আবির তার মাকে বলতে চাইছে যে বিদ্যালয়ে চলিত ভাষায় হরদম কথা বলা লাগে, তাই সে হাঁপিয়ে উঠেছে। সে জন্য সে বিদ্যালয়ে দুপুরের পর আর যাবে না। ঘরে এসে সে মন খুলে মায়ের সঙ্গে কথা বলে শান্তি পায় কি না! কারণ, তার মায়ের ভাষা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা যার কোনো লেখ্য রূপ নেই। আশার কথা যে, এই দেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নিজস্ব ভাষায় পড়ালেখা করার অধিকার আছে। শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাক্‌–প্রাথমিক পর্যায়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোকে তাদের নিজস্ব ভাষাশিক্ষার বই দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাংলা ভাষার প্রাণ শত শত আঞ্চলিক ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে শুধু রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে।

বাংলা ভাষার জন্য এ দেশের মানুষ রক্ত দিয়েছে বায়ান্নতে, শুধু বাংলা চলিত রূপ ভাষার জন্য নয়। অজপাড়াগাঁয়ের মায়ের ভাষা বলতে আমরা জন্ম থেকে যে বুলি শিখে বড় হয়েছি, তা–ই প্রকৃত দরদি ভাষা। তারপর লেখাপড়ার শুরুতে আমরা বাংলা ভাষার সাধু–চলিত রূপ চিনতে ও বুঝতে পারি। তাই মাতৃভাষায় কোনটাকে আগে স্থান দেবেন, সাধু চলিত রীতি না আঞ্চলিক রীতি কোনটা? যদিও আমরা চাইলে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা ও বিভাগের আঞ্চলিক ভাষাগুলোর লৈখিক রূপ দিতে পারি, যদি আমরা চেষ্টা করি।

মানুষ হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কৃষ্টি-সংস্কৃতি লালনপালন করার কেউ না থাকলে তা–ও মানুষের সঙ্গে হারাতে বাধ্য। পৃথিবীতে এ রকম প্রায় অনেক কিছুই বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মোগল কিংবা নবাবি শাসন, সংস্কৃতি আর নেই। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিও শেষ। কারণ, মানুষ তা ধরে রাখার চেষ্টা করেনি, ক্ষোভ বা অবহেলায় ফেলে দিয়েছে সেই যুগ। এভাবে ধীরে ধীরে পৃথিবী পুরোনো হচ্ছে। প্রায় ছয় শতাধিক ভাষা পৃথিবী থেকে একেবারেই হারিয়ে গেছে। এর পুনরুদ্ধারের সুযোগও ক্ষীণ। তাহলে কি আমরা নতুন প্রজন্ম মনের ভাষা, জনের ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখব না?

সম্প্রতি জেমস ওয়েব টেলিস্কোপে ধরা পড়েছে, পৃথিবীর প্রায় ১৩০০ হাজার কোটি বছর আগের গ্যালাক্সির ছবি। ছায়াপথ, নক্ষত্র ও ধোঁয়ার মতো জাল বিছানো মহাকাশের গায়ে দোদুল্যমান কেমন যেন অন্যরকম বস্তুর আবির্ভাব! মহাকাশ গবেষণায় অনেক উদার উন্নতি কিন্তু পৃথিবীর আদিম মানুষের আচার–আচরণ, ভাষা ও সংস্কৃতি নিয়ে মানুষের আগ্রহ থাকলেও তা নিয়ে গবেষণা হয় খুব কম, যে কারণে সত্যিকার মানুষের পথচলার ইতিবৃত্ত জানা মুশকিল হয়ে পড়েছে। কালের প্রবাহে আমরাও একদিন হারিয়ে যাবো। শতাব্দীর পর শতাব্দীর ধামাচাপায় পড়ে যাবে রক্তের সঙ্গে মিশে থাকা আমাদের বর্তমান ইতিহাস, সংস্কৃতি আর আঞ্চলিক ভাষা।

লৈখিক উপায়ে গান, কবিতা, ছড়া, গল্প, উপন্যাস, নাটিকা কিংবা চলচ্চিত্র নির্মাণ করে যদি আমাদের আঞ্চলিক ভাষাকে বাস্তবে রূপ না দেওয়া হয়, তবে আমরাও আমাদের সংস্কৃতি, ভাষা বিলুপ্তির সঙ্গে সঙ্গেই দাফন হয়ে যাব। আগামীর পৃথিবী কখনো মনে করার সুযোগ পাবে না যে বর্তমান বিংশ শতাব্দীর শুরু দিকের আমাদেরও একটি ভাষা ছিল, মুখে মায়ের মাখানো ভাত তুলে দেওয়ার মতো আদর মাখানো গীতি ছিল। আমাদের ঐতিহ্য, ইতিহাস আমাদের গর্বের জায়গা। তা কখনো খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। মনে রাখতে হবে, মায়ের মুখে প্রথম যে ডাকটি আমরা শুনি, তা–ই আমাদের আগামীর সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দেওয়ার চাবিকাঠি।

এখনই সময় বাংলাদেশের সাহিত্যের বাতিঘর তৈরি করতে আঞ্চলিক ভাষার প্রচার, প্রসার ও তা যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা হোক এবং জনমনে লজ্জা নয়; বরং উৎসাহের সঙ্গে নিজস্ব ঐতিহ্যের ধারক–বাহক হতে সচেতনতামূলক কার্যক্রমের উদ্যোগ নেওয়া হোক। এ জন্য বাংলা একাডেমি নানামুখী পদক্ষেপ নিতে পারে। গ্রামগঞ্জে লোক নিয়োগ করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভাষা, সংস্কৃতির পসরা আরও সক্রিয় পদক্ষেপ নিয়ে চমক দেখাতে পারে। ব্যতিক্রম কিছু করে দেখান। রাষ্ট্র চাইলেই সব সম্ভব। বলাতো যায় না হয়তো অদূর ভবিষ্যতে আঞ্চলিক ভাষার নিমিত্তে একটি রাষ্ট্রকে বাঁচিয়ে রাখার মূলমন্ত্র হতে পারে। জাতীয় শিক্ষাক্রমে আঞ্চলিক ভাষার ওপর আলাদা গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাই।

পারভীন আকতার
শিক্ষক
রাঙ্গুনিয়া, চট্টগ্রাম
ই–মেইল: [email protected]

প্রতিক্রিয়া থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন