উপজেলা আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন নেতার অভিযোগ, আবু বক্কারের মতো তাঁরা সাংসদ তানভীরের কারণে দলীয় রাজনীতিতে পদ-পদবি হারিয়েছেন বা নিষ্ক্রিয় আছেন। আবার মামলা ও পুলিশি হয়রানির শিকার হয়েছেন অনেকে। উপজেলার বিভিন্ন পর্যায়ের অন্তত ১০ জন নেতা প্রথম আলোর কাছে পুলিশি হয়রানির কথা বলেছেন।

তানভীর ইমাম ২০১৪ সালে প্রথম সাংসদ হন। এরপর তিনি উল্লাপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন। কিন্তু কেন্দ্র থেকে ওই কমিটি বাতিল করা হয়। গত ফেব্রুয়ারিতে উপজেলা কমিটির সম্মেলনে সভাপতি পদে ফয়সাল কাদির ও সাধারণ সম্পাদক পদে গোলাম মোস্তফা নির্বাচিত হন। তাঁরা দুজনই সাংসদের ঘনিষ্ঠ।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান জাহেদুল হক প্রথম আলোকে বলেন, শুধু যাঁরা সাংসদের পক্ষের লোক, তাঁরাই দলে গুরুত্বপূর্ণ পদ পেয়েছেন।

উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব সারোয়ারের মতে, ‘উল্লাপাড়ায় আওয়ামী লীগ নেই, আছে তানভীর লীগ।’ তিনি অভিযোগ করেন, তানভীর ইমাম সাবেক সাংসদ শফিকুল ইসলামের লোকজনকে বাদ দিয়ে দলের কমিটি করেছেন।

এসব অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে সাংসদ তানভীর ইমাম বলেন, তাঁর জয়প্রিয়তা দেখে কিছু স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে। তিনি বলেন, ‘মনোনয়ন-বঞ্চনার পর থেকে সাবেক সাংসদ শফিকুল ইসলামের অ্যাজেন্ডা হয়েছে, “তানভীর হটাও”। আমার কাছ থেকে সুযোগ-সুবিধা পেয়েছেন, এমন দু-একজনও তাঁর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন।’

কয়রা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক ছিলেন সেলিম উদ্দিন। তাঁকে ২০১৪ সালের ২৮ মার্চ উল্লাপাড়া থানায় ডেকে নিয়ে আটক রাখা হয়। ওই রাতে দলের সদর ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক আবু সাঈদকেও (স্বপন) আটক করা হয়। পরদিন তাঁদের বিরুদ্ধে মানব পাচারের মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। ওই মামলায় তখনকার থানা আওয়ামী লীগের স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক লিয়াকত আলী, সদর থানা যুবলীগের সহসভাপতি আমিনুজ্জামান ও সরকারি আকবর আলী কলেজ ছাত্রলীগের সদস্য রেজাউল করিমকেও আসামি করা হয়।

সেলিম উদ্দিন অভিযোগ করেন, তাঁরা সবাই ছিলেন সাবেক সাংসদ শফিকুলের অনুসারী। এ জন্য তাঁদের মামলা দিয়ে আটক ও পুলিশি নির্যাতন করা হয়েছিল। ২০১৮ সালে শফিকুল ইসলামের শুভেচ্ছা বিলবোর্ড তৈরির সময়ও সেলিমকে আটক করা হয় বলে তিনি জানান।

প্রতিটি ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছে ৫ লাখ করে টাকা নিয়েছেন সাংসদ। আমি নিজেও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদের জন্য ৬ লাখ টাকা দিয়েছি।
এস এম নজরুল ইসলাম, মেয়র, উল্লাপাড়া পৌরসভা

সাংসদের কারণে হয়রানির শিকার হওয়ার কথা বলেছেন আবু সাঈদও। বাঙ্গালা ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক জাহিদুল ইসলাম তালুকদারও পুলিশি নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তখন তিনি ইউনিয়ন যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এখন তিনি ওই বিষয়ে কিছু বলতে রাজি হননি।

নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, সাংসদ তানভীরের নির্দেশে উল্লাপাড়া থানার সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) দেওয়ান কৌশিক আহমেদের হাতেই তাঁরা বেশি নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছেন। দেওয়ান কৌশিক আহমেদ ২০১৫ সাল থেকে চার বছর উল্লাপাড়া থানার ওসি ছিলেন। উল্লাপাড়ায় এক নারীর ঘরবাড়ি ভাঙচুরের মামলায় তিনি ২০১৯ সালে সাময়িক বরখাস্ত হন। তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশের বিভাগীয় মামলা চলছে। তিনি এখন বরিশালের উপমহাপরিদর্শকের কার্যালয়ে সংযুক্ত আছেন।

মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে দেওয়ান কৌশিক আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন ওসির পক্ষে সাংসদের নির্দেশের বাইরে যাওয়ার সুযোগ কম। তবে আমি কাউকে উদ্দেশ্যমূলক কিছু করিনি। তারপরও অনেকের মনে ক্ষোভ-কষ্ট থাকতে পারে।’

তবে সাংসদ তানভীর ইমাম দাবি করেন, ‘আমি কাউকে হয়রানি করিনি। স্বপন, সেলিমসহ যাঁরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের নামে মামলা আছে। পুলিশ তাঁদের মতো ব্যবস্থা নিয়েছে। ওসি কৌশিক যা সমুচিত মনে করেছেন, তা-ই করেছেন। আমি কখনো থানা ও প্রশাসনের কোনো বিষয়ে হস্তক্ষেপ করিনি।’

