যাঁরা উন্নয়নের কথা বলেন, তাঁরা কি সুশাসনের কথাও বলেন। প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ মনে হলেও এর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য গভীর। কারণ এই প্রশ্নের মুখোমুখি হলেই আমাদের রাজনীতির সবচেয়ে জনপ্রিয় বয়ানটি নড়বড়ে হয়ে যায়।
আমাদের বলা হয়, রাস্তা হয়েছে, স্কুল কলেজ হয়েছে, সেতু কালভার্ট হয়েছে, বিদ্যুৎ এসেছে, শহর বদলে গেছে। সুতরাং ধরে নিতে হবে রাষ্ট্রও সঠিক পথেই এগোচ্ছে। কিন্তু রাষ্ট্রকে যদি কেবল কংক্রিট, ইট পাথর আর অবকাঠামোর সমষ্টি হিসেবে দেখা হয়, তবে একটি মৌলিক সত্য অনিবার্যভাবেই আড়ালে পড়ে যায়।
রাষ্ট্র আসলে কী, এই প্রশ্নে ফিরে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্র কোনো স্থির বা জড় বস্তু নয়। রাষ্ট্র হলো মানুষ, প্রতিষ্ঠান, আইন ও ন্যায়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা একটি কাঠামো। এই কাঠামোর কার্যকারিতা নির্ভর করে ক্ষমতার প্রয়োগ কতটা ন্যায়সংগত, প্রতিষ্ঠানগুলো কতটা জবাবদিহিমূলক এবং সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রের কাছ থেকে কতটা নিরাপত্তা ও মর্যাদা অনুভব করে, তার ওপর।
এই সূচকগুলো উপেক্ষা করে যদি শুধু অবকাঠামোগত ও পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে রাষ্ট্রের সাফল্য মাপা হয়, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে, উন্নয়ন দিয়ে কি সত্যিই সুশাসন মাপা যায়।
উন্নয়ন সাধারণত দৃশ্যমান ও পরিমাপযোগ্য। নতুন উড়ালসড়ক, আধুনিক ভবন কিংবা বড় প্রকল্প সহজেই চোখে পড়ে। কিন্তু সুশাসন সরাসরি দৃশ্যমান নয়। এটি মূলত নাগরিক অভিজ্ঞতার বিষয়। সুশাসন হলো এমন এক শাসনব্যবস্থা, যা শাসক ও শাসিতের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করে। একজন মানুষ থানায় গিয়ে কী ধরনের সেবা পান, সরকারি দপ্তরে কাজ করতে গিয়ে অনানুষ্ঠানিক লেনদেনের প্রয়োজন হয় কি না, কিংবা আদালতে একটি মামলার নিষ্পত্তি পেতে কত সময় লাগে, এই অভিজ্ঞতাগুলোই রাষ্ট্রের শাসনব্যবস্থার প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে। এখানেই উন্নয়ন ও সুশাসনের মৌলিক পার্থক্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যায়, উন্নয়নের বর্ণনা যত বেশি জোরালো হয়, নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ ততটাই সংকুচিত হয়ে পড়ে।
উন্নয়নকেন্দ্রিক আলোচনার বাইরে গিয়ে সমালোচনামূলক প্রশ্ন উত্থাপনকে অনেক সময় অপ্রয়োজনীয় কিংবা নেতিবাচক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। অথচ সুশাসনের ভিত্তি গড়ে ওঠে প্রশ্ন ও জবাবদিহির মধ্য দিয়েই। যেখানে প্রশ্নের সুযোগ সীমিত হয়, সেখানে জবাবদিহিও দুর্বল হয়ে পড়ে। এই দুর্বলতাই ক্ষমতার অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে।
বহির্বিশ্বের অভিজ্ঞতাও একই কথা বলে। যেসব দেশে আইনের শাসন, নাগরিক নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়েছে, সেখানে কেবল উন্নয়নকেন্দ্রিক পরিকল্পনা রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে পারেনি। রাষ্ট্র টিকে থাকে তখনই, যখন ন্যায্যতা, আস্থা ও প্রতিষ্ঠানগত ভারসাম্য বজায় থাকে।
