বেসরকারি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ না দিয়ে নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন কীভাবে?

সভ্যতার গোড়াপত্তনে শিক্ষার ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। আধুনিক সমাজব্যবস্থায় যেকোনো উন্নয়নে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার যোগসূত্র নিবিড়। তাই তো কালে কালে দেশে দেশে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি গড়ে উঠেছে নানা ধরনের বেসরকারি বা ব্যক্তি উদ্যোগে পরিচালিত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থা। এসবের মধ্যে কিন্ডারগার্টেন (স্থানীয় পর্যায়ে যা কেজি স্কুল নামে পরিচিত) কার্যক্রমটি অন্যতম।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক স্কুল জরিপ ২০২১ (অ্যানুয়াল প্রাইমারি স্কুল সেনসাস)–এর তথ্য পর্যালোচনা করে দেখা যাচ্ছে, দেশে বর্তমানে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ১,১৮,৮৯১টি, শিক্ষক ৬,৬৭,২০৩ জন, শিক্ষার্থী ১,০১,০০,৯৭২ জন এবং ছাত্র–শিক্ষক অনুপাত ৩১:১। এ তথ্যে আরও দেখা যাচ্ছে, এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে ৬৫,৫৬৬টি। মোট শিক্ষক ৩,৫৯,০৯৫ জন, শিক্ষার্থী ১,৩৪,৮৪,৬১৭ জন এবং ছাত্র–শিক্ষক অনুপাত ৩৮: ১। একই পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, দেশে বেসরকারি তথা কিন্ডারগার্টেন স্কুলের সংখ্যা ২৮,১৯৩টি। এখানে মোট শিক্ষক ২,০০,৪৬৭ জন, শিক্ষার্থী ৩৩,২৪,১৭৭ জন এবং ছাত্র–শিক্ষক অনুপাত ১৭:১।

আরও পড়ুন

দেশে সঠিক কতটি বেসরকারি তথা কিন্ডারগার্টেন স্কুল রয়েছে, সে বিষয়ে সঠিক পরিসংখ্যান নেই। তবে কয়েকভাবে বিভক্ত কিন্ডারগার্টেন স্কুল অ্যাসোসিয়েশনের ধারণামতে, এ সংখ্যা ৫০ হাজারে বেশি ছাড়া কম নয়।

এপিএসসি ২০২১–এর তথ্যমতে, দেশে মোট প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাদ দিলে দেখা যাচ্ছে, কিন্ডারগার্টেনসহ অন্যান্য স্কুল যারা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে, তার সংখ্যা ৫৩,৩২৫। এসব স্কুলে মোট শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সংখ্যা যথাক্রমে ৩,০৮,১০৮ ও ৬৬,১৬,৩৫৫ জন। তাহলে দেখা যাচ্ছে, দেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের তুলনায় শুধু বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর হার যথাক্রমে ৪৬ ও ৩৩ শতাংশ প্রায়।

দেশের সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের পাঠ পরিচালনা বিশেষ দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সারা দেশে ৫৪টি প্রাথমিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (পিটিআই) রয়েছে, যারা সব সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কাজ করে চলেছে। কিন্তু কিন্ডারগার্টেনসহ মোট যে ৫৩,৩২৫টি বেসরকারি স্কুল রয়েছে, তার শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকারি কিংবা বেসরকারি কোনো উদ্যোগ কি আছে?

সাধারণভাবে আমরা মনে করে থাকি যে পড়তে পারলেই পড়াতে পারি। কিন্তু পড়ানো একটি বিশেষ দক্ষতাসম্পন্ন কাজ, যা প্রশিক্ষণ কিংবা শিক্ষা বিষয়ে কারিগরি জ্ঞান ও দক্ষতা ছাড়া সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণে শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের বিকল্প নেই।

আরও পড়ুন

বর্তমানে আমরা টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য কাজ করছি। কিন্তু বেসরকারিভাবে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত এসব স্কুলের শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণের বাইরে রেখে সবার জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতকরণ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষালাভের সুযোগ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে কি?

এখানে একটি কথা উল্লেখ করা প্রয়োজন, এসব কিন্ডারগার্টেন স্কুল ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত ও পরিচালিত হলেও এখানে সরকারের শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক অনুসরণ করেই প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হয়। অল্প কিছু স্কুল রয়েছে, যারা ইংলিশ মিডিয়াম তথা ব্রিটিশ শিক্ষাক্রমে পাঠ পরিচালনা করে থাকে।

দেশে শিক্ষার মান বৃদ্ধি ও পরিবর্তিত বিশ্ব পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনায় বর্তমান সরকার দেশের শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে ‘জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১’ প্রণয়ন করেছে। এ বছর, অর্থাৎ ২০২৩ সাল থেকে নতুন রূপরেখার আলোকে প্রথম, ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ২০২৭ সালের মধ্যে প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে এটি বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে।

জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখার আলোকে প্রণীত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের সফলতা নির্ভর করছে মূলত শিক্ষকদের দক্ষতা ও মনোযোগের ওপর। এখানে দেখা যাচ্ছে, শ্রেণি কার্যক্রমের সঙ্গে সঙ্গেই শিখনকালীন মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে। এর জন্য শিক্ষকদের যে পরিমাণ দক্ষতা প্রয়োজন, লক্ষ করা যাচ্ছে, তার অনেকটাই অনুপস্থিত কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে।

নতুন রূপরেখায় বেশ কয়েকটি জায়গায় ব্যাপক পরিবর্তন আনা হয়েছে। এটিতে প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণিতে মোট ১০টি শিখনক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো— ভাষা ও যোগাযোগ, গণিত ও যুক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, তথ্য যোগাযোগপ্রযুক্তি, সমাজ ও বিশ্বনাগরিকত্ব, জীবন ও জীবিকা, পরিবেশ ও জলবায়ু, মূল্যবোধ ও নৈতিকতা, শারীরিক-মানসিক স্বাস্থ্য ও সুরক্ষা এবং শিল্প ও সংস্কৃতি। মূলত এই ১০টি শিখনক্ষেত্র থেকে বিভিন্ন স্তরে পাঠের বিষয় ও সংখ্যা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে।

