
ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বাংলাদেশিদের গুলি করার পর বেশির ভাগ সময়ই যে অভিযোগের কথা বলে তা হলো, গরুর অবৈধ ব্যবসায়ী ছিল বলে গুলি করা হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচের দক্ষিণ এশিয়ার পরিচালক মীনাক্ষী গাঙ্গুলি ২০১০ সালে মানবাধিকার দিবসের প্রাক্কালে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী কর্তৃক বাংলাদেশ সীমান্তে মাত্রাতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় বলেন, বিএসএফ গত দশকব্যাপী গরুর অবৈধ ব্যবসায়ী সন্দেহে নির্বিচারে গ্রামবাসীর ওপর গুলি করেছে এবং গরুর অবৈধ ব্যবসায়ীদের গ্রেপ্তার করার পরিবর্তে বিএসএফের সদস্যরা তাদের গুলি করে হত্যা করছেন। অন্যদিকে বিএসএফের সদস্যরা দাবি করেন, তাঁরা আত্মরক্ষার্থে গুলি ছোড়েন। কিন্তু পুলিশি প্রতিবেদন অনুযায়ী, গরু ব্যবসায়ীদের কাছে ঘাস কাটার কাস্তে আর লাঠি ছাড়া এমন কিছু পাওয়া যায় না, যা দ্বারা বিএসএফের সদস্যদের প্রাণনাশ করা যায়।
গরুর ব্যবসা বৈধ করা হলে এই সমস্যার আপাতসমাধান পাওয়া যাচ্ছে বলে মনে হয়। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর সাবেক মহাপরিচালক ই এন রামমোহন ২০১১ সালে বাংলাদেশে এক সেমিনারে বলেন, গরুর ব্যবসা যদি আনুষ্ঠানিক করা হয়, তাহলে সীমান্ত হত্যা কমে আসবে। তিনি দুই দেশকে এ বিষয়ে আলোচনায় বসারও অনুরোধ করেন। কিন্তু ধর্মীয় সংবেদনশীল হওয়ায় ভারতের রপ্তানিনীতি অনুযায়ী গরু রপ্তানি করা ‘সীমিত’ (রেসট্রিকটেট) করা হয়েছে। ভারতের রপ্তানিনীতি অনুযায়ী কোনো পণ্য ‘সীমিত’ মানে হলো সঠিক লাইসেন্সের মাধ্যমে তা রপ্তানি করা যাবে। আর কোনো পণ্য ‘নিষিদ্ধ’ (প্রহেবিটেড) মানে হলো, কোনো অবস্থাতেই তা রপ্তানি করা যাবে না। এমনই একটি ‘নিষিদ্ধ’ পণ্য হলো গরুর গোশত। এমনকি ভারতীয় সংবিধানের ৪৮ ধারা অনুযায়ী, গরুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব; মানে হলো, গরু জবাই করা যাবে না। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি অধিদপ্তরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২ সালে ভারত পৃথিবীর প্রধান গোশত রপ্তানিকারক দেশের মর্যাদা পেয়েছে। বেশির ভাগ মহিষের গোশত হলেও গরুর গোশত ছিল উল্লেখযোগ্য পরিমাণ।
২০০৪ সালে ভারতীয় ইতিহাসবিদ ডি এন ঝা তাঁর বিতর্কিত লেখা দ্য মিথ অব দ্য হলি কাউ-এ যুক্তি দেখান, যে সময়ে হিন্দু ধর্মের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থগুলো প্রকাশিত হয়েছিল, তখনো ভারতে মানুষ গরুর গোশত খেত। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য ইনডিপেনডেন্টে এনড্রিউ বানকম্ব মন্তব্য করেন, গরু ভারতে ডানপন্থী হিন্দুত্ববাদের রাজনৈতিক ক্ষমতারও একটি উৎস। যা-ই হোক, বিতর্কিত বিষয় বাদ দিলে যেটি পরিষ্কার তা হলো ‘নিষিদ্ধ’ পণ্য (গরুর গোশত) যদি রপ্তানি করা যায়, তাহলে ‘সীমিত’ পণ্য (গরু) রপ্তানির সিদ্ধান্ত নিয়ে সীমান্তে মানুষ হত্যার একটি কারণ বন্ধ করার উদ্যোগ কি নেওয়া যায় না?
