বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু বন্ধ হবে কবে

আর্থিক অসচ্ছল নাগরিকও যে ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন না, তাই সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

পকেটে অর্থকড়ি থাকলে একটা পর্যায় পর্যন্ত আপনি বাংলাদেশেও চিকিৎসা পেতে পারেন, তা সরকারি বা বেসরকারি যে হাসপাতালেই হোক না কেন। অর্থকড়ি নেই তো, গুরুতর অসুখ হলে বিনা চিকিৎসায় বা অর্ধ চিকিৎসায় মারা যাবেন আপনি।

অবশ্য টাকা না থাকলেও চিকিৎসা পেতে পারেন, আপনি যদি নামীদামি বা গুণী কোনো ব্যক্তি হয়ে থাকেন। অবশ্যই তা সরকারি হাসপাতালে। আপনাকে নিয়ে তখন মেডিকেল বোর্ডও গঠন করা হতে পারে। যদিও তা বিরল ঘটনা। আর সরকারি দলের নামী কোনো রাজনীতিবিদ হলে তো কথাই নেই। তাৎক্ষণিকভাবে এয়ার অ্যাম্বুলেন্সে করে বিদেশের কোনো নামকরা হাসপাতালেও পাঠিয়ে দেওয়া হতে পারে আপনাকে।

চিকিৎসা মানেই যন্ত্রণার বিষয়। অর্থ খরচের পাশাপাশি চিকিৎসায় শারীরিক-মানসিক দুঃখ-কষ্টের বিষয়ও থাকে। কেউ চিকিৎসার নাম করে বেড়াতেও যান বিদেশে। তা কিন্তু সুখকর বিষয়। ‘একটু ডাক্তার দেখিয়ে এলাম, ঘুরেও এলাম’—মানুষের মধ্যে এমন প্রবণতা আছে বলেই দেশে দেশে ‘মেডিকেল টুরিজম’ গড়ে উঠেছে। তাই বুকের চিকিৎসা, চোখের চিকিৎসা, মুখের চিকিৎসা বা সুখের চিকিৎসা—যা-ই বলি না কেন, সবকিছুর পেছনেই রয়েছে কাঁড়ি কাঁড়ি টাকার মামলা।

সাধারণ মানুষের ক্ষেত্রে গুরুতর চিকিৎসার জন্য রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাটি তাহলে কী? ভালো, স্বস্তিদায়ক এবং ভরসা করার মতো কোনো ব্যবস্থা কি আছে? অবশ্য সাধারণ চিকিৎসাব্যবস্থারই যে হাল, গুরুতর চিকিৎসা সেখানে আশা করাই বাহুল্য। নিম্ন মধ্যম আয় থেকে মধ্যম আয়ের দেশের দিকে যাত্রা আমাদের। এই সময়েও আমাদের হুঁশ হয়নি। সবার জন্য স্বাস্থ্য অর্থাৎ সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি এখনো। সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার ব্যাপারে আমরা দেখে নিতে পারি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) কী বলছে। ডব্লিউএইচওর মতে, যে স্বাস্থ্যব্যবস্থার আওতায় নাগরিকেরা আর্থিক অসচ্ছলতা থেকে মুক্ত না হয়েও স্বাস্থ্যসুবিধা পেতে পারেন, সেটাই হচ্ছে সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা।

২০১২ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষা বা ইউনিভার্সেল হেলথ কভারেজ (ইউএইচসি) সংক্রান্ত প্রস্তাবে স্বাক্ষর করে এসেছে বাংলাদেশ। ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসেও নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ইউএইচসির পক্ষে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতি দিয়ে এসেছে। বাংলাদেশে সর্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থার হাল-হকিকত তাহলে কী? এ প্রশ্নের জবাব দেওয়ার লোক পাওয়া যাবে না জানি। ফাঁকে মিলিয়ে নিচ্ছি, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০১৮ সালের নভেম্বরে প্রকাশিত তথ্যভান্ডার। ওই তথ্যভান্ডার অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ হচ্ছে সেই দেশ, যে দেশে চিকিৎসায় রোগীদের পকেটের টাকা খরচ হয় সবচেয়ে বেশি। বাংলাদেশে চিকিৎসাসেবায় সরকারের খরচ হয় ২৮ শতাংশ, আর বাকি ৭২ শতাংশ খরচই হয় রোগীদের পকেটের পয়সায়।

