থার্টি ফার্স্ট নাইটে আতশবাজি: রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই

উৎসব হোক এমন, যা শিশুর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাবে না, বৃদ্ধের হৃৎস্পন্দন বাড়াবে না এবং পাখির প্রাণ কেড়ে নেবে না।ফাইল ছবি

প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব কষে, ভালো থাকার এবং অন্যকে ভালো রাখার অঙ্গীকার নিয়ে আমাদের জীবনে আসে নতুন বছর। তবে এখন নতুন বছরের প্রথম প্রহর মানেই এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতা। ক্যালেন্ডারের পাতা ওলটানোর আনন্দ একদিকে, আর অন্যদিকে মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা গিলে খাওয়া বারুদের আস্ফালন।

প্রতি বছরের মতো গত ৩১ ডিসেম্বরও দিবাগত রাতে ঢাকাসহ দেশের অন্য শহরগুলোতে যা ঘটল, তাকে কোনোভাবেই উৎসব বলা চলে না। এটি ছিল মূলত নববর্ষ উদ্‌যাপনের নামে শব্দত্রাস আর নৈতিক দেউলিয়াত্বের বহিঃপ্রকাশ, যার নীরব ভুক্তভোগী অবুঝ শিশু, বয়স্ক মানুষ, অসুস্থ রোগী ও অবলা পাখিরা, যা আমাদের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক মূল্যবোধের এক গভীর ক্ষতের দিকে আঙুল তোলে।

শোক ছাপিয়ে উন্মত্ত উদ্‌যাপন

এবারের প্রেক্ষাপটটি ছিল ভিন্ন। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া গত ৩০ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেছেন। তাঁর মৃত্যুতে দেশজুড়ে তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক চলছিল। থার্টি ফার্স্ট নাইট উদ্‌যাপনে সরকারের পক্ষ থেকে নিষেধাজ্ঞা ছিল। কিন্তু এই নির্দেশনা যে কেবল কাগজের বাঘ, তার প্রমাণ মিলল রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে। শোকের আবহে এমন উন্মত্ততা কেবল অসংবেদনশীলতা নয়, বরং শিষ্টাচারের চরম লঙ্ঘন।

আমরা হয়তো ভুলে গেছি, ২০২২ সালে আতশবাজির শব্দে অসুস্থ শিশু উমায়েরের মৃত্যুর ঘটনা, যা দেশজুড়ে আলোড়ন তুলেছিল। অবশ্য কয়েক দিন শোক, প্রতিবাদের ঝড়, তারপর সব ভুলে যাওয়া এই আমাদের চরিত্র। স্মৃতিহীন এই সমাজে প্রতিবছর একই দৃশ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটছে। শব্দদূষণ, অগ্নিকাণ্ড, পরিবেশদূষণ, স্বাস্থ্যঝুঁকি, ‍মৃত্যুভয়—সবই যেন আমাদের কাছে এখন স্বাভাবিক হয়ে গেছে। অথচ এই স্বাভাবিকতাই আসলে অস্বাভাবিক, অমানবিক এবং অপ্রত্যাশিত এক সমাজের প্রতিচ্ছবি।

রাতের শান্ত আকাশে যে আতশবাজি ফোটে, তার শব্দ শুধু কানে আঘাত করে না, তা কেঁপে ওঠে হৃদয়েও। অবুঝ শিশু, বয়স্ক মানুষ, হৃদ্‌রোগী, মানসিকভাবে সংবেদনশীল ব্যক্তি আর অবলা প্রাণীর এই নীরব আর্তনাদ উপেক্ষা করে যে নতুন বছরের সূচনা হয়, তা আসলে আমাদের সভ্যতারই পরাজয়। এই ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ কি আক্ষরিক অর্থেই কারও জন্য সুখের বার্তা নিয়ে আসে?

শহুরে জীবনে পাখি ও অন্য প্রাণীরা এমনিতেই কোণঠাসা। মধ্যরাতে যখন বিকট শব্দে আকাশ কেঁপে ওঠে, তখন এই অবলা প্রাণীগুলো দিগ্‌বিদিক ছোটাছুটি করে, বিদ্যুতের তারে ধাক্কা খেয়ে, আগুনে পুড়ে মারা যায়। এসব ঘটনা নতুন নয়। কিন্তু কোনো হিসাব নেই, কোনো দায় নেই। এমনকি বহু জায়গায় আতশবাজির কারণে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও ঘটে। এখন আমাদের এই তথাকথিত আধুনিকতাই প্রাণ-প্রকৃতিকে পিষ্ট করার হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে।

রাষ্ট্রের দায় বনাম নাগরিক দায়িত্ব

থার্টি ফার্স্ট নাইট ঘিরে যা হলো, তাতে রাষ্ট্রের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। প্রতিবছর ডিসেম্বর এলেই আতশবাজির অবাধ উৎপাদন, বিপণন ও বিক্রি শুরু হয়। সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ আতশবাজি, পটকাজাতীয় পণ্য দেশে ঢোকে। তাহলে প্রশ্ন আসে, এক মাস আগে থেকে কেন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয় না? পটকা বানাতে দেওয়া হবে, আমদানি করতে দেওয়া হবে, বিক্রি করতে দেওয়া হবে, এমনকি কিনতেও দেওয়া হবে। তারপর ঘোষণা দিয়ে বলা হবে, ‘নববর্ষের রাতে আতশবাজি নিষিদ্ধ।’ কেন এই দ্বিচারিতা? সরকার কি তবে ব্যর্থ, নাকি উদাসীন?

