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। বিশ্বব্যাপী যে ডিজিটাল পরিবর্তন, সেটিই এই চ্যালেঞ্জের মূল উৎস। আসক্তির যে সমস্যা নিয়ে কথা হচ্ছে, এটি সমাধানের একক কোনো সর্বসম্মতভাবে গৃহীত প্রক্রিয়া এখনো পর্যন্ত দেখা যাচ্ছে না। দৃশ্যমান বাস্তবতায় সমাধানটি যে খুব সহজ, তা–ও নয়। বিভিন্ন কৌশলে ব্যবহার নিয়ন্ত্রণে আনার কিছু পরামর্শ শুধু দেওয়া হচ্ছে। তবে সমাধান কৌশল যা–ই হোক না কেন, তার আগে সমস্যাগুলো কী, সেটি জানানোর জন্য সচেতনতা বৃদ্ধির নানা রকমের উদ্যোগ, গণমাধ্যমে লেখালেখি ও প্রচারণার কোনো বিকল্প নেই।

ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানা সাবলীলভাবে আমাদের দৈনন্দিন জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনার মাধ্যমে, আসক্তির দিকগুলো চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন। একটি কার্যকর সমাধানের জন্য প্ল্যাটফর্ম বা সেবা প্রদানকারী কর্তৃপক্ষ, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ ও ব্যবহারকারী—এই তিন পক্ষের ভূমিকাই গুরুত্বপূর্ণ। প্ল্যাটফর্মগুলো যে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সেটি কোনো জাদুর বাক্স থেকে না এসে বরং কীভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, সেই ব্যাখ্যাও দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই না বলে, এক্সপ্লেইনেবল এআই (ব্যাখ্যাযোগ্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ব্যবহার করার ওপর গুরত্ব দেওয়া হচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আসক্তি ও ক্ষতিকারক দিক নিয়ে সারা বিশ্বব্যাপী আলোচনা হচ্ছে; সমাধান নিয়ে হচ্ছে পরীক্ষা-নিরীক্ষা, গবেষণা। আশার কথা হচ্ছে, এই বিষয়গুলো নিয়ে দেরিতে হলেও আমাদের দেশেও বিভিন্ন পেশার মানুষ কথা বলতে শুরু করেছেন এবং সেটি নিয়মিতভাবেই বলতে হবে। বৈশ্বিকভাবে প্রস্তাবিত উপায়গুলো পর্যালোচনা করে, সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে আমাদের সমাজ, পরিবেশ, প্রতিবেশের ওপর ভিত্তি করে আমাদেরই আমাদের জন্য প্রযোজ্য সমাধান বের করে নিয়ে আসতে হবে।

ড. বি এম মইনুল হোসেন সহযোগী অধ্যাপক, তথ্যপ্রযুক্তি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

[email protected]

প্রতিক্রিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন