শিয়াল কি প্রতিশোধের রাজনীতি শিখে নিল

পদ্মা নদীর চরে শিয়ালের হামলায় ২০০ গরু-মহিষ আহত হয়েছে।গ্রাফিক্স: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি

পদ্মা নদীর চরের বাথানে একদল শিয়াল গরু-মহিষের ওপরে হামলা করেছে। হামলায় ২০০ গরু-মহিষ আহত হয়েছে। শিয়ালের দল শুধু গরু-মহিষকে জখম করেই ক্ষান্ত হয়নি, দুই কৃষকের ওপরও হামলা করেছে। এ ছাড়া চারজনকে তাড়া করে নদীতে নামিয়েছে।

এ ঘটনা শুনে শৈশবে পড়া শিয়াল পণ্ডিতের রাজনীতি নামের একটি চটি বইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। ওই বইতে পড়েছিলাম, বাঘের ওপর প্রতিশোধ নিতে শিয়াল একবার বাঘের সঙ্গে সন্ধি করেছিল। শর্ত ছিল, তারা কেউ আর মুরগি খাবে না। এ কথা সব মুরগিকে জানিয়ে দেওয়া হলো। মুরগিরাও খুশি। রাতে শিয়ালের দল গৃহস্থের বাড়িতে গিয়ে স্লোগান দেয়, ‘শিয়াল-মুরগা ভাই ভাই, খোপ খোলো মুরগা ভাই।’

মুরগিরা আনন্দের সঙ্গে খোপ খুলে বের হলো, অমনি শিয়ালের দল খপাখপ মুরগি ধরতে লাগল। আর বলতে লাগল আমরা বাঘ। রাতে শিয়ালেরা তাদের ডেরায় মুরগির হাড় চিবোতে লাগল। তখন শব্দ পেয়ে পাশের গুহা থেকে বাঘ জানতে চাইল, কী চিবাচ্ছ তোমরা? শিয়ালেরা বলল, নিজের পা চিবাচ্ছি, মামা। আপনিও চিবাতে পারেন। কাল সকালে আবার নতুন পা গজাবে।

শিয়ালের রাজনীতি বুঝতে না পেরে বাঘ নিজের পা চিবিয়ে খেল আর সারা রাত যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল। সকালে বাঘ বলল, কই আমার পা তো গজায়নি। শিয়ালেরা গিয়ে বলল, কী বলো মামা? আমাদের তো গজিয়েছে। এই তো দিব্যি হেঁটে বেড়াচ্ছি!’

গত ২০ ডিসেম্বর রাতে রাজশাহীর পবা উপজেলার পদ্মা নদীতে জেগে ওঠা একটি চর ষাটবিঘায় অবিশ্বাস্য এ ঘটনা ঘটেছে। এই চরে পাশের খানপুরের লোকজন গরুর বাথান করেছেন। সেখানে সারা দিন চরের মাঠে গরু চরে বেড়ায়। রাতের বেলায় বাথানে রেখে গৃহস্থরা বাড়িতে যান। ২১ ডিসেম্বর ভোরে লোকজনের মাধ্যমে তাঁরা খবর পান, তাঁদের গরু বাথানের বেড়া ভেঙে বেরিয়ে চরের মাঠে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁরা এসে দেখেন, গরুর নাক-মুখ কান ছিঁড়ে ফেলা। নাক-মুখ দিয়ে রক্ত ঝরছে। বাথানে ছয় শতাধিক গরু ছিল।

কৃষকেরা বলছেন, তাঁরা দেখেই বুঝতে পেরেছেন, এটা শিয়ালের কাজ। রাতে হামলার পর সকালেও ছয়টি শিয়াল বাথানের পাশে মহড়া দিচ্ছিল। উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা এসেও সেই শিয়াল দেখতে পেয়েছেন।

শুধু তা–ই নয়, একটি শিয়াল চরের ফেরিওয়ালা আফসার আলী ও তাঁর চাচাশ্বশুর আক্কাস আলীর ওপরে হামলা চালিয়েছে। আফসার আলীর ঠোঁট ছিঁড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। আর আক্কাস আলীর হাতের এক খাবলা মাংস তুলে নিয়ে গেছে।