আর সব দায় রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে নাগরিক হিসেবে আমরা কি মুক্তি পেয়ে যাই? যে বিল্ডিংয়ের ছাদ থেকে আতশবাজির শব্দে পুরো এলাকা কেঁপে উঠেছিল, সেখানে কি কোনো অভিভাবক ছিল না? ছিল না কোনো মহল্লা কমিটি, স্থানীয় রাজনৈতিক কিংবা নাগরিক সমাজ? নাকি আমরা সবাই মিলে ‘আজকাল বাচ্চারা কথা শোনে না’, এই অজুহাতে দায় এড়িয়ে যাব? ছোটদের ব্যাপারে বড়দের এই নীরবতা আসলে সম্মতিরই আরেক রূপ।

সবচেয়ে বড় সংকটের জায়গাটি হলো আমাদের পারিবারিক ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। একটি বাড়ির ছাদ থেকে যখন শত শত আতশবাজি ফোটানো হয়, তখন সেই বাড়ির অভিভাবকেরা জেগে জেগে ঘুমান। আমরা কি তবে এমন এক প্রজন্ম তৈরি করছি, যারা কেবল নিজের আনন্দটুকুই চেনে, অন্যের অধিকার বা বেদনা বুঝতে শেখে না?

উৎসব করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু সেই অধিকার ভোগ করার জন্য কিছু দায়িত্বও পালন করতে হয়। মনে রাখা দরকার, আনন্দ করা মানেই বিশৃঙ্খলা নয়। আমাদের বুঝতে হবে পারিপার্শ্বিক অবস্থা এবং অন্যের সুবিধা ও অসুবিধা। তাই শুধু উৎসব করা শিখলে হয় না, কখন ও কীভাবে করতে হয়, আর কখন নীরব থাকতে হয়, সেটা জানাও জরুরি। অর্থাৎ শোকের সময় সংযম, অসুস্থের পাশে নীরবতা, প্রকৃতির প্রতি সহানুভূতি, এসবই সভ্যতার মৌলিক পাঠ। এই পাঠ পরিবারে শুরু হয়, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিস্তৃত হয় আর সমাজে চর্চার মাধ্যমে বাস্তবায়ন হয়।

জনজীবনে উৎপাত সৃষ্টি হয় না, এমন বহু উপায়ে নববর্ষকে বরণ করা যায়। তাই উন্মত্ততায় ভরা কথিত উদ্‌যাপনের বিকল্প হিসেবে যা কিছু সুন্দর, সৃষ্টিশীল, শৃঙ্খল ও পরিমিত, তাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে। আধুনিক বিশ্বে অনেক দেশ এখন শব্দহীন ড্রোন শো বা আলোর রোশনাই দিয়ে উৎসব উদ্‌যাপন করে, যেখানে শব্দদূষণ নেই, প্রাণহানির ঝুঁকি নেই। আমরা কি পারি সেই পথে হাঁটতে? যে পথে গেলে আনন্দ আর শান্তি দুটোই নিশ্চিত হয়।

আর যারা শান্তি বিনষ্টকারী, আইন অমান্য করে মাঝরাতে জনজীবন অতিষ্ঠ করছে, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা বা জরিমানা করার নজির তৈরি করতে হবে। প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছাদ থেকে যারা অবৈধ উৎসব করছে, তাদের চিহ্নিত করা এখন অসম্ভব কিছু নয়। আর কত নির্লিপ্ততা; রাষ্ট্রের উচিত সেদিকে নজর দেওয়া। তবে এটাও সত্য যে আইন, পুলিশ, নিষেধাজ্ঞা, জরিমানা কিংবা হাতকড়া দিয়ে বিবেক তৈরি হয় না। দরকার নৈতিক শিক্ষা, সহমর্মিতার চর্চা, এবং সবচেয়ে বড় কথা, একটি সম্মিলিত সামাজিক অঙ্গীকার।

নতুন বছরে প্রত্যাশা, বদলে যাক উদ্‌যাপনের এই নিষ্ঠুর ধরন। উৎসব হোক এমন, যা শিশুর ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাবে না, বৃদ্ধের হৃৎস্পন্দন বাড়াবে না এবং পাখির প্রাণ কেড়ে নেবে না। বিবেক জাগ্রত না হলে কেবল আইন দিয়ে কোনো জাতিকে পূর্ণাঙ্গ সভ্য করা সম্ভব নয়। সবাই মিলে সবাইকে ভালোবাসার নামই হোক আগামীর উদ্‌যাপন।

  • ইয়াসির সিলমী শিক্ষক, বিজিসি ট্রাস্ট ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ।