মানবাধিকার ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব
>গত ৯ ডিসেম্বর প্রথম আলোর আয়োজনে ও জাতিসংঘ বাংলাদেশের সহযোগিতায় ‘মানবাধিকার ও স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসব’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

আলোচনা
আব্দুল কাইয়ুম
২০১৮ সাল জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ৭০ বছর পূর্তি। এ দীর্ঘ সময়ে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে যথেষ্ট অর্জন হয়েছে। তবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে হলে আরও অনেক দূর যেতে হবে। এখন প্রায় সারা বিশ্বেই কমবেশি মানবাধিকারের লঙ্ঘন হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে আমাদের সচেতন হতে হবে। সবার দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন।
চলচ্চিত্রসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে মানবাধিকারের বিষয় আরও বেশি করে উপস্থাপন করা প্রয়োজন। বিশ্বের যেখানে মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে, অন্যায়–অত্যাচার হবে, সেসব বিষয় চলচ্চিত্রে নিয়ে আসার গুরুত্ব অনস্বীকার্য। এ বিষয়ে এখন আলোচনা করবেন পিটার ফারেনহোল্টজ।

পিটার ফারেনহোল্টজ
আজ আমাদের একটি অর্জনের দিন। ২০১৮ সাল জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ৭০ বছর পূর্তি। বিশ্বের সব শ্রেণি–পেশার মানুষের মর্যাদার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। প্রত্যেককে তার প্রাপ্য সম্মান দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারি–বেসরকারি সংস্থা, নাগরিক সমাজের সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। মানবাধিকার রক্ষায় মানুষকে সচেতন করা জরুরি। তবে অন্যান্য মাধ্যম থেকে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
যেকোনো সমাজের ও দেশের জন্য প্রয়োজন টেকসই উন্নয়ন। একটি দেশের কেবল অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলে সেটা টেকসই উন্নয়নের সূচক হয় না। এর জন্য প্রয়োজন সব শ্রেণি–পেশার মানুষের মানবাধিকার রক্ষা।
মানবাধিকার রক্ষায় চলচ্চিত্রসহ অন্যান্য মাধ্যম ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। মানবজাতির ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাপত্র হলো, মানবাধিকারের ঘোষণাপত্র। ২০১৮ সালে এ ঘোষণাপত্রের ৭০ বছর পূর্ণ হলো। এই ঘোষণাপত্র পৃথিবীর মানুষের সম্মান ও মর্যাদা রক্ষায় কাজ করে যাচ্ছে।

মিয়া সেপ্পো
মানবাধিকার, তারুণ্য ও চলচ্চিত্র একটি চমৎকার সমন্বয়। চলচ্চিত্রের একটি মানবিক ভাষা আছে। এর মাধ্যমে মানবাধিকারের বিষয়গুলোকে বাস্তবতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে শক্তিশালীভাবে প্রকাশ করা যায়। হোক সেটি একজন শরণার্থীর মানবাধিকার অথবা একজন অভিবাসী কিংবা আদিবাসীর অধিকার। চলচ্চিত্রের মাধ্যমে মানুষ মানবাধিকারের বিষয়গুলো দ্রুত বুঝতে পারে।
চলচ্চিত্রের একটা বড় শক্তির জায়গা আছে। এটি সমাজের ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখে। ধন্যবাদ ঢাকা ইউনিভার্সিটি ফিল্ম সোসাইটিকে। তারা মানবাধিকার ঘোষণাপত্রের ৭০ বছর পূর্তিতে ৮২টি দেশের ৭৩৮টি মানবাধিকার–বিষয়ক চলচ্চিত্র এ উৎসবে এনেছে।
সমাজের সব মানুষের মানবাধিকার রক্ষায়, বৈষম্য, অন্যায় ও অনৈতিকতা রোধে চলচ্চিত্র তরুণদের উৎসাহিত করবে। মানবাধিকার, তারুণ্য ও চলচ্চিত্র সমাজে সম্প্রীতি তৈরি করবে বলে আমি আশাবাদী। এটা মানুষের মধ্যে বন্ধন দৃঢ় করে।

মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
মানবাধিকারের সংজ্ঞা কী হবে, এটা আমার কাছে জটিল মনে হয়। সতি্যকার অর্থে জীবনের প্রতিটি বিষয়ই মানবাধিকারের বিষয়। আমার প্রয়োজনীয় সুবিধাগুলো না পেলে সেটা কি মানবাধিকার লঙ্ঘন নয়? আবার সবকিছু মানবাধিকারের মধ্যে আনলে পরিস্থিতি কী হবে, সেটাও ভাবনার বিষয়। তবে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র মানবাধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখতে পারে।
মানুষ সাধারণত যখন কোনো ভালো কাজ করে, এর মধ্যে একধরনের স্বার্থ থাকে। চলচ্চিত্রে সবকিছু নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করা হয়। তাই চলচ্চিত্র সমাজ পরিবর্তনে অন্যতম ভূমিকা রাখে। তবে মানবাধিকার যেন আংশিকভাবে দেখা না হয়, সে বিষয়টিও ভাবতে হবে।
মানবাধিকার নির্দিষ্ট হলে সমাজে শান্তি নষ্ট হবে। আবার একজনের মানবাধিকার রক্ষায় আমরা অনেক কিছু করছি, আরেকজনের ক্ষেত্রে নীরব। আর সত্যি হলো, বিশ্বে এ ধরনের ঘটনা ঘটে চলছে।
এ ধরনের মানসিকতা মানবাধিকার রক্ষায় ভীষণভাবে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। চলচ্চিত্রসহ অন্যান্য গণমাধ্যমের দায়িত্ব এসব বিষয় নিয়ে আরও বেশি কাজ করা।

সঞ্জীব দ্রং
চলচ্চিত্র জীবনের কথা বলে। সমাজের কথা বলে। দেশের কথা বলে। সমাজের অন্যায়, অসংগতি, বৈষম্য দূর করতে ভূমিকা রাখে। সংখ্যালঘু মানুষ প্রায় সব সময় বৈষম্যের শিকার হয়। একটা সমাজ কতটা ভালো সেটা বোঝা যায়, সেখানে সংখ্যালঘু মানুষেরা কেমন আছে—অনেকটা তার ভিত্তিতে।
সংখ্যালঘু মানুষের জীবন, ঝুঁকিপূর্ণ মানুষের জীবন চলচ্চিত্রে যত আসবে, তত তাদের জীবনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সব মানুষ যেন ভালো থাকে, সে জন্য চলচ্চিত্রসহ সব ধরনের গণমাধ্যমে তাদের জীবনের দুঃখ–কষ্টগুলো আরও বেশি করে আনা প্রয়োজন। গণমাধ্যম মানবাধিকার রক্ষায় ভূমিকা রাখে। প্রত্যেকের মানবাধিকার রক্ষায় সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। তা না হলে সমাজে বৈষম্য সৃষ্টি হয়।
মানবাধিকার রক্ষার প্রধান দায়িত্ব হলো রাষ্ট্রের। সংখ্যালঘুসহ দেশের একজন প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষেরও যেন মানবাধিকার লঙ্ঘন না হয়, রাষ্ট্রের সেটা দেখা দরকার।

