নির্বাচনী সহিংসতা

নির্বাচনী সহিংসতার বিষয়টি আমরা ঝেড়ে ফেলেছি—এমনটিই আমরা ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা ফিরে আসার লক্ষণ স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। এবারের উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের দ্বিতীয় দফায় নানা ধরনের নির্বাচনী অনিয়মের অভিযোগ যেমন জোরালোভাবে উঠেছে, তেমনি সংঘাত-সহিংসতা ও প্রাণহানির ঘটনাও ঘটেছে। ১৫ মার্চ অনুষ্ঠেয় তৃতীয় দফা উপজেল পরিষদ নির্বাচন নিয়েও সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার দায়িত্ব যে নির্বাচন কমিশনের, তারাই বেশি সহিংসতার আশঙ্কা করছে। আমাদের প্রশ্ন হচ্ছে, সহিংসতা দূর করতে কমিশন কঠোর ভূমিকা নিচ্ছে না কেন? তাদের সমস্যা কোথায়?
বিভিন্ন স্থানে প্রার্থীদের নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের নানা অভিযোগ উঠছে। শুধু অভিযোগ নয়, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অনেক ঘটনা দৃশ্যমানও। এ ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের কাছ থেকে যে ভূমিকা প্রত্যাশিত, তা পাওয়া যাচ্ছে না। গাজীপুরের শ্রীপুরে যে পরিস্থিতি কয়েক দিন ধরে বিরাজ করছে, তাকে কোনোভাবেই স্বাভাবিক পরিস্থিতি বলা যাবে না। র‌্যাবের প্রার্থী আটক,
সংঘাত-সহিংসতা ও প্রাণহানি—সবই ঘটেছে। নির্বাচনের সময় যেহেতু স্থানীয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা মেনে চলার কথা, তাই এই পরিস্থিতির দায় নির্বাচন কমিশনকে নিতে হবে।
নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য এই প্রতিষ্ঠানকে অগাধ ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। এই ক্ষমতা প্রয়োগের বিষয়টি নির্ভর করে নির্বাচন কমিশনের দৃঢ়তার ওপর। ২০০৮ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত স্থানীয় সরকার পর্যায়ের অসংখ্য নির্বাচনসহ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এবং এই নির্বাচনগুলোয় কোনো ধরনের
সংঘাত-সহিংসতার ঘটনা ঘটেনি। অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হিসেবেই ওই নির্বাচনগুলো স্বীকৃতি পেয়েছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ ও দৃঢ় পদক্ষেপের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে বলে আমরা মনে করি। আমরা এটা বুঝতে পারছি না যে অতীতে এ কাজ করা গেলে এখন তা সম্ভব হচ্ছে না কেন? এটা কি কমিশনের অদক্ষতা, নাকি অনীহা বা অন্য কিছু?
নির্বাচনকে অবাধ, নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ রাখতে নির্বাচন কমিশনের যে সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশিত, তা দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমানে লক্ষণীয় নয়। প্রশাসন থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী—সবাই সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে কমিশনকে সহায়তা করতে বাধ্য। কিন্তু নির্বাচন কমিশন সেই কাজ করছে না বা করতে পারছে না।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান নির্বাচন কমিশনার গত সোমবার তৃতীয় দফা উপজেলা পরিষদ নির্বাচন সম্পর্কে বলেছেন, প্রার্থী ও সমর্থকেরা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন, সেই কারণে আগামী দফা নির্বাচনে সহিংসতা বেশি হতে পারে। আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এ ধরনের আশঙ্কা
যদি থাকে, তবে আগাম ব্যবস্থা কেন নেওয়া হয়নি? সহিংসতা ঠেকাতে এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচন নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশন পুলিশ, র‌্যাব, বিডিআর এমনকি প্রয়োজনে সেনাবাহিনীও কাজে লাগাতে পারে। আসলে প্রয়োজন নির্বাচন কমিশনের সক্রিয় ও দৃঢ় ভূমিকা। সেটা করতে ব্যর্থ হলে নির্বাচনী সহিংসতা প্রত্যাবর্তনের এই দায় তাদেরই নিতে হবে।