প্রাথমিক স্তরে যেমন শিক্ষার্থীদের জন্য মোট ৭টি বিষয় নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছে, সেগুলো হলো—বাংলা, ইংরেজি, গণিত, সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান, ক্রীড়া ও শিল্পকলা এবং ধর্মশিক্ষা। অন্যদিকে ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণির ক্ষেত্রে প্রাথমিকের ৭টি বিষয়ের সঙ্গে আরও ৩টি বিষয়, যেমন তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি, জীবন ও জীবিকা এবং ভালো থাকা—এই ৩টি বিষয় যুক্ত করে মোট ১০টি বিষয় নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে উল্লেখ্য, নতুন শিক্ষাক্রমে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সব শিক্ষার্থী একই বিষয় নিয়ে পড়াশোনা করবে। এখানে মানবিক, বিজ্ঞান বা ব্যবসায় শিক্ষা নামে কোনো বিভাগ নেই।

আরও পড়ুন

একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে গিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য মানবিক, বিজ্ঞান ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। নতুন এ শিক্ষাক্রমে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তন আনা হয়েছে, সেটি হচ্ছে শিক্ষার্থীদের শিখন বা যোগ্যতা মূল্যায়নব্যবস্থায়। একইভাবে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনায়ও বড় পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।

মূল্যায়নব্যবস্থায় প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত শতভাগ শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে। চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে ৭০ শতাংশ শিখনকালীন এবং ৩০ শতাংশ হবে পরীক্ষাভিত্তিক; ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত ৬০ শতাংশ শিখনকালীন এবং ৪০ শতাংশ হবে পরীক্ষাভিত্তিক; নবম শ্রেণিতে ৫০ শতাংশ শিখনকালীন এবং ৫০ শতাংশ হবে পরীক্ষাভিত্তিক; শুধু দশম শ্রেণির বিষয়গুলোর ওপর একটি পাবলিক পরীক্ষা হবে। এখানে ৮০ শতাংশ পরীক্ষাভিত্তিক এবং ২০ শতাংশ শিখনকালীন মূল্যায়ন হবে। একাদশ ও দ্বাদশ শ্রেণিতে ৩০ শতাংশ শিখনকালীন এবং ৭০ শতাংশ পরীক্ষাভিত্তিক। এখানে একাদশ শ্রেণিতে প্রতিষ্ঠানভিত্তিক পরীক্ষা হবে এবং দ্বাদশ শ্রেণি শেষে পাবলিক পরীক্ষা হবে।

জাতীয় শিক্ষাক্রমের রূপরেখার আলোকে প্রণীত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নের সফলতা নির্ভর করছে মূলত শিক্ষকদের দক্ষতা ও মনোযোগের ওপর। এখানে দেখা যাচ্ছে, শ্রেণি কার্যক্রমের সঙ্গে সঙ্গেই শিখনকালীন মূল্যায়ন সম্পন্ন করতে হবে। এর জন্য শিক্ষকদের যে পরিমাণ দক্ষতা প্রয়োজন, লক্ষ করা যাচ্ছে, তার অনেকটাই অনুপস্থিত কর্মরত শিক্ষকদের মধ্যে।

নতুন এ মূল্যায়নব্যবস্থায় শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি এটিতে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে কিছুটা সময় লাগবে। শিক্ষকদের এই দুর্বলতা কাটিয়ে তুলতে সরকারের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং হচ্ছে। ইতিমধ্যে যতটুকু প্রশিক্ষণ হয়েছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট নয় এবং ক্ষেত্রবিশেষ এসব প্রশিক্ষণের মান নিয়েও শিক্ষক ও অভিভাবকমহলে প্রশ্ন উঠেছে।

আরও পড়ুন

সবাই প্রত্যাশা করছেন, ভবিষ্যতে এসব প্রশিক্ষণের মানের উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষকদের দুর্বলতাও কেটে যাবে এবং নতুন শিক্ষাক্রম সফলভাবে বাস্তবায়িত হবে। কিন্তু একটি বড় প্রশ্ন দেখা দিয়েছে বেসরকারি তথা কেজি স্কুলগুলোর বিষয়ে।

সরকারি হিসাবমতে, দেশে ৫৩,৩২৫টি বেসরকারি স্কুল রয়েছে, যারা সরকারি শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তকের আলোকে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানেও তো শিখন মূল্যায়ন নতুন রূপরেখার আলোকেই করতে হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, এসব কেজি স্কুল এখনো পুরোনো পদ্ধতি তথা শতভাগ পরীক্ষাভিত্তিক মূল্যায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করছে।

নতুন শিক্ষাক্রম বাস্তবায়ন শুরুর প্রথম বছরের সাত মাস শেষ হলেও এখন পর্যন্ত এসব স্কুলের শিক্ষকদের কোনো প্রকার প্রশিক্ষণের আওতায় আনা হয়নি। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, বেসরকারিভাবে পরিচালিত এসব স্কুলের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের বাইরে রেখে কি দেশে সবার জন্য মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে? জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১–এর পূর্ণ বাস্তবায়ন ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিশ্চিতকরণে স্বল্পতম সময়ের মধ্যে দেশের বেসরকারি উদ্যোগে পরিচালিত স্কুলগুলোর শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসা জরুরি।

  • মো. সাইফুজ্জামান শিক্ষাবিষয়ক উন্নয়নকর্মী, ই-মেইল: [email protected]