ইতিহাস জানা, না-জানা

ইতিহাস হলো অতীতের মানবীয় ঘটনার বিবরণ। অতীতের ক্রিয়াকর্ম সম্পর্কে সাক্ষ্য-প্রমাণের সাহায্যে অনুসন্ধান করা। আর এর উদ্দেশ্য হলো, সেই ইতিহাস মানুষকে অবহিত করা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে। জাতি এ থেকেই আগামী দিনের পথ চলার দিকনির্দেশনা পায়।

দেড় শ বছর আগে সাহিত্য সম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় দুঃখ করে বলেছিলেন, বাঙালির ইতিহাস নেই। আমরা কিন্তু বলতে পারি, বাংলাদেশের বাঙালিদের ইতিহাস আছে। আছে বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস, একাত্তরের মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের ইতিহাস। হোক তা অসম্পূর্ণ। বিতর্ক থাকতেই পারে কিন্তু সেই ইতিহাস নিয়ে। ই. জি. কলিংউডের ভাষায়, ‘রি-এনাক্টমেন্ট অব পাস্ট এক্সপেরিয়েন্স’-এ হয়তো কমতি আছে। তবু বলি, আমাদের বাংলাদেশের অধিবাসীদের ইতিহাস আছে।

এখন প্রয়োজন, দেশের সব মানুষের সে ইতিহাস জানা। আমাদের ইতিহাসে জ্ঞানের যে অভাব তার এন্তার প্রমাণ রয়েছে। দেশের মানুষের বড় দুটি ঘটনা ভাষা আন্দোলন কিংবা স্বাধীনতাযুদ্ধের বিষয়ে ধারণা অস্পষ্ট। আমি সমাজের শীর্ষ পর্যায়ের লোকদের কাউকে কাউকে ’৭১-এর স্বাধীনতাযুদ্ধের বছরকে ‘গন্ডগোলের বছর’ সম্বোধন করতে শুনেছি। এ ধরনের অজ্ঞতা শিক্ষক-শিক্ষার্থী, শিক্ষিত-নিরক্ষরভেদে দেশের বহু মানুষের মধ্যে রয়েছে।

দক্ষিণ এশিয়ার ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এই গাঙ্গেয় ভূখণ্ডের মানুষেরা স্বাধীনতাযুদ্ধ করেছিল। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য একটাই—দীর্ঘকাল ধরে গড়ে ওঠা আমাদের যে গৌরবময় অতীত আছে, ঐতিহ্য আছে, অর্থনৈতিক পরিকাঠামো আছে, নিজস্ব যে জীবনাচরণ সংস্কৃতি আছে, তা বাঁচানো ও সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করা। আমাদের ভাষা-সাহিত্য-সংগীত-নাটক হবে আমাদের জল-হাওয়ার সঙ্গে সম্পর্কিত। বিজ্ঞান-প্রযুক্তির অগ্রযাত্রার যুগে সবকিছু যেন হারিয়ে না যায়। বরং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারি। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের জন্ম তো সে জন্যই।

৪২ বছর ধরে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। ইপ্সিত লক্ষ্যে বাংলাদেশ পৌঁছাতে পারেনি। অধিকন্তু ক্রমান্বয়ে দেশটি একটি অবাসযোগ্য রাষ্ট্রে পরিণত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত দেখছি, আমরা দেশের মানুষের মানবিক মূল্যবোধ ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে, মুখ থুবড়ে পড়ছে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা, অর্থনৈতিক অবস্থাসহ রাষ্ট্রীয় সব কর্মকাণ্ড।

দেশের এ অবস্থা কি চলতেই থাকবে? সবকিছুরই তো শেষ আছে। দেশের প্রতি দেশবাসীর ভালোবাসা তৈরির তাগিদ দিয়েছেন দেশের অভিজ্ঞজনেরা। তাঁরা বলছেন, দেশের প্রতি ভালোবাসা তৈরি করতে হলে দেশকে ভালো করে জানতে হবে সবাইকে।

আমরা লক্ষ করেছি, বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার জাতীয় শিক্ষানীতিতে বাংলাদেশ অধ্যয়ন (বাংলাদেশ স্টাডিজ) সংযোজন করেছে। মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের ‘বাংলাদেশ অধ্যয়ন’ বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। আমরা বলব, এটি সরকারের বিগত পাঁচ বছরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি সফল উদ্যোগ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষার্থীরা অধ্যয়ন-জীবন শেষ করে কর্মজীবনে ঢুকবে অথচ দেশকেই জানবে না, ঐতিহ্যকে জানবে না, ভূগোল-অর্থনীতি-সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে জানবে না, আন্দোলন-সংগ্রামের কথা জানবে না, তা তো হয় না। বিভিন্ন গণমাধ্যমেও বিষয়টি এসেছে। শুধু মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকই নয়, একেবারে প্রাথমিক স্কুল থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সর্বস্তরে, ‘বাংলাদেশ অধ্যয়ন’ বিষয়টি বাধ্যতামূলক করার। সেখানে মতামত ব্যক্ত করা হয়েছে সরকারি-বেসরকারি সব বিশ্ববিদ্যালয়ে তো বটেই, চিকিৎসাশাস্ত্র এবং বিজ্ঞান-প্রযুক্তির মতো একাডেমিক ডিসিপ্লিনেও কোনো একপর্যায়ে ওই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করার। আরও একটি প্রস্তাব এসেছে—বাংলাদেশ অধ্যয়নের অংশ হিসেবে সব বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস, ভূগোল, নৃতত্ত্ব, প্রত্নতত্ত্ব, ফোকলো, শিল্পকলার মতো বিষয় সংযোজন করা। এতে করে দেশের অতীত চর্চার ক্ষেত্র সম্প্রসারিত হবে।

ইতিহাসের অধীত জ্ঞান আমাদের নতুন করে পথ দেখাবে, সংকট দূর হবে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি উদ্ধৃতি দিয়ে শেষ করছি:

আমারই চেতনার রঙে পান্না হল সবুজ / চুনি উঠল রাঙা হয়ে

আমি চোখ মেললুম আকাশে / জ্বলে উঠল আলো / পুবে পশ্চিমে।

ড. সাইফুদ্দীন চৌধুরী: গবেষক। অধ্যাপক, ফোকলোর বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।