দেশের বাস্তবতা পর্যবেক্ষণ করলেও এই প্রশ্নের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। একদিকে বড় আকারের উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, অন্যদিকে নাগরিক অভিজ্ঞতায় ভিন্ন চিত্র উঠে আসছে। স্বাস্থ্যসেবা পেতে অনিশ্চয়তা, নিয়োগ ও পদোন্নতিতে যোগ্যতার প্রশ্ন, কিংবা নির্বাচন ঘিরে জনমনে উদ্বেগ এসব অভিজ্ঞতা উন্নয়ন ও সুশাসনের মধ্যকার ব্যবধানকে সামনে নিয়ে আসে। উন্নয়ন যদি সুশাসনের প্রকৃত প্রতিফলন হতো, তবে এ ধরনের অসন্তোষ ও অনাস্থা সমাজে এত গভীরভাবে জায়গা করে নিত না।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো, উন্নয়নপ্রক্রিয়া অনেক সময় ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণকে ত্বরান্বিত করে। বড় প্রকল্প মানেই বড় সিদ্ধান্ত, আর সেই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা সীমিত কিছু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যেই আবদ্ধ থাকে। সংসদ, স্থানীয় সরকার কিংবা জনঅংশগ্রহণমূলক কাঠামো অনেক ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা হারিয়ে ফেলে। বাইরে থেকে রাষ্ট্রকে শক্তিশালী মনে হলেও ভেতরে ভেতরে গণতান্ত্রিক কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
সুশাসনের প্রকৃত পরীক্ষা আসে সংকটের মুহূর্তে। ভিন্নমত সহ্য করার সক্ষমতা, আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ এবং নাগরিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়েই রাষ্ট্রের পরিপক্বতা বোঝা যায়। উন্নয়ন থাকা সত্ত্বেও যদি মতপ্রকাশে ভয় কাজ করে, তাহলে সেই উন্নয়ন নাগরিক আস্থা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়।
দীর্ঘ সময় ধরে দেশে উন্নয়নের বয়ান প্রাধান্য পেয়েছে। বড় প্রকল্প ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির চিত্র সামনে এসেছে। কিন্তু একই সময়ে আইনের শাসন, নাগরিক সেবার মান এবং জনমনে জমে ওঠা অসন্তোষের বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব পায়নি। ফলে উন্নয়ন ও সুশাসনের মধ্যে যে ফাঁক তৈরি হয়েছে, তা উপেক্ষা করা আর সম্ভব নয়।
এই প্রেক্ষাপটে নির্বাচন ও রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নতুন গুরুত্ব পাচ্ছে। বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি উন্নয়নকে সামনে রেখে প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু মৌলিক প্রশ্নটি থেকেই যাচ্ছে, এসব প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সুশাসনের অঙ্গীকার কতটা স্পষ্টভাবে যুক্ত হচ্ছে। নির্বাচন যদি কেবল উন্নয়নের হিসাব উপস্থাপনের মঞ্চে পরিণত হয়, তবে রাষ্ট্রের গভীর কাঠামোগত সংকট অমীমাংসিতই থেকে যাবে।
এই কারণেই প্রশ্নটি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কেন উন্নয়নের কথা বলা হয়, কিন্তু সুশাসনের কথা তুলনামূলকভাবে কম বলা হয়। কারণ সুশাসন মানে রাষ্ট্রের আয়নায় তাকানো। সেখানে নাগরিক অধিকার, ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির বাস্তব চিত্র সামনে আসে। রাষ্ট্র কেবল অবকাঠামো দিয়ে টিকে থাকে না। রাষ্ট্র টিকে থাকে মানুষের আস্থায়। উন্নয়ন রাষ্ট্রকে সক্ষম হিসেবে দেখায়, কিন্তু সুশাসনই রাষ্ট্রকে বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।
মো. শাহিন আলম স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়