সর্বস্তরে বাংলা ভাষার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালত থেকে নির্দেশ পাওয়া গেল। ১৭ ফেব্রুয়ারি বিচারপতি কাজী রেজাউল হক এবং এ বি এম আলতাফ হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ এক রিটের শুনানি শেষে যে রুল দেন, সেখানে বলা হয়েছে: ইংরেজিতে থাকা ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিজ্ঞাপন, গাড়ির নামফলক, সব ধরনের সাইনবোর্ড ও নামফলক বাংলায় লিখতে হবে। একই সঙ্গে বাংলা ভাষা প্রচলন আইনানুসারে সব ক্ষেত্রে অবিলম্বে বাংলা ভাষা ব্যবহারে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে কেন নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুলও দিয়েছেন আদালত। আগেও আমরা এমন নির্দেশনা পেয়েছিলাম।
বাংলা ভাষা বাংলাদেশের সংবিধান স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষা। এ ভাষার রয়েছে নিজস্ব বর্ণমালা। বাংলা সাহিত্যসম্ভার নিঃসন্দেহে বিশ্বমানের। এ সবকিছুই বাংলা ভাষার জন্য ইতিবাচক উপাদান। এ ছাড়া সারা বিশ্বে বর্তমানে বাংলাভাষী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩০ কোটি। এর মধ্যে বাংলাদেশে ১৬ কোটি; ভারতের পশ্চিমবঙ্গ, আসাম ও ত্রিপুরা মিলিয়ে ১২ কোটি এবং পৃথিবীময় ছড়িয়ে থাকা বাঙালির সংখ্যা কম-বেশি এক থেকে দেড় কোটি। এই বিপুলসংখ্যক ভাষী নিয়ে একটি ভাষার টিকে থাকা অত্যন্ত সংগত ও ইতিবাচক। যেখানে শত শত ভাষা নিজস্ব ভাষী হারিয়ে বিপন্নতার মুখোমুখি, সেখানে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জয়জয়কার সর্বত্র। এত অর্জনের পরও আমাদের ভালোবাসার বাংলা ভাষা তার স্বকীয়তা হারাচ্ছে দিন দিন। এর জন্য মূলত দায়ী আমরাই।
বিশ্বজুড়ে মানুষে মানুষে যোগাযোগের উপায় হিসেবে ইংরেজি ভাষার স্থান সবার ওপরে। ইংরেজি ভাষার এই আধিপত্য বিস্তার সম্ভব হয়েছে ইংরেজদের ঔপনিবেশিক যাত্রার কারণে। ভারতবর্ষ তথা বাংলাদেশ থেকে ঔপনিবেশিক ধারার মূলোৎপাটন হলেও এর প্রভাব থেকে গেছে আমাদের অফিস-আদালত, শিক্ষা ও দৈনন্দিন কর্মপরিচালনায়। একসময় ফারসি ভাষা ভারতের দাপ্তরিক ভাষা ছিল, সে ভাষা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব হলেও দাপ্তরিকভাবে ইংরেজি ভাষার হাত থেকে আমাদের মুক্তি মেলেনি। অথচ পৃথিবীতে এমন অনেক জাতি (যেমন জাপান ও কোরিয়া) রয়েছে ইংরেজি ভাষার প্রবল প্রতিপত্তিকে উপেক্ষা করে মাতৃভাষায় রাষ্ট্রীয়, দাপ্তরিকসহ সব কাজ সম্পন্ন করছে।
বাংলা ভাষাকে আজ জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের দাপ্তরিক ভাষা করার দাবি উত্থাপিত হয়েছে। এমনকি দেশের সরকারপ্রধানও বাংলায় জাতিসংঘে বক্তৃতা দিচ্ছেন। কিন্তু আমাদের এই সাধের ও প্রাণের ভাষা নিজ ভূমিতেই কতটা যে অবহেলার স্বীকার, তার নজির ছড়িয়ে আছে সর্বত্র। আমাদের বিদ্যালয়গুলোর পাঠ্যপুস্তক খুললে শিশুদের জন্য ভুল বানান আর ভুল বাক্যের ছড়াছড়ি দেখতে পাই। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে অধিকাংশ শিক্ষকেরই নেই প্রমিত বাংলা উচ্চারণদক্ষতা। ফলে আমাদের নতুন প্রজন্ম বিদ্যাপীঠ থেকে ভুল উচ্চারণ ও ভুল বানানে মাতৃভাষা শিখছে। উপরন্তু মহাবিপদ হয়ে উঠেছে হিন্দি ভাষার সিরিয়াল এবং হিন্দিতে ডাবিং করা কার্টুন ও অন্য অনুষ্ঠানগুলো। শহরের বাংলাভাষী অনেক মা-বাবাই আজ ঘরে শিশুর ইংরেজি কথোপকথনদক্ষতা বাড়াতে অনবরত ইংরেজি বলে যাচ্ছেন। তাই এই শিশুর কাছে আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল হয়ে উঠেছে জ্যাকফ্রুট।
