গ্রামীণ ব্যাংক, আওয়ামী লীগ আর সোনার ছেলেরা

বিমান থেকে চট্টগ্রামে নেমেই পরিচিত কয়েকজনের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে মনে হলো, তাঁরা শুধু বিরক্তই নন, কেউ কেউ আমার ওপর ক্ষুব্ধও। কারণ জানতে চাইলে বলেন, গ্রামীণ ব্যাংক আর আওয়ামী লীগের সোনার ছেলেদের কারণে দলটির যে বারোটা বাজছে, তা কি তারা বুঝতে পারছে না? তাঁদের ধারণা, আমি আওয়ামী লীগের গোঁড়া সমর্থক এবং তাদের পক্ষে লেখালেখি করি। সুতরাং, এ বিষয়ে কেন আমি কিছু লিখছি না। গ্রামীণ ব্যাংক নিয়ে বর্তমান বিতর্কের শুরুর দিকে একটি কলাম লিখেছিলাম। তা পড়ে আমার কজন সুহূদ ফোন করে জানিয়েছিলেন, আমি নাকি কোন পক্ষে লিখেছি, তা তাঁরা বুঝতে পারেননি। তাঁদের বলেছি, আমি কোনো পক্ষ নিয়ে লিখিনি, তবে কিছু তথ্য শেয়ার করেছি। মনে হলো না তাঁরা আমার কথায় তেমন গুরুত্ব দিলেন।
তারও আগে মুহাম্মদ ইউনূস, যাঁকে তাঁর অন্য ভাইদের মতো আমিও মেজো ভাই বলে সম্বোধন করি, তিনি যখন নোবেল পুরস্কার পেলেন তখন তাঁকে অভিনন্দন জানিয়ে লিখেছিলাম। আবার তিনি যখন নিজে একটি রাজনৈতিক দল গঠনের ঘোষণা দিলেন, তখন তাঁর এ সিদ্ধান্তের সমালোচনাও করেছিলাম। ব্যক্তিগতভাবে আমি গ্রামীণ ব্যাংক ধারণার তেমন একটা সমর্থক না হলেও তা নিয়ে কোনো কিছু লেখা থেকে বিরত থেকেছি। তার কারণ, যাঁকে তামাম বিশ্ব ক্ষুদ্রঋণ বা এ ব্যাংকের জন্য সম্মান দিয়েছে এবং এখনো দিচ্ছে তাঁর সম্পর্কে আমার কিছু লেখা একধরনের বালখিল্যতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যেহেতু একসময় মুহাম্মদ ইউনূসের এবং আমার কর্মক্ষেত্র একই বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল এবং তাঁর সঙ্গে কয়েকটি শিক্ষক পর্ষদে একাধিক নির্বাচনও করেছি, তাঁকে খুব কাছ থেকে দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত পরিচয় ১৯৭২ সালে, যখন তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে বাংলাদেশের প্রথম পরিকল্পনা কমিশনে একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর ভাইদের সঙ্গে পরিচয় আরও অনেক আগে থেকে। আমার মা বলেন, মুহাম্মদ ইউনূসের বড় বোন আর মা স্কুলে একই ক্লাসে পড়তেন। মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে এখনো কোথাও দেখা হলে আপন ভাইয়ের মতো জড়িয়ে ধরে কথা বলেন, কুশলাদি জানতে চান। সুতরাং, তাঁর সম্পর্কে বিতর্কে জড়াতে কখনো উৎসাহ বোধ করিনি। এসব কারণে আবার তাঁর সমালোচকদের কেউ কেউ আমাকে সুবিধাবাদী হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের বলেছি হয়তো কখনো কখনো সুবিধাবাদী হওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।
সেদিন সচিবপর্যায়ের একজন সাবেক সরকারি কর্মকর্তা ফোন করে আমাকে বেশ ক্ষোভের সঙ্গে বললেন, আওয়ামী লীগের এ মেয়াদে তাদের অনেক বড় বড় অর্জন আছে কিন্তু যে কারণেই হোক স্বপ্নের পদ্মা সেতু তো হলো না। তাই বলে গ্রামীণ ব্যাংককে কেন ভেঙে টুকরা টুকরা করতে হবে? তাঁকে বলি, কই, টুকরা টুকরা করার সিদ্ধান্ত তো হয়নি। গ্রামীণ ব্যাংক তদন্ত কমিশন তিনটি সুপারিশ করেছে এবং বলেছে, সে সুপারিশগুলো নিয়ে আলোচনা হবে। আর মুহিত সাহেব তো বলেছেন সেই আলোচনায় মুহাম্মদ ইউনূসকেও আমন্ত্রণ জানাবেন। তাহলে সমস্যা কোথায়? তিনি বলেন, সিদ্ধান্ত যা-ই হোক, ভুললে চলবে না, গ্রামীণ ব্যাংকের ৮৪ লাখ সদস্য আছেন এবং তাঁরা সবাই এ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতার পেছনে কাতারবন্দী। তিনি আরও বললেন, মুহাম্মদ ইউনূসের বয়সের ব্যাপারটা নিয়ে যে বিতর্কের শুরু তা তো আরও ভালোভাবে নিষ্পত্তি করা যেত, তা কেন হলো না?
