বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আইভী বিগত দিনে নারায়ণগঞ্জে প্রভাবশালী ওসমান পরিবারের নানা ‘অপকর্মের’ বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। সারা দেশে আলোচিত মেধাবী ছাত্র তানভীর মুহাম্মদ ত্বকী হত্যাসহ অনেক হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে তাঁর প্রতিবাদ ছিল জোরালো। এবার দল থেকে যাতে মনোনয়ন না পান—এ কারণে গত এক বছর ওসমান পরিবারের অনুগত ব্যক্তিরা আইভীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে নানা কুৎসা রটান, সভা-সমাবেশ করেন।

সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০১১ সালে প্রথম সিটি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৮ ভোট পেয়েছিলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের শামীম ওসমান পেয়েছিলেন ৭৮ হাজার ৭০৫ ভোট। এরপর ২০১৬ সালে নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনকে ৭৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন আইভী।

সিটি নির্বাচনে প্রার্থী হতে ওসমান পরিবারের অনুসারী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবু হাসনাত মোহাম্মদ শহীদ বাদল, নারায়ণগঞ্জ মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি চন্দন শীল ও সাধারণ সম্পাদক খোকন সাহা দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনেছিলেন। তবে দল এবারও আইভীকে বেছে নেয়। এমন অবস্থায় আইভীর নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণায় কোথাও সাংসদ শামীম ওসমান ও তাঁর অনুসারী নেতা-কর্মীদের দেখা যায়নি। দলীয় মনোনয়ন চেয়ে ব্যর্থ হওয়া তিন নেতাকেও সরাসরি আইভীর সঙ্গে গণসংযোগে দেখা যায়নি। উল্টো নানাভাবে ওসমান পরিবার ও তাঁর অনুসারীদের বিরোধিতার শিকার হন। ভেতরে-ভেতরে আইভীর বিপক্ষে তৈমুর আলম খন্দকারের সমর্থনে কাজ করার গুঞ্জন রয়েছে শহরে। এত দিন বিরোধিতার বিষয়টি গোপন থাকলেও গতকাল প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারের গণসংযোগে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। ওসমান পরিবারের অনুগত চার ইউপি চেয়ারম্যানকে তৈমুরের প্রচারণায় দেখা যায়।

একা লড়ে কখনো জেতা যায় না। দলের একটা অংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রতিবারই তিনি বিজয়ী হয়েছেন। নিজ দলের লোকজনের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন ও রাহাজানির বিরুদ্ধে তিনি সাহসের সঙ্গে লড়েছেন। উন্নয়ন করেছেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষকে হতাশ করেননি। প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করেননি। এ জন্যই নারায়ণগঞ্জের মানুষ দলমত-নির্বিশেষে তাঁর পক্ষে ছিলেন এবং এখনো আছে।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রফিউর রাব্বি

বিষয়টি নজরে আনা হয় নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচন নিয়ে আওয়ামী লীগের গঠিত পরিচালনা কমিটির প্রধান সমন্বয়ক জাহাঙ্গীর কবির নানকের। আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এই সদস্য গতকাল বিকেলে বন্দরে থানা আওয়ামী লীগের কর্মিসভায় কারও নাম উল্লেখ না করে বলেন, জাতীয় পার্টির নেতা-কর্মীরা সরকারি দলের সুবিধা নিয়েও স্থানীয় এমপির কারণে নৌকার বিরোধিতা করছেন। কেউ কোনো ষড়যন্ত্র করে রেহাই পাবেন না। যাঁরা বিরোধিতা করছেন, তাঁদের জীবিত থাকতে আগামী নির্বাচনে নৌকা দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

সেলিনা হায়াৎ আইভী ২০১১ সালে প্রথম সিটি নির্বাচনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ১ লাখ ৮০ হাজার ৪৮ ভোট পেয়েছিলেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী আওয়ামী লীগের শামীম ওসমান পেয়েছিলেন ৭৮ হাজার ৭০৫ ভোট। এরপর ২০১৬ সালে নির্বাচনে নৌকা প্রতীক নিয়ে বিএনপির মেয়র প্রার্থী সাখাওয়াত হোসেনকে ৭৮ হাজার ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন আইভী।

