পরিবেশ সুরক্ষায় বৃক্ষের অবদান যেন ভুলে না যাই

‘সেদিন ছায়ায় এসো; হানো যদি কঠিন কুঠারে,/ তবুও তোমায় আমি হাতছানি দেব বারে বারে;/ ফল দেব, ফুল দেব, দেব আমি পাখিরও কূজন/ একই মাটিতে পুষ্ট তোমাদের আপনার জন।।’—কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ‘আগামী’ কবিতায় স্পষ্ট ফুটে ওঠে প্রাণিকুলে ভারসাম্য বজায় রাখতে বৃক্ষের নিঃস্বার্থ অবদানের কথা। বৃক্ষ আমাদের ফুল, ফল ও বিশুদ্ধ বাতাসের জোগান দেয়। বৃক্ষের এ ত্যাগের বৈশিষ্ট্যে বিমোহিত হয়ে কবি-সাহিত্যিকেরা বলেছেন, তোমরা নিজেদের মধ্যে বৃক্ষরাজের বৈশিষ্ট্য ধারণ করো, বৃক্ষের মতো পরের কল্যাণে আত্মত্যাগী হও। কিন্তু বৃক্ষের এত ত্যাগের মহিমা আদৌ কি আমরা বুঝতে সক্ষম হচ্ছি?

যেখানে একজন মানুষের খাদ্য ছাড়া ২১ দিন এবং পানি ছাড়া ৩ দিন বাঁচার সম্ভাবনা থাকে (স্বাস্থ্যভেদে ভিন্ন), সেখানে অক্সিজেন ছাড়া মানুষ বাঁচতে পারে মাত্র কয়েক মিনিট। আর সেই জায়গায় দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক অক্সিজেনের সবচেয়ে বড় উৎস বৃক্ষ নিধন করতে আমরা বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত বোধ করি না। তথ্য অনুযায়ী, একজন মানুষের বার্ষিক যে পরিমাণ অক্সিজেন প্রয়োজন হয়, সে পরিমাণ অক্সিজেন সাত থেকে আটটি পূর্ণবয়স্ক গাছ বাতাসে ছাড়তে পারে। কিন্তু আশঙ্কার বিষয় এই যে আমরা যে পরিমাণ বৃক্ষ নিধন করি, তার অর্ধেক পরিমাণ বৃক্ষও রোপণ করি না। দীর্ঘ মেয়াদে এটি জলবায়ুর পরিবর্তনে নেতিবাচক ভূমিকা পালন করছে। এ কারণে বৃষ্টি কমে যাচ্ছে, কোথাও দেখা দিচ্ছে খরা, আবার কোথাও কোথাও অসময়ের বন্যায় বড় ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছি আমরা। শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়, বৃক্ষনিধনের কারণে বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ ক্রমে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সৃষ্টি হচ্ছে গ্রিনহাউস ইফেক্ট। ফলস্বরূপ, বায়ুমণ্ডলের ওজোনস্তর ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অসহনীয়ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে পৃথিবীর তাপমাত্রা।

গত ২৫ বছরে বাংলাদেশের বনভূমি কমেছে প্রায় ৬৫ হাজার হেক্টর। যেখানে একটি দেশে মোট ভূমির ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার, সেখানে দ্য ওয়ার্ল্ড ফরেস্ট ২০২২-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের আছে মাত্র ১৪ দশমিক ১ শতাংশ। ভূমি মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, এ পরিমাণ ১৭ শতাংশ।

বনভূমির সংকটের প্রভাব স্পষ্ট পরিলক্ষিত হচ্ছে আমাদের দেশের ঋতুচক্রে। এ কারণে দেখা যাচ্ছে শুষ্ক মৌসুমে বৃষ্টি হতে, আবার বর্ষাকালে দেখা যায় বৃষ্টির কোনো খোঁজ নেই। একইভাবে শরতে দেখা যায় বৃষ্টি। এ পরিবর্তনগুলোর জন্য দায়ী আমরা মানুষেরাই। বৃক্ষনিধনের কারণে প্রকৃতির এ চিরায়ত নিয়মগুলো ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, যা পরিবেশের বাস্তুতন্ত্রের ওপর যথেষ্ট খারাপ প্রভাব ফেলছে। বৃক্ষ যে শুধু আমাদের পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখতেই সাহায্য করে তা কিন্তু নয়, বরং আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাপনের প্রতিটি কাজের সঙ্গে বৃক্ষ কোনো না কোনোভাবে জড়িত। ঘরবাড়ি তৈরি থেকে শুরু করে আসবাব তৈরি, খাবারের চাহিদা, শাকসবজি, ফলমূল, ওষুধ—সবকিছুর জন্যই আমরা বৃক্ষের ওপর নির্ভরশীল। এমনকি বৃক্ষ শব্দদূষণ, মাটিদূষণ, বায়ুদূষণ রোধ করতেও সাহায্য করে।

গবেষণায় দেখা গেছে, এক হেক্টর পরিমাণ মাঝারি বন প্রায় ১০ ডেসিবেল শব্দদূষণ প্রতিরোধ করতে পারে। এ ক্ষেত্রে দেবদারু প্রজাতির গাছ কৃত্রিম শব্দ শুষে নিয়ে পরিবেশকে রাখে কোলাহলমুক্ত, তীব্র থেকে তীব্রতর শব্দও বাধা পড়ে এ গাছের পাতার আড়ালে। তাই পরিবেশবিদেরা বিভিন্ন শহরাঞ্চলের শব্দদূষণ রোধে রাস্তার দুপাশে বেশি করে এই গাছ লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন।

বায়ুদূষণ ও মাটিদূষণ প্রতিরোধেও বৃক্ষের ভূমিকা অনস্বীকার্য। কিন্তু বর্তমান সময়ে আমরা কারণে-অকারণে যে পরিমাণ বৃক্ষ নিধন করছি, এভাবে চলতে থাকলে পরিবেশে অক্সিজেনের পরিমাণ কমে যাবে। বাড়বে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা। বন্যায় প্লাবিত হবে দেশের নিম্নাঞ্চল। বায়ুদূষণ ও শব্দদূষণ অসহনীয় পরিমাণে বেড়ে যাবে, যার সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হব আমরা মানুষেরাই।

তাই চলুন আমরা বৃক্ষনিধনকে ‘না’ বলি। আগামীর সুস্থ, সুন্দর ও সতেজ পৃথিবী গড়ে তুলতে সবাইকে বৃক্ষরোপণে উৎসাহী করি।

কারিশমা ইরিন


শিক্ষার্থী

বন ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউট

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]