তাঁর সঙ্গে দ্বিমত করি কীভাবে? এ কথাই আমি শুরুতে লিখেছিলাম। অনেকে এমনও মন্তব্য করেন, মুহাম্মদ ইউনূস রাজনৈতিক দল করতে চেয়েছিলেন বলে সম্ভবত তাঁর ওপর শেখ হাসিনার এত ক্ষোভ। মুহিত সাহেব যতই বলেন মুহাম্মদ ইউনূস একজন বড় রাজনীতিবিদ, আমার দৃষ্টিতে তিনি একজন বিশ্ববরেণ্য ব্যক্তি বটে, কিন্তু কখনো আওয়ামী লীগের মতো একটি বৃহৎ দলের প্রতিদ্বন্দ্বী হতে পারেন না। বুধবার গ্রামীণ ব্যাংক কর্মচারী সমিতি সভা করে বলেছে, তদন্ত কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন হলে তারা আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কাজ করবে। তবে তারা এটা বলেনি কার পক্ষে কাজ করবে। তবে বুদ্ধিমান আইনজীবী মওদুদ আহমদ পুরো বিষয়টাকে লুফে নিয়ে বলেছেন, ভবিষ্যতে বিএনপি ক্ষমতায় গেলে তাঁরা গ্রামীণ ব্যাংককে সম্পূর্ণ স্বায়ত্তশাসনসহ ব্যাংকটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেবেন। এরই মধ্যে দলের শীর্ষস্থানীয় নেতারা গিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসকে তাঁদের চেয়ারপারসনের অভিনন্দন জানিয়ে এসেছেন। একেই বলে রাজনীতি, যা বুঝতে আওয়ামী লীগ অক্ষম। ব্যাপারটা এমন দাঁড়াল, হেফাজতে ইসলামও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে, গ্রামীণ ব্যাংকের ৮৪ লাখ সদস্যও তাদের বিপক্ষে, কর্মচারীরা ঘোষণা দিয়েছেন তাঁরা সামনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কাজ করবেন, দেশের মিডিয়ার একটি বড় অংশ আর সুশীল সমাজ চায় না আওয়ামী লীগ আবার সরকারে ফিরুক, দলের সোনার ছেলেদের অপকর্মের কারণে দলনিরপেক্ষ ভোটাররাও এখন বিপক্ষে, দলের ভেতর থাকা কোন্দলপ্রিয় দলীয় নেতা-কর্মীরা দলের বিরুদ্ধে কাজ করছেন, একদা আওয়ামী লীগ করতেন, এখনো গায়ে মুজিব কোট, তাঁরা প্রতি রাতে টিভির বিভিন্ন টক শোতে আওয়ামী লীগের চৌদ্দগুষ্টি উদ্ধার করেন, মুহাম্মদ ইউনূসের প্রতি সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলও বর্তমান সরকারের ওপর অসম্ভব রকমের বিরক্ত। এত সব বোঝা নিয়ে আওয়ামী লীগ সামনের নির্বাচনের লড়াইয়ে কীভাবে পার পাবে?