আমরা যে আগে এটা নিয়ে ভাবিনি, তা নয়। পরিকল্পনা করেছি, বাস্তবায়নের পথে যাইনি। স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইউনিটের করা ২০১২ সালের স্বাস্থ্য অর্থায়ন কৌশলপত্রটির কথা মনে পড়ছে। ২০ বছর মেয়াদি (২০১২-৩২) এ কৌশলপত্রের প্রায় অর্ধেক সময় শেষ। কৌশলপত্রে বলা হয়েছিল, ২০৩০ সালের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় কমিয়ে ৩২ শতাংশ করা হবে। তখন ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় ছিল ৬৪ শতাংশ। ২০১৫ সালে তা বেড়ে হয় ৬৭ শতাংশ। আর এখন যে ৭২ শতাংশও ছাড়িয়ে গেছে। অর্থাৎ চিকিৎসার জন্য ব্যক্তির নিজস্ব ব্যয় বাড়ছেই। আর নির্বিকারভাবে আমরা হাঁটছি উল্টো পথে।

যুক্তরাষ্ট্রের কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ও ব্র্যাক স্কুল অব পাবলিক হেলথের প্রতিষ্ঠাতা মোশতাক রাজা চৌধুরীর সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। তিনি বলছিলেন, অর্থনৈতিকভাবে সমগোত্রীয় দেশই ছিল শ্রীলঙ্কা, ফিলিপাইন, ভিয়েতনাম ও মরক্কো। তারা ইউএইচসি বাস্তবায়ন করেছে। থাইল্যান্ড ২০০২ সালে যখন ইউএইচসি বাস্তবায়ন করে, তখন তাদের জাতীয় আয় বর্তমান বাংলাদেশের সমানই ছিল।

প্রশ্ন আসতে পারে, স্বাস্থ্য খাতকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আগামী ৩ জুন সংসদে ঘোষিত হচ্ছে নতুন অর্থবছরের বাজেট। চলতি অর্থবছরের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ ছিল মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশেরও কম। আর বাজেটের ৫ দশমিক ২ শতাংশ। তার চেয়েও বেশি বরাদ্দ যেখানে শিক্ষা ও প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, স্থানীয় সরকার এবং পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে। এমনকি সুদ পরিশোধের বরাদ্দও স্বাস্থ্য খাত থেকে বেশি।

অথচ আমাদের জিডিপির আকার বাড়ছে। মাথাপিছু আয়ও বাড়ছে বলে ঘোষণা করছে সরকার। গত সপ্তাহেই মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম সাংবাদিকদের জানালেন, আমাদের মাথাপিছু আয় এখন ২ হাজার ২২৭ মার্কিন ডলার। আগের বছর তা ছিল ২ হাজার ২৪ ডলার। এ আয় পড়ে থাকছে কাগজেই। অথচ সর্বশেষ খানা আয়-ব্যয় জরিপ বলছে, ৪০ দশমিক ২১ শতাংশ মানুষ কবিরাজ, হাতুড়ে ডাক্তার কিংবা ওষুধের দোকানের কর্মীদের কাছ থেকে চিকিৎসাসেবা নিয়ে থাকেন।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় তাহলে কী করছে? নিজেরা তো পারছেই না, কারও পরামর্শও আমলে নিচ্ছে না। মানলাম, সরকার একা পারবে না। যতই মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার দিকে যাচ্ছি না কেন, অর্থের অভাব তো আছেই। সরকারও অস্বীকার করছে না যে জিডিপির তুলনায় আমাদের রাজস্ব আয়ের হার শুধু দক্ষিণ এশিয়ায় নয়, গোটা বিশ্বেই নিম্নতম।