২৬ মে ২০১৩ তারিখে নিউইয়র্ক টাইমস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, অপরাধ চক্রের সদস্যরা দিল্লির রাস্তায় ঘুরে বেড়ানো ৪০ হাজারের মতো গরু একসঙ্গে করে তা মহানগরের অদূরে অবস্থিত গ্রামের অবৈধ কসাইখানাগুলোতে বিক্রি করে দেয়। অন্ধ্র প্রদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে প্রতিবেদনে বলা হয়, শুধু এই প্রদেশেই তিন হাজার ১০০ অবৈধ কসাইখানা আছে। দ্য হিন্দু পত্রিকার প্রতিবেদন অনুযায়ী (২২ এপ্রিল ২০১৩) অন্ধ্র প্রদেশের ৬৪টি জেলার মধ্যে শুধু একটি জেলার এক বাজার থেকেই বছরে ২৮ হাজার গরু জবাই করার জন্য বিক্রি করা হয়।
ভারতের নীতিতে অসামঞ্জস্যও রয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে সরকারিভাবে গরু রপ্তানি না করলেও, গরু চোরাচালান বন্ধের বিষয়টি ভারত এড়িয়ে চলেছে। গরুর ব্যবসা অবৈধভাবে হলে আরও একটি মারাত্মক সমস্যা সৃষ্টি হয়। গরুর অবৈধ ব্যবসায়ীরা কাঁটাতারের বেড়া ধ্বংস করে চোরাচালান করে থাকেন, যা পরবর্তী সময়ে অবৈধ অভিবাসনের সুযোগ তৈরি করে দেয়। অবৈধ অভিবাসন বিষয়টি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি ক্ষত হিসেবে কাজ করে। সারা ভারতে শুধু পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় গরু জবাই আইনত বৈধ। বাংলাদেশের সঙ্গে গরু ব্যবসা বৈধ করলে পশ্চিমবঙ্গ দিয়েই বেশির ভাগ গরু রপ্তানি হবে। কারণ, মেঘালয় টাইমস-এর ৩০ জুলাই ২০১৩ সালের সম্পাদকীয় কলামে বলা হয়, শুধু পশ্চিমবঙ্গেই ৬৮টি চোরাচালান করিডর ও ১৪৯টি চোরাচালান সংবেদনশীল গ্রাম রয়েছে।
চলতি বছরের ১৩ আগস্ট দিল্লির অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন একটি গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করে। সেখানে বক্তরা গরু ব্যবসার এই বাস্তবতা মেনে নেওয়ার পক্ষে মত দেন। ভূ-বাস্তবতার কারণেই বাংলাদেশ ও ভারতকে পরস্পরের বন্ধু হিসেবে থাকতে হবে। এর কোনো বিকল্পও নেই। তাই দুই দেশকেই পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো দেখতে হবে। বাংলাদেশে গরু একটি অত্যাবশকীয় পণ্য। ভারতে গরুর চাহিদা কম হলেও বাংলাদেশে খাদ্যনিরাপত্তার পাশাপাশি কৃষিকাজের জন্য এখনো গরুর ব্যবহার অনস্বীকার্য। তা ছাড়া সিরামিক পণ্য ও চামড়া রপ্তানির ক্ষেত্রেও গরু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
এই প্রেক্ষাপটে এটি দুই দেশের স্বার্থেই গুরুত্বপূর্ণ। এখানে মূল সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে চোরাকারবারি শক্তি এবং তাদের কাছ থেকে যারা লাভবান হয়, সেই সব প্রভাবশালী ব্যক্তি। তারাই এটির বৈধকরণের পেছনে বড় বাধা। গরু যে রপ্তানি হচ্ছে, এটি সবারই জানা। ব্রিটিশ সংবাদপত্র দ্য ইনডিপেনডেন্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিবছর ১৫ লাখ গরু অবৈধভাবে চোরাচালান হয়। এর মধ্যে বাংলাদেশে আসে সাত লাখ গরু। পার্থক্য হলো, এখন এই বার্ষিক ৫০০ মিলিয়ন ডলারের ব্যবসা থেকে বাংলাদেশ বা ভারত রাষ্ট্রীয়ভাবে কেউই লাভবান হতে পারছে না কিছু ব্যক্তি ছাড়া। কিন্তু এই ব্যবসাকে বৈধ করা হলে একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয়ভাবে দুই দেশই আয় করতে পারে, তেমনি মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে গরুর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাও সহজতর হয়, যা চোরাচালানের সময় সম্ভব নয়।
খলিলউল্লাহ্: সহকারী সম্পাদক, প্রতিচিন্তা।
[email protected]