আজ বাংলা ভাষা এফএম বেতার ও টিভিসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রভাবে হিন্দি-উর্দু-ইংরেজি মিলিয়ে একটি মিশ্র ভাষারূপ অর্জনের পথে অনেক দূর অগ্রসর হয়েছে। কেউ কেউ এর নতুন নামকরণের বিষয়ও উল্লেখ করেছেন। বাংলা ভাষার মর্যাদার জন্য এটা যে খুব সুখকর নয়, তা বলাই বাহুল্য।
একসময় গ্রিক, লাতিন ও সংস্কৃত খুব দাপটের সঙ্গে পৃথিবীতে চর্চা হয়েছে। এ ভাষার সাহিত্যসম্ভার পাঠ করে আজও আমরা আবেগাক্রান্ত হই, কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে এ ভাষা এখন সংগ্রহশালা আর গবেষণার ভাষা। শত বছর পর বাংলা ভাষার ভবিষ্যৎ ভেবে তাই আতঙ্কিত না হয়ে পারি না।
শহুরে তরুণ প্রজন্মের মুখের ভাষায় বিস্মিত না হয়ে উপায় কী! তারা যেন বাংলা ‘র’ ধ্বনিটি ভুলেই গেছে। তার জায়গায় প্রিয় হয়ে উঠেছে ‘ড়’। আর ইংরেজি উচ্চারণে বাংলা বলার প্রবণতাও বাড়ছে।
বিশ্ববাজারের দ্রুত সম্প্রসারণ অথবা মুক্তবাজার অর্থনীতির টাইফুন ঝড়ে আজ দেশীয় ঝালমুড়ি, চানাচুরের মোড়কগুলোও ভোল পাল্টেছে। দেশি ফলের গন্ধ ও স্বাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘ম্যাঙ্গো ফ্লেভার’। ইংরেজি নাম ছাড়া যেন মুখে স্বাদ লাগে না। আমাদের অহেতুক বিদেশি ভাষাপ্রীতির কারণে আজ বাংলা নামের খাদ্য মানেই অখাদ্য যেন। সরকারি অফিস-আদালত, বিদ্যালয় থেকে বিশ্ববিদ্যালয়, হোটেল-রেস্তোরাঁ— সবখানেই বাংলা হরফে ইংরেজি অথবা ইংরেজি হরফে বাংলা লেখা। ক্রমাগত বাড়ছে এই প্রবণতা। টিভি নাটক, চলচ্চিত্রের নামকরণেও আজ ইংরেজির আধিপত্য। আমাদের নীতিনির্ধারণী ব্যক্তিরা কি এগুলো নিয়ে ভাবছেন? ভবিষ্যতের বাংলা ভাষার জন্য কি কিছুই করণীয় নেই? এ দেশে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ আইন হচ্ছে, অথচ বাংলা ভাষায় যে যথেচ্ছচার চলছে, তা দেখার কেউ নেই।
কিছুদিন আগে ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সরকার আইন করে রাজ্যের সব বিলবোর্ডে বাংলা লেখা বাধ্যতামূলক করেছে। (আশির দশকে আমরাও করেছিলাম কিন্তু ধরে রাখতে পারিনি) আমাদের প্রতিবেশী দেশ নেপালে দুই বছর আগে তাদের সরকার ও শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক সরকারি প্রজ্ঞাপনে সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের নাম বিদেশি ভাষা পরিত্যাগ করে স্থানীয় ভাষায় রাখার আদেশ জারি করেছে। দুই মাসের মধ্যে নাম পরিবর্তন না করলে অধিভুক্তি বাতিলসহ শাস্তি প্রদানের কথাও বলা হয়েছে। সেখানে ‘ইস্টার্ন স্কুল’ যদি হিমালয় বিদ্যালয় হতে পারে, তাহলে বাংলাদেশে প্রায় ৯০টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, যেগুলোর মাত্র কয়েকটি বাদে সবই ইংরেজি নামে চলছে, সরকার চাইলেই সেগুলোর (মন্ত্রণালয় বা মঞ্জুরি কমিশন প্রস্তাব করতে পারে) বাংলা নাম দেওয়া সম্ভব।
যে দেশ ও জাতি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস নিয়ে অহংকার করে, সে দেশে ভাষাচর্চাকে উৎসাহিত করার জন্য কোনো রাষ্ট্রীয় নীতি নেই। এটা দুর্ভাগ্যজনক।
সৌরভ সিকদার: লেখক ও ভাষাবিজ্ঞানী, অধ্যাপক, ভাষাবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
[email protected]