৩ ডিসেম্বর ২০১৩ সালে দৈনিক প্রথম আলোর কলাম শাখায় সাবেক নির্বাচন কমিশনার এম সাখাওয়াত হোসেন ও মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়ার ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটের অধিকার’ শিরোনামে একটি লেখা প্রকাশিত হয়। ১০ বছর পর সে লেখা এখনো প্রাসঙ্গিক। এখনো প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
লেখকেরা তাঁদের কলামে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে বেশ কয়েকটি বাধা চিহ্নিত করেছিলেন। যেমন শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে অপ্রবেশগম্য ভোটকেন্দ্র, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা নিজেরা ভোট না দিতে পারা ও শ্রবণপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ইশারা ভাষার ব্যবস্থা না থাকা। ওই লেখায় আরও উল্লেখ করা হয়েছিল কী উপায় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটদান প্রক্রিয়া আরও প্রবেশগম্য ও সহজ করা যেতে পারে। সেখানে তাঁরা উল্লেখ করেন আইন সংস্কার, পরিপত্র জারি করা ও রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা করা।
সেই লেখার পর দুটি জাতীয় নির্বাচন হয়েছে। স্থানীয় সরকারের অনেক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। এখন আমরা দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের জন্য ক্ষণ গুনছি। অথচ প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার বাধা এখনো দূর হয়নি। স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের যে ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়নি, তার দায় আমাদের সবার।
আমরা মানি না–মানি, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার প্রতিষ্ঠার যে সংগ্রাম, তা এখন অনেকটা প্রকল্পভিত্তিক হয়ে পড়েছে। দাতারা যেভাবে চায়, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো সেভাবেই তাদের কর্মসূচি তৈরি করে। ফলে অনেক সংগঠন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটের অধিকার নিয়ে কথা বললেও তা প্রকল্পের সময় পর্যন্ত স্থায়ী হয়েছে।
আমাদের সমাজের প্রাজ্ঞ ব্যক্তিরাই নির্বাচন কমিশনার, প্রশাসন ও রাজনৈতিক দলে আছেন। কিন্তু তারপরও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করা গেল না। প্রকৃতপক্ষে আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের এখনো চ্যারিটি মডেলে দেখে থাকে। সমাজের এসব মানুষ দানদক্ষিণা নেবেন ও সৃষ্টিকর্তাকে ডাকবেন—এটাই হচ্ছে একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অবয়ব। আর সে কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার বাধাগুলো অপসারণ করা যাচ্ছে না।
দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের খুব বেশি সময় নেই। আমরা যদি নির্বাচন কমিশনের পরিকল্পনা বিবেচনায় নিই, তাহলে আগামী ডিসেম্বর অথবা জানুয়ারি মাসে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এই অল্প সময়ের মধ্যেও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য প্রবেশগম্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচনব্যবস্থা তৈরি করা সম্ভব।
নির্বাচনের দিন প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেসব সমস্যার সম্মুখীন হন, সেগুলোর অন্যতম হলো যানবাহন বন্ধ থাকা, অপ্রবেশগম্য ভোটকেন্দ্র ও ভোটদান প্রক্রিয়া প্রতিবন্ধী ব্যক্তিবান্ধব নয়।
উল্লেখিত সমস্যাগুলোর সমাধান করার লক্ষ্যে প্রথমেই কোন এলাকায় কোন ধরনের এবং কত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন, সে সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহ করতে হবে। প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩–এর ৩১ নম্বর ধারা বলে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের একটি বিশেষ কার্ড প্রদান করে, যা সুবর্ণ নাগরিক কার্ড হিসেবে পরিচিত। সেই পরিচয়পত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে কোন এলাকায় কতজন ভোট দেওয়ার উপযুক্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি আছেন, তা শনাক্ত করতে হবে। এরপর তাঁদের প্রতিবন্ধিতার ধরন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোট দেওয়ার ক্ষেত্রে অন্যতম বাধা হলো যাতায়াত। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী নির্বাচনের দিন নির্বাচনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরাই যানবাহন ব্যবহার করতে পারবেন। এই নিয়মের কারণে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা ভোটকেন্দ্রে যেতে পারেন না। বিশেষ করে শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের বেশি সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। এই সমস্যার সমাধানে নির্বাচন কমিশন আমাদের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে যুক্ত করতে পারে। যেন তাঁরা তাঁদের গাড়িতে করে প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভোটারকে ভোটকেন্দ্রে আসতে সহায়তা করেন।
অপ্রবেশগম্য ভোটকেন্দ্র প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটদানের ক্ষেত্রে আরও একটি সমস্যা। আমাদের নির্বাচন কমিশন চাইলেও সব ভোটকেন্দ্র প্রবেশগম্য করতে পারবে না। এই বাস্তবতায় নির্বাচন কমিশন নির্বাচনী এলাকায় কত প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ভোটার আছেন, তার ওপর ভিত্তি করে প্রতিটি নির্বাচনী এলাকায় একটি কেন্দ্রকে প্রবেশগম্য করার উদ্যোগ নিতে পারে। যেখানে নিচতলায় ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা ও পোর্টেবল র্যাম্পের ব্যবস্থা থাকবে। আর দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা যেন তাঁদের মনোনীত ব্যক্তির দ্বারাই ভোট দিতে পারেন, সে বিষয় প্রিসাইডিং কর্মকর্তাদের সচেতন করতে হবে। যে প্রবেশগম্য ভোটকেন্দ্র তৈরি করা হবে, তার সব কর্মকর্তাকে ইশারা ভাষার প্রশিক্ষণ দিতে হবে।
আমাদের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ একটি বাধা হতে পারে। কারণ, এই আইনে শুধু দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটদানের বিষয়টি উল্লেখ করা আছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের খুব বেশি সময়ে নেই এই অল্প সময়ের মধ্যে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২ সংশোধন করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন যদি আমাদের রাজনৈতিক দল, বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী দেশ, বিভিন্ন আইনবিশেষজ্ঞ সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের কাছে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটদানের গুরুত্ব তুলে ধরেন, তাহলে সবাই একমত হবে যে কী করে আইনের ভেতরে থেকে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা যেতে পারে।
তা ছাড়া বাংলাদেশ জাতিসংঘের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সনদ ২০০৬ এবং জাতিসংঘের নাগরিক ও রাজনৈতিক কভেনেন্ট স্বাক্ষর ও অনুস্বাক্ষরকারী দেশ। যেখানে সব নাগরিকের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড ও ভোট দেওয়ার বিষয়ের উল্লেখ করা আছে। এর পাশাপাশি বাংলাদেশ সরকার প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩ পাস করেছে। সেই আইনের ১৬ অনুচ্ছেদে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের ভোটদানের বিষয়টি বলা আছে।
ভোটদান গণতন্ত্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ। ভোটদান প্রক্রিয়া যত অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং অংশগ্রহণমূলক হবে, তত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া শক্তিশালী হবে।
তাই এবারের দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অপ্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের পাশাপাশি প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে ভোট দেওয়া নিশ্চিত করা গেলে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই সমৃদ্ধ হবে।
তালুকদার রিফাত পাশা
পলিসি কর্মকর্তা, ইনস্টিটিউট অব ওয়েলবিং বাংলাদেশ
ই-মেইল: [email protected]