এ সমস্যার সমাধান কেমন করে হতে পারে? হয়তো সামান্য একটি উদ্যোগ দিতে পারে এ প্রশ্নের উত্তর। উদ্যোগটা প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকেই আসতে হবে। মুহাম্মদ ইউনূস একাধিকবার অভিযোগ করেছেন, তিনি চেষ্টা করেছেন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে তাঁকে পুরো বিষয়টা বুঝিয়ে বলতে। সফল হননি। প্রধানমন্ত্রী প্রতিদিন কত মানুষের সঙ্গেই তো দেখা করেন, আমাদের একমাত্র নোবেল বিজয়ীর সঙ্গে কিছু সময় কাটালে কী এমন মহাভারত অশুদ্ধ হতো? এ ব্যাপারে যাঁরা তাঁকে বুদ্ধি-পরামর্শ দিচ্ছেন, বুঝতে হবে তাঁরা তা তাঁর বা দলের মঙ্গলের জন্য দিচ্ছেন না। মুহাম্মদ ইউনূস যেদিন নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হলেন, তার দুদিন পর তাঁকে নাগরিকদের পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে একটি বড় সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছিল। সেখানে একমাত্র বড় রাজনৈতিক দল যেটি বিশাল এক ফুলের তোড়া নিয়ে অভিনন্দন জানাতে গিয়েছিল, সেটি হচ্ছে তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ। মঞ্চে তখন মুহাম্মদ ইউনূস আমার সঙ্গে কথা বলছিলেন। আবদুল জলিলকে দেখে তিনি আগ বাড়িয়ে তাঁকে টেনে হাত ধরে স্টেজে তুলে ফুলের তোড়াটি নিয়ে গলাগলি করলেন। দুর্ভাগ্য সেই গলাগলি এখন অনেকটা গালাগালিতে পরিণত হয়েছে, যা কখনো কাঙ্ক্ষিত হতে পারে না, অন্তত দলের স্বার্থে। এসবই হয়তো ছোট মুখে বড় কথা। তার পরও আওয়ামী লীগের একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে এসবের পরিবর্তন করতেই তো পারি।
সোনার ছেলেদের নিয়ে দেখি চট্টগ্রামের মানুষ দারুণ ক্ষুব্ধ। গত সোমবার রেলওয়ের টেন্ডার নিয়ে চট্টগ্রামের সিআরবি ভবনে (রেল ভবন) এই সোনার ছেলেরা গোলাগুলি করে আট বছরের এক শিশুসহ দুজনকে হত্যা করেছে। দ্বিতীয়জন যুবলীগের একজন কর্মী। এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত সন্দেহে পুলিশ ৫২ জনকে গ্রেপ্তার করেছে, যাঁদের মধ্যে ৪৪ জনকে এক দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। নগরের মানুষ বলছেন যেখানে সামান্য একটি চুরির মামলায় একজনের চার-পাঁচ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়, সেখানে খুনখারাবির জন্য মাত্র এক দিনের রিমান্ড? তাঁদের বলি, ভাই এটি আদালতের এখতিয়ার। এর বেশি কিছু বললে আদালত অবমাননা হতে পারে। আবার অন্য আরেক বিপদ। একবার এই সোনার ছেলেদের নিয়ে যৎসামান্য লিখলে তারা আমাকে আমার আগের কর্মক্ষেত্রে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেছিল। এবার লিখলে হয়তো আমাকে আমার শহরেই অবাঞ্ছিত ঘোষণা করতে পারে। আমার যাওয়ার আর কোথাও জায়গা নেই।
তবে সরকারের শেষ মুহূর্তে এসে সোনার ছেলেদের এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে হলে সারা দেশে জরুরি ভিত্তিতে শুদ্ধি অভিযান চালানোর কোনো বিকল্প নেই বলে মত দিয়েছেন অনেকেই। বলেছি, তাঁদের এ মন্তব্য হয়তো আমি লিখব, তবে আমার কথা কেউ যে শুনবেন তার নিশ্চয়তা কোথায়? তাঁরা বলেন, না শুনলে যাঁদের খেসারত দেওয়ার তাঁরা ঠিকই খেসারত দেবেন। তবে একটা কথা না বললেই নয়। অন্তত এ সরকারের আমলে এই সোনার ছেলেদের অনেককেই তো সন্ত্রাস সৃষ্টির কারণে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাংলাদেশে এটি ব্যতিক্রমী ঘটনা। আগে এমনটি ঘটেছে বলে মনে পড়ে না। তবে গ্রেপ্তারেই বিষয়টা শেষ হওয়া উচিত নয়, বিচারে যেন সবার উপযুক্ত শাস্তি হয়।
 আবদুল মান্নান: সাবেক উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।