অং রাখাইন
ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের ফিল্ম সোসাইটি ও জাতিসংঘের আবাসিক কার্যালয়কে ধন্যবাদ তারা এমন একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে। আমার কাছে মানবাধিকার নিয়ে অনেক প্রশ্ন আছে। আমি ঢাকায় পড়ছি। আমার বন্ধু গ্রামে পড়ছে। এখানে তার মানবাধিকার লঙ্ঘিত হচ্ছে কি না, সেটা আমার কাছে পরিষ্কার না। এটা আমার কাছে একটা প্রশ্ন।
আমাদের চারপাশে বৈষম্য, নির্যাতন ও অন্যায়ের ছড়াছড়ি। আমাদের এগুলোর প্রতিবাদ করা উচিত। কিন্তু আমরা অধিকাংশ মানুষ সেটা করছি না। আমি মনে করি, সবকিছুর আগে ভালো মানুষ হওয়া প্রয়োজন। ভালো মানুষেরা কোনো অন্যায় করে না।
তাঁদের দ্বারা কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘন হয় না। অন্যায়, নিপীড়ন, অত্যাচার ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রতিবাদের কার্যকর ভাষা হলো গণমাধ্যম। বিশেষ করে শর্ট ফিল্ম এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখতে পারে। প্রযুক্তি প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে। আমরা চলচ্চিত্রকে শক্তিশালী মাধ্যম বলছি। কিন্তু ফেসবুক এর চেয়েও বেশি শক্তিশালী মাধ্যম বলে মনে হচ্ছে।

রাশেদুল হাফিজ
১৯৪৮ সালে ঘোষিত মানবাধিকার সনদের আজ ৭০ বছর পূর্তি। এবার উৎসবের শিরোনাম হলো, ‘মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্রের ৭০ বছর পর বাংলাদেশ ও দক্ষিণ এশিয়া’।
জাতিসংঘের আবাসিক কার্যালয় ও জার্মান সরকারকে ধন্যবাদ এ উৎসবে সহযোগিতা ও অংশগ্রহণের জন্য। এমন একটি দিনে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র উৎসবের আয়োজন করতে পেরেছি, এটা আমাদের জন্য অনেক আনন্দের।
১০০ বছর চলচ্চিত্র শক্তিশালী মাধ্যম ছিল এখন ফেসবুক শক্তিশালী হচ্ছে। তারপরও সিনেমার আবেদন কখনো কমবে বলে মনে হয় না। জাতিসংঘের সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণার ৭০ বছর পূর্ণ হলো।কিন্তু এখনো এ ঘোষণা সম্পর্কে অধিকাংশ সাধারণ মানুষ জানে না। বেশির ভাগ সংস্কৃতিকর্মী জানেন না।
এমনকি সমাজে যাঁরা দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখেন, তাঁরাও অনেকে জানেন না। তৃণমূল মানুষের মধ্যে এ বিষয়ে কর্মশালা করা প্রয়োজন।
দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় মানবাধিকার বিষয়ে পড়ানো উচিত। এসব শিক্ষার্থী যখন বড় হয়ে দেশের কাজ করবেন, তখন তাঁরা মানুষের মানবাধিকার রক্ষায় সচেতন থাকবেন।
আব্দুল কাইয়ুম
কোনো সম্প্রদায়ের মানবাধিকার যেন লঙ্ঘন না হয়, সেদিকে সতর্ক থাকা জরুরি। মানবাধিকার রক্ষায় অনেক মাধ্যম রয়েছে। এর মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য মাধ্যম হলো চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্র সমাজের বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। এখানে সমাজের ন্যায়–অন্যায়গুলো সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়।
সমাজ পরিবর্তনেও চলচ্চিত্র গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শিক্ষার্থীসহ সব শ্রেণির মানুষের স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের প্রতি আগ্রহী হওয়া প্রয়োজন। এতক্ষণ আলোচনায় অংশগ্রহণের জন্য প্রথম আলোর পক্ষ থেকে সবাইকে কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ।
যাঁরা অংশ নিলেন
পিটার ফারেনহোল্টজ
অ্যামবাসেডর, ফেডারেল রিপাবলিক অব জার্মানি ইন বাংলাদেশ
মিয়া সেপ্পো
জাতিসংঘের বাংলাদেশের আবাসিক সমন্বয়কারী
মোস্তফা সরয়ার ফারুকী
চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক
সঞ্জীব দ্রং
প্রতিনিধি, বাংলাদেশ মানবাধিকার ফোরাম
অং রাখাইন
চলচ্চিত্র নির্মাতা
রাশেদুল হাফিজ
সদস্য, লাইফ টাইম, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফিল্ম সোসাইটি
সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম: সহযোগী সম্পাদক, প্রথম আলো