নদীভাঙা অসমীয়দের আসামিজীবন

আসামের নদীভাঙা চরুয়াদের জীবন নদীর মতোই—চির বেদেজীবন। তারা দেশ গড়ে তোলে, তবু তাদের অপর তরফ বানিয়ে আসামের দেয়ালে দেয়ালে লেখা হয়: ‘মিঞারাই অসমখান খেল’, ‘পিন্দে লুঙ্গি চোরর বেশ, বল মিঞা বাংলাদেশ’। আসাম সরকার জানিয়েছে, এই মিঞার সংখ্যা ৪০ লাখ। এই মিঞাদের মধ্যে আছেন ভারতের পঞ্চম রাষ্ট্রপতি ফকরুদ্দীন আলী আহম্মদের পরিবার থেকে অজস্র সরকারি চাকুরের পরিবার। এই অর্ধকোটি মানুষের জন্য বরাদ্দ হয়েছে ডিটেনশন ক্যাম্প। শুরু হয়েছে তাঁদের জেলে ঢোকানোর পালা। আর ৪০ লাখের বাইরে যাঁরা আছেন, তাঁরা মাথায় নিয়ে ঘুরবেন অবৈধ হয়ে যাওয়ার চিরস্থায়ী আতঙ্ক। তাড়া খাওয়া ফেরারি হয়ে মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, দিল্লি, রাজস্থান, যেখানেই তাঁরা যান না কেন, তাঁদের দেখা হবে অন্য চোখে।
ইতিহাস বলছে, আজকের আসাম যেমন আসাম ছিল না, তেমনি ছিল না বাংলাদেশও। তিস্তা-ব্রহ্মপুত্র সংগম থেকে শুরু করে হিমালয়ের পাদদেশ পর্যন্ত কোচ রাজ্য বা প্রাগজ্যোতিষ রাজ্য ছিল। সেই রাজ্যের অতি ক্ষুদ্র অংশ কুড়িগ্রাম-রংপুরটুকু কেটে নিয়ে যখন বাংলাদেশে ঢোকানো হলো, তখন কোচ-রাজবংশী জাতির মুসলমান অংশটি হয়ে গেল বাঙালি। ডব্লিউ ডব্লিউ হান্টারের ‘স্ট্যাটিস্টিক্যাল অ্যাকাউন্ট অব গোয়ালপাড়া’ থেকে জানা যায়, ১৮২২ সালে রংপুর জেলা থেকে আলাদা করে প্রথমে গোয়ালপাড়া জেলা গঠিত হয় (পৃষ্ঠা ৩২-৩৪ )। আসামে তখন মান বংশের রাজত্ব। এর পরের বছরই ডেভিট স্কটের নেতৃত্বে কোম্পানি সৈন্যরা কামরূপ থেকে কলিয়ার পর্যন্ত দখল করে। কোঁকড়াঝাড়, বঙাইগাঙ, গোসাঁইগাঁও ও বিজনী অঞ্চলকে কোচ রাজ্য থেকে কেড়ে নিয়ে গোয়ালপাড়া জেলার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। গোয়ালপাড়াকে আসাম প্রদেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সে সময় গোয়ালপাড়া জেলার মোট জনসংখ্যা ছিল ৪ লাখ ৭ হাজার ৫৯৭ জন। এর মধ্যে বাঙালি ছিল ১ লাখ ৯৫ হাজার ৯১৭ জন, কোচ ১ লাখ ১৮ হাজার ৯১ জন আর বাকিরা ছিলেন কছারি, রাভার, জেলে-কৈবর্ত ও কলিতার।
১৮৭১ সালের আদমশুমারির সময় আসামের মোট জনসংখ্যা ছিল ২১ লাখ থেকে সামান্য বেশি। তার মধ্যে লক্ষাধিক জনসংখ্যা থাকা জাতি ও গোষ্ঠী ছিল মাত্র ৩টি—কোচ-রাজবংশী, কছারি ও মুসলমান। এদের জনসংখ্যা ছিল যথাক্রমে ২ লাখ ৯৯ হাজার ৩৪৬ জন, ২ লাখ ৫৮ হাজার ৮১০ ও ২ লাখ ৫০ হাজার ৪৭০ জন। মুসলমানরা আসামে আসার অনেক পরে এসেছেন উচ্চবর্ণের হিন্দুরা।
আসামের শিকারজীবী আদিবাসী জনগোষ্ঠী কৃষিকাজ করতে অনাগ্রহী থাকায় চর ও নদ-নদী এবং পার্শ্ববর্তী জলা ও জঙ্গল আবাদ করে কোচ-রাজবংশী ও বাঙালরা। এই ঐতিহাসিক কারণেই ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের কালে আসামকে পূর্ব বাংলার সঙ্গে যুক্ত করা হয়।
অর্থাৎ, নদী ও সমভূমির কৃষিজীবীরা ভূমির সন্ধানে তীর ধরে ধরে উজানে আসামের ও-মাথায় গিয়ে পৌঁছেছে, তেমনি পাহাড়ি মিজো-নাগারাও শিকারের পথ ধরে বঙ্গোপসাগরের উপকূল এসে পড়েছে। কিন্তু জাতিরাষ্ট্র ও সার্বভৌমত্ব দিয়ে আসামে ও আরাকানে বাঙালি মুসলমান জনগোষ্ঠীকে রাজনৈতিক অধিকারহীন করে জীবের জীবনে ঠেলে দেওয়া হয়েছে।

২.