কৃষক আবুল কালামের কাছে গিয়ে মাটিতে রক্তাক্ত মুখ মুছেছে। আবুল কালাম বললেন, তাকে দেখে শিয়াল কিছুই মনে করছে না। মাটিতে মুখ মুছে চলে গেল। তারপরই চারজন চাষিকে তাড়া করেছে। তারা নদীতে ঝাঁপ দিয়ে বেঁচেছেন।

চাষি মাহমুদ সুজন আলী বলেছেন, গরুর ওপরে হামলার ঘটনার তিন দিন আগে মাঠে তাঁর একটি গরুর বাছুর হয়েছিল, সেই গরুকে তিনটি শিয়াল ঘিরে রেখেছিল। পরে তিনি গিয়ে গরু ও বাছুর উদ্ধার করেন। এখন লাঠি ছাড়া কেউ শিয়ালের ভয়ে মাঠে নামতে পারছেন না।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে খবর নিয়ে জানলাম, এ বছর হাসপাতালে শিয়ালের কামড়ে আহত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে। গত বছর শিয়ালের কামড়ে আহত ১৭৬ জন রোগী রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। গত ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত ১৮৮ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন।

সবাই যখন ভাবছেন, শিয়াল কেন বাঘের মতো আচরণ করছে, তখন চর মাঝারদিয়াড় এলাকার কৃষক আবদুল হান্নান বলেন, শিয়ালের তো কোনো দোষ নেই। হামলার ঘটনার আগের দিন চরখানপুরে দুই রাখাল একটি শিয়াল মেরে ফেলে। চারটি শিয়াল দূরে দাঁড়িয়ে এই দৃশ্য দেখে। ওই দিন রাতেই শিয়ালের দল এসে বাথানে হামলা করেছে। শিয়ালের তো দোষ নেই।

আরও পড়ুন

পবা উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা আবদুল লতিফ জানান, ‘ঘটনা সত্য কি না, জানি না। শিয়ালের হামলার ঘটনার আগের দিন লোকজন বন মহিষ মারতে এসেছিল। তারা নাকি একটি শিয়ালের বাচ্চাও মেরে নিয়ে গেছে। এই ক্ষোভে শিয়াল হামলা চালাতে পারে।’

এসব কাণ্ড দেখে ভাবছি, শিয়াল কি মানুষকে দেখে দেখে প্রতিশোধের রাজনীতি শিখে নিল? কেননা, শিয়াল পণ্ডিতের রাজনীতির বইয়ে গল্পকে আমরা রূপকথাই বলব; কিন্তু গরুর বাথানে ঢুকে ২০০ গরুর ওপরে হামলা চালানোর ঘটনাকেও কি আমরা রূপকথা বলব? এ ঘটনা বোধ হয় রূপকথাকেও ছাড়িয়ে গেছে। কারণ, প্রকৃতিতে সবকিছুই যেন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে। শিয়ালও তো প্রকৃতির সন্তান। সে তার বাইরে যেতে পারবে কেন।

রাজশাহী বন বিভাগের বন্য প্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পরিদর্শক জাহাঙ্গীর কবিরের কথা আমাদের একটি বার্তা দেয়,‘শিয়ালের খাবারের অভাব হলে শিয়াল এ রকম করতে পারে। আবার কেউ বিরক্ত করলে বা তাদের প্রজনন মৌসুমে ওরা এ রকম আচরণ করে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি তাদের প্রজনন মৌসুম।

ভাবলাম, খাবার তো দূরের কথা,আমরা তো শিয়ালের আবাস্থলই ধ্বংস করে ফেলেছি। শিয়াল এখন কী করবে। শিয়াল পণ্ডিতের গল্পে মুরগি ধরতে গিয়ে শিয়াল নিজেদের বাঘ বলে পরিচয় দিয়েছে। এখানে ‘ঠোঁট ছেঁড়া আফসার আলী’ বলেন, শিয়াল একেবারে বাঘের মতন, কোনো ভয় করছে না। আমাদের বোধ হয় সতর্ক হওয়ার সময় এসে গেছে। তা ছাড়া প্রকৃতি হয়তো এমন অনেক ঘটনা ঘটাবে, যা রূপকথাকে হার মানাবে। অর্থনীতিবিদ ম্যালথাসের ভাষায় তখন হয়তো আমরা বলব, ‘এটা প্রকৃতির প্রতিশোধ।’

  • আবুল কালাম মুহম্মদ আজাদ

    নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী

*মতামত লেখকের নিজস্ব