দলীয় পদ ও মনোনয়ন-বাণিজ্য

মোহনপুর ইউনিয়নে গত ডিসেম্বরে আওয়ামী লীগের সম্মেলন হয়। তাতে আবুল কালাম আজাদকে সভাপতি করা হয়। একই পদে প্রার্থী ছিলেন ইকবাল হোসেন। তিনি অভিযোগ করেন, আবুল কালাম আজাদ ২০১৬ সালে ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিদ্রোহী প্রার্থী ছিলেন। এ জন্য তাঁকে বহিষ্কার করা হয়েছিল এবং তাঁর বিরুদ্ধে দলীয় কার্যালয় ভাঙচুরের মামলাও হয়েছিল। কিন্তু তিনি সাংসদের ঘনিষ্ঠ হওয়ায় পরে উপনির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পেয়ে চেয়ারম্যানও হন।

উল্লাপাড়া পৌরসভার মেয়র এস এম নজরুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ‘প্রতিটি ইউনিয়ন কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের কাছ থেকে পাঁচ লাখ করে টাকা নিয়েছেন সাংসদ। আমি নিজেও পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি পদের জন্য ছয় লাখ টাকা দিয়েছি।’ তাঁর দাবি, ২০১৫ সালের পৌর নির্বাচনের সময় সাংসদ তাঁর কাছ থেকে ৩০ লাখ টাকা নিয়েছিলেন।

এ বিষয়ে তানভীর ইমাম বলেন, ‘টাকাপয়সার যে কথা বলা হচ্ছে, তার প্রশ্নই ওঠে না। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া মেনে তৃণমূলে দলীয় কমিটিগুলো করা হয়।’ পৌর মেয়রের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘নজরুল প্রথমবার যখন মেয়র হন, তখন তাঁর নির্বাচন করার পয়সা ছিল না। আমিসহ নেতা-কর্মীরা তাঁর খরচের জোগান দিয়ে নির্বাচন করে দিয়েছি। আজকে পাল্টা প্রশ্ন তুলেছেন। এটা দুঃখজনক।’

২০১৯ সালে উল্লাপাড়া উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পান সাবেক সাংসদ শফিকুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, তখন তাঁর কাছে এক কোটি টাকা দাবি করেন সাংসদ। টাকা না দেওয়ায় তাঁর বাড়ি ঘেরাও করেছিলেন সাংসদের লোকজন। এর এক সপ্তাহ পর তিনি সাংসদকে ২১ লাখ টাকা দিয়েছিলেন উপজেলা পরিষদে সাংসদের বসার কক্ষে। তখন সেখানে সাংসদের তখনকার ব্যক্তিগত সহকারী শওকাত ওসমান ও উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান উপস্থিত ছিলেন।

সাংসদের ওই সময়কার একান্ত সহকারী সচিব শওকাত ওসমান এখন সলপ ইউপির চেয়ারম্যান। তিনি শফিকুলের কাছ থেকে সাংসদের টাকা নেওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। তবে উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মনিরুজ্জামান বলেন, তিনি টাকা নেওয়ার বিষয়ে কিছু জানেন না। সে সময় তিনি ঢাকায় ছিলেন।

এ বিষয়ে সাংসদ তানভীর ইমামের ভাষ্য, ‘শফিকুলের সঙ্গে দুজন স্বতন্ত্র প্রার্থী ছিলেন। শফিকুল আমাকে এসে বলেন, “ভাই, আমার নির্বাচন করে দিতে হবে।” আমি স্বতন্ত্র দুজনকে বসিয়ে দিতে সক্ষম হলে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। টাকাপয়সার আলাপ আসবে কোথা থেকে? এটা ঢাহা মিথ্যা।’

এবারের ইউপি নির্বাচনে উল্লাপাড়া সদর ইউনিয়নে দলীয় মনোনয়ন পান ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুস সালেক। বিদ্রোহী প্রার্থী হন ইউনিয়ন কমিটির সহসভাপতি রফিকুল ইসলাম এবং কার্যকরী সদস্য আকমল হোসেন। এ কারণে দুজনই দল থেকে বহিষ্কৃত হন।

দলীয় সূত্র জানায়, এই তিন প্রার্থীর কাছ থেকেই দলের মনোনয়ন পাইয়ে দেওয়ার কথা বলে তানভীর ইমাম টাকা নিয়েছেন তাঁর একান্ত সহকারী সচিব আরিফুল ইসলামের (উজ্জ্বল) মাধ্যমে। এই তিনজনের মধ্যে আকমল টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করলেও টাকার পরিমাণ বলতে রাজি হননি। আর নবনির্বাচিত চেয়ারম্যান আবদুস সালেক টাকা দেওয়ার কথা স্বীকার করেননি। তিনি বলেন, টাকাপয়সার কোনো লেনদেন হয়নি। আরিফুলও টাকা নেওয়ার কথা অস্বীকার করেছেন।

আর সাংসদের দাবি, ‘মনোনয়ন নিয়ে কারও কাছে টাকা দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। আকমল ও রফিকুল নির্বাচনে সুবিধা নেওয়ার জন্য এসব কথা বলেছে। তারা বোঝাতে চেয়েছিল, এমপিকে টাকা দিয়েছি মানে আমি এমপির আশীর্বাদপুষ্ট।’

তবে রফিকুল ইসলাম বলেন, দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার আগে সাংসদ তাঁকে ডেকে নিয়ে মনোনয়ন দিতে চান। এ জন্য আরিফুলের সঙ্গে দেখা করতে বলেন। আরিফুলকে কত টাকা দিয়েছেন—জানতে চাইলে রফিকুল ইসলাম এ নিয়ে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, ‘আমি ব্যবসা-বাণিজ্য করি। আমাকে চলতে হবে।’ (শেষ)

(প্রতিবেদন তৈরিতে সহায়তা করেছেন সিরাজগঞ্জ প্রতিনিধি আরিফুল গণি)