আত্মহত্যা: মানসিক চিকিৎসাসেবার অপ্রতুলতাই কি কারণ নয়?

মানসিক সমস্যা আর রোগ এক নয়। মানসিক স্বাস্থ্য যখন খারাপ হয়, তখন মানসিক সমস্যা দেখা দেয়। সময়মতো মানসিক সমস্যার চিকিৎসা বা কাউন্সেলিং না করা হলে তা একসময় প্রকট আকার ধারণ করে। প্রত্যেক মানুষেরই  জীবনে সমস্যা থাকে এবং তা সমাধানের জন্য সবাই চেষ্টা করে বটে। অনেকে কঠিন পরিস্থিতি সামলে উঠতে পারলেও, সবাই পারে না। অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সমস্যা যখন চরম রূপ নেয়, হতাশা যখন ঘিরে ধরে, তখন মানসিকভাবে সে ভেঙে পড়ে, নিজেকে আর সামলে রাখতে পারে না, ঠিক সেই মুহূর্তে ভুল সিদ্ধান্ত নিতে দ্বিধা করে না।

মানুষের জীবনে আসা এই কঠিন বাস্তবতায় প্রয়োজন একটু কাউন্সেলিং বা বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ। কিন্তু এই সুযোগ আমাদের দেশে পাওয়া খুব দুর্লভ। ফলে দেখা যায়, পুরো দেশে, বিশেষ করে বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়াদের আত্মহত্যার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর একমাত্র কারণ,  মানসিক চাপ সামলাতে না পারা।

গত ৪ এপ্রিল জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্র এবং ৮ এপ্রিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যা নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, ‘২০২২ সালে ৫৩২ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করে।’ যা সত্যিই উদ্বেগজনক!

বিভিন্ন জরিপে আত্মহত্যার কারণ হিসেবে ওঠে আসে পারিবারিক কলহ, প্রেম বা বিবাহিত জীবনে সমস্যা, হতাশা, বিষণ্নতা ইত্যাদি। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে হতাশা, বিষণ্নতা খুব বেশি লক্ষ করা যায়। মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে একসময় বেছে নেন আত্মহত্যার পথ কিংবা মাদকের কালো জগৎ। এ সমস্যা দূরীকরণে মানসিক স্বাস্থ্যের প্রতি জোর দিতে হবে। যদি প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়, জেলা ও উপজেলায় অন্তত একজন করে মানসিক রোগবিশেষজ্ঞ থাকতেন এবং সবাইকে কাউন্সেলিংয়ের আওতায় আনা যেতে, তাহলে হয়তো আত্মহননের সংখ্যাটা তত ভারী হতো না।

জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের মতে, ‘বাংলাদেশে ১৮ দশমিক ৫ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক এবং প্রায় ১৩ শতাংশ শিশু-কিশোরের মধ্যে মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যা রয়েছে। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ৯২ শতাংশ মানুষই কোনো ধরনের সেবা বা পরামর্শ নেন না। আর নেওয়ার মতো পরিবেশ  সৃষ্টিতে ব্যর্থ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।’

আমাদের দেশে মানসিক সমস্যা থেকে উত্তরণের সহজ কোনো উপায় খুঁজে পাওয়া যায় না।  প্রতিটি জেলা-উপজেলা ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে কোনো বিশেষজ্ঞ নেই। কোনো কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থা নেই। কয়েকটি বিভাগীয় শহর, আর কয়েকটা বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়া তেমন কোনো চিকিৎসা বা পরামর্শের সুযোগ পান না সাধারণ মানুষেরা। আমরা দেখতে পাই, মানসিক স্বাস্থ্যসেবাপ্রত্যাশী তিন লাখ মানুষের বিপরীতে মাত্র একজন মানসিক চিকিৎসক রয়েছেন। সংখ্যাটা মোটেই সন্তোষজনক নয়।

আমাদের দেশে মানসিক চিকিৎসাসেবা নিয়ে উচ্চতর পড়াশোনা শেষ করে কাজ করছেন, এমন চিকিৎসকের সংখ্যা প্রায় ৩০০। আর সাইকোলজিস্ট, সাইকিয়াট্রিস্ট, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে যুক্ত সব মানুষ মিলিয়ে সংখ্যা হাজারের কম। এটা অত্যন্ত দুঃখজনক! জাতীয় স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার যৌথ প্রযোজনায় ২০২১ সালের জরিপমতে, ‘বয়স্কদের ক্ষেত্রে মানসিক সমস্যায় আক্রান্তের হার ১৬ দশমিক ৮ ভাগ। আর তরুণদের বেলায় তা ১৩ ভাগ।’ অর্থাৎ ১৬ কোটি জনসংখ্যার দেশে অন্তত ৩ কোটি মানুষ কোনো না কোনোভাবে মানসিক সমস্যায় আছেন বা মানসিক রোগে আক্রান্ত। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর বিপরীতে আমাদের চিকিৎসাসেবা দিতে পারেন, এমন মানুষের সংখ্যা মাত্র এক হাজার, যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল।

এ ছাড়া স্বাস্থ্য খাতের মোট বাজেটের মাত্র শূন্য দশমিক ৪৪ শতাংশ মানসিক রোগ চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, যা প্রয়োজন মেটাতে ব্যর্থ।

দেশের জনসংখ্যা অনুযায়ী মনোরোগ-বিশেষজ্ঞ না থাকার যথেষ্ট কারণও আছে। আমরা দেখতে পাই, বাংলাদেশে সরকারি মেডিকেলের সংখ্যা ৩৭, কিন্তু এর মধ্যে ১৬টিতেই কোনো মানসিক স্বাস্থ্যসেবার বিভাগ নেই। আর যেগুলোতে মনোরোগ বিভাগ চালু করা হয়েছে, সেগুলোও চলছে হযবরল অবস্থায়। মেডিসিন কোর্সের অধীনের পরীক্ষায় সাইকিয়াট্রিস্টের অংশ থাকে বেশ কম। ক্লাস, পরীক্ষায় সাইকিয়াট্রিস্টের অংশ একটি যৌক্তিক পর্যায়ে উপনীত করা প্রয়োজন। সেই সঙ্গে ইন্টার্নশিপের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ মানসিক রোগসংক্রান্ত ট্রেনিংয়ে বরাদ্দ করলে একজন নবীন এমবিবিএস চিকিৎসক মানসিক রোগনির্ণয় ও প্রাথমিক মানসিক চিকিৎসা দিতে সমর্থ হবেন। এতে মানসিক চিকিৎসকের ঘাটতি পূরণ করা সম্ভব হবে।  
রোগটির চিকিৎসাব্যবস্থায় পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ, দ্রুততম সময়ের মধ্যে নার্স, টেকনিশিয়ানসহ জনবল নিয়োগ, ইউনিয়ন হেলথ সেন্টারে রোগটির প্রাথমিক ওষুধ সরবরাহ, সরকারি পর্যায়ে আরও বিশেষায়িত হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, অভিজ্ঞ চিকিৎসক ও সহায়ক জনবল তৈরি করতে হবে। নতুবা আমাদের দেশে মানসিক রোগাক্রান্ত মানুষের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাবে, বাড়বে আত্মহননের সংখ্যা, মাদকাসক্তের সংখ্যা। এতে দেশের সার্বিক অগ্রগতি ব্যাহত হবে। তাই জাতির সুস্থ বিকাশের জন্য হলেও মনোরোগ চিকিৎসকের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

রানা দাশ
শিক্ষার্থী, নাট্যকলা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়