
কবি ফজল শাহাবুদ্দীন পৃথিবী ছেড়ে চলে গেলেন ৯ ফেব্রুয়ারি। পঞ্চাশের দশকে বাংলাদেশে যে কজন কবির শুভ আবির্ভাব, তাঁদের মধ্যে তিনি একজন। কবি শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হাসান হাফিজুর রহমান—তাঁদের সঙ্গে তিনিও। কিন্তু কেমন যেন নীরব। পাদপ্রদীপের নিচে।
কবিকণ্ঠ কখনো থেমে যায়নি। লিখেছেন অনেক, আমৃত্যু কবিতার সাধনা করেছেন। তবে অতি সংগোপনে। তিনি প্রচারবিমুখ। সভা, সমিতি ও সেমিনারে তাঁর বিচরণ কম। বাণী, উপদেশ ও মুখবন্ধ লেখা তাঁর স্বভাব নয়। একজন খাঁটি কবি। কবিতার কথার আসনখানি তিনি পাতেন পথের মধ্যে, সবার জন্য। এ যেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের গানের কলি, ‘আমি গানের সুরের আসনখানি পাতি পথে’।
কবি ফজল শাহাবুদ্দীনকে আমি দেখেছি আমার স্কুলজীবন থেকে, সেই ষাটের দশকে, ৪০ বছরেরও বেশি। দেখা যে নিয়মিত হতো তা নয়, তবে তাঁর নাম শুনলে পুরোনো সেই স্মৃতির কথা মনে পড়ে যেত। তাঁর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিলেন প্রয়াত মীজানুর রহমান, যাঁর মীজানুর রহমানের ত্রইমাসিক পত্রিকা এবং আরও কিছু কালজয়ী গ্রন্থ যেমন বৃক্ষ, গণিত—এগুলো অমর কীর্তি হয়ে থাকবে। কবি ফজল শাহাবুদ্দীনের আরও কিছু বন্ধুর সঙ্গে আমার স্বল্প পরিচয় আছে। তাঁদের সবার মধ্যে কবি ফজল শাহাবুদ্দীন এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।
বিদগ্ধ এই কবির শাণিত বক্তব্য সমাজকে আশার আলো দেখিয়েছে। বাংলা কবিতার জগৎকে করেছে ব্যঞ্জনাময়। সৈনিকের মতো তিনি নাড়া দিয়েছেন আমাদের সমাজের, আমাদের মানসের কতগুলো কৃত্রিম ও অনিষ্টকারী ভিত্তিকে। সমাজের অবিচার, অনৈতিক কাজ, এমনকি সন্ত্রাসের মতো দুষ্ট ক্ষতকেও তিনি কবিতার ভাষায় শাণিত কৃপাণ দিয়ে করেছেন কঠোর আঘাত।
মহান ভাষা আন্দোলনের ফেব্রুয়ারি মাসের ১৪ তারিখ এই গুণীজনের জন্ম। তাই ফেব্রুয়ারি ও ফাল্গুনের এই অবিনশ্বর দিনগুলোয় রক্তিম আভায় উদ্ভাসিত ছিল তাঁর জীবন। কবিতার মাধ্যমে ফাল্গুনের রঙে রাঙিয়েছিলেন আমাদের হূদয়। আগামী প্রজন্মের জন্য তাঁর কবিতা দিকনির্দেশনার কাজ করবে। তাঁর কবিতা ‘সন্ত্রাসের কাছে’তে তিনি বলছেন—
‘আত্মহননের পথে আজ যাচ্ছে কেন আমার সন্তান
একদিন যে তরুণ গেয়েছিল স্বদেশের গান
ঢেলেছিল তাজা রক্ত রাজপথে ঘাসে আর প্রান্তরের ফুলে
আজ কার ভুলে সেই ছেলে অন্ধ এক নির্মম অস্ত্রের কাছে।’
আমাদের সমাজের তরুণদের আগের দীপ্ত ভূমিকা আজ অশুভ দিকে ধাবিত হচ্ছে, এমনই চিত্র এত সুন্দর করে বোধ করি কেউ কবিতায় আর তুলে ধরেননি।
নিভৃতচারী এই কবি পার্থিব সম্পদের পেছনে কখনো ছোটাছুটি করেননি। ঢাকার অভিজাত এলাকায় নয়, বাসাবোর সাধারণ এলাকায় ‘নিভৃতি’ নামের গৃহে তিনি নীরবেই কবিতার সাধনা করেছেন।
ফাল্গুনের কবি চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর কবিতা আমাদের হূদয়ে গ্রন্থিত থাকবে চিরকাল। কবির প্রতি জানাচ্ছি আমার অগাধ শ্রদ্ধা এবং প্রার্থনা করছি তাঁর আত্মার শান্তির জন্য।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ
সাবেক গভর্নর, বাংলাদেশ ব্যাংক।