ইসমাইল হোসেন তাঁর ‘চর-চাপারির জীবন চর্যা’ নামের অসমীয় পত্রিকায় লিখেছেন, ‘ব্রহ্মপুত্রের বন্যা নিয়ন্ত্রণ আয়েগের ১৯৫৪ থেকে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত সংগ্রহ করা তথ্যের ভিত্তিতে জানা যায়, প্রতিবছর গড়ে ২৫৩টি গ্রাম এবং প্রায় ৮ হাজার ৯১ হেক্টর ভূমি ভাঙনের কবলে পড়ে।...১৯৫০ থেকে ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত কামরূপ, নলবাড়ি ও বরপেটা জেলার নদী তীরবর্তী অনেকগুলো শস্যশ্যামলা গ্রাম ভাঙনের কবলে পতিত হয়েছে। কিন্তু এই সম্পর্কে কোনো সরকারি তথ্য পাওয়া যায় না।’
ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোর মধ্যে বরপেটা অন্যতম। জেলাটির পূর্বে আসামের রৌমারী থেকে নগদে লুপ্ত তারাবারি পর্যন্ত, চেনিমারী, চেংলিদিয়া, বালিধারি, যাত্রাদিয়া, বরদিয়া, আটিয়া, কলতলিসহ অনেক শস্যশ্যামলা জনপদ এখন নাই হয়ে গিয়েছে। অথচ বরপেটার পূর্বাঞ্চলের দরজা তারাবারি ছিল উল্লেখযোগ্য বন্দর। একসময়ের প্রসিদ্ধ জাহাজঘাট ছিল এখানকার খোলাবান্ধা, বর্তমানে তা কয়েকটি চরের সমষ্টিমাত্র। শুধু বরপেটা জেলাতেই গত ৫০ বছরে ৮০টির মতো গ্রাম ব্রহ্মপুত্রে ভেসে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৪০ হাজারের অধিক পরিবার। ধুবড়ি জেলার শালমারার ২০১টি গ্রামের মধ্যে ১৩৫টি নাই হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর তথ্য কোথাও পাওয়া যায়নি। এই ঠিকুজিহারা লোকজনের তথ্য কোথাও থাকে না। শেখ বদরুজ্জামান ফিরদৌসি তাঁর ‘অসমের চরবাসীদের জীবন-সংস্কৃতি’ প্রবন্ধে লিখেছেন, ‘অসমে স্থায়ী-অস্থায়ী চরের সংখ্যা দুই হাজারের বেশি।...অসমের জনসংখ্যার তিন ভাগের এক ভাগ সংখ্যালঘু শ্রেণির। আবার সংখ্যালঘু শ্রেণির প্রায় অর্ধেক জনগণ বাস করে চরাঞ্চলে।’ এঁরাই হলেন এই অবৈধ হয়ে যাওয়া ৪০ লাখের অংশ।
বাংলাদেশে যত মানুষ গ্রামছাড়া হয়, তারও ৮০ শতাংশ হলো এই নদীভাঙা মানুষ। কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার তিন-চতুর্থাংশ এলাকা ব্রহ্মপুত্রের গর্ভে চলে গিয়েছে। তাই দেখা যায়, বাংলাদেশের হেন এলাকা নেই, যেখানে চিলমারীর মানুষকে খুঁজে পাওয়া যাবে না। সেখানে আসামজুড়ে বিস্তীর্ণ ব্রহ্মপুত্র এলাকার ভাঙনকবলিত বাসিন্দাদের কী অবস্থা, তা অনুমান করা কঠিন নয়। যখন ভাঙন আসে, তখন যে যেভাবে পারে, একটু আশ্রয়ের জন্য ছোটাছুটি করে। ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনের শব্দে সমস্ত অতীত মুহূর্তে নাই হয়ে যায়। ইয়া নফসি ইয়া নফসি করে ভাই ছেড়ে যায় ভাইকে, পিতা পুত্রকে বিদায় দেন। সেখানে নাগরিক নিবন্ধনের (এনআরসি) তথ্য কীভাবে থাকে? যেখানে সরকারের কাছে তথ্য থাকে না, সেখানে সরকারই আবার নাগরিকদের গায়ে নাগরিকত্বহীনতার ছাপ মারে কীভাবে? ভাত দেওয়ার বেলায় নেই, কিন্তু কিল মারার গোসাঁইগিরির রাজনীতিতে তরা পাকা। এই আসামের এই ভাওয়াইয়া গানে যেন আসামের বাঙাল কৃষকের মনে কথা ফুটে উঠেছে: ‘হামরা এলা একলা ঘুরি বেড়াই/ চৌখের পানি ঝরে রে/ কেউ কুনুদিন ঘর বান্দেন না/ বরমপুত্রর (ব্রহ্মপুত্রের) পারে রে...’
লেখক: সভাপতি, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ, রেল-নৌ, যোগাযোগ ও পরিবেশ উন্নয়ন গণকমিটি।
[email protected]