বাস্তবতা সবাই মানছেন, মানবেনও। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। গোঁয়ার্তুমির সমস্যা কীভাবে মেটাবেন? তাঁরা যদি গোপনে প্রতিজ্ঞা করে থাকেন যে গবেষক, চিকিৎসক, স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদ, সাংবাদিক,কারও কথাই শুনবেন না, কারও কাছ থেকেই শিখবেন না—কারও কিছু করার নেই। কারণ, চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁরাই আছেন দায়িত্বে। কার যেন একটা বাণী আছে, ‘অজ্ঞ হওয়া যত না লজ্জার বিষয়, তার চেয়েও বড় লজ্জার বিষয় শিখতে না চাওয়া।’ না শেখার লজ্জা নিয়ে তাঁরা ভালো থাকুন। জনগণ ভুগছেন, ভুগতে থাকুন। ভাই, জরুরি একটা কাজ তো শুরু করবেন! আপনার রুজিটা তো হালাল করবেন! দরকার এখন স্বাস্থ্যবিমার দিকে এগিয়ে যাওয়া। এর কোনো বিকল্প নেই। অথচ কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেই।

প্রথম আলোর বিশেষ প্রতিনিধি শিশির মোড়ল পাঁচ বছর আগে ফিলিপাইন ঘুরে এসে ‘স্বাস্থ্যবিমায় ফিলিপাইন থেকে যা শিখতে পারি’ শীর্ষক একটি কলাম লিখেছিলেন। তাতে বলা হয়েছিল, ১০ কোটি জনসংখ্যার ফিলিপাইনের ৯২ শতাংশ অর্থাৎ প্রতি ১০ জন নাগরিকের ৯ জনই স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আছে। ‘ফিলহেলথ’ নামের একটি সামাজিক স্বাস্থ্যবিমা প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে তা সম্ভব হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সারা বিশ্বে সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার যে দর্শন প্রচার করছে, ফিলিপাইন তা আগেই বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। সর্বজনীন স্বাস্থ্য সুরক্ষার মূল কথা হচ্ছে, দরকারের সময় মানুষ মানসম্পন্ন স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা পাবে এবং অর্থের অভাবে মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত থাকবে না। চিকিৎসা করতে গিয়ে কোনো মানুষ গরিবও হয়ে পড়বেন না।

সরকারি বা বেসরকারি যে খাতেরই হোক, নিয়মিত বেতন পান ফিলিপাইনের এমন যেকোনো ব্যক্তি এই বিমা কর্মসূচির আওতায় আসতে আইনগতভাবে বাধ্য। চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সময় ধনী-গরিব একই মানের সেবা পেয়ে আসছেন ফিলিপাইনে। স্তন ক্যানসার, প্রোস্টেট ক্যানসার, কিডনি প্রতিস্থাপন, হৃদ্‌যন্ত্রের বাইপাস সার্জারিসহ অনেক জটিল ও ব্যয়বহুল অস্ত্রোপচার এই কর্মসূচির আওতায় করা হচ্ছে।

করোনাভাইরাস এসে প্রতিদিন দেখিয়ে যাচ্ছে স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশ কতটা অসহায় এবং তা মোকাবিলায় বাংলাদেশ কতটা অপ্রস্তুত। টেস্টিং কিট, ভেন্টিলেটর, হাসপাতালের বিছানা, হাসপাতালে নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট এবং ভ্যাকসিন থেকে শুরু করে চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীর সংখ্যার ঘাটতির চিত্র এখন আমাদের সামনেই।

মনে পড়ে গেল গত বছরের ১৯ এপ্রিল বীর মুক্তিযোদ্ধা আলমাছউদ্দিনের মৃত্যুর কথা। ঢাকার পাঁচ হাসপাতাল ঘুরেও চিকিৎসা না পেয়ে সন্তানেরা তাঁদের বাবাকে নিয়ে যখন মুগদা হাসপাতালে গেলেন, তাঁদের জানানো হলো হাসপাতালটির সিটিস্ক্যান ও এমআরআই যন্ত্র নষ্ট। ফলে চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই মারা গেলেন আলমাছউদ্দিন।

স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় কিছু করুক বা না করুক, কিছু পারুক বা না পারুক, সে দিক থেকে চোখটা আপাতত সরিয়ে রাখছি। করোনাভাইরাস আসার আগেই (ডিসেম্বর ২০১৯) বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা একটা প্রতিবেদন তৈরি করে জানিয়েছিল, চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে প্রতিবছর বাংলাদেশের ১ কোটি ১৪ লাখের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাচ্ছে। আশা করছি, এ কথা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় অস্বীকার করবে না। আমরা যাতে এটুকু বলতে পারি, স্বীকার তো করল!

ফখরুল ইসলাম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক
[email protected]