এবারের নির্বাচনে আইভীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার জন্য মহানগর আওয়ামী লীগের নেতা খোকন সাহার একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। সেখানে খোকন সাহা মুঠোফোনে সোনারগাঁ থানা যুবলীগের সভাপতি রফিকুল ইসলামের কাছে আইভীর নির্বাচন পরিচালনার জন্য ৫ লাখ টাকা দাবি করেন। ওই ঘটনায় বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। আইভী এই ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে ওই নেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তবে গতকাল পর্যন্ত এ বিষয়ে দল কোনো সিদ্ধান্ত জানায়নি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, আইভীর বিরুদ্ধে ওসমান পরিবারের বিরোধিতার আরেকটি উদাহরণ পাওয়া যায় ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর নির্বাচন নিয়ে। এই ওয়ার্ডে মেয়র প্রার্থী তৈমুর আলম খন্দকারের ছোট ভাই মাকছুদুল আলম বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী মহানগর আওয়ামী লীগ নেতা রবিউল হোসেনকে ওসমান পরিবারের ইন্ধনে নির্বাচন থেকে সরিয়ে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ আছে। এই অভিযোগে রবিউলকে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এখন ভাইয়ের নির্বাচনী কাজে পুরোপুরি সময় দিতে পারছেন মাকছুদুল।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা বলেন, প্রচারণায় জাপার ইউপি চেয়ারম্যানসহ নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণে তৈমুরকে নির্বাচনে ওসমান পরিবারের ইন্ধন ও গোপনে সমর্থন দেওয়ার বিষয়ে শহরে যে গুঞ্জন ছিল, সেটি পরিষ্কার হয়ে গেছে। বিগত ইউপি নির্বাচনে তাঁরা নৌকাকে ডুবিয়ে জাতীয় পার্টির ইউপি চেয়ারম্যান করেছেন। নৌকার ওপর ভর করে শেখ হাসিনার প্রার্থী আইভীর বিপক্ষে অবস্থান নেওয়ায় দলের উচিত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া।

এ ব্যাপারে জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল হাই প্রথম আলোকে বলেন, মহাজোটের সমর্থন নিয়ে তাঁরা এমপি হয়েছেন। তাঁরাই এখন নৌকার প্রার্থীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিচ্ছেন। এটা তাঁদের নতুন কিছু নয়। বিষয়টি কেন্দ্রীয় নেতাদের অবহিত করা হয়েছে।

তবে নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি রফিউর রাব্বি মনে করেন, আইভী কখনো একা লড়েননি। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, একা লড়ে কখনো জেতা যায় না। দলের একটা অংশের বিরোধিতা সত্ত্বেও প্রতিবারই তিনি বিজয়ী হয়েছেন। নিজ দলের লোকজনের সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, খুন ও রাহাজানির বিরুদ্ধে তিনি সাহসের সঙ্গে লড়েছেন। উন্নয়ন করেছেন, নারায়ণগঞ্জের মানুষকে হতাশ করেননি। প্রতিশ্রুতির বরখেলাপ করেননি। এ জন্যই নারায়ণগঞ্জের মানুষ দলমত-নির্বিশেষে তাঁর পক্ষে ছিলেন এবং এখনো আছে।

এদিকে গতকাল সকালে ১১ নম্বর ওয়ার্ডে শহরের হাজীগঞ্জ এলাকায় গণসংযোগ করেন আইভী। আইভীর সঙ্গে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসংগঠনের লোকজন অংশ নেন। গণসংযোগকালে এলাকার নারীরা রাস্তায় নেমে আসেন।

গণসংযোগকালে আইভী বলেন, ‘আমি যেখানেই যাচ্ছি, সেখানেই জনগণের ব্যাপক সাড়া পাচ্ছি। ছোট ছোট বাচ্চা ও মা-বোনেরা রাস্তায় নেমে আসছেন। তাঁরাই “আইভী, আইভী” স্লোগান ধরেন। উৎসবমুখর পরিবেশ তৈরি হয়েছে।’

আইভী বলেন, ‘তৈমুর সব জায়গায় যাচ্ছেন, কোথাও তো তাঁকে কেউ বাধা দেয়নি। আমি প্রচারণা চালাচ্ছি, তৈমুর কাকাও তাঁর প্রচারণা চালাচ্ছেন। কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা বা অসন্তোষ দেখা দেয়নি। আশা করি, আগামী ১৬ তারিখ পর্যন্ত এটি বজায় থাকবে।’ তিনি বলেন, নারায়ণগঞ্জের নির্বাচনের একটি চরিত্র আছে, আগে ও পরে মিলিয়ে একটা উৎসবমুখর পরিবেশ থাকে—এটি তাঁরা বজায় রাখবেন।

এক প্রশ্নের জবাবে আইভী বলেন, জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগসহ তৃণমূলের সবাই তাঁর সঙ্গে আছেন, তাঁরা নির্বাচনে কাজ করছেন, ভোটারদের কাছে ভোট চাইছেন।

আচরণবিধি ভঙ্গের তৈমুরের অভিযোগ প্রসঙ্গে আইভী বলেন, আচরণবিধি মেনে তিনি মাইক ব্যবহার করছেন। তিনটি ওয়ার্ডে তিনি একটি মাইক দিয়েছেন। তৈমুরের মাইক সবচেয়ে বেশি চালানো হচ্ছে।

রাজনীতি থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন